১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৫ ফাল্গুন ১৪২৫

মুক্তিযুদ্ধের কিশোর উপন্যাস ‘শরণার্থী শিবির থেকে’

  • মুনশি আলিম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-01-14 14:48:30 BdST

bdnews24

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা মৌলিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি ‘শরণার্থী শিবির থেকে’। মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী শিবির প্রেক্ষাপট নিয়ে এই উপন্যাস। বইটির লেখক মোজাম্মেল হক নিয়োগীর লেখা আবেগঘন, শিবিরে এদেশের হতভাগা প্রায় কোটি মানুষের যাপিতজীবনের প্রতিচ্ছবি- একটি কিশোর উপন্যাস।

একটি সফল উপন্যাসের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তার সবগুলোই রয়েছে এ উপন্যাসে। এ উপন্যাসের ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে দেশপ্রেমের মন্ত্র, নিটোল অন্তর্বয়ান, শরণার্থীদের জীবনযন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাস এবং তেজোদীপ্ত অঙ্গীকারে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদাত্ত আহ্বান। যে বয়ানের পথ ধরে পাঠক অবলীলায় ঘুরে আসবে মুক্তিযুদ্ধের নানা প্রান্ত।

সম্মোহিত বর্ণনার ভাষাগুণে পাঠক ক্রমাগত মোহাচ্ছন্ন হবে। লেখনীর নিখুঁত আঁচড়ে কোনো কোনো চরিত্র এত বেশি জীবন্ত হয়ে উঠছে যে, সে চরিত্রের সুখ পাঠকের সুখ বলে মনে হবে; আবার সে চরিত্রের ট্র্যাজেডি পাঠকের নিজের ট্র্যাজেডি বলে মনে হবে। এককথায়, এ উপন্যাস পঠনপাঠনে পাঠকহৃদয় ক্রমাগতই দলিতমথিত হবে, কখনও উচ্ছ্বসিত হবে, আবেগ আর ঘটনার শৈল্পিক মিশেলের নতুন রসায়নে পাঠক নিয়ত সিক্ত হবে। এক দুর্বার চুম্বকীয় আকর্ষণ ও উত্তাপ উপন্যাসের সূচনাবিন্দু থেকে পাঠককে নিয়ে যাবে চূড়ান্ত সীমারেখায়।

এ উপন্যাসের পটভূমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের শরণার্থী জীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহ, সেইসঙ্গে তাদের বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, সাহসিকতা, রণাঙ্গনে নৈপুণ্যসহ যাপিতজীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতময় ভয়ংকর সময়ের বাস্তবানুগ বর্ণনা এ উপন্যাসকে দিয়েছে ভিন্নধর্মী ব্যঞ্জনা। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনা পরম্পরায় স্থানিক বৈশিষ্ট্যে তিনটি স্থানকে দৃশ্যায়িত করা হয়েছে; যুদ্ধপূর্ব ঢাকা শহর, যুদ্ধ চলাকালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাঘমারা শরণার্থী শিবির এবং সম্মুখ যুদ্ধের সময় বর্তমান বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকা। স্থান ও চরিত্রের বর্ণনায় লেখককে মনে হবে একজন সফল শব্দশিল্পী যেখানে প্রতিটি উপাদানই জীবন্ত, দৃশ্যমান।

২০১৮ সালে ‘চিত্রা প্রকাশনী’ থেকে এ উপন্যাসটির দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়। এতে মোট পর্ব রয়েছে ২১টি। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নাজমুল ইসলাম বাবু নামের এক বুদ্ধিদীপ্ত দুর্দান্ত মেধাবী কিশোর। বয়স তেরো বছর। ছোটোবেলায় পিতা আবদুল হামিদ মারা যাওয়ার পরই মা আজিজার অন্যত্র বিয়ে হয়। শুরু হয় বাবুর জীবনের দুর্ভোগের করুণ অধ্যায়। এসময় তার ভরণপোষণের দায়িত্ব এসে পড়ে বড়ো বোন দিলারার ওপর।

পাকিস্তানিদের অতর্কিত আক্রমণে ২৫ মার্চ কালো রাতে হাজার হাজার নিরীহ বাঙালির মৃত্যু ঘটে। এরাতে বাবুর দুলাভাই কাজ থেকে আর বাসায় ফেরেনি। দিলারা আর বাবুর অপেক্ষা অপেক্ষায় দিন যায়, রাত যায়, কিন্তু বাসায় ফেরেনি প্রেসের প্রুফরিডার দুলাভাই। ক্রমেই ঢাকার পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকলে একসময় পাশের বাসার কাশেমের পরামর্শে ও অনুরোধে গ্রামে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

একদিন ভোরবেলায় কাশেমসহ তারা দুই পরিবার গ্রামে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। কখনও হেঁটে, কখনও রিকশায় এবং শেষে নদীপথে নৌকায়। কিছুদূর যেতেই পাকিস্তানি ও রাজাকারদের যৌথ আক্রমণের শিকার হয়। দিলারার ছেলে টিপু কান্না করা মাত্রই তাকে পানিতে ছুঁড়ে ফেলে দেয় পাক হায়েনারা। কাশেমের ছমাস বয়সি মেয়েকে আছাড় মেরে একেবারে নিথর করে ফেলে। কাশেমকে গুলি করে নদীর কিনারে ফেলে দেয়। বাবুর বোনকে হায়েনারা ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় বলে ‘খুব সুরত লাড়কি আছে হ্যায়।’

বাবু দিলারাকে রক্ষা করতে গেলে লাথি মেরে এক রাজাকার তাকে পানিতে ফেলে দেয়। এরপর সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে নদীর কিনারে। পরের দিন গিরিশচন্দ্র, গিরিবালা, নীলা, বিমলসহ ভারতগামী শরণার্থীদের চোখে পড়ে বাবু। গিরিশচন্দ্র নদীর পার থেকে বাবুকে নিজেদের নৌকায় তুলে এবং চোখে পানির ঝাপটা, হাতেপায়ে তেল মালিশ করে যমের হাত থেকে ফিরিয়ে আনে। এরপর থেকেই সে তাদের পরিবারের সদস্য হয়ে যায়। হিন্দু পরিবারে আশ্রিত হয় বাবু এবং উপন্যাসের নতুন এক বাঁক, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের উত্তাপস্পর্শ পাঠকহৃদয়কে নতুন আঙ্গিকে ভাবতে শেখায়।

পুরো পরিবার আশ্রয় নেয় ভারতের বাঘমারা শরণার্থী ক্যাম্পে। তাদের নাম রেজিস্ট্রি করা হলো। তাঁবু নাম্বার ৮২২। ক্যাম্পে নাম রেজিস্ট্রি করার সময় গিরিশচন্দ্র মুসলমান ছেলে বাবুকে নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকলেও স্ত্রী গিরিবালার মাতৃত্বের অমোঘ দরদ ও দৃঢ়তার সঙ্গে যখন বলে, ‘জীবন-মরণের সময় আবার হিন্দু-মুসলমান কী? বাবু আমাদের সাথেই থাকবে। দরকার হলে নাম পাল্টিয়ে দাও।’ গিরিশচন্দ্রের মন কি স্নেহশূন্য! একজন শিক্ষকের মনও অপত্য স্নেহের দুর্বলতায় কম্পিত হয়! অবশেষে বাবুকে পুত্রতুল্য করে ৮২২ নম্বর তাঁবুতে ভারত সরকারের আশ্রয়ে আশ্রিত হয় তারা। 

ক্যাম্পে একদিন দিল্লির সাংবাদিক হৃষিকেশ রায় আসেন শরণার্থীদের জীবন ও বাংলাদেশের খবরাখবর জানতে, পরিচয় ঘটে বাবুর সঙ্গে। এক অদ্ভুত সুন্দর চরিত্রের মানুষ হৃষিকেশ। হিন্দির মতো বাংলা বলা, ইংরেজি-হিন্দি-অশুদ্ধ বাংলা মিশেলের ভাষার এক নিটোল চিত্র এঁকেছেন লেখক। মৃত্যুপুরীতে বসে হৃষিকেশ বাবুর চরিত্রের ভিতর দিয়ে লেখক পাঠককে নিয়ে যায় অন্যরকম আবেশে।

ক্যাম্পের পাশেই সোমেশ্বরী নদী। ক্যাম্পে ২ লাখের বেশি শরণার্থী। এ ক্যাম্পটা যেনো একটা মৃত্যুপুরী! এখানে প্রতিদিনই বিনা চিকিৎসায় পঞ্চাশ থেকে ষাটজন মানুষের মৃত্যু ঘটে। চর্মরোগ, পয়ঃনিষ্কাশনের তীব্র সংকট, ডায়রিয়া, পানির সংকটের কারণেই শিশু ও বৃদ্ধরাই যেন মৃত্যুর মিছিলে। ওই ক্যাম্পেও তখন গড়ে ওঠে নানা রকম কালো ব্যবসা, কালোবাজার আর অর্ধেক মূল্যে শ্রম বিক্রি করতে থাকে হতভাগা মানুষেরা। অবস্থাসম্পন্ন মানুষেরা পাহাড়ে আদিবাসীদের বাসা ভাড়া নিয়ে থাকলেও গরিব মানুষেরাই ক্যাম্পে থাকে।

নারায়ণের মাধ্যমে বাবু একসময় মুক্তিযুদ্ধে যায়। প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় বাবুর সঙ্গে পরিচয় ঘটে ইসহাকের। আর তার সূত্র ধরেই সে পরিচয় পায় তার হারিয়ে যাওয়া মা আজিজার। এ সময় আজিজা গর্ব করেই বলে ‘আমার বাবু মুক্তিযোদ্ধা। আমার বাবু দেশ স্বাধীন করবে।’ বাবুর অসামান্য ম্যাপিং, যুদ্ধকৌশল, রণনৈপুণ্য এমনকি তার বোনের সন্ধান পাওয়াসহ বিশদ জানতে পাঠকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করতে হবে উপন্যাসের পুরো অংশ।

উপন্যাসে কিছু অংশে রয়েছে বাবুর নিজের মুখে বয়ন, কিছু অংশে নীলার আর কিছু অংশ উত্তম পুরুষে বর্ণিত। তবে কখনো-সখনো বাবু ও নীলার বর্ণনাভঙ্গি বয়স অনুযায়ী একটু বেশিই পরিপক্ক মনে হয়েছে; তবু তা পাঠকহৃদয়কে মমতার পরশে সিক্ত করে রাখে। দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত বাবু চরিত্রটি লেখক অত্যন্ত দরদ দিয়ে নির্মাণ করেছেন। প্রকারান্তরে এ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক অসাম্প্রদায়িক চেতনার মন্ত্রই যেন ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন।

শরণার্থী শিবির থেকে উপন্যাসে যেনো সত্যিকার মুক্তিযুদ্ধের কাহিনীই তুলে ধরা হয়েছে। হাসনা, তুলসিতলা, রাজগাতি, সুন্দাইল, তালজাঙ্গা, কেন্দুয়া, নান্নাইল, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, তাড়াইল, মদন থানাসহ প্রভৃতি স্থানগুলোর বর্ণনা ও ঘটনায়  যুদ্ধেরই প্রতিফলন মিলে। গিরিশচন্দ্র, গিরিবালা, নীলা, বিমল, দিলারা, ইসহাক প্রমুখ পার্শ্বচরিত্র হিসেবে উপন্যাসের গতিকে ত্বরাণিত করেছে। 

প্রতিটি পর্বের শুরু এবং শেষে রয়েছে কথাসাহিত্যিকের নিটোল চমক। দেশেপ্রেমের মাহাত্ম্য প্রতি পর্বে তথা প্রতি অধ্যায়েই সুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। দেশেপ্রেমে উজ্জীবিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সফল চরিত্রগুলো হলো নারায়ণ, সামাদ, কালাম, জামাল ও রশিদ। ঔপন্যাসিকের শিল্পগুণের কারণেই এ চরিত্রগুলোকে মনে হয় চিরচেনা আর জীবন্ত। আর এখানেই একজন গুণী ঔপন্যাসিকের শিল্পসার্থকতা।

ঔপন্যাসিকের লেখনীর নিখুঁত আঁচড়ে বাস্তবের মতোই জীবন্ত হয়ে উঠেছে রাজাকার চরিত্রগুলোও। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য চরিত্র হলো টিএইচ তালুকদার চেয়ারম্যান, জুম্মত আলী, আকবর, শাবু, বজলু, সিদ্দিক ও হিরণ। যুদ্ধে রক্তক্ষরণ, হৃদয়ক্ষরণ উভয়ই থাকতে পারে। তবে তা প্রয়োগে লেখককে একটু সংযত ও কৌশলী হতে হয়। বাস্তবতা ও আবেগকে জীবন্ত করতে গিয়ে প্রতি পর্বেই কান্নার চিত্র একটু বেশি সংযোজিত হয়েছে। তবুও প্রয়োগের শিল্পসফলতায় তা উপন্যাসকে দিয়েছে ভিন্নধর্মী ব্যঞ্জনা।

উপন্যাসের বর্ণনাশৈলী এতই সাবলীল ও জীবন্ত যে একজন সচেতন পাঠক পড়ামাত্রই তার মনে হতে পারে এটি লেখকের আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার বস্তুনিষ্ঠ শিল্পফসল। ঔপন্যাসিকের জীবনচেতনা, বস্তুনিষ্ঠতা, সমাজবোধের গভীরতা কোনো কোনো উপন্যাসকে তীব্র, তীক্ষ্ণ, গূঢ়ভাষী শিল্পকর্মে পরিণত করে। আর এমনই একটি উপন্যাস হলো ‘শরণার্থী শিবির থেকে’। বিষয়, আঙ্গিক ও সুললিত অন্তর্বয়ানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জীবনচেতনার সার্থক রূপায়ণ ঘটেছে এ উপন্যাসে।

উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক এবং মানবতাবিরোধীদের কূটকৌশল ও বিভিন্ন অপরাধের ঘৃণ্যচিত্র স্বতন্ত্র মহিমায় ফুটে উঠেছে। হানাদার বাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতন, ধ্বংসযজ্ঞের চালচিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও স্বপ্নময় আকাঙ্খা, স্বজন হারানোর বেদনা, মুক্তির উল্লাস, দেশপ্রেম প্রভৃতি বিষয়গুলো এ উপন্যাসে নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে। এ উপন্যাস পাঠ মানে প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধকেই পাঠ করা।

মূলত ঔপন্যাসিকের উপস্থাপনা, ভাষার কাব্যিক ব্যঞ্জনায় ছোট্ট, হৃদয়গ্রাহী উপন্যাসটি পাঠক যতই পড়বে ততই বিষমবেদনায় উদ্বেলিত হবে। এটি নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধের একটি মৌলিক উপন্যাস; আর ঐতিহাসিক সত্যতার চুলচেরা বিশ্লেষণে মৌলিক দলিলও বটে।

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!


ট্যাগ:  বইয়ের পোকা