পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

এনসিডি কর্নার দিচ্ছে চিকিৎসা, সঙ্গে ভরসা

  • ওবায়দুর মাসুম, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2022-05-17 10:55:16 BdST

সত্তরোর্ধ্ব রেহানা বেগমের উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি ডায়াবেটিসে রয়েছে; কিন্তু শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তার ছিল না। মাস ছয়েক আগে তিনি খোঁজ পান এনসিডি কর্নারের।

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের কমলপুরের এই দরিদ্র নারী এখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নন কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) কর্নারে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা আর ওষুধ পাচ্ছেন। নিয়মিত ফলোআপ হওয়ায় আগের চেয়ে ভালো আছেন অনেকটা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে রেহানা বললেন, “পাওডা (পা) অবশ অইয়া যায়গা, জির্বা (জিহ্বা) শুকায়া যায়গা, শইলডা কাইপ্পা উঠে। আমার বাবারা (চিকিৎসক) চিকিৎসা কইরা দিছে। এখন ভালা আছি। আল্লাহর রহমতে সুস্ত অইয়া গেছি।”

উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস আক্রান্তদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় ‘উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং ফলোআপ’ কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে।

সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর- এই ছয় জেলার ৫৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন এনসিডি কর্নারের সেবা মেলে। সহযোগী হিসেবে সেখানে চিকিৎসা সেবা দেয় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ।

এই কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ৭ লাখের বেশি মানুষের উচ্চ রক্তচাপ স্ক্রিনিং করা হয়েছে। উচ্চ রক্তচাপের নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন ৮৮ হাজার ২৭২ জন। ডায়াবেটিস আক্রান্তদের মধ্যে ৯ হাজার ৬০০ জন চিকিৎসা ও নিয়মিত ওষুধ পাচ্ছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, বাংলাদেশে প্রতি বছর মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ হয় অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ হৃদরোগ এবং সরাসরি ডায়াবেটিসের কারণে মারা যায় তিন শতাংশ।

অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর মারা যায় ৫ লাখ ৭০ হাজার ৬০০ জন মানুষ। এর ২২ শতাংশেরই অকাল মৃত্যু, অর্থাৎ প্রত্যাশিত গড় আয়ু পুরো হওয়ার অনেক আগেই তারা চিরবিদায় নিচ্ছেন রোগে ভুগে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের একটি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্ত বয়স্কদের ২৫ দশমিক ২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। আর আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের ২০২১ সালের হিসাবে, বাংলাদেশের প্রাপ্ত বয়স্ক জনসংখ্যার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

গত শনিবার ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা গেল, এনসিডি কর্নারে রোগীদের ভিড়। কেউ প্রথমবার এসেছেন, কেউ এসেছেন ফলোআপে।

স্থানীয় বাসিন্দা আলকাস মিয়া বললেন, হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত ঝরায় তিনি দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। প্রাথমিকভাবে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে তার।

এনসিডি কর্নারের চিকিৎসক এক মাসের ওষুধ দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার ওই সমস্যাডা আর নাই, আগের চাইতে ভালো আছি। তয় শইলডা কিছু দুর্বল। আইজকা আবার ওষুধ নিতাম আইলাম।”

ভৈরব শহরের আমলাপাড়ার বাসিন্দা অঞ্জনা রানী দাস ডায়াবেটিসে ভুগছেন ছয় বছর ধরে। ৪০ বছর বয়সী এই নারীর স্বামী ভৈরব স্টেশন এলাকায় লন্ড্রি চালান।

অঞ্জনা বলেন, করোনাভাইরাস মহামারীতে আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। জরুরি ওষুধ কেনার সামর্থ্যও আর ছিল না। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে এনসিডি কর্নারের কথা জানতে পেরে এখানে আসেন।

“প্রথম প্রথম গলা শুকাইয়া আসত। কিমুন লাগত আমি নিজেও কইতারতাম না। ডাক্তার দেহানোর পর জানলাম ডায়বিটিস অইছে। ঔষধ কিন্না খাইছি অনেক দিন। কিন্তুক করোনা আওয়ার পরে টাকার অভাবে খাইতাম পারছি না, অনেক দাম। আমরার এক আফায় এই হাসপাতালের কথা কইছে, হেয় নিয়া আইছে।”

ভৈরবের নবীপুর এলাকার মোহাম্মদ আবুল বাশার দুই বছর ধরে হৃদরোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিসে ভুগছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন গত চার মাস ধরে। আগে মাসে মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হত। এখন এনসিডি কর্নার থেকে বিনামূল্যে ওধুষ পাচ্ছেন।

“এই সার্ভিস দিয়া আমরার অনেক উপকার করছে। বেশিরভাগ ওষুধ এইহানেথে দেয়। পাঁচ-সাতশ টাকার ওষুধ বাইরেত্থে কিন্না খাই।”

এনসিডি কর্নারের মেডিকেল অফিসার ডা. উম্মে হাবিবা জুঁই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, যতটা সম্ভব ওষুধ তারা রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়ার চেষ্টা করেন। যেসব ওষুধের সরবরাহ থাকে না, সেগুলো বাইরে থেকে কিনে নিতে বলেন।

“এখানে আসা রোগীদের বেশিরভাগই ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং কিডনির রোগে আক্রান্ত। যাদের দীর্ঘমেয়াদী হাইপারটেনশন আছে, তারা একটা সময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। আবার ডায়াবেটিস থাকলে এক সময় তিনি হৃদরোগের সমস্যায় ভোগেন।

“আমরা প্রথমে রোগীকে ব্যবস্থা আর এক মাসের ওষুধ দিই। এক মাস পর নিয়মিত ফলোআপে আসতে বলা হয়। তাছাড়া যে কোনো সময় যে কোনো সমস্যায় হাসপাতাল চলে আসতে পারবেন।”

এনসিডি কর্নারে মার্চ মাসে ৩৪৩ জন এবং এপ্রিল মাসে ২৭৫ জন নতুন রোগী নিবন্ধন করেছেন বলে জানান ডা. উম্মে হাবিবা।

কীভাবে চিকিৎসা নেওয়া যায়

এনসিডি কর্নারে চিকিৎসা নিতে প্রথমে হাসপাতালের কাউন্টার থেকে পাঁচ টাকার টিকেট কিনতে হবে। এরপর রোগীর স্ক্রিনিং হয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস আছে কি না তা পরীক্ষা করেন একজন স্বাস্থ্যকর্মী।

স্ক্রিনিংয়ের পর রোগীকে পাঠানো হয় মেডিকেল অফিসারের কাছে। রোগীর কি ধরনের অসুস্থতা আছে তা দেখে ব্যবস্থাপত্র দেন চিকিৎসক।

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে রোগী যান একজন নার্সের কাছে। তিনি একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে রোগীর নাম নিবন্ধন করেন। পাশাপাশি রোগীর সব তথ্য নেওয়া হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এক মাস সেবন করার মত ওষুধ দেওয়া হবে রোগীকে

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শামীম জুবায়ের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, এ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ৭ লাখ ২৬ হাজার মানুষের উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করা হয়েছে। ৯২ হাজার মানুষ নিবন্ধন করেছেন, তারা নিয়মিত চিকিৎসা এবং ওষুধ পাচ্ছেন। উচ্চ রক্তচাপের জন্য তিনটি এবং ডায়াবেটিস আক্রান্তদের দুটি ওষুধ নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে এ কর্নার থেকে।

“এনসিডি কর্নার থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন এমন রোগীদের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের রোগীদের চিকিৎসা করা এবং প্রিমেচিওর ডেথ কমিয়ে আনা- এটাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের অবজারভেশন, যারা নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা সুস্থ আছেন।”

এনসিডি কর্নার হবে ২০০ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. রোবেদ আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হৃদরোগের মূল কারণ উচ্চ রক্তচাপ।

“স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের মূল রিস্ক ফ্যাক্টর হাইপারটেনশন, বিশ্বজুড়ে এটা প্রমাণিত। যাদের দীর্ঘমেয়াদী ডায়াবেটিস আছে তাদেরও একটা সময় হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়।”

তিনি বলেন, এনসিডি কর্নার করা হয়েছে অসংক্রামক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। এখন উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পরে অন্যান্য এনসিডিও এর আওতায় আসবে।

“আক্রান্তদের একটা কম্প্রিহেনসিভ কেয়ার দেওয়ার চেষ্টা এটা, যাতে তারা হাইপারটেনশন এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। এতে স্ট্রোক এবং হার্টের অসুখ থেকে দূরে থাকা যায়।”

রোবেদ আমিন জানান, সারাদেশে এনসিডি কর্নারের সংখ্যা ২০০ তে উন্নীত করার চিন্তা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।