রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধার পার্থক্য

  • মো. রেজাউল করিম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-12-19 16:56:48 BdST

bdnews24
অলঙ্করণ: সোহাগ পারভেজ

বাবার কাঁধে বসে আছে তৃনা। আজ তার বাবা তাকে সারা মাঠ ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখাচ্ছে। তাই তৃনা খুব খুশি।

আজকের দিনটাকে তার বেশি ভাল লাগছে। আজ সে লাল-সবুজ জামা পরেছে। বাম হাতে একটা লাল বেলুন ধরে আছে। আর ডান হাত দিয়ে তার বাবার মাথার চুল আলতো করে ধরেছে। বাম হাতের বেলুনটি বাতাসে উড়ছে।

সে শক্ত করে বেলুনের সুতা ধরে আছে। মাঝে মাঝে একটু বাতাস বেশি হলে বেলুনটি উড়ে যেতে চায়। কিন্তু তৃনা শক্ত করে বেলুনের সুতা ধরে রাখে। বেলুন উড়ে যেতে পারে না।

হঠাৎ মাইকে গোলাগুলির শব্দে তৃনা হকচকিয়ে উঠে। বাবাকে শক্ত করে চেপে ধরল। ভীরু-ভীরু কণ্ঠে বলে- বাবা! বাবা! ওই দেখো মাঠের মধ্যে গোলাগুলি হচ্ছে। ঘরগুলোতে আগুন লেগেছে।

মেয়ের কথা শুনেই রফিকুলের বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। মনে মনে মেয়ের কথায় হাসতে লাগল। তারপর হেঁটে হেঁটে ভিড়ের মধ্যে চলে এলো। কম লোকজন দেখে রফিকুল দাঁড়িয়ে পড়ল। তৃনা তখনও বাবার মাথার চুলগুলো শক্ত করে ধরে আছে।

রফিকুল তার মেয়েকে বলল, মাঠের মধ্যে সত্যি সত্যি আগুন লাগেনি। ওইখানে একদল ছেলে-মেয়ে অভিনয় করছে। তৃনা অবাক হয়ে বলল, বাবা কিসের অভিনয়?

রফিকুল মেয়ের এমন প্রশ্ন শুনে বললেন, মুক্তিযুদ্ধের অভিনয়। কিভাবে আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তা অভিনয়ের মাধ্যমে সবাইকে দেখানো হচ্ছে।

বাবার মুখে অভিনয়ের কথা শুনে তৃনার ভয়টা কমে গেল।

আচ্ছা বাবা, কারা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল?

রফিকুল বলল, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা ঘরগুলোতে আগুন লাগিয়েছিল। আর তাদের সাহায্য করেছিল এদেশের কিছু পদলেহি মানুষ। যাদের মানুষ ঘৃণা করে ‘রাজাকার’ বলে।

কেন আগুন লাগিয়েছিল বাবা? তৃনার এমন কঠিন কথা শুনে রফিকুল বলল, এখন তুমি ওই অভিনয় দেখ। বাসায় গিয়ে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দেবো। তৃনা বলল, বাসায় গিয়ে কিন্তু সব বলতে হবে।

রফিকুল হাসতে হাসতে বলল, হুম। সব বলব।

তৃনা মনোযোগ দিয়ে মাঠের অভিনয়ের দৃশ্য দেখতে লাগল। তৃনা দেখল, একদল বন্দুকধারী লোক বাড়ি-ঘরগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিল। আগুনে বাড়ি-ঘরগুলো দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল। একদল মানুষ বাড়িঘর হতে দৌড়ে পালিয়ে যেতে লাগল।

কিন্তু বন্দুকের গুলিতে লোকগুলো মারা গেল। মারা যাওয়া লোকগুলোর মধ্যে নারী ও শিশুরাও ছিল। তাদের মারা যাওয়ার দৃশ্য দেখে তৃনার মনটা খারাপ হয়ে গেল। মনে মনে সে ভাবতে লাগল, কেন এই সাধারণ মানুষ ও শিশুদের মেরে ফেলা হলো! মানুষগুলো কেন এতো নিষ্ঠুর?

বন্দুকধারী লোকজন ওই মারা যাওয়া মানুষগুলোর এমন করুণ পরিণতি দেখে হাসতে লাগল আর তাদের দেখে আনন্দ করতে লাগল। তাদের সাথে থাকা কিছু বন্দুক ছাড়া মানুষও আনন্দে নাচতে লাগল। মানুষ মেরে ফেলে, শিশুদের মেরে ফেলে তারা আনন্দ করছে।

এরা কি মানুষ! দৃশ্যটি তৃনার মনে গভীর ছাপ সৃষ্টি করল। মনে মনে ওই মানুষগুলোর প্রতি ঘৃণা হলো। মনে মনে বলল, ছি! বনের হিংস্র পশুরা অন্য পশুকে মেরে ফেলেও তো এমন উল্লাস করে না। তবে মানুষ কেন এসব করে?

এমন সময় মাইকে একটি মানুষের কথা ভেসে এলো। খুব বজ্রকণ্ঠ। গগন বিদারী শ্লোগান ‘জয় বাংলা’। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। সে কণ্ঠ শোনামাত্র চারদিক থেকে অনেক মানুষ বন্দুক হাতে নিয়ে পোশাক পরা বন্দুকধারী ওই মানুষগুলোকে আক্রমণ করল।

তাদের কেউ কেউ মারা গেল, কেউ কেউ পালিয়ে গেল। তাদের এমন অবস্থা দেখে মাঠের সব মানুষ হাততালি দিতে লাগল। তাদের হাততালি দেখে তৃনাও হাততালি দিল। আর তখনই বাম হাতে থাকা লাল বেলুন ফুস করে তার হাত থেকে ছুটে গেল। আকাশে উড়ে যেতে লাগল তার পছন্দের লাল বেলুন।

তৃনা তখন বাবাকে ডেকে বলল, বাবা! বাবা! আমার লাল বেলুনটা আকাশে উড়ে যাচ্ছে। রফিকুল আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার মেয়ের লাল বেলুনটি আকাশে উড়ে যাচ্ছে। বেলুনটির আকাশে উড়ে যাওয়ায় রফিকুলের তেমন খারাপ লাগল না। তার কাছে মনে হলো, আজ এই দিনে বেলুনের উড়ে যাওয়া আমাদের স্বাধীনতার কথাই মনে করে দেয়। যে স্বাধীনতা আমাদের এনে দিয়েছিল মুক্তির স্বাদ। প্রাণ খুলে হাসার সুযোগ। ভালভাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।

রফিকুল তৃনাকে কাঁধের উপর থেকে মাটিতে নামাল। লোকজনের ভিড় থেকে ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়াল। তৃনা বাবাকে বলল, বাবা আবারও বেলুন কিনব। রফিকুল মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল ঠিক আছে। মাঠে তখন বিজয় দিবস-২০১৯ সালের অনুষ্ঠান রীতিমতো চলছে। তৃনা বাবার হাত ধরে মাঠের মধ্যে হাঁটতে লাগল।

হাঁটতে হাঁটতে তৃনা বাবাকে বলল, বাবা আমি পতাকা কিনব। রফিকুল একজন ফেরিওয়ালার কাছে গেল। তৃনা ছোট্ট একটা পতাকা হাতে নিয়ে উড়াতে লাগল। আর একটি ব্যান্ড পতাকা নিয়ে মাথায় প্যাচালো। তৃনা বাবাকে বলল, বাবা আমাদের দেশের পতাকা লাল-সবুজ রঙের কেন?

মেয়ের কথা শুনে রফিকুল বলল, আমাদের দেশটার রঙ সবুজ। তুমি যেদিকে তাকাবে শুধু সবুজ দেখতে পাবে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। আর এই সবুজ দেশটাকে স্বাধীন করার জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন দিয়েছিল। দুই লাখ মা-বোন তাদের সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়েছিল।

আরও নাম না জানা হাজারও মানুষ দেশের জন্য নিজেদের জীবন বিসর্জন করেছিল। সবুজে ভরা এই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য মানুষ অকাতরে বিলিয়েছে তাদের বুকের তাজা লাল রক্ত। আমাদের স্বাধীনতা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। তাই এই দেশের পতাকা লাল-সবুজ।

বাবার কথা শুনে তৃনা তার পরনে জামার লাল বৃত্ত দেখিয়ে বলল, বাবা এই যে লাল। হাতের পতাকা দেখিয়ে বলল, এই লাল, এ যে রক্ত! আমাদের দেশের মানুষের রক্ত। আমাদের স্বাধীনতা। হঠাৎ তৃনা বলল, বাবা আমি আইসক্রিম খাবো। মেয়ের আবদার শুনে রফিকুল বলল, ঠিক আছে। আইসক্রিম খাবে।

রফিকুল ও তৃনা ঘুরে ঘুরে বিজয় দিবসে আসা স্কুল কলেজের শতশত ছোট ছেলে-মেয়েদের দেখতে লাগল। আর হাজারও মানুষ ওই ছেলে-মেয়েদের নানারকম কুচকাওয়াজ দেখতে লাগল। রফিকুল দেখল একটি মেয়ে বীরাঙ্গনা সেজে মাঠের মধ্যে আনমনে ঘুরছে। প্রথমে দেখে তার মনে হয়েছিল মেয়েটি বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে এমন করে সেজে এসেছে। কিন্তু পরে বুঝতে পারল মেয়েটি বীরাঙ্গনা সেজে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। ভালভাবে দেখার জন্য তারা আর একটু এগিয়ে গেলো।

রফিকুল মেয়েকে বলল, দেখ ওই ছোট্ট মেয়েটি বীরাঙ্গনা সেজেছে। খুব সুন্দর লাগছে। তৃনা বলল, বাবা বীরাঙ্গনা কি?

রফিকুল মেয়েকে বললেন, ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা শুধু আমাদের দেশের নিরীহ মানুষকে হত্যায় করেনি। তারা সবার বাড়িঘরও জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া আমাদের মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রেখেছিল। তাদেরকে নির্মম অত্যাচার করেছিল। সেই অত্যাচারিত অসহায় মেয়েদের ‘বীরাঙ্গনা’ বলে।

কিছু সময় পর ‘বীরাঙ্গনা’ সেজে আসা মেয়েটি দর্শকদের মধ্যে হারিয়ে গেল। মাঠের মধ্যে তখন একটি স্কুলের ডিসপ্লে চলছিল। হঠাৎ মাঠের পশ্চিম পাশে শোরগোল দেখা গেল। রফিকুল লোকজনকে দুপাশে সরে যেতে দেখল। লোকজন দু-পাশে সরে গিয়ে ছোট একটি রাস্তা করে দিল। দেখা গেল একটি ভ্যানগাড়ির উপর তিনজন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা সেজে মাঠের মধ্যে আসছে।

প্রতিটি ছেলে গায়ে কাদা মেখেছে। কাঠ কেটে বন্দুক বানিয়ে সবাই একটি করে বন্দুক ধরে আছে। ছোট ছোট ছেলেদের মুক্তিযোদ্ধা সাজতে দেখে সারা মাঠ সরগরম হয়ে উঠল। সবাই একসাথে হাততালি দিতে লাগল। সবার হাততালি দেওয়া দেখে তৃনাও হাততালি দিতে লাগল।

তৃনা বাবাকে বলল, বাবা ওরা কি সেজেছে? রফিকুল বললেন, ওরা মুক্তিযোদ্ধা সেজেছে। সে আবারও বলল, মুক্তিযোদ্ধা কারা? ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশের হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তাঁরাই মুক্তিযোদ্ধা। শুধু তাঁরাই না এ দেশের চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষক, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক, কবি, স্চ্ছোসেবী, কৃষক, শ্রমিকরাও মুক্তিযোদ্ধো ছিল। এক কথায় এদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা সামান্যতম অবদান রেখেছিল তাঁরাই মুক্তিযোদ্ধা।

তৃনা বলল, বাবা তুমি কি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলে?

রফিকুল বলল, না। তৃনা বলল, কেন মুক্তিযুদ্ধ করোনি বাবা?

রফিকুল বলল, তখন আমি তোমার মতো ছোটটি ছিলাম। বাবার কথা শুনে তৃনার হাসি পেল। সে মনে মনে ভাবল, বাবাও আমার মতো ছোট ছিল!

বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান তখনও শেষ হয়নি। স্কুলের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ডিসপ্লে শেষে মাঠের মধ্যে বসে আছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার লুকিয়ে লুকিয়ে বাদাম, চানাচুর, আচারের দোকানে ভিড় জমিয়েছে। মাঠের চারপাশ দিয়ে হরেক রকমের দোকানিরা নানা রকম জিনিস নিয়ে দোকান বসিয়েছে। বিশাল এ মাঠে মানুষে মানুষে পরিপূর্ণ। মানুষের কোলাহলে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠেছে।

রফিকুল আর তৃনা বাসায় আসার জন্য একটি রিকশা নিলো। রিকশায় উঠার আগে তৃনা আবারও একটা বেলুন নিলো। এবারও সে লাল-সবুজ রঙের একটা বেলুন কিনলো। রিকশায় উঠে রফিকুল একটি বিষয় লক্ষ্য করল, শুধু মাঠের মধ্যেই হাজার-হাজার মানুষ না, রাস্তাঘাটেও মানুষে মানুষে পরিপূর্ণ। ছোট-বড় সবাই আজ লাল-সবুজের রঙে উল্লসিত। সব মানুষের চোখেমুখে স্বাধীনতার নির্মল সুখের এক বর্ণচ্ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। যে বর্ণচ্ছটায় আলোকিত হয়েছে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।

মিনিট দশের মধ্যে রিকশা তৃনাদের বাসায় সামনে এসে দাঁড়াল। তৃনা বাসার কলিংবেল বাজাতে লাগল। তৃনা তার বাবার হাত ধরে গেটে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ তৃনা বাবার হাত ধরে টানতে টানতে বলল, বাবা! বাবা! এখন কিন্তু আমাকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতে হবে। রফিকুল মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে।

বাসায় মেইন গেট খুলে গেল। তৃনা বাসার ভিতর চলে গেল। তখনও তার মাথায় প্যাচানো লাল-সবুজ পতাকা। হাতে লাল-সবুজের ছোট পতাকা। আর গায়ে ছিল লাল-সবুজে জামা। যার বুকের অংশটা ছিল গাঢ় লাল।

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  দাদাইয়ের গল্প