ভূতের বাক্সে রাজুর ম্যাজিক

  • মুহসীন মোসাদ্দেক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-03-09 15:57:04 BdST

bdnews24
অলঙ্করণ: সোহাগ পারভেজ

রাজুর স্কুলে আজ বিশাল অনুষ্ঠান। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে আজ।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ইভেন্টে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরুর আগে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারও পুরস্কার বিতরণ করা হবে আজ।

পুরো স্কুল তাই উৎসবমুখর। সব ক্লাসের প্রায় ছাত্র-ছাত্রীই আজ উপস্থিত। যারা মাঝেমধ্যেই স্কুল ফাঁকি দেয় তারাও আজ উপস্থিত। প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই তাদের বাবা-মা এসেছে। কারো কারো অবশ্য শুধু মা এসেছে, বাবা আসেনি। রাজুরই যেমন বাবা আসেনি।

অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন এক ম্যাডাম। ম্যাডাম খুব সুন্দর দেখতে, কথা বলেন সুন্দর করে, হাসেনও সুন্দর  করে। সবারই খুব প্রিয় এই ম্যাডাম। ম্যাডামের নাম সায়মা খানম। ম্যাডাম রাজুদের স্কুলের ম্যাডাম না, ট্রেনিং নিতে এসেছেন। রাজুদের স্কুলটা একটা পিটিআই, মানে প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট।

প্রাইমারি স্কুলে নতুন চাকরি পাওয়া স্যার-ম্যাডামরা এখানে ট্রেনিং নিতে আসেন। ট্রেনিংয়ের একটা অংশ হিসেবে এসব স্যার-ম্যাডাম রাজুদের অর্থাৎ ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির ক্লাস নিয়ে থাকেন। সে ক্লাসগুলো খুব মজার  হয়। স্যার-ম্যাডামরা একটুও বকাবকি করেন না, খুব হেসে-খেলে-মজা করে ক্লাস নেন। বছরের ওই কয়টা দিন খুব মজা লাগে স্কুলে আসতে।

অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। সায়মা ম্যাডামের মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনায় সবাই খুব উপভোগ করছে অনুষ্ঠানটা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের এক-দুইটা পরিবেশনার পরে দেয়া হচ্ছে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার এক-দুইটা ইভেন্টের পুরস্কার। এভাবেই চলছে অনুষ্ঠানটা।

রাজু এবার কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি, অংশ নেয়নি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায়ও। গান-বাজনা-নাচ-অভিনয় কিংবা কৌতুক কিছুই পারে না রাজু। তবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একটা পর্যায়ে রাজুই বিশেষ আকর্ষণ। আজ সে একটা ম্যাজিক দেখাবে। এমন একটা ম্যাজিক যা বিশ্বের কোনো ম্যাজিশিয়ানই দেখাতে পারেনি। জুয়েল আইচ কিংবা ডেভিড কপারফিল্ডের মতো ম্যাজিশিয়ানরা হয়তো এমন ম্যাজিকের বিষয়টা কখনো কল্পনাও করেননি। আজ রাজু দেখাবে সে ম্যাজিক।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পরিবেশনায় যারা অংশ নিচ্ছে তারা সাজগোজ করে প্রস্তুত হয়ে মঞ্চের পেছনে অপেক্ষা করছে। সবাই অবশ্য এখনই মঞ্চের পেছনে উপস্থিত হয়নি। অনেকের এখানো সাজগোজই শেষ হয়নি। যাদের শুরুর দিকেই পরিবেশনা, তারাই কেবল উপস্থিত। একজনের বা একটি দলের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে, অপরজন বা অপর দলকে প্রস্তুত থাকতে বলা হচ্ছে। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি তাদের বাবা-মা, এমনকি স্যার-ম্যাডামরাও অংশ নিচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পরিবেশনায়।

রাজুর পরিবেশনা একেবারে শেষে। সব পরিবেশনা শেষে রাজুর ম্যাজিক দিয়ে শেষ হবে অনুষ্ঠান। রাজু তাই অনেক নির্ভার। মঞ্চের পেছনে বসে অপেক্ষা না করে সে একটা ফাঁকা ক্লাসরুমে বসে তার প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। রাজুর যে ম্যাজিক তাতে অবশ্য সবার থেকে একটু আলাদা থাকাই উত্তম।

রাজুর ম্যাজিকের কেন্দ্রে আছে একটা ভূত! আশ্চর্যজনক হলেও সত্য রাজু আজ সবার সামনে একটা ভূত হাজির করবে। এখানে অবশ্য ম্যাজিকের কিছু নেই। ম্যাজিকটা কেবল আনুষ্ঠানিকতা। ভূতটার সঙ্গে রাজুর অনেক ভাব। রাজুর বন্ধুই বলা যায়। ভূতটা অবশ্য বছর খানেক আগে এক রাতে রাজুকে ভয় দেখাতে এসেছিল। রাজুকে ভয় দেখাবে কী, রাজুই ভূতটাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল! তারপরই ভূতটার সঙ্গে রাজুর সন্ধি হলো, বন্ধুত্ব হলো।

দিন-রাতের প্রায় পুরোটাই ভূতটা এখন রাজুর সঙ্গে থাকে, রাজুর সঙ্গে ঘোরে, খেলা করে, ঘুমোয়। ভূতের বিষয়টা রাজু অবশ্য কাউকে বলেনি। রাজুর বাসা কিংবা বন্ধু-বান্ধব কেউ জানে না ভূতটার কথা। বলতে অনেক ইচ্ছে হলেও সে চেপে রেখেছে। কেউ যদি বিশ্বাস না করে, তবে তাকে পাগল ভেবে বসতে পারে। এজন্যই কাউকে কিছু বলেনি রাজু।

ভূতটার সঙ্গে রাজুর চুক্তি হয়েছে- আজ ম্যাজিকের ছুতোয় ভূতটা অন্তত ত্রিশ সেকেন্ডের জন্য সবার সামনে হাজির হবে। ভূতটাকে ঘাড়ে করে রাজু যদি এখন পুরো স্কুল ঘুরে বেড়ায় কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দর্শকসারিতে ভূতটাকে পাশে নিয়ে বসে থাকে তবে রাজু ছাড়া কেউ-ই ভূতটাকে দেখতে পাবে না। ভূতদের একটা সিস্টেম আছে। তারা চাইলে যে কাউকে দেখা দিতে পারে, না চাইলে কেউ দেখতে পাবে না। ম্যাজিকটা তাই ভূতটার ওপরেই নির্ভর করছে।

ভূতটা অবশ্য সহজে রাজি হয়নি। জনসমক্ষে এভাবে হাজির হওয়াটা ভালো কিছু হবে না, বরং ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যেতে পারে। কিন্তু রাজু কেঁদে-কেটে একাকার হয়ে গেলে শেষে ভূতটা রাজি হয়েছে। মাঝারি সাইজের একটা পাখির খাঁচায় ভূতটাকে ঢুকিয়ে রেখেছে রাজু। ভূতকে অবশ্য কোনো কিছুতে আটকে রাখা সম্ভব না। ম্যাজিকের প্রক্রিয়ার স্বার্থেই এমনটা করতে হয়েছে।

পুরো প্রক্রিয়া ভূতটাকে আরেকবার বর্ণনা করে রাজু, ‘শোনো, তুমি এই খাঁচার ভেতরেই থাকবে। আমি একটা কালো কাপড় দিয়ে খাঁচাটা ঢেকে দিয়ে একটা মন্ত্র দুইবার পড়ে ফুঁ দিবো। তারপর কালো কাপড়টা সরাবো। আর তখন তুমি সবার সামনে দেখা দিবে। জাস্ট ত্রিশ সেকেন্ডের জন্য। আবার যখন কাপড় দিয়ে ঢেকে দিবো তখন তুমি নাই হয়ে যাবে। ঠিক আছে?’

‘কিন্তু…’ ভূতটা ফ্যাকাশে মুখে বলে, ‘আমার যে ভয় করছে!’

টাসকি খেলো রাজু, ‘ভয় করছে মানে! ভূতের আবার কীসের ভয়!’

‘জানি না। কিন্তু কেন জানি ভয় ভয় লাগছে।’

‘আরে ধুর, ভয়ের কিছু নাই। মাত্র তো ত্রিশ সেকেন্ড।’

ভূতটা কিছু বললো না।

রাজু ভূতটাকে কিছুটা শাসিয়ে বললো, ‘দেখো, উল্টাপাল্টা কিছু যেন না হয়। যেভাবে বলেছি সব যেন ঠিকঠাক হয়। না হলে কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব কাটা!’

ভূতটা কিছু বললো না। খাঁচার ভেতরে চুপচাপ বসে থাকলো। আর রাজু ক্লাসের ভেতরে পায়চারি করতে লাগলো। যতই সময় যেতে থাকলো ততই রাজুর উত্তেজনা বাড়তে থাকলো। যদি সব ঠিকঠাক হয় তবে আজ সে বিখ্যাত হয়ে যাবে। কয়েকজন সাংবাদিক উপস্থিত আছেন অনুষ্ঠানে। আর যদি না হয় তবে রাজু ওদিকে আর ভাবলো না। অপেক্ষায় থাকলো ডাক পড়ার।

একে একে সব পরিবেশনা প্রায় শেষ। রাজুর আগের অংশগ্রহণকারীর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাজুকে প্রস্তুত হতে ঘোষণা দেয়া হলো। কিন্তু, রাজু তখনো মঞ্চের পেছনে হাজির হয়নি। রাজুর এক বন্ধু হন্তদন্ত হয়ে রাজুর কাছে এসে বললো, ‘কিরে রাজু! তুই এখানে কী করছিস? তোর নাম ঘোষণা করেছে, তাড়াতাড়ি চল।’

রাজুর উত্তেজনা এবার আরো বেড়ে গেলো। খাঁচাটাসহ সব সামগ্রী গুছিয়ে নিয়ে সে হাঁটা ধরলো মঞ্চের দিকে। যেতে যেতে ফিসফিস করে ভূতটাকে বললো, ‘সব মনে আছে তো?’

ভূতটা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ-সূচক ইঙ্গিত দিলো।

রাজু মঞ্চের পেছনে এসে উপস্থিত হতেই আগেরজনের পরিবেশনা শেষ হলো। সায়মা ম্যাডাম মাইক্রোফোনে ঘোষণা দিলেন, ‘প্রিয় সুধিবৃন্দ, একে একে আমাদের আয়োজন শেষের পথে। বাকি কেবল একটি পরিবেশনা। হ্যাঁ, এখন সেই মহেন্দ্রক্ষণ। মঞ্চে এখন পরিবেশিত হবে ম্যাজিক। ম্যাজিক নিয়ে আপনাদের সামনে আসছে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রাজু। মঞ্চে আসছে রাজু…’

সায়মা ম্যাডামের উচ্ছ্বসিত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো তুমুল করতালি। তুমুল করতালির ভেতরে রাজু হাজির হলো মঞ্চে। অনুষ্ঠানটা হচ্ছে স্কুলের একটা বিশাল হলরুমে। হলরুম ভর্তি ছোট-বড় মানুষ। সবাই দেখছে রাজুকে এবং হততালি দিচ্ছে। একসঙ্গে এতোগুলো মানুষ তাকে দেখছে, বিষয়টা ভেবে রাজুর শরীর একটু শিরশির করে উঠলো। মুহূর্তেই আবার নিজেকে সামলে নিয়ে রাজু মাথা একবার নত করে সবার অভিবাদন গ্রহণ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।

সবার হাততালি থেমে গেলো, সব এখন নীরব। রাজু হাতের খাঁচাটা একটা টুলের ওপর রাখলো। রাজু ভূতটাকে দেখতে পেলেও বুঝতে পারলো আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না। পাবার কথাও তো না। ভূতটা না চাইলে কেউ তাকে দেখতে পাবে না। এমনকি রাজুও না!

হলরুমের সব বাতি নিভে গেলো। পুরো হলরুম প্রায় অন্ধকার, দর্শকসারিতে বসা মানুষগুলোকে আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে। কেবল রাজু এবং টুলসহ খাঁচার অংশটায় আলো পড়ছে, ওই অংশটা আলো দিয়ে ফোকাস করে রাখা হলো।

রাজুর পরনে কালো জামা, কালো প্যান্ট, কালো টাই, কালো গাউন গোড়ালি পর্যন্ত বিস্তৃত, পায়ে কালো জুতো, হাতে কালো গ্লাভস, মাঝারি সাইজের একটা কালো কাঠি হাতে ধরা, মাথায় কালো হ্যাট এবং চোখে কালো চশমা।

রাজুর গায়ের রঙও কালো। সুতরাং মুখের অনাবৃত অংশটুকুও কালো। এমন বেশে রাজুকেই একটা ভূত বলে চালিয়ে দেয়া যায়! হলরুমের পরিবেশ এবং রাজুর বেশ ভূতের ম্যাজিক দেখানোর জন্য খুবই মানানসই। রাজু যে ভূতের ম্যাজিক দেখাতে যাচ্ছে উপস্থিত কেউ এখনো অবশ্য জানে না।

সবাই আবছা অন্ধকারে চুপচাপ বসে অপেক্ষা করছে রাজুর ম্যাজিকের জন্য। রাজু হাতের কালো কাঠিটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বললো, ‘প্রিয় বন্ধুগণ, আপনাদের স্বাগতম’।

রাজুর কথা শুনে অনেকেই ভ্রূ কুঁচকে তাকালো, বিশেষ করে বাবা-মায়েরা। রাজুর নজরে অবশ্য তা পড়লো না, সে বলে চললো, ‘আজ আপনাদের আমি এমন একটি ম্যাজিক দেখাবো যে ম্যাজিক বিশ্বের কোনো ম্যাজিশিয়ান দেখাতে পারেনি। কেউ কখনো এমন ম্যাজিক কল্পনাও করেনি!’

মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চের পাশ থেকে সায়মা ম্যাডাম বললো, ‘কী ম্যাজিক, আমরা কি জানতে পারি?’

‘নিশ্চয়।’

রাজু দর্শকসারির দিকে মুখ করে হাতের কাঠিটা দিয়ে খাঁচাটাকে ইশারা করে বললো, ‘বন্ধুগণ, এখানে একটা খাঁচা দেখতে পাচ্ছেন। খাঁচার ভেতরে কি কিছু দেখতে পাচ্ছেন?’

পুরো হলরুম কাঁপিয়ে উত্তর আসলো, ‘না।’

রাজু মুচকি মুচকি হেসে বললো, ‘বন্ধুগণ, ম্যাজিক দিয়ে আজ এ খাঁচায় আমি একটা ভূত হাজির করবো।’

মুহূর্তেই পুরো হলরুমে আতঙ্কের রব উঠলো। কিছু ছেলেমেয়ের আর্তনাদও শোনা গেলো। প্রায় সব ছেলেমেয়ে তাদের বাবা-মার গায়ের সঙ্গে সেঁটে গেলো। কেউ কেউ বাবা-মার কোলে মুখ ঢুকিয়ে ফেললো। যারা ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছিল, ম্যাজিকের বিষয়ে যাদের কোনো আগ্রহ ছিল না তারাও একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। আর বড়রা রাজুর দিকে কিছুটা অবিশ্বাসী, কিছুটা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো।

সায়মা ম্যাডাম কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, ‘ভূ-ভূ-ভূত!’

রাজু স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো, ‘হ্যাঁ, ভূত।’

‘সত্যি সত্যি ভূত!’

রাজু এবার একটু মেজাজ নিয়ে বললো, ‘ভূত আবার মিথ্যেমিথ্যি হয় নাকি!’

সায়মা ম্যাডামও একটু জোর গলায় বললো, ‘ভূত বলতে কি আসলেই কিছু আছে!’

রাজু মুচকি হেসে বললো, ‘সেটা এখনই প্রমাণ হয়ে যাবে।’

সায়মা ম্যাডামকে আর কথা বাড়াতে না দিয়ে রাজু দর্শকসারির দিকে তাকিয়ে হাতের কাঠিটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে ম্যাজিকের প্রক্রিয়াটা বর্ণনা করলো, ‘বন্ধুগণ, এই কালো কাপড়টা দিয়ে আমি খাঁচাটা ঢেকে দেবো। তারপর একটা মন্ত্র দুইবার পড়ে ফুঁ দিয়ে কাপড়টা সরালেই দেখবেন খাঁচার ভেতরে একটা ভূত বসে আছে।’

রাজু দর্শকসারির দিকে ফিরে তাকিয়ে বললো, ‘বন্ধুগণ, তাহলে চলুন শুরু করি।’

আবার পুরো হলরুমে আতঙ্কের রব উঠলো। কিছুটা হুটোপুটি লক্ষ্য করা গেলো। সবাই নড়েচড়ে বসলো এবং তাকিয়ে থাকলো খাঁচাটার দিকে।

রাজু হাতের কালো কাপড়টা এদিক-ওদিক উল্টিয়ে, একবার ঝেড়ে দেখালো কাপড়টা শুধুই একটা কাপড়, অন্য কিছু নেই। তারপর কাপড়টা দিয়ে ঢেকে দিলো খাঁচাটাকে। খাঁচাটা ঢেকে দেয়ার আগে ভূতটাকে রাজু ফিসফিস করে বললো, ‘ঠিকঠাকভাবে সব করো কিন্তু!’

তারপর দুই হাত একটু উপরে উঁচিয়ে, চোখ বন্ধ করে হাতের কালো কাঠিটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে মন্ত্র পড়তে শুরু করলো—

‘আঁঙকারে মাঁঙকারে চাঁঙকারে ঝাঁঙকারে সাঁঙকারে টাঁঙকারে ফুঁঙকারে হুঁঙকারে ছুঁ...

আঁঙকারে মাঁঙকারে চাঁঙকারে ঝাঁঙকারে সাঁঙকারে টাঁঙকারে ফুঁঙকারে হুঁঙকারে ছুঁ...’

মন্ত্র শেষ করে দর্শকসারির দিকে মুখ করে রাজু ধীরে ধীরে কাপড়টা সরানো শুরু করলো। সবাই মুখ হা করে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কারো চোখের পলক পড়ছে না, সবাই যেন দম আটকে আছে, কোথাও কোনো শব্দ নেই, পাথরের মতো বসে সবাই তাকিয়ে আছে খাঁচাটার দিকে।

রাজু ধীরে ধীরে কাপড়টা পুরোপুরি সরাতেই সবাই ভুস করে নিঃশ্বাস ফেললো, ফিসফিসানি শুরু হলো, কাউকে কাউকে মুচকি মুচকি হাসতেও দেখা গেলো। যে ছেলেমেয়েরা মুখ গুঁজে রেখেছিল বাবা-মার কোলে তারা মুখ তুলে তাকালো, যারা বাবা-মার গায়ের সঙ্গে সেঁটে ছিল তারা একটু আয়েশ করে বসলো। অবস্থা দেখে রাজু বুঝতে পারলো ভূতটাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না! কিন্তু, খাঁচার ভেতর থেকে অসহায়ের মতো দৃষ্টি নিয়ে ভূতটা রাজুর দিকে তাকিয়ে আছে- রাজু সেটা ঠিকই দেখতে পাচ্ছে!

সায়মা ম্যাডাম মুচকি মুচকি হেসে বললেন, ‘তোমার মন্ত্রে মনে হয় কোথাও ভুল হয়েছে রাজু। নাও, আবার শুরু করো।’

রাজু খাঁচার কাছে মুখ নিয়ে ভূতটার দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো, ‘কী হচ্ছে এগুলো! এমন করছো কেন!’

ভূতটা কিছু বললো না। রাজুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।

সায়মা ম্যাডাম তাগাদা দিলেন, ‘কই রাজু, শুরু করো। ভূত আসবে না মানে! না এসে যাবে কতদূর! ভূত আসবে, ভূতের বাবা-মা আসবে, ভাই-বোন সুদ্ধ আসবে। নাও রাজু, আবার মন্ত্র পড়ো।’

রাজু খাঁচাটা কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়ার আগে ভূতটাকে শাসিয়ে বললো, ‘এবার যেন উল্টাপাল্টা কিছু না হয়!’

দুই হাত একটু উপরে উঁচিয়ে, চোখ বন্ধ করে হাতের কালো কাঠিটা নাড়িয়ে নাড়িয়ে রাজু আবার মন্ত্র পড়তে শুরু করলো—

‘আঁঙকারে মাঁঙকারে চাঁঙকারে ঝাঁঙকারে সাঁঙকারে টাঁঙকারে ফুঁঙকারে হুঁঙকারে ছুঁ...

আঁঙকারে মাঁঙকারে চাঁঙকারে ঝাঁঙকারে সাঁঙকারে টাঁঙকারে ফুঁঙকারে হুঁঙকারে ছুঁ...’

মন্ত্র শেষে খুব ধীরে ধীরে অনেকটা ভয়ে ভয়ে কাপড়টা সরালো রাজু। কাপড়টা পুরোপুরি সরাতেই ধাক্কা খেলো রাজু! খাঁচাটা খালি! এবার সে নিজেই দেখতে পাচ্ছে না ভূতটাকে, মানে ভূতটা পালিয়েছে!

হলরুমের সবাই হাসতে শুরু করলো। মাইক্রোফোনে সায়মা ম্যাডামেরও উচ্চস্বরে হাসি শোনা গেলো। দর্শকসারি থেকে কিছু ছেলেমেয়ে চিৎকার করে বলতে থাকলো, ‘ভুয়া, ভুয়া, রাজুর ম্যাজিক ভুয়া! ভুয়া, ভুয়া, রাজুর ম্যাজিক ভুয়া!’

রাজু মাথা নিচু করে মুখ পেঁচার মতো করে দাঁড়িয়ে থাকলো।

হলরুমের সব বাতি জ্বলে উঠলো। সায়মা ম্যাডাম মঞ্চে এসে রাজুর পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কনগ্র্যাচুলেশন রাজু। হোয়াট আ ম্যাজিক! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।’

তারপর দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ম্যাডাম বললেন, ‘আরে, আপনারা হাসছেন কেন? কী চমৎকার একটা ম্যাজিক দেখালো রাজু। বিশ্বের আর কেউ এমন ম্যাজিক দেখাতে পেরেছে! আরে, ভূত তো খাঁচার ভেতরে এসেছে! আমরা শুধু দেখতে পাচ্ছি না। ভূত কি আর যখন তখন দেখা যায়!’

দর্শকরা আবার হেসে উঠলো।

ম্যাডাম এবার সিরিয়াস হয়ে বললো, ‘আর তাছাড়া এখানে এত লোকের সামনে এসে কিছু একটা পারফরম করা মুখের কথা না! রাজু সাহস করে এমন একটা পারফরম করেছে, এজন্য তাকে অনুপ্রাণিত করা উচিত। সুতরাং, এখানে হাসার কিছু নেই!’

ম্যাডাম রাজুকে বললো, ‘ঠিক আছে রাজু, এবার তুমি এসো।’

রাজু মঞ্চ থেকে লাফ দিয়ে এক দৌড়ে দর্শকসারিতে বসা মায়ের কোলে গিয়ে মাথা গুঁজে কাঁদতে লাগলো।

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  দাদাইয়ের গল্প