কোভিড-১৯: পরীক্ষায় পিছিয়ে, মৃত্যুহারে এগিয়ে বাংলাদেশ

  • রিয়াজুল বাশার ও ফারহান ফেরদৌস, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-04-02 19:45:09 BdST

বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রথম ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর গত প্রায় এক মাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে সংখ্যা এসেছে, তা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম হলেও মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

এর বিপরীতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরীক্ষায় অধিকাংশ দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যে তথ্য দিয়েছে তাতে, এ পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাসজনিত রোগ কোভিড-১৯ এ দেশে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৬ জন, তাদের মধ্যে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এই হিসাবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের ১০ দশমিক ৭১ শতাংশের এ রোগে মৃত্যু হয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারীতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে যেসব দেশে, তার মধ্যে ইতালিতে মৃত্যুহার ১১.৮৯ শতাংশ, স্পেনে ৯.০১ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ২.৩৭ শতাংশ, চীনে ৪.০৩ শতাংশ, ফ্রান্সে ৬.৯৯ শতাংশ এবং ইরানে ৬.৩৭ শতাংশ।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি নিয়ে সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এমন একটি গাবেষণামূলক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারস ডট ইনফোর তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসে পুরো বিশ্বে মৃত্যুর হার এখন ৫ দশমিক ০৮ শতাংশ।

দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো দেশই মৃত্যুহারে বাংলাদেশের কাছাকাছি নেই। বাংলাদেশ ছাড়া এ অঞ্চলের কোনো দেশেই মৃত্যুহার তিন শতাংশ অতিক্রম করেনি।

এর মধ্যে ভারতে মৃত্যুর হার ২.৮৫ শতাংশ, পকিস্তানে ১.৩৫ শতাংশ, আফগানিস্তানে ১.৬৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ২.০৩ শতাংশ। নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপে আক্রান্ত রোগী থাকলেও কারও মৃত্যুর তথ্য এখনও আসেনি।

অবশ্য আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে মৃত্যুহার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হার সুদানে ২৮.৫৭ শতাংশ । এঙ্গোলা, গাম্বিয়া ও বোতসোয়ানাতে মৃত্যুহার ২৫ শতাংশ করে, গায়ানায় ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ। সিরিয়ায় ও নিকারাগুয়ায় ২০ শতাংশ।

এদিকে বাংলাদেশে নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করলেও করোনাভাইরাস পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সমালোচনা হয়েছে অনেক।  

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য বাতায়ন, তাদের হটলাইন এবং ৩৩৩ নম্বরে এ পর্যন্ত কোভিড-১৯ সংক্রান্ত কল এসেছে ১০ লাখ ৪২ হাজারের বেশি। এর মধ্যে পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ১৯০০ জনকে।

অর্থাৎ, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ১১ দশমিক ০৫ জনের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়েছে এ পর্যন্ত।

কিন্তু আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা নামের একটি ওয়েবসাইটে বিভিন্ন দেশে মোট পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, চীনে ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি ১০ লাখে পরীক্ষা করা হয়েছে ২২২ দশমিক ৩০ জনকে, ইতালিতে ২০ মার্চ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪২২ জনকে, জাপানে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ১১৮ জনকে, মালয়শিয়াতে ২০ মার্চ পযন্ত ৪২৯ জনকে, অস্ট্রেলিয়াতে ২০ মার্চ পযন্ত ৪ হাজর ৪৫৬ জনকে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ৩১৪ জনকে, ভারতে ১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি ১০ লাখে ৩৫ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে।

এতদিন বাংলাদেশে পরীক্ষা কম হল কেন জানতে চাইলে আইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিএমএর কেন্দ্রীয় কাযনির্বাহী কমিটির সদস্য ড. মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোযেন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সবাই শুধু টেস্ট টেস্ট করছে। শুরুতে অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করেছে। কিন্তু সিংগভাগের মধ্যেই পাওয়া যায়নি। এখন এখানে বাছাই করতে হবে। স্যাম্পল নেওয়ার ক্রাইটেরিয়া ওয়াইড হয়েছে “

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস রোগী ধরা পড়ার কথা আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয় গত ৮ মার্চ। তার আগ পর্যন্ত বিদেশ থেকে আসা কারও মধ্যে জ্বর-কাশির মত উপসর্গ থাকলে কেবল তখনই পরীক্ষা করার কথা ভাবা হত। 

প্রথম দিন যে তিনজন রোগী পাওয়ার কথা বলা হয়, তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন বিদেশফেরত, তাদের একজনের মাধ্যমেই পরিবারের একজন সংক্রমিত হন।

এরপর পরীক্ষার আওতা বাড়িয়ে বলা হয়, বিদেশ থেকে ফেরা এবং তাদের সংস্পর্শে আসা কারও মধ্যে উপসর্গ পাওয়া গেলে আইইডিসি আর পরীক্ষা করবে।

এরই মধ্যে খবর আসে বিভিন্ন হাসপাতালে শ্বাসতন্ত্র ও নিউমোনিয়ার রোগী বেড়ে গেছে, যাদের মধ্যে কোভিড-১৯ রোগীও থাকতে পারে।

তখন ঠিক হয়, হাসপাতালে তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে যারা ভর্তি হয়েছেন এবং প্রচলিত চিকিৎসায় সুস্থ হচ্ছেন না, তাদের নমুনাও পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা হবে।

এদিকে দেশে যখন ভাইরাস সংক্রমণের ক্লাস্টার পাওয়া গেল, অর্থাৎ এক জায়গায় অনেকের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ল, তখন তাদের ঘনিষ্ঠজন এবং তাদের সংম্পর্শে আসা ডাক্তার, নার্সদেরও নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা শুরু হল।

ড. মুশতাক বলেন, “কোয়ারেন্টিন এলাকার মধ্যে যাদের লক্ষণ থাকছে, তাদেরও এখন টেস্ট করা হচ্ছে। তার মানে যাদের এপিডেমিক্যাল লিংকেজ আছে, লক্ষণসহ ও লক্ষণছাড়া, যারা ক্লোজ কন্টাক্টে আছেন, তাদের স্যাম্পল নেওয়া হচ্ছে। তাহলে স্যাম্পলের নেটটা কিন্তু ওয়াইড হয়ে গেল।

“কনফার্মড কেইস পাওয়া গেছে দুই/একটা, যাদের কন্টাক্ট লিংক অনেক বড়। এরকম অনেক অনেক স্যাম্পল নিতে হচ্ছে। লক্ষণ থাক বা না থাক। এখানে নেগেটিভ আসছে বেশি। যদি ওয়াইড ট্রান্সমিশন হয়, তখন রোগীর সংখ্যাও বাড়বে।”

ড. মুশতাক আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কিছু দিন আগে অবসরে গেলেও করোনাভাইরাসের এই সঙ্কটকালে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছে সরকার।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে টেস্ট নেট যখন ওয়াইড করলাম, তখনও নেগেটিভ আসছে বেশি। তার মানে হল, আমাদের দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এখনও খুবই লিমিটেড। কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের মাত্রা যদি বেড়ে যায়, তখন র‌্যানডম টেস্ট নিলেও পজিটিভ আসবে বেশি।”

পরীক্ষা কম বলে মুত্যুহার বেশি দেখাচ্ছে?

করোনাভাইরাসে মৃত্যুর বৈশ্বিক যে গড়, সে তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুহার বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে দেশে কোভিড-১৯ পরীক্ষা কম হওয়াকে কারণ বলে মনে করছেন একজন গবেষক।

আইইডিসিআরের সাবেক ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোযেন্টিফোর ডটককে বলেন, “এতদিন শুধু সিভিয়ার কেইস হলে টেস্ট করেছে। তাদের মধ্যে মরবিডিটি ছিল বেশি। ফলে মোট রোগীর মধ্যে মৃত্যু বেশি হয়েছে। এখানে যদি মাইল্ড, মডারেট কেইসও পরীক্ষার আওতায় আসত, তাহলে রোগীর সংখ্যা বেশি দেখাত, মৃত্যুহার তখন এত বড় মনে হত না।”

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড. মুশতাক বলেন, পরীক্ষায় যাদের কোভিড-১৯ ধরা পড়ছে, কেবল তাদেরই হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে, এবং তাদের সংখ্যাই আক্রান্তের তালিকায় দেখা যাচ্ছে।

অনেকে হয়ত সংক্রমণের সন্দেহ করছেন, কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না। তারা কোভিড-১৯ রোগী হিসেবে গণ্য হচ্ছেন না। এটা মৃত্যুহার বেশি দেখানোর একটি কারণ হতে পারে বলে মত দেন মুশতাক।

রোগীরা যে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছে না, সেজন্য কারা দায়ী?

এ প্রশ্নের উত্তরে ড. মুশতাক বলেন, “রোগী তো আসতেই চায়। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে একবারে ম্যানেজমেন্ট থেকে বলে দিয়েছে যে, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের রোগী ভর্তি করা যাবে না।

“সরকারি হাসপাতালে এখন সে অবস্থা নাই। সবারই মাস্ক ও পিপিই আছে। এখন বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের ভর্তি হওয়ার পরিবেশটা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে বলে মনে হয়।”