দুই বেড়াল বোনের আত্মকাহিনী, পর্ব ২

  • সুস্মিতা ও রেদওয়ান, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-12-24 08:20:03 BdST

bdnews24

পরদিন সকালে এ নিয়েতো বাসায় মহা হুলুস্থুল লেগে গেলো, 'বেড়াল ভাগাও' আলোচনাটা শুরু হলো। কিন্তু কোনো অ্যাকশন নেয়া হলো না।

আগেই বলেছি যে, এই বাসায় খাবারের কোনো অভাব আমরা কোনোদিন দেখিনি। কিন্তু তারপরও আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের বেড়াল-সুলভ আচরণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করলো। আমরা লাফ দিয়ে ডাইনিং টেবিলে উঠা শুরু করলাম এবং টেবিলে রাখা বিভিন্ন খাবারে নাক লাগিয়ে শুঁকে দেখতাম।

কখনো কখনো কিছু খাবার একটু মুখেও দিতাম- টেস্ট করার জন্য। আমাদের এই বেড়ালসুলভ আচরণটি এই বাসার বাচ্চাদের মা মেনে নিতে পারলেন না। কারণ, উনার ধারণা যে, বেড়ালের মুখের খাবার খেলে উনার বাচ্চাদের অনেক কঠিন রোগ হতে পারে। কাজেই 'বেড়াল ভাগাও' বিষয়টি আবার আলোচনায় উঠে এলো।

'বেড়াল ভাগাও' ইস্যু নিয়ে পক্ষে এবং বিপক্ষে বাসায় অনেক আলোচনা হলো। এই বাসার ছেলেটা এবং মেয়েটা কিছুতেই এই প্রস্তাব সমর্থন করলো না; ওদের মা বিষয়টা নিয়ে দ্বিধায় পড়লেন- একদিকে ছোটবেলা থেকে আমাদেরকে বড়ো করে তোলার কারণে আমাদের প্রতি উনার মাতৃসুলভ মায়ার টান, অন্যদিকে চারতলার এই ফ্ল্যাট বাড়িতে আমাদেরকে রাখার ঝামেলা; বিশেষ করে, আমরা বড়ো হয়ে যাওয়াতে দিনের পর দিন আমাদের বেড়াল-সুলভ কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করাটা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। যা হোক, এই বিষয়ে সিদ্ধান্তটা ঝুলে থাকলো।

আমরা বড়ো হওয়ার সাথে সাথে আমাদের মধ্যে কৈশোরের চপলতা এবং পৃথিবীর সবকিছু দেখার, জানার এবং বোঝার ইচ্ছা দিন দিন বাড়তে লাগলো। চার দেওয়াল ঘেরা চারতলার এই বিশাল ফ্ল্যাটে দিনরাত শুধু খাওয়া আর ঘুমানোর এই জীবনটা আমাদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠলো।

আমরা বাসার বাইরে যেতে চাইতাম। কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ ছিলো না। চারতলা থেকে বারান্দা বা জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বাইরে পড়ার সাহসও আমাদের হলো না। কারণ, বেড়ালের শরীর এবং হাড়ের জয়েন্ট যতই ফ্লেক্সিবল হোক না কেন, চারতলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়াটা আমাদের জন্য খুবই বিপদজনক ছিল।

তার উপর, নিচে পড়ে গিয়ে যদি কোনোভাবে আমরা বেঁচেও যেতাম এবং আমাদের হাড্ডি-গুড্ডি না ভাঙতো, তাহলেও নিচ থেকে চারতলা পর্যন্ত লাফ দিয়ে উঠে জানালা বা বারান্দার ফাঁক খুঁজে এই বাসায় আবার ঢোকাটা আমাদের পক্ষেতো অসম্ভব ছিলই, এমন কি দুনিয়ার সবচেয়ে তুখোড় 'বেড়াল স্পাইডারম্যানের' পক্ষেও সম্ভব ছিল না। কাজেই, আমাদেরকে অন্য উপায় নিয়ে চিন্তা করতে হলো।

একটা মজার বিষয় হলো, এই বাসার মেয়েটা ওর বাবার অনেক আদরের; তাই আদরে আদরে 'বাঁদর' হয়ে গেছে- ঘরের খাবার মোটেই খেতে চাইতো না- খালি বাহির থেকে দামি দামি ফাস্ট ফুড অর্ডার দিয়ে এনে খেতে চাইতো। ওদের মা উনার বাচ্চাদের জাঙ্ক ফুড খাওয়াটা মোটেই পছন্দ করতেন না। কিন্তু কে শোনে কার কথা- মেয়েটা ওর বাবাকে ফোন করে এমনভাবে আদুরে গলায় কথা বলে পটিয়ে ফেলতো যে, ওর বাবা তখনই মেয়েটার মাকে ফোন করে বলে দিতেন যেনো মেয়েটা যা  খেতে চায়, তা অর্ডার করা হয়।

এই ব্যাপারে ছেলেটা ছিলো সম্পূর্ণ উল্টো- খাবার পছন্দের দিক দিয়ে একেবারে ওর মায়ের মতো খাঁটি বাঙালি- ভাত, মাংস, মাছ আর ডাল- এই হলো ওর পছন্দের খাবার। ফাস্ট ফুড বা বাহিরের খাবার ওর তেমন পছন্দ না। যদিও বোনের সাথে কম্পিটিশন দিয়ে মাঝে মাঝে বাহির থেকে ফাস্ট ফুড অর্ডার করে এনে খেতো। কিন্তু খাবারগুলো যে ছেলেটা খুব এনজয় করতো, সেটা আমাদের কাছে মনে হয়নি- জাস্ট খাওয়ার জন্যই খেতো।

এই বাসার বাচ্চাদের মা অত্যন্ত ভালো মানুষ- সহজ সরল এবং সবার জন্য উনার গভীর মায়া। আমাদের জন্যও অনেক মায়া উনার; প্রায়ই আমাদেরকে কোলে নিয়ে আদর করতেন এবং কোনোদিন আমাদের উপর রাগ করেননি। বাচ্চাদের মা প্রায়ই সোফাতে হেলান দিয়ে হোয়াটস্যাপে ভিডিও কল করে বিদেশে উনার হাসব্যান্ডের সাথে কথা বলতেন এবং আমরা উনার পাশে সোফায় শুয়ে ফোনে উনার হাসব্যান্ডের ছবি দেখতাম আর কথা শুনতাম।

ভদ্রলোকটিকে আমাদের কাছে খুব একটা সুবিধার মানুষ বলে মনে হলো না- চেহারা এবং কথাবার্তায় বেশ কাঠখোট্টা স্বভাবের। শুনেছি, ভদ্রলোক নাকি ডাক্তার; সব ডাক্তারই উনার মতো কাঠখোট্টা কিনা জানি না, তবে সত্যি কথা বলতে কি, উনাকে আমাদের পছন্দ হয়নি।

আরেকটা মজার ঘটনা বলছি। আমরা যখন বড়ো হতে শুরু করলাম, তখন বেড়ালদের শরীরের স্বাভাবিক নিয়মেই আমাদের গায়ের পুরানো লোম অল্প অল্প করে ঝরে যেতে লাগলো। আমাদেরকে কোলে নিলেই বা আমরা কোথাও শুয়ে থাকলেও দেখা যেতো যে, আমাদের গায়ের কয়েকটা লোম ঝরে গিয়ে হাতে বা কাপড়ে লেগে রয়েছে। এই ব্যাপারটা দেখে মেয়েটার কাছে মনে হলো যে, খুশকি হলে বা ভিটামিনের অভাব হলে যেমন মানুষের মাথার চুল ঝরে যায়, তেমনি আমাদের শরীরেও খুশকি হয়েছে বা আমাদের ভিটামিনের অভাব হয়েছে।

তাই, মেয়েটি ওর মায়ের সাথে পশুপাখির ওষুধের দোকানে গিয়ে আমাদের জন্য খুশকি আর ভিটামিন শ্যাম্পু চাইলো। দোকানদারতো মেয়েটির কথা শুনে হেসেই ফেললেন এবং বললেন যে, শরীরের লোম ঝরে যাওয়া বেড়ালদের কোনো রোগ না- এটা বেড়ালদের শরীরের একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু তার পরও মেয়েটির পীড়াপীড়িতে দোকানদার আমাদের গায়ের উকুনের জন্য একটা শ্যাম্পু দিয়ে দিলেন।

যা হোক, এবার আমাদের কথায় ফিরে আসি। এই বাসার মেইন এক্সিট দরজাটা সব সময় বন্ধ থাকতো; শুধু বাসায় কেউ আসলে বা বাসা থেকে কেউ বের হওয়ার সময় অল্প কয়েক সেকেন্ডের জন্য দরজাটা খোলা হতো এবং আবার লাগিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম যে, এই বাসায় যখন দুধওয়ালা আসে, তখন রান্নাঘর থেকে দুধের পাত্র আনার জন্য কিছুক্ষণ দেরি হয় এবং সেই সময় দরজাটা খোলা থাকে। আমরা আরও লক্ষ্য করলাম যে, বাহিরে অর্ডার দেওয়া খাবারের ডেলিভারিম্যান আসলেও ডেলিভারি বুঝে নেয়া, দাম হিসাব করা এবং দাম দেওয়া, এসব করতে গিয়ে কয়েক মিনিট লেগে যায় এবং সেই সময়ও মেইন দরজাটা খোলা থাকে।

একদিন আমার বোন এই সুযোগটা নিলো, খাবার ডেলিভারি নেয়ার সময় এক ফাঁকে খোলা দরজা দিয়ে চুপচাপ বের হয়ে গেলো, কেউ টের পেলো না। ডেলিভারিম্যান চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই দরজা লাগিয়ে দেওয়া হলো। আমার বোন মনের আনন্দে সিঁড়ি দিয়ে একবার নিচের দিকে আরেকবার উপরের দিকে উঠতে লাগলো এবং কিছুক্ষণ পর বাসায় ফিরে আসতে চাইলো।

কিন্তু বাসা ভুলে গেলো- সব বাসার দরজা দেখতে একই রকম। যদিও দরজার উপর ফ্ল্যাট নম্বর লাগানো আছে, কিন্তু আমরাতো আর সেই নম্বর পড়তে পারি না। আমার বোন কোনো উপায় না দেখে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের উপর উঠে গিয়ে মিয়াঁও মিয়াঁও করে কাঁদতে লাগলো।

এদিকে কিছুক্ষণ পর বাসায় আমার বোনকে খুঁজে না পেয়ে সবাই আমার বোনকে খুঁজতে বের হলো। সিঁড়ি খোঁজা হলো, দারোয়ানদের কাছ থেকে খবর নেয়া হলো- আমার বোন নিচে আছে কিনা বা গেইট দিয়ে বাহিরে চলে গেছে কিনা। শেষে দারোয়ানরা ছাদের উপর গিয়ে আমার বোনকে পায় এবং বাসায় নিয়ে আসে।

এরপর আমি এবং আমার বোন কয়েকবার বাসার বাহিরে যাওয়ার এই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছি এবং প্রতিবারই দারোয়ানরা আমাদের ধরে এনে বাসায় দিয়ে গেছে।

এরপর থেকে বাসার লোকজন সাবধান হয়ে গেছে- মেইন দরজা খোলা হলেই আমাদের প্রতি নজর রাখতো যেনো আমরা বাইরে বের হয়ে যেতে না পারি। আমাদেরকে নিয়ে যখন এতোকিছু হচ্ছিলো, তখনই এই বাসার বাচ্চাদের বাবা বিদেশ থেকে দেশে এলেন ঈদের ছুটিতে। বাচ্চাদের মায়ের ফোনে ভদ্রলোককে দেখে আমাদের কাছে যে রকম মনে হয়েছিল, বাস্তবে উনাকে সেই রকমই দেখলাম- কাঠখোট্টা এবং নিরামিষ স্বভাবের- বাচ্চাদের মায়ের স্বভাবের সাথে উনার স্বভাবের কোনো মিলই নেই। আমাদের দিকে ফিরেও তাকালেন না, আমাদেরকে একবার কোলেও নিলেন না বা আমাদের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে একটু আদরও করলেন না।

এই ভদ্রলোক আমাদেরকে কোনো ডিসটার্বও করতেন না, তবে টেলিভিশন দেখতে এসে যদি দেখতেন যে, উনি যে সোফাতে বসবেন সেখানে আমরা বসে বা শুয়ে আছি, তাহলে দূর-দূর করে আমাদেরকে তাড়িয়ে দিতেন- আমরা তখন মুখ গোমড়া করে অন্য সোফায় গিয়ে বসতাম বা শুয়ে থাকতাম। এই রুক্ষ স্বভাবের লোকটিকে আমরা বেশি ঘাটাতাম না- যতটা পারি, দূরে দূরে থাকতাম।

আমাদের ডাক্তার সাহেব ঈদের পর উনার ফ্যামিলি নিয়ে সিলেটের একটা হলিডে রিসোর্টে যাবেন ৩ দিনের জন্য; রিসোর্ট বুকিং থেকে শুরু করে বিমানের টিকেট পর্যন্ত সবকিছু ঠিক করা হয়ে গেছে অনেক আগেই। আমাদের দুই বেড়াল বোনকে নিয়ে যথারীতি প্ল্যান হলো- এই কয়েক দিনের জন্য আমাদেরকে নিচে দারোয়ানদের কাছে রেখে যাওয়া হবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো যে, এবার দারোয়ানরা আমাদেরকে আর রাখতে চাইলো না।

কারণ, এই বিল্ডিং-এর অনেকেই নাকি আমাদেরকে (বেড়াল) পছন্দ করেন না এবং দারোয়ানদের নিষেধ করেছেন ওরা যেনো আমাদেরকে নিচে ওদের কাছে না রাখে। মানুষ খুব অদ্ভুত জীব; একেকজন একেক রকম- কেউ আমাদেরকে আদর করে কোলে নেয় এবং অনেক ভালোবাসে আর কেউ কেউ আমাদেরকে দুই চোখে দেখতে পারে না- প্রচণ্ড ঘৃণা করে। মানুষরা এমন বিচিত্র মনের হয় কেন, কে জানে?

আমাদেরকে দারোয়ানদের কাছে রেখে যাওয়া যাবে না এবং ফ্যামিলির সাথে হলিডে রিসোর্টেও নিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ, রিসোর্ট সেটা অ্যালাউ করবে না। শুনেছি যে, নামি-দামি হোটেল এবং রিসোর্টগুলোতে গেস্টদের সাথে আনা পোষা প্রাণী অ্যালাউ করা হয় না। তার উপর সিলেট যাওয়া-আসার জন্য বিমানের টিকেট করা হয়েছে; আমাদেরকে নিয়ে বিমানে ভ্রমণ করতে হলে অনেক ঝামেলা করতে হবে।

আমাদেরকে প্রয়োজনীয় সব টিকা দেওয়া হয়েছে কিনা- সেই প্রমাণপত্র লাগবে, আমাদের স্বাস্থ্য ভালো আছে এবং আমরা বিমানে ভ্রমণ করতে পারবো- এটা নিশ্চিত করার জন্য ভ্যাটেরানিয়ান ডাক্তার দেখিয়ে সেই সার্টিফিকেট নিতে হবে, আমাদেরকে বিশেষ খাঁচায় করে নিতে হবে, আমাদের বিমান ভ্রমণের জন্য পশু অধিদপ্তর থেকে বিশেষ পারমিশন নিতে হবে, আমাদের জন্য টিকেট করতে হবে- নিয়ম কানুনের এক বিশাল বহর।

বিমানে বিদেশে যেতে হলেতো আমাদের (পশুপাখি) জন্য আরো জটিল সব নিয়ম-কানুন ফলো করতে হয়। অবশ্য আমাদের বিমানে ভ্রমণের একটা অভিজ্ঞতা থাকলে ভীষণ মজা হতো- অন্য বেড়ালদের কাছে সারা জীবন গর্ব করে সেই অভিজ্ঞতা বলে বেড়াতে পারতাম।

এই পরিস্থিতে আমাদের নিয়ে কী করা যায়, সবাই সেটা নিয়ে ভাবতে লাগলো। বাচ্চাদের মা আশপাশের পরিচিত অনেক ফ্যামিলিতে ফোন করে আমাদেরকে এই তিনদিন রাখার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু কেউ আমাদের রাখতে চাইলেন না। এয়ার কন্ডিশন মিস্ত্রি একবার এই বাসায় আমাদেরকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন; উনাকে ফোন করা হলো আমাদেরকে রাখার জন্য। উনি প্রথমে রাজিও হয়েছিলেন, কিন্তু উনার ওয়াইফ বাসায় আমাদেরকে (বেড়াল) নিতে রাজি না হওয়াতে উনিও শেষে 'না' বলে দিলেন।

ডাক্তার সাহেবের এক বোন থাকেন মোহাম্মদপুরে; বাচ্চাদের মা উনাকেও ফোন করে আমাদের কথা জানালেন। যেমন রগচটা ভাই, তেমনই মুখপোড়া বোন; একেবারে সোজা-সাপ্টা জানিয়ে দিলেন যে, 'বিলাই-ফিলাই' (বেড়াল) উনি পছন্দ করেন না।

এরকম অবস্থায় এই বাসার বাচ্চাগুলো এবং ওদের মা আমাদেরকে নিয়ে বেশ টেনশনে পড়ে গেলেন।

কাঠখোট্টা ডাক্তার সাহেব ইনিয়ে-বিনিয়ে কয়েকবার বলার চেষ্টা করেছিলেন, আমাদেরকে বস্তায় ভরে উত্তরার বিডিআর বাজারে ফেলে দিয়ে আসার জন্য। কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুটো এবং ওদের মায়ের তিব্র প্রতিবাদের তোড়ে ডাক্তারের সেই কুপরামর্শ পাত্তাই পায়নি।

কোনো উপায় না দেখে বাচ্চাদের মা উনার ভাগ্নে, আমাদের প্রথম মালিক, সেই দয়ালু তরুণ শিক্ষককে ফোন করলেন এবং আমাদেরকে নিয়ে কী করবেন- সেই পরামর্শ চাইলেন। দয়ালু শিক্ষক সাহেব তখন ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীতে ছিলেন। উনি জানালেন যে, এক দিন পর উনি গ্রাম থেকে ঢাকা আসবেন এবং তখন আমাদেরকে উনি আবার উনার কাছে নিয়ে যাবেন। এরপর দারোয়ানদেরকে অনেক অনুরোধ করে আমাদেরকে একদিনের জন্য তাদের কাছে রাখার সুযোগ পাওয়া গেলো। আমাদেরকে দারোয়ানদের কাছে রেখে পরিবারের সবাই চলে গেলেন সিলেটের হলিডে রিসোর্টে।

পরদিন সকালে আমাদের সেই মহান শিক্ষক সাহেব আসলেন। উনাকে দেখেই আমাদের মন কেমন যেনো শান্তিতে ভরে গেলো। যদিও অনেক দূর থেকে ঈদ-ধকলের জার্নি করে এসে উনি খুব ক্লান্ত ছিলেন, বিল্ডিং-এ ঢুকে নিচে দারোয়ানদের কাছে আমাদেরকে দেখার সাথে-সাথেই উনার মুখে গভীর মমতামাখা পবিত্র হাসিটা আমরা আবার দেখলাম। উনার কাছে এই বাসার চাবি ছিল; উনি আমাদেরকে দারোয়ানদের কাছ থেকে বাসায় নিয়ে আসলেন এবং আমাদেরকে কিছু খাবার দিয়ে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় গিয়ে নাক ডেকে ঘুম দিলেন।

লম্বা ঘুম দিয়ে বিকেল বেলা উঠে আমাদেরকে একটা সুন্দর বাক্সে ভরে, উনার ব্যাগ আর আমাদের বাক্স নিয়ে রওনা হলেন উনার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেসের উদ্দেশ্যে। সমাপ্তি হয়ে গেলো আমাদের রাজকীয় জীবনের 'উত্তরা' অধ্যায়; শুরু হলো নতুন জীবন- যেখান থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের জীবনের প্রথম অধ্যায়- আমাদের সেই কঠিন, নির্দয়, নির্মম এবং চরম কষ্টের শৈশব।

দুই ঘণ্টা পর আমরা আশুলিয়াতে আমাদের শিক্ষক সাহেবের মেসে এসে পৌঁছলাম এবং আমাদেরকে বাক্স থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো। মেইন রাস্তার একটু ভেতরে একতলা বিল্ডিং, সিঁড়ি দিয়ে উপরে ছাদে উঠা যায়, চারদিক খোলামেলা; সবুজ ঘাসের মাঠ এবং গাছপালায় ভরা। যে কোনো সময় দরজা বা জানালা দিয়ে বাইরে যাওয়া এবং আসা যায়।

উত্তরার পরিবেশের সাথে এখানকার পরিবেশের কোনো মিলই নেই। উত্তরার বাসায় আমরা পেয়েছিলাম জীবনের সবচেয়ে বেশি আদর-যত্ন আর ভালোবাসা। কিন্তু চার দেয়ালের ভেতর বন্দি। আশুলিয়াতে এসে আমরা দেখলাম স্বাধীনতার বিশাল পৃথিবী। হঠাৎ করে এতো বিশাল স্বাধীনতা দেখে আমাদের কাছে পৃথিবীটা অনেক বড়ো আর ঢিলা মনে হতে লাগলো; আমরা বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে, এই বিশাল স্বাধীনতার উপভোগটা আমরা কী দিয়ে শুরু করবো।

আশুলিয়াতে আমরা আমাদের শৈশবের কোনো স্মৃতি মনে করতে পারছিলাম না; এতো অল্প বয়সের স্মৃতি কারোই মনে থাকার কথা না। একমাত্র আমাদের শিক্ষক সাহেব ছাড়া এই বাসার আর কাউকেই আমরা মনে করতে পারলাম না। বাড়িঘর, রাস্তা, মাঠ, আশপাশের কোনো পরিবেশই আমরা মনে করতে পারলাম না। কিন্তু তারপরও, কেন জানি একটা অজানা আকর্ষণে চারদিক দেখার জন্য আমরা দুই বোন একসাথে বাসা ছেড়ে বের হয়ে গেলাম।

হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেলাম, বিভিন্ন বাড়ির পাশে এবং রাস্তার পাশ ধরে উদ্দেশ্যহীন অনেক ঘোরাঘুরি করলাম। আমাদের কিছু স্বজাতীয় (বেড়াল) ভাই-বোন, মামা-চাচা, খালা-ফুপু বয়সের কয়েকজনকে বিভিন্ন যায়গায় দেখলাম, ডাস্টবিনের মধ্যেও দুইজনকে খাবার খুঁজতে দেখলাম। কিন্তু আমাদেরকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলো না- একবার হ্যালোও করলো না। আমাদের কাছে মনে হলো যে, বেঁচে থাকার জন্য জীবনযুদ্ধে এরা এতটাই ব্যস্ত হয়ে আছে যে, কাউকে হ্যালো বলার সময় বা ইচ্ছেটুকু পর্যন্ত এদের হয় না।

এখানকার অন্য বেড়ালদের কঠিন কষ্টের জীবন দেখে আমাদের দুই বোনকে ভীষণ ভাগ্যবতী মনে হলো। আমরাতো এদেরই আত্মীয়-স্বজন এবং এদেরই মতো এখানে জন্ম নিয়েছিলাম এবং আমাদের জীবনতো এদের জীবনের মতোই কঠিন হতে পারতো। কিন্তু ভাগ্যের খেলায় জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এখন পর্যন্ত একটা চরম সৌভাগ্যের জীবনই কাটিয়ে এসেছি।

মানুষদের সময়ের হিসাবে যদিও আমাদের বয়স মাত্র আট মাস হয়েছে, তারপরও আমাদের কাছে মনে হচ্ছে যে, আমরা আট যুগেরও বেশি সময় ধরে বেঁচে আছি। জীবনের চরম কঠিন এবং পরম সুখের অভিজ্ঞতা গুলোই হয়তো আমাদের দুই বোনকে খুব দ্রুত বড়ো করে তুলেছে; মানুষদের জীবনেও কি একই রকম অভিজ্ঞতা হয় কিনা জানি না।

সেই রাতে আমরা আর বাসায় ফিরলাম না; সারা রাত ধরে এলাকার অন্য বেড়ালদের সাথে খাতির জমানোর চেষ্টা করলাম এবং কয়েকজনের সাথে ভালো খাতিরও হয়ে গেলো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো যখন আমাদের ক্ষুধা লাগলো; অন্য বেড়ালদের মতো ডাস্টবিনের খাবার খাওয়া বা লুকিয়ে অন্যের বাসায় ঢুকে খাবার চুরি করে খাওয়ার চিন্তাও আমরা করতে পারলাম না। এর আগে আমাদের কখনো এগুলো করার দরকার হয়নি এবং সেই অভ্যাসও তখন আমাদের হয়নি।

কাজেই সকালবেলা ক্ষুধাপেটে দুই বোন বাসায় ফিরে এলাম। আমাদের ফিরে আসা দেখে শিক্ষক সাহেব খুব খুশি হয়ে গেলেন এবং একটা আকর্ণ হাসি দিলেন। এরপর আমাদেরকে আগের রাতে আমাদের জন্য রেখে দেওয়া খাবারগুলো খেতে দিলেন- মাছ, ঝোল মাখানো ভাত, মাছের কাঁটা- এসব; ক্ষুধা-পেটে আমাদের কাছে খাবারগুলো বেশ সুস্বাদু লাগলো এবং আমরা পেট ভরে খেয়ে দিলাম একটা ঘুম।

আমাদের জন্য শিক্ষক সাহেবের যত্ন এবং ভালোবাসা ছিল অভূতপূর্ব। প্রতিদিন সকালে উনি বাসার সামনের ফুটপাত থেকে আমাদের জন্য সস্তা দামের কিন্তু ফ্রেশ হালিম কিনে আনতেন। আমরা সেই হালিমের মধ্যে দেওয়া মাংসগুলো শুধু খেতাম- স্যুপগুলো খেতাম না, আমাদের কাছে ভালো লাগতো না- মশলার গন্ধ লাগতো।

এছাড়া আমরা সাধারণত মেসের খাবারই খেতাম, তবে শিক্ষক সাহেব মাঝে মাঝে রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেতেন এবং আমাদের জন্য রেস্টুরেন্ট থেকে প্যাকেটে করে উচ্ছিষ্ট মাছ-মাংস আর মাছের কাঁটা নিয়ে আসতেন- আমরা সেগুলো মজা করে খেতাম। অনেক সময় শিক্ষক সাহেব ভাত খাওয়ার সময় মাছের শক্ত কাঁটা এবং মাংসের শক্ত হাড্ডিগুলো চিবিয়ে নরম করে আমাদেরকে খেতে দিতেন; অদ্ভুত রকমের একটা টেস্ট পেতাম সেই চিবানো হাড্ডি আর কাটা খেয়ে।

আমাদের দিন কেটে যাচ্ছিলো ভালোই। কিন্তু প্রায় এক সপ্তাহ পর এমন একটা ঘটনা ঘটলো যা আমরা কল্পনাও করতে পারি নি- আমাদের মা এই বাসায় ফিরে এলেন। এতো ছোট বয়সে আমাদের মা আমাদেরকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন যে, উনার চেহারা বা গায়ের গন্ধ- কিছুই আমাদের মনে নেই। শিক্ষক সাহেব যখন আমাদের মাকে দেখিয়ে উনার বন্ধুদেরকে বললেন যে, এই বেড়ালটিই আমাদের মা, তখন আমাদের বুকের ভেতর কেমন যেনো করতে লাগলো এবং আমাদের চোখে পানি এসে গেলো।

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আমাদের মা আমাদেরকে চিনতে পারলেন না- কিছুক্ষণ শুধু আমাদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন; আমাদের কাছে এলেন না, আমাদের গায়ের গন্ধও শোঁকার চেষ্টা করলেন না, আমাদেরকে একটা 'মেঁয়াও' শব্দ পর্যন্ত বললেন না- চুপচাপ আস্তে আস্তে হেঁটে বাড়ির অন্য দিকে চলে গেলেন।

আমাদের মা আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে এতো ছোট বয়সে কেনো ফেলে রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন, সেটা আমরা জানি না। হয়তো আমরা তা কোনোদিন জানতেও পারবো না। মানুষের জীবনের মতো পশু-পাখিদের জীবনও অনেক বিচিত্র এবং অদ্ভুত। মানুষদের মতো পশু-পাখিদেরও আবেগ আছে, সুখ-দুঃখ আছে, কষ্ট আছে, বেদনা আছে, হাসি-কান্না আছে, স্মৃতি আছে, ভয় আছে, আশা-আকাঙ্খা আছে- অধিকাংশ মানুষই এই বিষয়টা জানে এবং বুঝেও না।

শুধু আমাদের এই মহৎ শিক্ষক সাহেব আর উত্তরার সেই বাসার ছেলে-মেয়ে দু'টো এবং তাদের মায়ের মতো কিছু হৃদয়বান মানুষই আমাদের এই সব অনুভূতিগুলো বুঝেন। এই হৃদয়বান এবং মহৎ মানুষ গুলোর কারণেই হয়তো পৃথিবীটা এখনো এতো সুন্দর এবং আমাদের মতো গৃহপালিত পশু-পাখিরা এখনো মানুষদের কাছাকাছি থাকতে চায়।

সমাপ্ত

লেখক পরিচিতি: সুস্মিতা (সপ্তম শ্রেণি) ও রেদওয়ান (ষষ্ঠ শ্রেণি), ইন্টারন্যাশনাল হোপ স্কুল বাংলাদেশ, উত্তরা, ঢাকা

আগের পর্ব:

  দুই বেড়াল বোনের আত্মকাহিনী, পর্ব ১

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  দাদাইয়ের গল্প