উপকথা: মা যেভাবে সন্তানের জীবন বাঁচায়

  • মোহাম্মদ অংকন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-07-06 14:07:09 BdST

bdnews24
অলঙ্করণ: কাজী রুদমিলা রায়হান, পঞ্চম শ্রেণি

এক বনে এক মা-হরিণ বাস করত। তার দুটো বাচ্চা ছিল। বাচ্চা দুটো খুবই দুষ্টু প্রকৃতির। মায়ের কথা একদম শুনত না।

মা যদি বলত, ‘বাচ্চারা, তোমরা আজ বাইরে যেও না, আমি তোমাদের জন্য খাবার আনতে যাচ্ছি’, ওরা কিছুতেই মানত না। মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ছুটত। মা যেখানে যেত, ওরাও সেখানে যেত। হরিণের বাচ্চা দুটো মাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। মা-হরিণও বাচ্চা দুটোকে ভীষণ ভালোবাসত। সবসময় চোখে চোখে রাখত।

এক দিন মা-হরিণ নদীর ধারে দুর্বাঘাসের খোঁজে বের হয়। মা-হরিণ তার বাচ্চা দুটোকে বলে, ‘তোমরা এখানে খেল। আমি এই যাব আর এই আসব। তোমাদের জন্য খাবার না আনলে ক্ষিধেয় তোমরা কষ্ট পাবে।’

বাচ্চা দুটো মায়ের এমন কথায় মাথা নাড়ায় সেসময়। কিন্তু পরক্ষণে মায়ের পেছন পেছন ছুটতে থাকে। কিছু দূর যাওয়ার পর মা-হরিণ পেছনে তাকিয়ে দেখে তার বাচ্চা দুটো আসছে।

       ‘বাচ্চারা, তোমাদের বললাম ঘরে থাকতে। আর তোমরা সঙ্গে সঙ্গে চলে এলে। তোমরা কি ভালো থাকতে চাও না?’

       ‘মা, আমরাও তোমার সঙ্গে নদীর ধারে যাব। ওখানেই আমরা খাবার খাব। তোমাকে কষ্ট করে বাসায় আনতে হবে না।’

       ‘ঠিক আছে, চল তাহলে।’

তারপর মা-হরিণ বাচ্চা দুটোকে সঙ্গে নিয়ে নদীর ধারে চলে যায়। বাচ্চা দুটোকে খেলতে দিয়ে মা-হরিণ খাবার যোগাড় করতে থাকে। সে একটু দূরে চলে যায়। এরই মধ্যে এক নেকড়ে বাঘের চোখে পড়ে বাচ্চা দুটো। সেও শিকারের জন্য বনের ভেতর থেকে নদীর ধারে এসেছে। নেকড়ে বাঘ হরিণের বাচ্চা দুটোকে দেখে বেশ লোভাতুর হয়ে ওঠে। জিহ্বায় জল চলে আসে।

       ‘বাহ্, কী সুন্দর দুটো হরিণছানা। কী কপাল আমার। নদীর ধারে এলাম আর শিকার পেলাম। আজ মজা করে খাব ওদের।’

নেকড়ে বাঘ দাঁত চিবোতে চিবোতে, মাথা তুলে গর্জন করতে করতে হরিণের বাচ্চা দুটোর কাছে এগুতে থাকে। ততক্ষণে নেকড়ে বাঘের গর্জন মা-হরিণের কানে পৌঁছে যায়। সে সব ফেলে বাচ্চা দুটোর কাছে ছুটে আসতে থাকে। কিন্তু ততক্ষণে নেকড়ে বাঘ বাচ্চা দুটোর কাছে এসে হাজির হয়। মা-হরিণও ততক্ষণে তার বাচ্চা দুটোর কাছে হাজির হয় এবং ওদের আগলে ধরে। ওদিকে নেকড়ে বাঘ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মা-হরিণকে বলে, ‘বাচ্চা দুটো আমার শিকার। তুমি সরে যাও, বলছি।’

মা-হরিণ কান্নাস্বরে বলে, ‘আমি সরে যাব না। তুমি আমাকে খাও, তবুও আমার বাচ্চা দুটোকে বাঁচতে দাও।’

এ নিয়ে নেকড়ে বাঘ ও মা-হরিণের মধ্যে কথা কাটাকাটি হতে থাকে। মা-হরিণ চায় তার জীবনের বিনিময়ে হলেও তার বাচ্চা দুটো বেঁচে যাক, বাসায় ফিরে যাক। ওদিকে নেকড়ে বাঘ চায়, বাচ্চা দুটোকে খেতে। ওদের মাংস সুস্বাদু হবে। মা-হরিণ বুড়ো হয়ে গেছে। ওকে খেতে ভালো লাগবে না। বাচ্চা দুটো যেন তাই চাই, চাই।

মা-হরিণ ও নেকড়ে বাঘের কথা কাটাকাটি হরিণের বাচ্চা দুটো বুঝতে পারে। বুঝতে পারে, ওদের এখন ভীষণ বিপদের সময়। এখান থেকে ছুটে পালাতে হবে। কিন্তু মাকে ছেড়ে পালালে কেমন হয়? ওদিকে মা বারবার চোখ দিয়ে ইশারা করে, ‘বাচ্চারা যাও, তোমরা পালিয়ে যাও।’

শেষমেষ মা-হরিণের ইশারা বুঝে বাচ্চা দুটো মাকে রেখে নদীর ধার থেকে দ্রুত ছুটতে থাকে। নেকড়ে আরও ক্ষিপ্ত হয়। ওদের পেছনে ছুটতে চায়। কিন্তু মা-হরিণ বাধা দেয়। বাচ্চা দুটোকে ধরতে না পেরে রেগে গিয়ে মা হরিণকে নেকড়ে বাঘ কামড়ে ধরে। কামড় দিয়ে তার শরীর থেকে মাংস খাবলে তোলে। মা-হরিণ তবুও চুপচাপ থাকে। যতক্ষণ না তার বাচ্চাগুলো নদীর ধার থেকে নিরাপদে বাসায় ফিরতে না পারে, ততক্ষণ ওদের দিকে মায়াভরা চোখে তাকিয়ে থাকে। আর নেকড়ে বাঘ মা-হরিণকে রাগে কামড়াতে থাকে।

নেকড়ে বাঘের কামড়ে মা-হরিণের শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। সে দৌড়ে পালাতে পারে না। নেকড়ে বাঘ তাকে আটকে ফেলেছে। সে ধরেই নেয় আজ তার জীবনের শেষ দিন। বাচ্চা দুটোকে আর দেখতে পারবে না কখনও। বাচ্চা দুটো সঙ্গে সঙ্গে না আসলে সে নিশ্চয়ই পালাতে পারত। বাচ্চা দুটোর বিপদ রক্ষা করতে গিয়ে তার বিপদে পড়তে হল। এতে তার মোটেও আফসোস নেই। সে তার বাচ্চা দুটোকে বাঁচাতে পেরে সার্থক।

নেকড়ে বাঘ মা-হরিণকে আটকে রেখে তার বাচ্চা দুটোকে ডাকতে থাকে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে নেকড়ে বাঘের বাচ্চা দুটো এসে হাজির হয়।

       ‘এই দেখ বাচ্চারা, তোমাদের জন্য আজ হরিণ শিকার করেছি। তোমরা মজা করে খাও এখন।’

নেকড় বাঘের বাচ্চা দুটো হরিণকে দেখে থমকে ওঠে। তারা চিনতে পারে এই হরিণ তাদেরকে বিপদ থেকে বাঁচিয়েছিল কদিন আগে। তাই তারা বাঘ মাকে বলে, ‘না, মা তুমি এই হরিণকে মারতে পার না।’

       ‘কেন মারব না, বাচ্চারা? ও আমাদের শিকার। ওর বাচ্চা দুটো পালিয়েছে।’

       ‘তাহলে শোন, একটা ঘটনা বলছি।’

নেকড়ে বাঘের বাচ্চারা একদিনের ঘটনা বলতে থাকে।

       ‘আমরা একদিন খাদ্যের জন্য নদীর তীরে আসি। আমরা কাঁকড়া ধরতে এতই মরিয়া হয়ে উঠি যে ঢেউ এসে আমাদের তলিয়ে নিয়ে যেতে পারে তা আমাদের একদম খেয়াল থাকে না। হঠাৎ জোরে ঢেউ এসে আমাদের দুজনকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। আমরা ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার করতে থাকি। কিন্তু আশপাশে কেউ নেই যে আমাদের বাঁচাবে। সে কী বিপদ!

তারপর এই হরিণ আমাদের বাঁচাতে ছুটে যায়। আমাদের ডাঙ্গায় তুলে আনে। আমরা জীবন নিয়ে গুহায় ফিরে যাই। সেদিন যদি হরিণ আমাদের বাঁচাতে এগিয়ে না আসত, তবে আমরা আর বেঁচে থাকতাম না আজ। আমাদের ছাড়া তোমার কেমন লাগত, মা?’

       ‘তোমাদের ছাড়া আমার একদম ভালো লাগত না, বাচ্চারা।’

হরিণ তখন নেকড়ে বাঘকে বলে, ‘তুমি যদি আজ আমার বাচ্চা দুটোকে খেতে, তাহলে আমারও একদম ভালো লাগত না। একই কষ্ট আমারও হত।’

নেকড়ে বাঘের বাচ্চা দুটো তাদের মাকে বলে, ‘মা, তুমি হরিণকে ছেড়ে দাও। সে তার বাচ্চাদের কাছে ফিরে যাক। তার বাচ্চারা তাকে না পেয়ে ভীষণ কান্না করবে।’

নেকড়ে বাঘ তার বাচ্চা দুটোর কথা শুনে মা-হরিণকে তখনি ছেড়ে দেয়।

       ‘দুঃখিত, হরিণ। তোমাকে আঘাত করা আমার মোটেও ঠিক হয়নি। তুমি আমার বাচ্চা দুটোকে বাঁচিয়েছ জেনে খুশি হলাম। তোমাকে ধন্যবাদ জানাই।’

তারপর নেকড়ে বাঘ মা-হরিণকে ছেড়ে দিয়ে তার দুটো বাচ্চাকে নিয়ে সেখান থেকে গুহায় ফিরে যায়। ওদিকে আহত মা-হরিণ রক্তাত শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে বাসায় ফিরতে থাকে। তার শরীরজুড়ে তীব্র ব্যথা। ঝরঝর করে রক্ত ঝরছে। নেকড়ে বাঘের কামড় সে মাথা পেতে নিয়েছিল শুধু তার বাচ্চা দুটোকে বাঁচাতে।

দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে থাকে। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে মা-হরিণ তার বাচ্চা দুটোর কাছে ফিরে। বাচ্চা দুটো তাদের মাকে দেখে কেঁদে ওঠে। বুকে জড়িয়ে নেয়। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘মা, দুষ্টু বাঘটার সঙ্গে তুমি অনেক লড়াই করেছ বুঝি?’

       ‘না, আমি লড়াই করিনি একদম। আমি তো নেকড়ে বাঘের শক্তির সঙ্গে পারি না। ও যাতে তোমাদের খেতে না পারে তাই নিজেকে ধরা দিয়েছি। তোমরা না থাকলে আমি দৌড়ে পালাতাম ঠিকই।’

       ‘তাহলে যে তুমি ফিরে এলে? তোমাকে কেন ছেড়ে দিল?’

       ‘আমি একদিন নেকড়ে বাঘের দুটো বাচ্চাকে রক্ষা করেছিলাম। সে উপকারের প্রতিদান দিয়েছে আমাকে।’

বাচ্চা হরিণ দুটো মাকে ফিরে পেয়ে ভীষণ খুশি হয়। মায়ের সেবা-যত্ন করতে থাকে। তারপর মা-হরিণ বলে, ‘আজকের পর থেকে আমার কথার অবাধ্য হবে না। দেখলে তো তোমাদের জন্য আজ কত বড় বিপদের মুখে পড়েছিলাম।’

বাচ্চা দুটো মায়ের কথা অকপটে মেনে নেয়। সমস্বরে বলে ওঠে, ‘আর কখনও এমন দুষ্টুমি করব না। তোমার অনুমতি ছাড়া আর কোথাও যাব না। তুমি আমাদের লক্ষ্মী মা।’

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  দাদাইয়ের গল্প