সংগীতজ্ঞ আলাউদ্দিন খাঁর জীবনী ‘আমার কথা’

  • মিনার মনসুর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-12 14:38:10 BdST

বই: আমার কথা, ধরণ: আলাউদ্দিন খাঁর আত্মজীবনী, অনুলেখক: শুভময় ঘোষ, ভূমিকা: রবিশঙ্কর, প্রচ্ছদ: রামকিঙ্করের ভাস্কর্য অবলম্বনে বিপুল গুহ, প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স (ভারত), প্রকাশকাল: ১৯৮০, পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৭৮

মায়ের অসুখ, এই অবস্থায় ৮ বছর বয়সী ছেলেটি মায়ের আঁচলের চাবি নিয়ে গোপনে বাক্স খুললো। এক মুঠ যা পেলো ১০-১২ টাকা চুরি করে আর একটা বোঁচকা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো সঙ্গীতের টানে। ঘুরে বেড়ালো পথে পথে, দেশ থেকে দেশে, কালক্রমে হয়ে উঠলো বিশ্বসঙ্গীতের কিংবদন্তী।

বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্ম নেওয়া সংগীতজ্ঞ আলাউদ্দিন খাঁর (৮ অক্টোবর ১৮৬২ - ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭২) সেই বিশ্বভ্রমনের অভিজ্ঞতা ও মজার কিছু স্মৃতি তাঁর মুখ থেকেই শোনা যাবে ‘আমার কথা’ বইতে। বইটি কিনেছিলাম ১৯৯২ সালে। কিন্তু কী আশ্চর্য, দীর্ঘ ২৮টি বছর এই অসামান্য বইটি অপঠিতই রয়ে গেছে! না জানি, এ তালিকা কত দীর্ঘ!

আলাউদ্দিন খাঁ একসময় শান্তিনিকেতনে ছিলেন কিছুদিন। তখন তিনি আলাপ-আলোচনা-আড্ডায় নিজের জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু বলেছিলেন, সেসব কথাই শুভময় ঘোষ এ বইতে লিপিবদ্ধ করেছেন। সেটাই ‘আমার কথা’ নামে প্রথমে ‘রত্মসাগর গ্রন্থমেলা’ থেকে, পরে ‘আনন্দ প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত হয়।

কেন অসামান্য এ বই? এখন তো শর্টকাটের যুগ। তার ওপর প্রযুক্তি আরও সহজ করে দিয়েছে আমাদের জীবন। ঘরে বসে পছন্দের খাবারটি খাওয়ার জন্য এখন কেবল কষ্ট করে হা করলেই হয়। শিল্পী-সাহিত্যিক হওয়ার ক্ষেত্রে তা ভিন্ন হবে কেন! অতএব, শিল্পীর জন্য একদা অপরিহার্য বলে বিবেচ্য ‘সাধনা’, ‘অধ্যবসায়’ শব্দগুলোর ঠাঁই হয়েছে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায়।

ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়ে গেছে যে, যে কেউ চাইলেই শিল্পী বা সাহিত্যিক হতে পারেন। যিনি বা যারা এখনো হননি, (আপনাকে বুঝতে হবে যে) এ ব্যাপারে তার বা তাদের আগ্রহের অভাব রয়েছে! শিল্পসাহিত্যের নগণ্য একজন অনুরাগী হিসেবে আমি মনে করি, বিপর্যয়কর এ বাস্তবতায় যারা ইতোমধ্যে শিল্পী বা সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এবং যারা প্রতিষ্ঠা পেতে উন্মুখ তাদের উভয়েরই আলাউদ্দিন খাঁর ‘আমার কথা’ বারবার পড়া উচিত।

বইয়ের শুরুতে শুভময় ঘোষ লিখেছেন, “এই বই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী নয়, তাঁর সঙ্গীত শিল্পের আলোচনাও নয়। তবে এখানে তাঁর জীবনের মূল সত্যটি প্রকাশ পেয়েছে, আর প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সঙ্গীত সাধনার ইতিবৃত্ত। বিশ্বভারতী ১৯৫২ সালে এই সঙ্গীতগুরুকে ‘দিনেন্দ্র অধ্যাপক’ পদে আহ্বান জানিয়ে শান্তিনিকেতনবাসীদের তাঁর সঙ্গীত ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচিত হবার মহৎ সুযোগ দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ দুমাস ছিলেন। দুমাসে সঙ্গীত শিক্ষার সূচনাও হয় না, কিন্তু সঙ্গীত সাধক আলাউদ্দিনের সান্নিধ্যই শিক্ষাপ্রদ। তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, আলাপ আলোচনা, ভারতীয় সংস্কৃতির এক দুর্লভ রত্নের সন্ধান পেয়েছিল। এই সান্নিধ্যের স্মৃতি তাদের প্রত্যেকের জীবনে অবস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বইয়ের ভেতর সংগীতজ্ঞ আলাউদ্দিন খাঁর একটি স্কেচ

বইয়ের ভেতর সংগীতজ্ঞ আলাউদ্দিন খাঁর একটি স্কেচ

“ওস্তাদ আলাউদ্দিন আছেন সঙ্গীত ভবনের নতুন হস্টেলে। পুরো বাড়িটা তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যায় যখন নাতিকে (আলী আকবর খাঁর ছেলে আশিস খাঁ) তালিম দেন, সবাই আসে শোনে। অত্যন্ত আমুদে, আলাপী, অমায়িক, বিনয়ী লোক। চমৎকার কথা বলেন। বাজনার সঙ্গে সঙ্গে গল্পগুজব, গান অনেক কিছু হয়। তাঁর গল্প তাঁর বাজনার মতোই মনোহর। হাসি এবং রসিকতায় ভরা। এই কয়দিন ওস্তাদ আলাউদ্দিন নিজের মুখে তাঁর জীবনের গল্প বলেছেন। আলাউদ্দিনের নিজের জবানিতে তাঁর জীবনী শুনুন।”

কেন পড়া উচিত এ বই? শেখার আছে অনেক কিছুই। তবে সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় বিষয়টি বোধ হয় এই যে, পূর্ববঙ্গের অতি সাধারণ পরিবারের ‘গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া’ একটি সন্তানের বিশ্ববরেণ্য শিল্পী হয়ে ওঠার পথরেখাটি এত নিখাদ ও হৃদয়গ্রাহী আর কোথাও পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয় না। অধুনালুপ্ত শিল্পীর সারল্য আর বিনয়ের ব্যাপারটি নাই-বা বললাম।

এই বইতে আলাউদ্দিন খাঁ কোন রাখঢাক বা লোকাছুপা করেননি। তিনি তার জীবনের নানা দিক নিয়ে বলে গেছেন স্বতস্ফূর্তভাবে। ডাকাতের বংশধর ছিলেন সেটাও গোপন করেননি। বাড়ি পালিয়েছেন সঙ্গীত ভালোবেসে, লঙ্গরখানায় খেয়েছেন, সঙ্গীত শিখতে না পেরে আফিম খেয়ে আত্মহত্যার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, মাইহারের রাজসভায় অন্তর্ভুক্তি, নিজের সঙ্গে দুটো দৈত্য রাখার মজার কাহিনী, বিলেত ভ্রমন এরকম নানা দিক উঠে এসেছে তার কথায়।

বইটির ভূমিকায় পণ্ডিত রবিশঙ্করের স্মৃতিচারণ আরো গভীরতা এনেছে। রবিশঙ্কর খুব কাছ থেকে দেখেছেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে। তিনি লিখেছেন, “আমি সত্যি এতদিন জানতাম না যে, বাবা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের মুখের কথার উপর ভিত্তি করে এত সুন্দর একটা বই লেখা হয়েছিল। বাবার কথার মধ্য দিয়েই এইভাবে তাঁর প্রজ্ঞার কথা স্বতস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসত।”

বইটি বোর্ডবাঁধাই ছাড়াও অনলাইনে পিডিএফ আকারে পাওয়া যায়। ‘গ্রন্থ ডটকম’ থেকে যে কেউ ডাউনলোড করে পড়তে পারে।

লেখক পরিচিতি:  মিনার মনসুর, কবি ও গবেষক। বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক।

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি,সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা  kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!