এ গল্পটি ভীতুদের পড়া নিষেধ

  • আলী নাঈম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-18 10:32:59 BdST

bdnews24
অলঙ্করণ: সোহাগ পারভেজ

ভূতের কথা শুনে আজকাল কেউ আর ভয় পায় না। হয়তো এ লজ্জায় ভূতেরাও আজকাল দেখা দেয় না।

অথচ আমরা ছোটবেলায় ভূতের কথা শুনলেই ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যেতাম। আর এ জন্যই ভূতেরা মাঝে মাঝে আমাদের দেখাও দিত। আমিও ছোটবেলায় ভূত দেখেছিলাম। একবার নয়, দু’বার। ছোটবেলার দেখা সেই ভূতের কথাই তোমাদের শোনাই।

আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। স্কুলের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শেষ, সময়টা সম্ভবত অগাস্ট মাস। আমাদের বড়চাচা (আমরা জ্যাঠা বলে ডাকি) ঢাকায় এসেছিলেন, ওনার সঙ্গে গেলাম গ্রামের বাড়িতে। বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল।

আমাদের বাড়ি কাছে প্রতি বৃহস্পতিবার ছোট একটা বাজার বসে। জ্যাঠাকে দেখেই বাজারের কয়েকজন হইহই করে উঠল। কয়েকদিন পর জারি গানের আসর হবে। জ্যাঠা একসময় খুব ভালো জারি গান গাইতেন। তিনি ঢাকায় গিয়েছেন শুনে জারি গানের দলের সদস্যরা একটু দুশ্চিন্তায় ছিল। কারণ জারি গানের রিহার্সাল তারই করানোর কথা। জ্যাঠা ওদের আশ্বাস দিলেন তিনি বাড়িতে দেরি করবেন না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসবেন। আমরা বাড়ি চলে এলাম।

জ্যাঠা বাড়িতে গিয়েই ব্যাগ রেখে আবার বাজারে চলে গেলেন। আমারও জারি গান শোনার খুব আগ্রহ। তাই আমিও জামা-কাপড় পাল্টে হাত-মুখ ধুয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বাজারে হাজির হলাম। এখন আর ঠিক মনে নেই, সেদিন তারা কোন গান গাইছিল। সম্ভবত কারবালার ঘটনা নিয়ে কাসেম-সখিনার জারি।

গান শুনতে শুনতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেল। এদিকে আমার খুব খিদে পেয়ে গেছে। সেই সকালে বাসা থেকে খেয়ে বেরিয়েছি। বাড়িতে এসে কিছুই খাওয়া হয়নি। কিন্তু বাড়ি যাই কী করে? একা একা বাড়ি ফিরতে হবে ভাবতেই ভয় লাগছে।

আমাদের বাড়ি আর বাজার হচ্ছে একটা আয়তক্ষেত্রের দুই বিপরীত কোণে অবস্থিত। মাঝখানে চাষের জমি। বাড়িতে দুই পথে যাওয়া যায়। কিন্তু যেদিক দিয়েই যাই, আশপাশে কোনো বাড়িঘরও নেই। ডান দিক দিয়ে গেলে পড়বে আমাদের বাঁশের ঝাড় আর জঙ্গল। বাঁশ ঝাড়ে একটা বিরাট হরিতকী গাছ আছে। ওই গাছে অনেকেই ভূত দেখেছে।

মাত্র কয়েকদিন আগে একটা ছেলে ভূত দেখে ভয় পেয়ে মারাও গেছে। ওই ছেলে নাকি দেখেছে হরিতকী গাছের মগডালে দুটো বিরাট আকারের পাখি বসে আছে। ও যখন পাখি দুটোকে দেখে আবার নিচের দিকে তাকিয়েছে তখনই নাকি পাখি দুটো শাঁই শাঁই শব্দ করে নেমে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তখন ছেলেটা ভয়ে দৌড় দিয়েছে।

এ ঘটনার পর ছেলেটা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ফলে ওদিক দিয়ে যাওয়াই যাবে না। কিন্তু বাম দিক দিয়ে গেলেও জঙ্গল। বাজারের পাশের এ জঙ্গলেই লোকজন ভূত দেখেছে। এসব গল্প আমার জানা। ফলে একা একা বাড়ি ফিরতে হবে এটা ভাবতেই ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে। কিন্তু কি করি! পেটের ভেতর যাকে বলে আগুন জ্বলছে।

জ্যাঠার ফিরতে আরো রাত হবে। বাড়িতে যাওয়ারও কেউ নেই। নানাদিক ভেবে একা একাই রওয়ানা দিলাম। কিন্তু ডান-বাম দু’দিকের কোনো পথেই গেলাম না। আড়াআড়ি বা কোণাকুণি জমির উপর দিয়ে রওনা দিলাম। গানের শব্দ, বাজারের লোকজনের শব্দ কানে আসছে, তাই মনে একটু সাহসও পাচ্ছিলাম। বাজার থেকে বেরিয়ে প্রথম কিছুক্ষণ চোখে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না।

আস্তে আস্তে চোখ সয়ে এল। একেবারে নিকষ অন্ধকার নয়। আবছা আবছা দেখা যায়। কোনোটা ছিল পাটক্ষেত, কোনোটা আখক্ষেত। আমার খালি পা। পাট বা আখ কাটার পর গোড়া রয়ে গেছে, পায়ে খুব লাগে। তাই মাটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখ তুলে দেখি বাড়ির পাশের তালগাছটা দেখা যায় কিনা।

বাজার ছেড়ে অনেকটা চলে এসেছি, প্রায় অর্ধেক পথ। গানের শব্দ আর ততটা জোরালো নয়। চোখ তুলে তাকালাম এবং ভয়ে আমার হাত-পা জমে গেল। আমার ছয়-সাত হাত সামনে দুটো মূর্তি। একটা লম্বা এবং চিকন, আরেকটা বেঁটে আর মোটা। লম্বাটা আবার দুই হাত তুলে নাড়ছে। মনে মনে ভাবলাম, ভূতগুলোকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য জঙ্গলের পাশের রাস্তা দিয়ে না গিয়ে জমির উপর দিয়ে এলাম।

কিন্তু এখানেও রেহাই নেই। আমাকে ধরতে ওরা এখানেও চলে এসেছে। আমি ভয়ে আর তাকাই না। বুড়ো আঙুল দিয়ে কড়ে আঙুলের নখের ওপর চাপ দিয়ে ধরে রাখলে নাকি ভূতেরা কিছু করতে পারে না, এমন কথা শুনেছিলাম। তাই করলাম। আর সূরা তো আওড়ে চলেছি সমানে। ভাবলাম সূরার গুণে ভূত দুটো যদি চলে যায়। ভয়ে ভয়ে আবার তাকালাম। না, ও দুটো যায়নি। আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে আর চিকন ভূতটা দুই হাত নেড়ে নেড়ে আমার দিকেই আসছে।

একবার ভাবলাম উল্টো দিকে দৌড় দেই। কিন্তু দৌড়ালেই কি আর ভূতেদের সঙ্গে পারব? ওরা তো আমার চেয়ে জোরে দৌড়াতে পারে। তাহলে উপায় কী? মন স্থির করে ফেললাম। ভূতগুলো তো আমাকে এমনিতেও ধরে ফেলবে, ওমনিতেও ধরে ফেলবে। মিছিমিছি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধরা না দিয়ে দেব এক দৌড়। কিন্তু সেটা বাড়ির দিকে এবং ভূতেদের মাঝখান দিয়েই। দুই ভূতের মাঝখানে দুই-আড়াই হাত মতো ফাঁক আছে। ওর মাঝ দিয়েই বেরিয়ে যাব।

যেই ভাবা সেই কাজ। মনের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে দিলাম দৌড়। পায়ে পাটের গোড়া বিঁধছে, বিঁধুক। কিন্তু দৌড় দিয়েই গিয়ে পড়লাম ভূতের গায়ে। আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে ভূতটাকে জড়িয়ে ধরলাম। ভূত আমাকে ধরতে এসেছিল, এখন আমিই ভূতটাকে ধরেছি। না জানি কি হয়! চোখ বন্ধ করে আছি। কিন্তু ভূত তো দেখি কিছু করে না। ভয়ে ভয়ে চোখ খুললাম। আমি ধরেছি চিকন ভূতটাকে। একটা কলাগাছ। আর পাশে যেটা মোটা ভূত মনে করেছিলাম সেটা একটা তালগাছের চারা। জমির আইলের ওপর দুই হাত ব্যবধানে গাছ দুটো দেখে আবছা অন্ধকারে আমি ভূত ভেবেছিলাম।

আমি তখন গল্পের বইটই পড়ি। কোনো কোনো বইতে পাই, ভূত বলে কিছু নেই। সবই মানুষের দুর্বল ভীরু মনের খেয়াল অথবা দেখার ভুল। ওই ঘটনার পর থেকে আমার একটু সাহস বেড়ে গেল। ভূতের ওপর বিশ্বাসও একটু কমে গেল। এরপর আরো একবার আমি ভূত দেখেছিলাম। তবে সেটা আরেক দিনের গল্প।

এই লেখকের আরও লেখা

টিকটিকির জেঠা ডাইনোসরের ভাই  

বাঘ মামার মন ভালো নেই  

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি,সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা  kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  পৃথিবীর যতকিছু