পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

গণটিকাদানের শেষ দিনেও অব্যবস্থাপনায় ক্ষোভ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-08-12 17:57:06 BdST

করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে বড় পরিসরে টিকাদানে সপ্তাহব্যাপী যে কর্মসূচি পালিত হল, তাতে অব্যবস্থাপনাই প্রকট হয়ে দেখা দিল।

দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও অব্যবস্থাপনার কারণে তাদের টিকা নিতে বেগ পেতে হয়েছে অনেককে। অনেকে টিকাই পাননি। মুখ দেখে টিকা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

মহামারীর বিরুদ্ধে সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে গত শনিবার থেকে দেশজুড়ে ছয় দিনের গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার।

ছয় দিনে ৩২ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য

টিকা পেতে সন্ধ্যা থেকেই লাইনে  

এর শেষ দিন বৃহস্পতিবার টিকা নিতে আগ্রহী অনেক মানুষই ভিড় করেছিলেন রাজধানীর টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে।

ভাটারায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ের গণ টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভোরেই দীর্ঘ লাইন হয়ে গেছে।

সকাল সাড়ে ৭টার দিকে টিকা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে জানিয়ে লাইনে না দাঁড়াতে সবাইকে কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে মাইকে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। এতে অনেকেই টিকা না নিয়ে কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান।

ভাটারা নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা আজিফা খাতুন জানান, এর আগেও দুদিন এসে ফিরে যেতে হয়েছে তাকে।

বাড্ডা লিংক রোডের বাসিন্দা নিশাদ তাবাসসুম তন্বী বলেন, “গতকাল আসছিলাম। তখন বলছে, টিকা শেষ। আজকে আসতে বলছে। এখন তো বলতেছে দিবেই না।”

ভাটারার বাসিন্দা ইয়াসিন বলেন, “তিন-চারদিন ধরে ঘুরতেছি। নিজেদের লোকদের বেছে বেছে আগে দিয়ে দিচ্ছে। সরকারের টিকা সাধারণ জনগণ কেন পাবে না?”

সকাল সোয়া ৮টার দিকে কেন্দ্রে আসা বৃদ্ধ আলম মিয়াকে কাউন্সিলর কার্যালয়ের চৌকিদার হযরত আলি টিকা দেওয়া হবে না জানিয়ে ফেরত যেতে বলেন।

আলম মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভেতরে কিছু লোক ঢুকছিল টিকা নিতে। তখন আমি চৌকিদারকে বললাম, এরা কারা? সে বলছে, এরা অফিসের লোক। এর বাইরেও কিছু লোক ভেতরে ঢুকছে। তাদের কথা জানতে চাওয়ার পর বলছে, এরা রিলিফ নিতে আসছে।

“কিন্তু এ সময়ে কিসের রিলিফ? ওরা নিজেদের লোকদের টিকা দিতে ভেতরে পাঠাচ্ছে।”

বেলা বাড়ার সাথে সাথে টিকা নিতে আসা মানুষের উপস্থিতিও বাড়ছিল। অপেক্ষামানদের একদল লোক ১৬ তারিখের পর বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া হবে জানিয়ে ফিরে যেতে বলেন। তারা নিজেদের ‘কাউন্সিলরের লোক ও তার কার্যালয়ের লোক’ বলে পরিচয় দেন।

কাউন্সিলরের কার্যালয়ের পাশের বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম বাদল বলেন, “পরপর তিন দিন আসছি। প্রথম দিন আসার পর বলে সিল মারতে হবে। সিল মারার জন্য গেলাম তখন বলছে, বিকাল ৪টায় আসেন। এর মধ্যে দেখলাম কিছু মানুষ সাইড দিয়ে কাগজ দিয়ে সিল মেরে ‍নিচ্ছে। আমাদের পরিচিত লোক না থাকায় আমাদের দেয়নি।

“৪টায় আসার পর আমাদেরটা নেয়নি। দেখলাম তাদের বেশ পরিচিত কিছু লোক তাদেরকে সিল মেরে দিচ্ছে। এরা পরেরদিন এসে সিরিয়াল ধরে ভ্যাকসিন নিচ্ছে। পরপর দুই তিনদিন আসছি একই ঘটনা।”

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “অনেক মানুষের সাথেই এমন হচ্ছে। তারা বোঝাতে চাচ্ছে, তাদের কাছে সাড়ে তিনশ ভ্যাকসিন আসে; এগুলা কত মানুষকে দেবে। কিন্তু আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকা পাচ্ছি না, অনেকে হুট করে এসে টিকা নিয়ে চলে যাচ্ছে। তাদের পরিচিত জনেরা পরে এসে আগে পেয়ে যাচ্ছে। এটা ভালো করে তদারকি করা হোক। এগুলা অবিচার।”

আরেক টিকাপ্রত্যাশী রাশিদা বেগম বলেন, “ধাক্কায়ে বের করে দিতেছে। এতক্ষণ কইতেছে দিবই না, এখন কয় টোকেন লাগবে। কাউন্সিলরের ভাই জাহিদে সিল মাইরা দিছে। আমরা সিল অনুযায়ী আইছি। এখন কয় টোকেন নিতে। ওরা টোকেন না দিলে আমরা কই পামু।”

এসময় টিকা নিতে আসা লোকদের উদ্দেশে ভাটারা থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক পরিচয় দেওয়া দিপুকে বলতে শোনা যায়, “যোগাযোগ রাখতে হবে তো। এতদিন সিরিয়াল দিছে, সিরিয়াল কালকে রাতে বিক্রি করা শুরু হইছে পাঁচশ, এক হাজার টাকায়।”

তবে সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও একদল লোককে টিকা নিতে দেখা গেছে।

সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী খলিলুর রহমান বলেন, “কাউন্সিলর অফিসের লোকজন বলছে আজকে আসতে, তাই আসছি।”

ব্র্যাকের সহযোগিতায় এই কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হচ্ছে। ব্র্যাক জানিয়েছিল, যারা নিবন্ধন করেছেন, কিন্তু এসএমএস পাননি তাদের ৯টি কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে।

অন্য এলাকা থেকে কেন্দ্রে আসা এমন টিকাপ্রত্যাশীদেরও ফিরিয়ে দিয়েছেন কাউন্সিলর কার্যালয়ের পরিচয়দানকারীরা।

জানতে চাইলে কেন্দ্রে থাকা ব্র্যাকের এরিয়া ম্যানেজার মির্জা হাফিজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কাউকে বাধা দেওয়ার বিষয়টা আমার জানা নেই।”

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে কয়েকবার ফোন দিলেও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শফিকুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি।

এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের সচিব নেছার আহমেদ রাসেল ৩৫০ জনকে আগেই টোকেন দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, “আমরা ঠিক করছি আত্মীয়-স্বজন আর ভোটারদের দিব, এছাড়া অল্প টিকা সঠিকভাবে বিতরণের কোনো রাস্তা নাই। গতকাল থেকে এ টোকেন সিস্টেম চালু করছি। গতকাল থেকে লাইনে ভোটারের বাইরে কেউ থাকলে তাকে আমি বের করে দিছি।”

নেছার বলেন, “আমরা ৮টায় আসতে বললে পাবলিক আসে আগের দিন ৮টায়। সেজন্য কে আগে এলো এটা দেখে রাতেই সিল মেরে দেই। তারপর আমি বলতে পারি, সিল মারার বাইরে কেউ দাঁড়ায়েন না। সিল মেরে দিলে আমার হাতে হিসাব থাকে।”

তবে টোকেন বিক্রি হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, “কেউ যদি টোকেন বিক্রি করে থাকে, তাহলে তার বিচার হবে সে যেই হোক।” 

এদিকে সকালে মিরপুরের পল্লবী ২নং ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টারে দেখা যায় টিকার জন্য কয়েকশ' মানুষের সারি।

গত কয়েকদিন চেষ্টা করেও টিকা না পাওয়ায় তাদের অনেকেই রাত থেকে টিকাকেন্দ্রের সামনে জড়ো হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

তবে টিকাদান শুরুর পর থেকেই কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের পরিচয়ে পিছনের ফটক দিয়ে কেউ কেউ টিকা নিচ্ছিলেন। এ নিয়ে সারিতে দাঁড়ানো টিকাপ্রত্যাশীরা বিক্ষোভ দেখালেও সে তৎপরতা বন্ধ হয়নি।

ফলে টিকা নিতে বিলম্ব হওয়ায় কেউ কেউ টিকা ছাড়াই ফেরত যান। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে দেখা যায়, টিকা শেষ হয়ে যাওয়ায় সারিতে দাঁড়ানো অনেকেই টিকা পাননি।

এই কেন্দ্রে টিকা না পেয়ে হতাশ নাসরিন সুলতানা বলেন, “টিকা তো পেলাম না। দুই-তিন দিন আসলাম, প্রতিদিনই পিছন দিক দিয়ে লোক ঢুকছে। আত্মীয়স্বজন, দলের লোক- এসব পরিচয়ে ঢুকছে। আবার কবে টিকা দিবে, তখন তো এমনই হবে।”

আরেক টিকাপ্রত্যাশী সোহেল রানা জানান, ২ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা না হওয়ায় টিকাকেন্দ্রের গেইট থেকে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

“আমরা ঢাকায় কাজকাম করে খাই। এখন টিকা নিতে কি আমরা গ্রামে যাব? এখানের ভোটার না হই, আমি তো দেশের নাগরিক?”

তবে এসব বিষয় নিয়ে এই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কেউই কথা বলতে চাননি।

অব্যবস্থাপনার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র রোবেদ আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকার তো সবাইকে টিকা দিতে বলছে। এরকম কিছু হয়ে থাকলে সেটা ঠিক হয়নি। সরকারের তো এরকম কোনো নির্দেশনা ছিল না।”

টিকা নেই, পল্লবীতে বন্ধ থাকল কার্যক্রম

গণটিকাদান কর্মসূচির মধ্যেই টিকা সংকটে রাজধানীর মিরপুরের বর্ধিত পল্লবীর একটি নিয়মিত টিকাকেন্দ্রে বৃহস্পতিবার টিকা দেওয়া বন্ধ ছিল।

সকাল থেকে কয়েকশ’ টিকাপ্রত্যাশী নগর মাতৃসদন কেন্দ্রে আসলেও সবাইকে টিকা না নিয়েই ফিরে যেতে হয়েছে।

কবে নাগাদ আবার প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া শুরু হবে তা জানাতে পারেননি এই কেন্দ্রের কেউই।

বৃহস্পতিবার সকালে কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের ভেতর-বাইরে শতাধিক মানুষ টিকা কার্ড নিয়ে এসেছেন।

তারা জানান, বৃহস্পতিবার এই কেন্দ্রে টিকা নেওয়ার এসএমএস পেয়েই তারা এসেছেন। টিকার মজুদ না থাকায় তাদের এর আওতার বাইরেই থাকতে হচ্ছে।

মিরপুর ১২ নম্বরের বাসিন্দা ফরিদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এতদিন অপেক্ষা করে আজকে ডেট পেয়েছিলাম। কিন্তু তারা টিকা দিচ্ছে না। টিকা নেই বলছে। কিন্তু কবে আসবো সেটাও বলতে পারছে না। তারাও নাকি জানে না। বলতেছে, নিউজে দেখে আসার জন্য।”

টিকা নিতে আসা গৃহকর্মী মনিরা বেগম জানান, গত দুইদিন টিকা না পেয়ে আজ তিনি আগেভাগেই এসেছিলেন কেন্দ্রে।

“টিকার ডেট তো পুরান হয়ে যাচ্ছে। একটু টেনশনই হচ্ছে। পরে টিকা আবার কবে পাবো। দিনদিন ভিড়ও বাড়তেছে।”

এই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মী মোহাম্মদ ইয়াসিন জানান, এই কেন্দ্রে এতদিন মডার্নার প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হচ্ছিল।

“আজকে আর টিকা নাই তাই কাউকেই টিকা দিচ্ছি না। যারা আসছে তাদের চলে যেতে বলছি।”

কবে আবার প্রথম ডোজ টিকা প্রদান করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটা আমরা বলতে পারছি না। শনিবার থেকে আমরা মডার্নার দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিব। প্রথম ডোজ টিকা যদি সরকার দিতে বলে, তখন আবার শুরু হবে।”

টিকাদান বন্ধের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র রোবেদ আমিন বলেন, “যেসব কেন্দ্রে টিকা শেষ হয়ে গেছে, সেসব কেন্দ্রে টিকাদান বন্ধ ছিল। কাল-পরুশু পেয়ে গেলে হয়ত আবার শুরু করবে।”