নিশাত সুলতানার গল্প: চকোলেট ডিমের ছানা

  • নিশাত সুলতানা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-22 10:26:17 BdST

bdnews24

রনি এইমাত্র খবরটা পেয়েছে। দীপু মামা আজ দেশে ফিরছেন। খবরটা জানার পর থেকেই খুশিতে লাফাচ্ছে সে।

রনির তিন মামা। দীপু মামা সবচেয়ে ছোট। তিনি থাকেন ফিনল্যান্ড। প্রতি বছর একবার দেশে আসেন তিনি। আর দেশে ফিরেই সবার আগে আসেন রনিদের বাসায়। দীপু মামা খুবই মজার মানুষ! প্রতিবার দেশে এলে রনির জন্য নিয়ে আসেন আজব কিছু।

এইতো গত বছর তিনি এনেছিলেন এক খেলনা ঘোড়া। ঘোড়াটি দেখতে যেন একেবারেই জীবন্ত! ঘোড়ার গায়ে হাত রাখলেও সত্যিকারের ঘোড়া ছোঁয়ার অনুভূতি হয়। শুধু কি তাই! একবার ‘মড়’ বললেই সারাবাড়ি দৌড়ে বেড়ায় সে। এতে না লাগে ব্যাটারি আর না লাগে চার্জার।

সন্ধ্যায় হাজির হলেন দীপু মামা। এসেই ডাক-হাঁক শুরু করলেন। মামাকে দেখেই রনি দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। দীপু মামাও যেন পারলে রনিকে কোলে তুলে নেয়!

‘রনি, এবার কোন ক্লাশে যেন! মস্ত বড় হয়ে গেছিস দেখছি!’ দীপু মামা বললেন।

রনির চটপট উত্তর, ‘আমি তো এখন বড়ই। ক্লাশ ফোরে পড়ি।’

দীপু মামা হাসতে হাসতে বললেন, ‘তাইতো দেখছি।’

এরপর তিনি রনির হাতে তুলে দিলেন ডিমের আকৃতির দুইটি চকোলেট। ঠিক যেন মুরগির ডিমের সমান। বললেন, ‘খুব সাবধানে ধরিস। ভেঙে যাবে কিন্তু। এগুলো কিন্তু সাধারণ কোনো চকোলেট না। এগুলো চকোলেট মুরগির ডিম।’

রনি তো খুব অবাক! চকোলেট মুরগির ডিম! সে আবার হয় নাকি!

দীপু মামা বললেন, ‘ডিমগুলো চাইলে এখনই খেয়ে নিতে পারিস। দারুণ চকোলেটি স্বাদ এগুলোর। তবে তুই নিশ্চয়ই সারা বছর চকোলেট খেতে চাইবি। আর যদি তাই চাস তাহলে ডিম ফুটিয়ে ছানা বের করতে হবে। তারপর ওদের বড় করতে হবে। এরপর শুধু মজা! প্রতিদিনই খেতে পারবি টাটকা তাজা চকোলেট ডিম।’

রনি বলল, ‘কীভাবে ডিম থেকে ছানা বের হবে দীপু মামা?’

দীপু মামা হাসতে হাসতে বললেন, ‘সেটাই তো রহস্য! আমি কিছুই জানি না। তোকেই উপায় বের করতে হবে। তবে সাবধান, ডিমগুলো ফ্রিজে রাখবি না। তাহলেই কিন্তু সর্বনাশ। আবার বেশি গরমে রাখলেও এগুলো কিন্তু গলে যাবে। একটু ঠান্ডা জায়গাতে রাখলেই চলবে।’

রাতেই দীপু মামা রওয়ানা হয়ে গেলেন মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে নওগাঁর উদ্দেশ্যে।

ভারি চিন্তায় পড়ে গেল রনি। সেই রাতে চকোলেট ডিমের চিন্তায় কিছুতেই ঘুম এলো না তার। ডিমগুলো থেকে ছানা ফুটাতেই হবে। কিন্তু কীভাবে! চিন্তা করতে করতে রাত ভোর হয়ে গেল।

সকালে নাস্তার টেবিলে চকোলেট ডিমের কথা তুলল রনি। হেসে ফেললেন মা-বাবা। মা বললেন, ‘দীপু মজা করে এরকম কত কী বলে! চকোলেট ডিম ফুটে কখনো ছানা হয় নাকি! কখনো শুনেছ এরকম ঘটনা? এসব চিন্তা বাদ দাও। তাড়াতাড়ি চকোলেট ডিমগুলো খেয়ে শেষ করো। না হলে নষ্ট হয়ে যাবে কিন্তু।’

মা-বাবা দুজনেই অফিসে চলে গেলেন। রনির স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। তাই স্কুল বন্ধ। মা-বাবা বেরিয়ে গেলে রনি ফোন করল নয়ন ভাইয়াকে। নয়ন রনির চাচাতো ভাই। পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান বিভাগে। বিজ্ঞান নিয়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালবাসে সে। ফোনে রনি নয়নকে ডিমের ব্যাপারটা খুলে বলল। নয়নের আর তর সইলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই রনিদের বাসায় হাজির হলো।

রনি নয়নকে ডিমগুলো দেখাল। ডিমগুলো হাতে নিয়েই সূর্যের আলোতে ধরলো নয়ন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল খুব ভাল করে। এরপর খুশিতে চিৎকার করে উঠল নয়ন। বলল, ‘রনি, তুই মনে হয় ঠিকই ধরেছিস। এগুলো চকলেট মুরগির ডিম হলেও হতে পারে। ডিমের ভেতরটা একেবারে স্বচ্ছ বলে মনে হচ্ছে। একবার চেষ্টা করে দেখি না! যদি ডিম ফুটে ছানা বেরিয়ে আসে!’

চকোলেট ডিম ফুটানোর জন্য একটা ইনকিউবেটর প্রয়োজন। মাত্র দুটি ডিম ফোটানোর জন্য এত ছোট ইনকিউবেটর কোথাও পাওয়া যাবে না! তাই ডিম ফোটাতে হলে নিজেদেরই বানিয়ে ফেলতে হবে ইনকিউবেটর। আরেকটি চিন্তা হলো, ডিমের বাইরের স্তরটি চকোলেটের তৈরি। তাই ইনকিউবেটরের ভিতরের গরমে ডিমের উপরের স্তরটি যেন গলে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আবার উষ্ণতা যেন ঠিকভাবে ডিমের মধ্যভাগে লাগে সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা চাই। নয়ন দ্রুত বেরিয়ে পড়ল বাইরে। ইনকিউবেটর বানানোর জন্য কিছু জিনিস কেনা চাই।

ঠিক একঘণ্টা পর নয়ন ফিরে এলো। নয়ন রনিকে জিজ্ঞেস করল, ছোট প্লাস্টিকের বোতল আছে বাসায়? রনি ছুটে গেল রহিমা খালার কাছে। নিয়ে এলো দুই লিটারের পুরনো একটি পানির বোতল। সেই বোতলটি দিয়েই ইনকিউবেটর বানাবে বলে ঠিক করল তারা। প্লাস্টিক বোতলটির একপাশ ছিদ্র করে তাতে আঙুর-আকৃতির ছয়টি বাল্ব সেট করা হলো।

সাধারণত ইনকিউবেটরের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে রাখা হয়। কিন্তু যেহেতু ডিমগুলো চকোলেটের তৈরি তাই তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উপর ওঠানো যাবে না। তাহলে চকোলেটের স্তর গলে যাবে। ডিমের বাইরে চিলিং পাউডার মাখিয়ে নিলে ডিমের বাইরের স্তর ঠান্ডা থাকতে পারে। এছাড়া আর্দ্রতার পরিমাণ হতে হবে অনেক বেশি। তাই ইনকিউবেটরের ভিতরে রাখা হলো ছোট্ট বাটি। সেখানে পানি দিতে হবে দিনে অন্তত তিনবার।

প্রায় বিকেল পর্যন্ত খেটেখুটে তারা বানিয়ে ফেলল ইনকিউবেটর। রহিমা খালাও সাহায্য করলেন। ইনকিউবেটরে ব্যাটারি আর তাপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র সেট করা হলো। প্লাস্টিক বোতলটি শুইয়ে তাতে বিছানো হলো কাঠের গুড়ো। ডিম দুটিতে চিলিং পাউডার মাখিয়ে সেগুলো সাবধানে রাখা হলো কাঠের গুড়ার উপরে। ইনকিউবেটরের মুখটি বন্ধ করা হলো। এরপর ইনকিউবেটরটি সাবধানে রাখা হলো রনির খাটের নিচে। সুইচ অন করতেই ইনকিউবেটরের বাল্বগুলো জ্বলে উঠলো। আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল তারা।

বাসায় ফেরার আগে নয়ন রনিকে চারটি বিষয় মনে রাখতে বলল।

১. রনি যেন রোজ দুইবার ডিমগুলো উল্টিয়ে দেয়। ডিম উল্টানোর সময় যেন সে ডিমে কুলিং পাউডার মাখিয়ে নেয়।

২. শুধু ডিম উল্টানোর সময় ছাড়া ইনকিউবেটরের সুইচ যেন কেউ বন্ধ না করে।

৩. প্রতিদিন তিনবার যেন ইনকিউবেটরের ভিতরে বাটিতে পানি দেওয়া হয়।

৪. ঘরে যেন একদম হৈচৈ না করা হয়।

নয়ন আরও বলল, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বিশ দিনেই ডিম ফুটে ছানা বের হবে। আর কোনো সমস্যা দেখলেই রনি যেন নয়নকে খবর দেয়।

শুরু হলো অপেক্ষার পালা। বিষয়টি নিয়ে রহিমা খালাও ভীষণ ভাবনায় আছেন। তিনি রোজ ঘরমোছার সময় অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন ইনকিউবেটরের দিকে। শুধু এই বিষয়ে কিছু জানল না রনির মা-বাবা। রনি নয়নের কথা মেনে চলছে। রনি প্রতিদিন নিয়ম করে দুইবার ডিম উল্টিয়ে দেয়, ডিমে কুলিং পাউডার মাখায়, ইনকিউবেটরের বাটিতে পানি ঢালে। নয়ন প্রায় প্রতিদিন রনির কাছে খবর নেয় ডিমগুলোর। তবে একটা বিষয় রনি লক্ষ্য করেছে, ডিম দুটির ওজন আগের চেয়ে কিছুটা কমে গেছে। নয়ন অবশ্য বলেছে এতে চিন্তার কিছু নেই।

ডিম ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছে প্রায় আঠারো দিন হলো। উনিশতম দিনটি ছিল শুক্রবার। হঠাৎ সকালে রনির ঘরে মায়ের হৈচৈ। ঘুম ভেঙে গেল রনির। হঠাৎ মায়ের কী হলো! বাবা, রহিমা খালা সবাই এসেছে রনির ঘরে। সবার দৃষ্টি রনির খাটের নিচে। রনির মনে পড়ল চকোলেট ডিমের কথা। তাহলে কী ডিম ফুটে ছানা বেরিয়ে এসেছে নাকি! মা বোধহয় ছানাদের চেঁচামেচিতেই এখানে ছুটে এসেছেন!

খাট থেকে লাফ দিয়ে নেমে এলো রনি। তাকাল খাটের নিচে রাখা ইনকিউবেটরে। এ কী দেখছে রনি! চকোলেট ডিম ফুটে বেরিয়ে এসেছে দুইটি চকোলেট মুরগির ছানা। ওদের পুরো শরীর নরম তুলতুলে চকলেটে তৈরি! কী মিষ্টি দেখতে! আনন্দে লাফাতে শুরু করল রনি। ঘটনা বুঝতে পেরে রনির মা-বাবাও হতবাক! এ কী করে সম্ভব!

রনি হাতে তুলে নিল একটি ছানা। ওরা এত নরম আর তুলতুলে যে ধরতেও ভয় হচ্ছে রনির। এরপর ছানাটি হাত থেকে নামিয়ে দৌড়ে নয়নকে খবর দিতে গেল রনি। দীপু মামাকেও জানাতে হবে বিষয়টা। সামনে অনেক কাজ। চকোলেট ছানাগুলোকে এবার বড় করতে হবে যে!

লেখক পরিচিতি: নিশাত সুলতানা পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে। কাজ করেন একটি উন্নয়ন সংস্থায়। তার লেখা আরও কিছু বই- ‘নিপুর রঙিন একদিন’, ‘পুটুর বদলে যাওয়া’ ও ‘সবার বন্ধু পিকু’। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য নিশাত সুলতানা পেয়েছেন ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০১৮ ও ২০১৯

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি,সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা  kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  দাদাইয়ের গল্প