ছোটগল্প: একটা গাছে ফুল ফুটতে কতোদিন লাগে

  • জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-07-08 17:37:26 BdST

bdnews24
আঁকা: শিশুশিল্পী রাইদা তাকিয়া

থিতুন আর বিতুন দুই ভাই, যমজ। থিতুন গাছ লাগাতে খুব ভালবাসে আর বিতুন স্টিকার জমাতে ভালবাসে।

ওদের ছোট মামা গতবছর জন্মদিনে দুটো বই উপহার দিয়েছিল। ওরা প্রথমে বুঝতে পারেনি যে সেগুলো ছিল আসলে স্টিকারের বই, অনেক যত্ন করে একটা একটা স্টিকার আলাদা করে নেওয়া যায়। থিতুন তো জানে যে এই বইগুলো আসলে বিতুনেরই বেশি পছন্দ, তাই ও দুটো বই-ই বিতুনকে দিয়ে দিয়েছিল। ও বিতুনকে বলেছিল যে আমার গাছে কুঁড়ি আসতে শুরু করেছে, সেই কুঁড়িগুলো যেদিন ফুল হবে এটা দেখলেই ও বেশি খুশি হবে। তাই ও অপেক্ষা করছে আর বিতুনের পছন্দ বলে ওকে সব স্টিকার দিয়ে দিয়েছে।

তাছাড়া বিতুনতো ওর থেকে ৩৯ মিনিটের ছোট। মা বলেছে সবসময় ছোটদেরকে বড়রা বেশি ভালবাসবে, তাহলে ছোটরাও বড়দের থেকে শিখবে কীভাবে অন্যদেরকে ভালবাসতে হয়, এই ব্যাপারটা।

এটা এপ্রিল মাস। গত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই চারমাস থিতুনের বেলিফুলের গাছগুলোর সব পাতা ঝরে গিয়ে ডালগুলো শুধু কাঠি হয়ে আছে। ওর খুব মনখারাপ হতো। গাছদের জন্য খুব কান্না পেত এটা ভেবে যে আর যদি কখনও গাছগুলো না বাঁচে!

ও তবুও অনেক যত্ন করে গাছে পানি দিত। যতোই শীতকাল হোক তবুও কিছুটা পানি ও গাছদের খেতে দিত। ওকে কেউ শেখায়নি, ও নিজে নিজেই বুঝতে পেরেছে যে গাছদেরও পানি পিপাসা পায়। একজন মানুষ যেমন গরমকাল, শীতকাল অথবা বর্ষাকাল সব কালেই প্রতিদিন পানি খায়, তেমন গাছদেরও তো পানি পিপাসা লাগার কথা। এটা ভেবে থিতুন সব দিন গাছগুলোয় পানি দিত।

তারপর একদিন ও সত্যি সত্যি দেখলো যে মার্চ মাসের একটা ভোরে গাছদের ডালে ডালে খুব ছোট সবুজ মাথা জাগতে শুরু করেছিল। ও সেদিন অনেক খুশি হয়েছিল। বুঝতে পেরেছিল যে ওর দেওয়া পানি খেয়েই তাহলে গাছগুলো প্রাণ ধরে রেখেছিল এতদিন। এখন আবার পাতাগুলো জীবন্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

কিন্তু এবছর সারা পৃথিবীতে একটা ভাইরাস দেখা দিয়েছে, তাই এখন থিতুন-বিতুনের স্কুল বন্ধ। সারাদিন বাড়িতে থাকছে বলে থিতুন দিনের মধ্যে প্রায় পাঁচশবার বারান্দায় গিয়ে দেখে যে পাতাগুলো কতটুকু বড় হয়েছে? কিন্তু তা হয় না। গাছগুলোর পাতা একটু একটু করেই প্রতিদিন বড় হয়। এভাবেই ওকে প্রায় দেড়মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এখন ওর গাছগুলোয় অনেক কুঁড়ি এসেছে। এই আনন্দেই তো ও সব স্টিকার বিতুনকে দিয়ে দিতে পেরেছে!

যেদিন ওর গাছে প্রথম ফুল ফুটলো সেদিন ও বাবা-মা, দাদু আর বিতুন সবাইকে ভোরবেলায় ডেকে দেখিয়েছে ওর হাসিখুশি ফুলগুলোকে। তখন বাবা বলেছে যে এবার ওর ফুলগুলো নাকি দাদুবাড়ির ফুলগুলোর মতোই সুন্দর। এটা শুনে থিতুনের খুব গর্ব হচ্ছিল যে ও বাবাকে বাবার ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দিতে পেরেছে। তারপর একদিন বাবা একটা ভোঁতা ছুরি দিয়ে থিতুনের গাছগুলোর গোড়ায় মাটি খুঁড়ে দিয়েছিল।

থিতুন বাবার পাশে বসে মন দিয়ে দেখেছে বাবা কীভাবে মাটি খুঁড়ে দিয়েছে। যেন গাছের গোড়া কেটে না যায় এজন্য কিছুটা দূরের মাটি শুধু আলগা করে দিয়ে ঝুরঝুর করে দিয়েছে। এর কিছুদিন পর ও দেখেছে গাছে আরও বেশি পাতা আসতে শুরু করেছে। তখন থেকে ও ভেবেছে মাসে একদিন করে ও টবের মাটি এভাবে খুঁড়ে দেবে।

একদিন সন্ধ্যায় দুই ভাই বারান্দায় গাছের পাশে ছিল। তখন ওরা দুজন ঠিক করলো আজ ওরা একটা ফুলের কুঁড়ি ফোটার সময়টা সামনে থেকেই দেখবে। কিন্তু যেখানে ওদের গাছটা রাখা ছিল সেখানে বসার ঘরের লাইটের আলোটা খুব কম পৌঁছায়। তাই ফুলগুলোকে খুব স্পষ্ট দেখা যায় না রাতের বেলা। তাছাড়া বারান্দায় অনেক সময় বসে থেকে মশার কামড় খাচ্ছিল বলে মা একটা বকা দিয়েছে। এজন্য ওরা দুজন তখন ভাবল আচ্ছা একটা ফুলের কুঁড়ি ছিঁড়ে নিয়ে ঘরে পড়ার টেবিলের ওপর রেখে তখন দেখবে কখন একটা একটা করে পাতা ফুটে ওঠে?

থিতুন-বিতুন আরও অধীর অস্থির অনুভব করতে লাগলো ফুল ফোটার সময়টা দেখবে বলে। কিন্তু তখন মা রাতের খাবার খেতে ডাকল। ওরা কুঁড়িটাকে টেবিলের ওপরে রেখেই খেতে চলে গেল। ফিরে এসে দেখলো একটুও ফোটেনি তখনও। তারপর আরও কিছুক্ষণ সময় গেল। ওরা দাঁতব্রাশ করে মশারি টানিয়ে দুজনে রাতে ঘুমানোর জন্য তৈরি হয়েছে তখন দেখলো কুঁড়িটা অনেকটা আলগা হয়েছে আধফোটার মতো। ওদের কি ভীষণ আনন্দ লাগছিলো তখন।

হঠাৎ বিতুন বলল, আচ্ছা একটা কাজ করলে হয় না, যদি আস্তে করে কুঁড়িটাকে চাপ দিয়ে দেই তাহলে তো ফুটে উঠবে, তাই না? তখন থিতুনও ভাবল, হ্যাঁ চেষ্টা করে তো দেখা যায় এভাবে কাজ হয় কিনা? ওরা কিছুটা চাপ দিয়ে দেখলো যে হ্যাঁ অনেকটাই ফুটে ওঠা ফুলের মতো লাগছে। তবে তারপরও এটা ঠিক সম্পূর্ণ ফুটে ওঠা ফুল হয়নি, কুঁড়ির মতই লাগছে এখনো। তখন ওরা ভাবলো আচ্ছা এভাবে রেখি দেই। আমরা ঘুমিয়ে যাই এখন। সকালে দেখবো যে ফুটে গিয়েছে।

সকালে উঠেই ওরা দুজনেই একলাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে টেবিলের কাছে গেল। কিন্তু দেখলো যে ফুলটা সেই রাতের মতো অতটুকুই ফুটে রয়েছে, সম্পূর্ণ ফোটেনি। তখন বাবা ওদের ঘরে আসলো। বাবা বলল, ওরা কি অভিযান করেছে আগের রাতে? বাবা ওদের দুজনকে তখন বারান্দায় নিয়ে গেল আর বলল যে গাছের ফুলগুলো দেখো আর আরো একবার তোমাদের টেবিলের ফুলটাকে দেখো।

ওরা তা-ই করল। তখন বাবা ওদের বুঝিয়ে বলল, একটা কুঁড়ি থেকে একটা ফুল ফুটতে মাত্র ১০-১৫ মিনিট অথবা ৩০ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু এই সময়টা ওদেরকে গাছেই থাকতে দিতে হয়। তোমরা ২/৩ মাস ধরে গাছের ডালে নতুন পাতা আসা, কুঁড়ি আসা আর সেই কুঁড়ি বড় হয়ে ওঠার জন্য অপেক্ষা করেছো।

কিন্তু একটা ফুল ফোটার জন্য ৩০ মিনিট সময় অপেক্ষা করোনি, কুঁড়িকে হাতের চাপে এক মিনিটেই ফোটাতে চেষ্টা করেছো। এটা তো প্রকৃতির নিয়ম নয়। প্রকৃতির নিয়ম হলো এই সময়টা কুঁড়িকে দিতেই হবে, সেটা গাছেই থাকতে পারে অথবা গাছ থেকে আলাদা করে টেবিলে রাখলেও ওকে এই সময়টা দিতে হবে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে জোর করে দ্রুত ফোটাতে গেলে কুঁড়িটাকে আসলে মেরে ফেলার মতো  হয়।

বাবার কথায় থিতুন বিতুন দুজনই খুব লজ্জিত হয়। ওরা খুব ভুল করেছে, এটা বুঝতে পারে। বাবা তখন ওদের মুখ দেখেই বুঝতে পারেন যে ওরা খুব লজ্জিত ওই কুঁড়িটাকে মেরে ফেলার জন্য। তখন বাবা বললেন যে, এই যে ভুলটা করেছো, এটা থেকে আসলে তোমরা জানলে যে কোন কাজের জন্য প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সময় দেওয়া কাকে বলে, তাই না?

থিতুন-বিতুন দুজনেই বলল, হ্যাঁ। আর আমরা কখনোই কোন কাজ সময়ের আগে করে ফেলার জন্য অধৈর্য আচরণ করবো না। থ্যাংক ইউ বাবা তোমাকে।

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  দাদাইয়ের গল্প