বানরের সাজা

  • ফাহিমা কানিজ লাভা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-17 11:24:50 BdST

bdnews24
অলঙ্করণ: সোহাগ পারভেজ

সুন্দরবনে বাস করতো এক বানর। সে ছিল খুব দুষ্টু। সারাদিন এ গাছ থেকে সে গাছে লাফিয়ে বেড়াত। আর দুষ্টু সব বুদ্ধি এঁটে বাকি জন্তু-জানোয়ারদের জ্বালাতন করতো।

একদিন সে এক কাঁদি কলা নিয়ে বনের রাস্তার ধারে একটা গাছে গিয়ে বসল। সুন্দরবনের একটা সাধারণ নিয়ম ছিল যে কেউ রাস্তায় ময়লা ফেলে অন্যদের হাঁটাচলায় অসুবিধা করতে পারবে না। ময়লা ফেলার জন্য সজারু আর শেয়ালের খুঁড়ে দেওয়া বেশ কয়েকটি গর্ত ব্যবহার করা হতো।

কিন্তু দুষ্টু বানর ওই নিয়ম মানলে তো! কলার খোসায় পা পিছলে কেউ পড়ে গেলে তা দেখে মজা নেবে দুষ্টু বানর, এই তার মতলব।

বেশ খানিকটা সময় পরে এক বাঘ আনমনে গান গাইতে গাইতে হেঁটে আসছিলো ওই পথ ধরে। সারাদিনের ঘোরাঘুরি আর ভোজন শেষে বাঘ তার গুহায় ফিরছিল। যেই না সে গাছের তলায় এলো, অমনি কলার খোসায় পা পিছলে বেচারা চিৎপটাং!

‘ওরে বাবা গো, মা গো! আমার পা’টা ভেঙে গেল গো!’, বাঘ ব্যথায় চিৎকার করতে লাগলো। এদিকে বাঘের এই দুর্দশায় দুষ্টু বানর ‘হু-হু-হা-হা’ ‘হু-হু-হা-হা’ করে হাসতে শুরু করলো।

বাঘ দেখে পায়ের নিচে কলার খোসা আর মাথার উপর দুষ্টু বানরের হাসি। তার আর বুঝতে বাকি রইলো না এই কুকীর্তি কার! বাঘ পায়ের ব্যথায় চিৎকার করে কাঁদতে থাকল আর বলতে লাগলো, ‘ওরে বাবা গো, মরে যাচ্ছি গো! দুষ্টু বানর, রাস্তায় কলার খোসা ফেলে আমার এই হাল করলি! নেমে আয় গাছ থেকে, তোকে মজা দেখাচ্ছি!’

বাঘের কথা শুনে বানরের আরও হাসি এলো। সে বলল, ‘ল্যাংড়া বাঘের দেমাগ দেখ! হাঁটতে পারছে না, তা-ও কিনা আমাকে শাসাচ্ছে। আগে তো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখা, তারপর না হয় আমাকে ধরিস। হু-হু-হা-হা! হু-হু-হা-হা!’ এই বলে বানর লাফাতে লাফাতে চলে গেল।

এদিকে ভাঙা পা নিয়ে রাস্তায় পড়ে অনেকক্ষণ ব্যথায় কাতরালো বাঘ। একসময় ওই রাস্তা দিয়ে একটা ভাল্লুককে আসতে দেখে বাঘ আশার আলো দেখতে পেল। বাঘ চেঁচাতে লাগলো, ‘ও ভাল্লুক ভাই। একটু শুনুন। আমি খুব বিপদে পড়েছি, আমাকে সাহায্য করুন।’

এমন করুণ ডাক শুনে ভাল্লুক ছুটে এলো বাঘের কাছে। ভাল্লুক বলল, ‘কী হয়েছে বাঘ ভাই, আপনি এভাবে উলটে পড়ে আছেন কেন?’

বাঘ তার দুঃখের কথা ভাল্লুককে জানালো। বানর কীভাবে তার এ হাল করেছে, সেই কাহিনী শুনে ভাল্লুকের মনে খুব মায়া হলো। বাঘ বললো, ‘ভাই ভাল্লুক, আপনি যদি আমাকে কষ্ট করে হাসপাতালে পৌঁছে দিতেন, তাহলে খুব কৃতজ্ঞ থাকতাম।’

ভাল্লুক বললো, ‘অবশ্যই। কেউ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করাটাই আরেকজনের দায়িত্ব। আপনি একটু সবুর করুন, আমি আশপাশ থেকে একটা গাড়ি যোগাড় করছি।’

এই বলে ভাল্লুক গাড়ি খুঁজতে চলে গেল। হাসপাতাল ছিলো বনের শেষ প্রান্তে, হেঁটে যেতে অনেকটা সময় লাগবে। তার ওপর এতবড় বাঘকে ভাল্লুক কাঁধে করে বেশিদূর নিয়েও যেতে পারবে না। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে একটু দূরে এক ঘোড়াকে পাওয়া গেল, গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাচ্ছিল সে। ভাল্লুকের কাছ থেকে সব শুনে ঘোড়া তার গাড়িতে বাঘকে নিতে রাজি হলো। তারপর দুজনে মিলে বহু কষ্টে বাঘকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিল।

হাসপাতালে বসেছিল ডাক্তার হরিণ। রোগীকে দেখে ডাক্তার চশমা কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী সমস্যা রোগীর? পেট খারাপ, না মাথা? নাকি গলায় হাড় ফুটেছে?’

বাঘ কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘ডাক্তারমশাই, আমার পা ভেঙে গেছে। দুষ্টু বানর রাস্তায় কলার খোসা ফেলে রেখেছিল, তাতে পিছলে আমার এই দশা। আমার পা ভালো করে দিন ডাক্তারমশাই।’

সব শুনে পা টিপে-টুপে ডাক্তার বললেন, ‘আপনার পায়ের অপারেশন করতে হবে, নইলে জোড়া লাগবে না। তার আগে ব্যথা কমানোর ইঞ্জেকশনও দিতে হবে। তারপর দুই সপ্তাহ হাসপাতালে থাকবেন, একটুও নড়াচড়া করা যাবে না। কিছুদিন ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে হবে।’

ডাক্তার হরিণ ইয়া বড় একটা ইঞ্জেকশন ঢুকিয়ে দিলেন বাঘের পাছায়। তারপর বাঘের পায়ের অপারেশন হলো। পায়ে প্লাস্টার বেঁধে হাসপাতালের বিছানার সাথে সেটাকে ঝুলিয়ে রাখা হলো। দুই সপ্তাহ পর সুস্থ হয়ে বাঘ ক্রাচে ভর দিয়ে আবারও তার গুহায় ফিরে এলো। কয়েকদিন সে গুহাতেই বিশ্রাম নিল।

হাসপাতাল থেকে ফিরেই বাঘ দুষ্টু বানরটার খোঁজ করছিল। যে করেই হোক, বানরটাকে উচিত সাজা দিতে হবে, এই তার পণ। কিন্তু আগে বানরকে তো বাগে পেতে হবে। দুষ্টুটাকে ধরা তো চাট্টিখানি ব্যাপার না!

গুহায় বসে বাঘ এক ফন্দি আঁটলো। সুস্থ হতেই সে বনের রাস্তায় পাকা কলার ঢিবি বানিয়ে রাখল। বানর প্রায়ই ওই রাস্তায় আসা-যাওয়া করতো, নিশ্চয়ই পথে পড়ে থাকা কলা খাওয়ার লোভ সামলাতে পারবে না সে। আর তারপর রাস্তার পাশের বড় বটগাছের আড়াল থেকে জাল ফেলে বানরকে ধরা হবে। এরপর দুষ্টুটাকে পাকড়াও করে উচিত শিক্ষা দেওয়া যাবে। বাঘের কথামতো বড় আর শক্ত একটা জাল বুনে দিল মাকড়সা।

দুদিন যেতে না যেতেই বানরের দেখা পাওয়া গেল। পথে এত কলা দেখে বানর খুশিতে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এলো। কলা খেতে শুরু করেছে কি, এমন সময় কোথা থেকে একটা জাল এসে তাকে জড়িয়ে নিল। বানর যতই সেটা থেকে বের হওয়ার জন্য ছটফট করে, ততই জালে আরও প্যাঁচ লেগে আটকে যায়।

এবার বাঘ গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো লাঠি হাতে। আর বানরের পাছায় শপাং শপাং করে কয়েক ঘাঁ বসিয়ে দিল। ব্যথায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠতে লাগল বানর, ‘ওরে বাবা রে, মারে! আমায় মেরে ফেললো রে! আমাকে কেন মারছো বাঘ ভায়া, লাগছে যে!’

বাঘ বলল, ‘এটা তোর বদমাইশির শাস্তি। তুই বনের নিয়ম ভেঙে রাস্তায় কলার খোসা ফেলে সবাইকে জব্দ করতে চেয়েছিলি, এবার দেখ্ ব্যথা পেলে কেমন লাগে? অন্যকে ব্যথা দিয়ে মজা নেওয়ার সাজা তোকে পেতেই হবে।’

এই বলে বাঘ আরও কয়েক ঘাঁ বসিয়ে দিল বানরের পিঠে। ব্যথায় বানর কাঁদতে লাগলো। সে অনুনয় করে বাঘকে বললো, ‘এবারের মতো আমায় মাফ করে দাও বাঘ ভায়া। আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। আমি আর কক্ষনো এমন দুষ্টুমি করব না, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলব না। ভুল হয়ে গেছে।’

বানরের কান্না দেখে বাঘের মনে দয়া হলো। সেবারের মতো সে বানরকে ছেড়ে দিল। আর প্রতিজ্ঞা করালো আর কখনো যেন বানর যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ নষ্ট না করে, বনের নিয়ম-কানুন মানে। আর অন্যকে কষ্ট না দিয়ে মিলেমিশে থাকে।

এই লেখকের আরও লেখা

কাক ও কোকিলের ইতিকথা  

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি,সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা  kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  দাদাইয়ের গল্প