২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬

শশীকাহন: পৌরাণিক উপাখ্যান পর্ব ১

  • রাজুব ভৌমিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-07-13 14:26:52 BdST

bdnews24

বহুকাল আগের কথা। পৃথিবীর তখনও সৃষ্টি হয়নি। সৌরজগতে শুধু চন্দ্র ও সূর্য নামে দুটি গ্রহ ছিল।

সূর্য গ্রহে ছিল মূলত দেবতাদের বসবাস। আর চন্দ্র গ্রহে ছিল শশীদের বসবাস। সূর্যগ্রহ তিনভাগে বিভক্ত ছিল। সূর্যের এক ভাগের নাম ছিল মহালয়। দ্বিতীয় ভাগের নাম ছিল নার্ক এবং তৃতীয় ভাগের নাম ছিল শান্তিকুঞ্জ।

মহালয় হলো সব দেবতাদের বাসস্থান। মহালয় থেকে উৎপন্ন আলো দিয়ে সৌরজগতের অন্ধকার দূর হয়। দেবতাদের রাজা কৃতনু তার পরিবার নিয়ে মহালয়ের সুরী সমুদ্রের উপর বিশাল অট্টালিকায় থাকে। দেবরাজ কৃতনু হচ্ছে আলোর দেবতা। তার হাতে বিশাল এক আলোর দণ্ড আছে। সে আলোর দণ্ড থেকে উৎপন্ন আলোতে সৃষ্টি এবং ধ্বংসের ক্ষমতা বিদ্যমান।

তার স্ত্রী মহাদেবী উষা হচ্ছে জ্ঞানের দেবতা। তার ডান হাতের তালু দেখতে কিছুটা বইয়ের মতো। তার ডান হাতের তালুতেই আছে সৌরজগতের সর্বজ্ঞানের সৃষ্টি এবং ধ্বংস। দেবরাজ কৃতনু ও মহাদেবী উষার দশ ছেলে এবং তিন মেয়ে।

অন্যদিকে, সূর্যগ্রহের দ্বিতীয় বিভাগ নার্ক হল পাপীদের স্থান। আত্মার মৃত্যুর পর সৌরজগতের সব পাপীদের শাস্তি এখানে হয়। এখন নার্কে কেউ নেই। সূর্যগ্রহে সবাই এখন পুণ্যবান। নার্কে এখনো কাউকে সাজা দেয়া হয়নি। দেবরাজ কৃতনু ভবিষ্যতের কথা ভেবে নার্ক গঠন করেছে। নার্কের রাজা জিগি। সে দেবরাজ কৃতনু ও মহাদেবী উষার বড় ছেলে।

শান্তিকুঞ্জ হলো পুণ্য আত্মার স্থান। মারা যাবার পর সব পুণ্য আত্মার স্থান এখানে হবে ভেবে দেবরাজ কৃতনু এই স্থান অনেক মনোরম করে গড়ে। শান্তিকুঞ্জে এখন বিভিন্ন পশুপাখিরা থাকে। আর মাঝে মাঝে দেবতারা ক্লান্তিদূর করতে শান্তিকুঞ্জে যায়। আবার অনেক দেবতা শান্তিকুঞ্জে ধ্যান করার জন্য ও যায়। শান্তিকুঞ্জের রাজা আদি। সে দেবরাজ কৃতনু ও মহাদেবী উষার কণিষ্ঠ ছেলে।

দেবরাজ কৃতনু ও মহাদেবী উষার দ্বিতীয় ছেলের নাম বানহি। বানহি আগুনের দেবতা। তৃতীয় ছেলের নাম কিতমু। কিতমু দুষ্কর্মের ও পাপের দেবতা। চতুর্থ ছেলের নাম আম্ভু। আম্ভু অস্ত্রের দেবতা। পঞ্চম ছেলের নাম জিনরু। জিনরু সমুদ্র ও বৃষ্টির দেবতা। ষষ্ঠ ছেলের নাম হিংকা। হিংকা মৃত্যুর দেবতা। সপ্তম ছেলের নাম শিশক্রু। শিশক্রু ধন-সম্পদের দেবতা। অষ্টম ছেলের নাম কুন্ত্রা। কুন্ত্রা পর্বতের দেবতা। নবম ছেলের নাম কৃহনু।কৃহনু পাপনাশের দেবতা।

দেবরাজ কৃতনু ও মহাদেবী উষার বড় মেয়ের নাম মুকি। মুকি ভালবাসা ও কামনার দেবী। দ্বিতীয় মেয়ের নাম আজ্রিয়া। আজ্রিয়া যুদ্ধ ও বিচারের দেবী। কণিষ্ঠ কন্যার নাম লিনিয়া। লিনিয়া জীবন দানের দেবী।

চন্দ্র গ্রহে শশীদের বসবাস। শশীরা দেখতে কিছুটা মানুষের মতো। ওদের হাতগুলো পাখির ডানার মতো। এরা সবাই উড়তে পারে। শশীদের সৃষ্টি হয় মহারাজ শশাঙ্ক ও মহারানী কুর্নষা

থেকে। শশাঙ্ক ও কুর্নষা একদিন শান্তিকুঞ্জের পুষ্পপুরী নামক এক বাগানে অন্যান্য পাখিদের সাথে থাকত। শশাঙ্ক তখন ছিল পাখিদের মহারাজা আর কুর্নষা মহারানী।

একদিন ভালবাসা ও কামনার দেবী মুকি পুষ্পপুরীতে শন্তু গাছের তলায় ধ্যান করছে। গভীর ধ্যানে সে মগ্ন। হঠাৎ গাছের একটি বড় ডাল মুকির গায়ের উপর পড়ে। এতে মুকির গভীর ধ্যান ভঙ্গ হয়। মুকি চোখ খুলে দেখে তার মাথার উপরে মস্ত শন্তু গাছের ডালের উপরে শশাঙ্ক ও কুর্নষা গভীর মিলনে আবদ্ধ। এতই ঘোর মিলনে তারা আবদ্ধ ছিল যে দেবী মুকিকে তারা দেখেনি। দেবী মুকি তার গভীর ধ্যান ভঙ্গ হওয়াতে রেগে মেগে আগুন।সাথে সাথে দিব্যশক্তির বলে দেবী মুকি শশাঙ্ককে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়।

‘দেবী মাতা, আপনি জগতের মাতা। আমাদের ক্ষমার অযোগ্য ভুল হয়ে গেছে। আমার স্বামীর প্রাণের উপর দয়া করুন। আমার স্বামীকে মারবেন না। আমাকে বিধবা বানাবেন না।’ কুর্নষা হাতজোড় করে কেঁদে কেঁদে দেবী মুকি কে বলল।

‘মূর্খ!! তুই আমার বহু বছরের সাধনা তোর কামের নেশায় ভঙ্গ করলি। আজ তোর মুক্তি নাই!’ দেবী মুকি শশাঙ্ককে বলল।

‘মাতা, ক্ষমা করুন। ক্ষমা করুন। এই হতভাগাকে ক্ষমা করুন মাতা।’ শশাঙ্ক দেবী মুকিকে কেঁদে কেঁদে বলল।

কুর্নষা দেবী মুকির পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করতে লাগল। দেবীর মন কিছুটা নরম হয়।

তারপর দেবী মুকি বলল, ‘আমি তোকে অভিশাপ দিলাম। আজ থেকে তোর কোন বংশধরের স্থান সূর্যগ্রহে হবে না। চন্দ্র গ্রহে হবে তোদের বসবাস। সেখানেই তোরা কাম বাসনায় লিপ্ত থাকবি। বংশের পর বংশ এই কাম বাসনা ও ভোগ- ভালবাসার জন্য তোরা একে অপরকে ধ্বংস করবি।’

দেবী মুকি আরও বলেন, ‘তোদের শরীরেরও পরিবর্তন হবে। তোদের এমন শরীর হবে যা সবসময় তোদের ভোগ ও কামনা বাসনায় লিপ্ত করতে সাহায্য করবে।’

শশাঙ্ক বলল, ‘মাতা, দয়া করুন। আমরা দুজন অনেক পাপ করেছি। দয়া করে আমাদের বংশের প্রতি এমন নির্দয় হবেন না। দয়া করে আমাদের মুক্তির উপায় বলুন।’

‘ঠিক আছে। তোদের মধ্যে যে ভোগ, কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণ করে দেবতাদের কৃপা পাবে শুধু তারাই সূর্যগ্রহের শান্তিকুঞ্জে স্থান পাবে। আর বাকিদের নার্কের সাজা ভোগ করতে হবে।’

এই বলে দেবী মুকি অন্তর্ধান হয়।

মহারাজা শশাঙ্ক এবং মহারানী কুর্নষা পুষ্পপুরীতে বিলাপ করতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর মহারাজা শশাঙ্ক এবং মহারানী কুর্নষা আধা-পাখি ও আধা-মানুষ রূপে পরিবর্তন হলো। অন্য পাখিদেরও দেহ পরিবর্তন হয়।

কিছুক্ষণ পর সবাই চন্দ্র গ্রহে আবির্ভাব হয়। চন্দ্র গ্রহের মনোরম রূপ দেখে তারা অভিভূত হয়। চারদিকে কত সুন্দর বাগান, ফুল ও ফলে ভরা, পাহাড় পর্বতে ঘেরা বিশাল বিশাল নদী ও সমুদ্র। শশাঙ্ক ও কুর্নষা চন্দ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মোহে তাদের অতীত প্রায় ভুলে যায়। কামনা-বাসনায় লিপ্ত হয়। চন্দ্রগ্রহে শশাঙ্ক লামগিন্তা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে প্রায় এক হাজার বছর কেটে যায়।

মহারাজা শশাঙ্ক ও মহারানী কুর্নষার তিন ছেলে। তাদের নাম অখিল, নিম্ব ও মন্জট। অখিল দেবরাজ কৃতনুর ভক্ত। সারাদিন সে ধ্যানে নিমগ্ন থাকে। চন্দ্রের কোনো মোহ তাকে স্পর্শ করে না। সে সিদ্ধান্ত নেয় হিরাসী পর্বতে গিয়ে উপাসনা করে বাকি জীবনটা এভাবেই কাটিয়ে দিবে।

অন্যদিকে মহারাজ শশাঙ্ক অনেক বৃদ্ধ হয়ে পড়ছে। তার খুব আশা যে তার বড় ছেলে অখিল তার রাজ্যের সব ভার নিবে। তার বড় ছেলের সংসারবিমুখতা তাকে প্রচণ্ড চিন্তায় ফেলে দেয়। বড় ছেলে অখিল পিতামাতার অনুমতি নিয়ে লামগিন্তা রাজ্য ছেড়ে হিরাসী পর্বতে চলে যায়। এতে মহারাজা শশাঙ্ক অনেক ভেঙে পড়ে।

মহারাজা শশাঙ্কের কণিষ্ঠ পুত্র মন্জট ছিল দুষ্কর্মের ও পাপের দেবতা কিতমু-এর ভক্ত। মন্জট দেবতা কিতমুর সন্তুষ্টির জন্য বহু যজ্ঞ এবং সাধনা করেছে। কিন্তু দেবতা কিতমু তার মনের ইচ্ছার কথা বুঝতে পেরে মন্জটের সাথে দেখা করবে না বলে ঠিক করেছে। মন্জটও ঠিক করছে যত কঠিন সাধনা করে হোক সে দেবতা কিতমুর দর্শন নেবে। মন্জট ঠিক করে সে দেবতা কিতমুর দর্শন পেতে তুষার পর্বত হৈমন্তিতে একাগ্রভাবে ধ্যান করবে।

তুষার পর্বত হৈমন্তিতে মন্জট যুগের পর যুগ সে কিতমুর সাধনা করে চলছে। কিন্তু দেবতা কিতমুর কোন দেখা নাই। বহুবছর পর মন্জটের সাধনার শক্তি এমনই প্রবল হয় যে তার শরীরের চারিদেকে বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি হয়। আর যত দিন সে সাধনা করে যাচ্ছে ততদিন সেই অগ্নিকুণ্ড বিশাল থেকে বিশালতর হচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে তুষার পর্বত হৈমন্তি ধীরে গলে যাচ্ছে। পর্বতের আশপাশের রাজ্যে হৈমন্তি পর্বতের গলা পানির দ্বারা ডুবে যাচ্ছে। হাজার হাজার শশী মারা যায়। বহু রাজ্য ডুবে যায়। কিন্তু দেবতা কিতমু অনড়। সে মন্জটের সাথে সাক্ষাৎ করবে না।

এদিকে শশীদের এমন দুর্ভোগ দেখে সব দেবতা মহালয়ের সুরী সমুদ্রের উপর বিশাল অট্টালিকায় দেবরাজ কৃতনুর সাথে দেখা করতে হাজির।

পর্বত দেবতা কুন্ত্রা দেবরাজ কৃতনুকে বলল, ‘পিতা শ্রী, কিছু একটা করুন। তুষার পর্বত হৈমন্তি প্রায় ধ্বংসের দিকে।’

‘মন্জটের সাধনার বল এমন আমি তার চারপাশের আগুনকে নিয়ন্ত্রন করতে পারছি না। আমি সত্যিই অসহায় পিতা।’ আগুনের দেবতা বানহি বলল।

‘তুষার পর্বত হৈমন্তির থেকে আশা পানিতে সব সমুদ্র ভরপুর। সমুদ্র কানায় কানায় জলে পরিপূর্ণ ও উত্তাল। এভাবে পানি সমুদ্রে আসতে থাকলে চন্দ্রগ্রহের বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে।’ সমুদ্র ও বৃষ্টির দেবতা জিনরু বলল।

মৃত্যুর দেবতা হিংকা বলল, ‘প্রভু পর্বত থেকে গলা পানিতে বহু রাজ্য ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে হাজার হাজার শশীদের মৃত্যু হয়। এতগুলো আত্মা আমি একসাথে শান্তিকুঞ্জে বা নার্কে স্থানান্তরিত করতে পারছি না।ফলে আত্মাগুলো চন্দ্রগ্রহের আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

ধন-সম্পদের দেবতা শিশক্রু বলল, ‘হে দেবরাজ, চন্দ্রগ্রহের শশীদের অবস্থা খুব খারাপ। খাবারের অভাবে শশীদের করুন অবস্থা। প্রভু, এর একটা উপায় বলুন।’

দেবরাজ কৃতনু অন্তর্যামী। তার কোন কিছুই অজ্ঞাত নয়। তিনি জানেন যে আজকের এ সমস্যার সমাধান এখন করলে সূদুর ভবিষ্যত শশীদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। এ সমস্যার সমাধান ভবিষ্যতে শুধু নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে। কৃতনু আরো জানেন যে এ সমস্যার বর্তমান সমাধান কেবল দেবতা কিতমুই করতে পারে।

দেবতা কিতমু এতক্ষণ নিরবে বসে সব শুনছে। কিছু বলছে না। দেবরাজ কৃতনু জানে কেন কিতমু নিরবে বসে আছে। কিন্তু উপায়ান্তর না দেখে কৃতনু কিতমুকে অনুরোধ করল সমস্যার উপায় বলার জন্য।

‘হে প্রভু আপনি সবই জানেন। সৌরজগতের কোন কিছুই আপনার অজ্ঞাত নয়। বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যত সম্পর্কে আপনার চেয়ে ভাল কেহ জানে না। কিন্তু তারপরও আপনি যদি আদেশ করেন তাহলে আমি মন্জটের সাথে দেখা করতে যাবো। তার ইচ্ছা পূরণ করব।’ কিতমু বলল।

‘শশীদের কর্মই ওদের ভবিষ্যত নিয়ন্ত্রণ করবে। পুত্র কিতমু, তুমি যাও। মন্জটের কঠোর সাধনা ফল দিয়ে নিজের কর্মশেষ কর।’ দেবরাজ কৃতনু বলল।

অন্যদিকে, তুষার পর্বত হৈমন্তিতে মন্জট যুগের পর যুগ সে কিতমুর সাধনা করে চলছে। আর যত দিন সে সাধনা করে যাচ্ছে ততদিন সেই অগ্নিকুণ্ড বিশাল থেকে বিশালতর হচ্ছে।

দেবতা কিতমু মহালয় ত্যাগ করে সঙ্গে সঙ্গে হৈমন্তি পর্বতে মন্জটের সামনে উপস্থিত হয়। কিতমু দেখতে পায় মন্জট একাগ্রচিত্তে কিতনুর ধ্যান করে যাচ্ছে।

‘এবার তোমার চোখ খুল মন্জট। আমি তোমার সাধনায় অনেক খুশি। তোমার মত একনিষ্ঠ ভক্ত এ জগতে মেলা ভার। বলো তুমি কি বর চাও?’ দেবতা কিতমু বলল।

‘প্রভু, আপনার সাথে দর্শন করার জন্য বহুদিন অপেক্ষা করে আছি। আপনার দর্শনে আমি জীবন সার্থক হল।’ মন্জট বলল।

সে আরও বলল, ‘প্রভু, আমি দুটি বর চাই।”

‘বল তুমি কি চাও। যা চাইবে তা পাইবে। সৌরজগত ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু আমার দেয়া বর অক্ষুন্ন থাকবে।’ কিতমু বলল।

‘প্রভু, এক বরে আমি আপনাকে পুত্র হিসেবে সাত জন্মে পেতে চাই। আর দ্বিতীয় বর হচ্ছে আমার জীবনে একটি মহাপাপ করবো আর সে পাপের ভাগীদার শুধু আপনিই হবেন। সে পাপ যেন আমাকে স্পর্শ করতে না পারে বা আমাকে মৃত্যুর পরে সে পাপকর্মের জন্য শান্তিকুঞ্জে যেতে বাধা যেন না পেতে হয়।’ মন্জট বলল।

মন্জটের বর দুটি চাওয়ার পর পরই সারা চন্দ্রগ্রহ কেঁপে উঠল। আকাশে বিজলী ও তুফান নেমে আসে। দেবতা কিতমুর চোখে জল এসে গেল। মহালয় থেকে অন্য দেবতারা সব দেখছে। আর একে অন্যের দিকে বিস্মিত হয়ে তাকাচ্ছে। এখন সবাই বুঝতে পারল কেন এতদিন দেবতা কিতমু মন্জটের সাধনার ডাক দেয়নি।

‘ঠিক আছে, তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। আমি এই জন্মে প্রথম তোমার পুত্র সন্তান হিসেবে জন্ম নিব।’ এই বলে দেবতা কিতমু অন্তর্ধান হল।

রাজকুমার মন্জট হৈমন্তি পর্বত ছেড়ে লাগগিন্তা রাজ্যে চলে যায়। লাগগিন্তা রাজ্যে গিয়ে সে মহারাজা শশাঙ্ক ও মহারানী কুর্নষাকে বলে তার সাধনার সিদ্ধিলাভ করছে আর দেবতা কিতমুর সাথে দর্শন হয়েছে। কিন্তু মন্জট যে দুটি বরও পেয়েছে সে খবর কাউকে বলেনি। বড় ছেলে অখিল রাজ্য ও সংসারের মায়া ছেড়ে হিরাসী পর্বতে চলে যাবার পর মহারাজ শশাঙ্ক অনেক বিচলিত চিলেন। কিন্তু কিতমুর সাধনার সিদ্ধিলাভের কথা শুন মহারাজ খুব প্রসন্ন হল।

কিছুদিন পর মহারানী কুর্নষা মহারাজকে বলল, ‘মহারাজ অখিল তো সংসার ছেড়ে পর্বতবাসী হল। আপনিও বৃদ্ধ। রাজভারের মত কর্ম এখন কি আর মানায়?

‘হ্যাঁ কুর্নষা, আমিও সেটাই ভাবছি গত কয়েকদিন। ইচ্ছে ছিল আমাদের বড় ছেলে অখিল একদিন লাগগিন্তা রাজ্যে সমস্ত ভার নিবে। অখিলের চেয়ে এই সংসারে ভাল যোদ্ধা আর কেউ নেই। সমস্ত অস্ত্রবিদ্যায় অখিল পারদর্শী ছিল। কিন্তু কি আর হবে আমাদের ভাগ্য খারাপ।’ মহারাজ বলল।

‘মেজপুত্র নিম্ব ও অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী। তার মত এমন সুদর্শন পুরুষ মহালয় এবং শান্তিকুন্জতে ও নাই। তাই নিম্বকে যুদ্ধ ও বিচারের দেবী আজ্রিয়া অনেক পছন্দ করে। আজ্রিয়া নিম্বকে অনেক ভালবাসে। ওরা দুজন মিলে লাগগিন্তা রাজ্যে সুদিন নিয়ে আসবে।’ মহারানী বলল।

‘মহারানী একটি রাজ্য চালানো সহজকর্ম নয়। তাছাড়া লাগগিন্তা রাজ্য অনেক বিশাল। এত বিশাল রাজ্যের ভার নিতে হলে বিশেষ গুণের প্রয়োজন হয়। তাছাড়া চারপাশের অন্য রাজ্যগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের সাথে যুদ্ধ বাধার সুযোগ খোঁজে।’ মহারাজ বলল।

‘কিন্তু উপায় কী মহারাজ?’

‘রাজবংশের নিয়ম অনুযায়ী বড়ছেলে রাজা হবে সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু অখিল যেহেতু নেই তার পরিবর্তে নিম্ব রাজা হওয়া পরম্পরা। রাজ্যসভায় সবার সাথে বিষয়টি আলাপ করে আর শুভক্ষণ নির্ধারণ করে একদিন নিম্বের রাজ্যাভিষেক করতে হবে।’ মহারাজা বলল।

(চলবে)

লেখক পরিচিতি: রাজুব ভৌমিক হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে তিনি জন জে কলেজ, সিটি ইউনিভার্সিটি নিউ ইর্য়কে অপরাধবিদ্যা, আইন ও বিচার বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। এছাড়া নিউ ইর্য়ক সিটি পুলিশ বিভাগের কাউন্টার টেরোরিজম কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেন তিনি। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২১।

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com । সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!


ট্যাগ:  দাদাইয়ের গল্প