রিন্তির প্রথম সমুদ্র দেখা

  • মৃত্তিকা সমাদৃতা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-08-10 10:24:39 BdST

bdnews24
আঁকিয়ে: মানহা নাঈমাত ইসলাম, শ্রেণি কেজি

প্রতি বছর বার্ষিক পরীক্ষার পর বাবা আমাদের সবাইকে বেড়াতে নিয়ে যায়। রিন্তি ছোট ছিল বলে আমরা অনেকদিন দূরে কোথাও যাইনি। আমার খুব সমুদ্র দেখতে যেতে ইচ্ছে করছিল।

চার বছর বয়সে একবার গিয়েছিলাম। তখন এত ছোট ছিলাম তেমন কিছু মনে নেই। তাই আমি বাবাকে বললাম এবার কক্সবাজার নিয়ে যেতে। শুনে মা-ও সায় দিল। রিন্তিতো রীতিমতো লাফিয়ে উঠলো। সে প্রথমবার সমুদ্র দেখবে।

সেইমতো বাবা ৪টা টিকিট কেটে নিয়ে এলো। বাসে যাওয়া হবে। চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাব। খুব মজা হবে।

এক শুক্রবার সকালে আমরা রওনা হলাম। কক্সবাজার পৌঁছে হোটেলে যেতে যেতে রাত হয়ে গেল। তাই সেদিন আমরা রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। 

পরদিন খুব সকালে উঠলাম। আমাদের রুমের বারান্দা থেকে সমুদ্র দেখা যায়। রিন্তি সমুদ্র দেখে বলে, দেখো আপু, কে যেন সমুদ্রে নীল রং মিশিয়ে দিয়েছে। কারণ পানির তো কোন রং নেই। কিন্তু এই পানিটা নীল নীল। ওর কথা শুনে আমরা সবাই হেসে ফেললাম। আমাদের হাসতে দেখে রিন্তিও খিলখিল করে হাসতে লাগলো।

হোটেলে নাস্তা করে আমরা সি বিচে গেলাম। কি বিশাল সমুদ্র! রিন্তির কথাই যেন সত্যি। আসলেই কেউ যেন নীল রং মিশিয়ে দিয়েছে পানিতে। আমি যেহেতু এর আগেও একবার কক্সবাজার এসেছি, তাই আমি সমুদ্রে দাপাদাপি করতে লাগলাম। কিন্তু রিন্তি ঢেউ দেখে একটু ভয় পেয়ে গেল।

বাবা একটা চেয়ার ভাড়া করে বসে ছিল। রিন্তি বাবার কাছে বসে বালু দিয়ে মহল বানাতে লাগলো। একটু পর নিজেই এসে জলে দাঁড়ালো। তারপর খুব মজা পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে বললো, আপু দেখো, পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে। এভাবে রিন্তিও খেলতে লাগলো।

এখানে ঘণ্টা ভিত্তিতে টিউব ভাড়া দেওয়া হয়। আমরা এক ঘণ্টার জন্য একটা টিউব ভাড়া করলাম। আমি আর রিন্তি টিউবে বসে নৌকা নৌকা খেলতে লাগলাম। মুহূর্তেই যেন এক ঘণ্টা কেটে গেল। আজ আমরা ঘোড়াও চড়লাম। রিন্তিও উঠেছিল, কিন্তু পড়ে যাবার ভয়ে নেমে গেল। প্রচণ্ড রোদ, তাই মা আমার আর রিন্তির জন্য সানগ্লাস কিনে দিল।

দুপুরে লাঞ্চ করে আমরা আবার গেলাম সি বিচে। আজ আমরা বেশিরভাগ সময় বিচেই থাকলাম। মা-বাবা সমুদ্র দেখলো, বিচে ঘুরলো আর আমি এবং রিন্তি বালি দিয়ে খেলতে লাগলাম। হোটেলে যাবার সময় রিন্তি চিৎকার করে বলে, চিংড়ি ভাজা! আমি চিংড়ি ভাজা খাব। রিন্তির কথায় বাবা আমাদের জন্য চিংড়ি ভাজা কিনলো ।

কিন্তু পিছনে ফিরতেই আমরা হতভম্ব, রিন্তি নেই! কোথায় গেল? মা তো প্রায় কেঁদেই ফেলেছিল। এমন সময় রিন্তি নিজেই চলে এলো। মা রিন্তিকে দেখতে পেয়েই জড়িয়ে ধরল। রিন্তি তার হাতের ঝিনুকগুলো দেখিয়ে বলল, আমি এগুলো কুড়িয়ে রেখেছিলাম। ভুলে ফেলে এসেছিলাম, তাই এগুলো আনতে গিয়েছিলাম। মা বলল, আমাদেরকে না বলে আর কোত্থাও যাবে না। রিন্তি মাথা নেড়ে সায় দিল। আমরা চিংড়ি ভাজা খেয়ে রুমে চলে এলাম।

রাতে আমরা হোটেলের ডাইনিং-এ খেতে গেলাম। টেবিলে খাবার আসার আগে  রিন্তি আমাকে বলে, আপু তোমাকে একটা ধাঁধা ধরি? আমি বলি, ধরো। ও বলে, বলো তো, কার পেটে আঙুল থাকে আর মাথায় থাকে পাথর? আমি বলি, এটা আবার কি?পারবো না। ও বলে, একটু ভাবো। আমি বললাম, মাথায় আসছে না। বলে দাও।

রিন্তি বলে, মার হাতের আঙুলে দেখো ওটা কি। আমি বলি, ও আচ্ছা, আংটি। এত সহজ ধাঁধাটা পারলাম না! ঠিক আছে, এবার আমি তোমাকে একটা ধাঁধা ধরি। বলো দেখি, তিনজন লোকের মধ্যে একজন লোক সমুদ্রে বালি ফেললো, আরেকজন ফেললো পানি। আর শেষ লোকটা ফেললো বরফ। তাহলে এদের মধ্যে কে আম খেতে পছন্দ করে? রিন্তি বলে, এ্যাঁ! এটা কি? দাঁড়াও একটু ভেবে নেই, এটার সঙ্গে আম খাওয়ার সম্পর্ক কি? উমম্, পারবো না। বলে দাও। 

আমি বলি, শেষ লোকটা। কারণ, সে সাগরে বরফ ফেলেছিল। তার মানে সে হিমসাগর পছন্দ করে। হিম মানে তো ঠান্ডা, আর বরফও ঠান্ডা। রিন্তি বলে, হিমসাগর আবার কি? আমি বলি, এটা আমের একটা প্রজাতি। এমন সময় খাবার চলে এলো।আমরা খেয়ে রুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ টিভি দেখে আমরা ঘুমানোর জন্য তৈরি হলাম। কাল আমরা ইনানী বিচ এবং হিমছড়িতে যাব।

পরদিন খুব সকালে উঠলাম। নাস্তা করে আমরা রওনা দিলাম। ইনানী যাওয়ার রাস্তাটা কি সুন্দর! একদিকে পাহাড় আর আরেকদিকে সমুদ্র। যেতে যেতে ইনানী পৌঁছলাম। রিন্তি জিজ্ঞেস করে, আপু, এই বড় বড় কালো কালো জিনিসগুলো কি? আমি বলি, এগুলো প্রবাল পাথর। রিন্তি বলে, ও। কি বড় পাথর, না? আমি বলি, হ্যাঁ, অনেক বড়। সেখানে জায়গায় জায়গায় গর্ত হয়ে পানি জমে ছিল। আমরা সেই অল্প জলেই থাকলাম।

আমি আর রিন্তি পানি ছিটিয়ে খেলতে লাগলাম। আমরা একজন প্রফেশনাল ক্যামেরাম্যানকে দিয়ে ছবিও তোলালাম। এখানে তিন চাকার একটা মোটরসাইকেল চলে। আমরা একটা ভাড়া করে চড়লাম। বাবা ড্রাইভারের সিটে বসে সেটা চালালো। সমুদ্রের পাড় ধরে আমরা ঘুরে বেড়ালাম। ৩০ মিনিটের জন্য ভাড়া করেছিলাম। সময় যেন মুহূর্তে কেটে গেল।  

এবার চললাম হিমছড়ি। মা খাবার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। আমরা গাড়িতেই খেয়ে নিলাম। হিমছড়ি পৌঁছলাম। এখানের মূল আকর্ষণ হলো ঝর্ণা। কিন্তু আমরা গিয়ে ঝর্ণাটা দেখে হতাশ হলাম। লোকজন কোক, চিপস খেয়ে খালি প্যাকেট ফেলে জায়গাটা নোংরা করে রেখেছে। আমি কিছু বলার আগেই রিন্তি বলে ওঠে, জায়গাটা কি নোংরা করে রেখেছে, তাই না আপু? আমি বলি, ঠিক বলেছো, ডাস্টবিন বানিয়ে ফেলেছে। সেখানে একটা উঁচু পাহাড় আছে। সিঁড়ি বেয়ে অনেকগুলো ধাপ পার হয়ে পাহাড়ে উঠতে হয়। একদম উপর থেকে সমুদ্রটা খুব সুন্দর দেখায়।

আমার আর রিন্তির দুজনেরই উচ্চতাভীতি আছে। বাবা আমাদের উপরে ওঠানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বেশিদূর আমরা উঠতে পারিনি। ভয়ে নেমে গিয়েছি। ওখানে অনেক দোকান বসে। মা আমাদের সবার জন্য টুপি কিনলো। রিন্তির একটা পুতুল পছন্দ হলো, সে ওইটা কিনলো। আর আমি কিনলাম একটা খেলনা। এরপর আমরা হোটেল ফিরে গেলাম।  

সন্ধ্যার পর আবার বের হলাম কেনাকাটা করতে। মা কিছু ঝিনুকের গয়না আর আচার কিনলো। বাবা শুটকি খেতে ভালোবাসে, তাই বাবার জন্য কেনা হলো শুটকি। রাতের খাবারটা রুমে আনা হলো। আজ আমরা সবাই খুব টায়ার্ড ছিলাম। তাড়াতাড়ি তাই লাগেজ গুছিয়ে ঘুমাতে গেলাম। কাল আমরা ঢাকায় ফিরে যাব।

ফিরে আসার দিন রিন্তির মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। সে কিছুতেই ঢাকায় ফিরতে চাইছিল না। সে মাকে বলল, মা আমরা এখানে একটা বাসা ভাড়া করে থেকে যাই চলো। শেষ পর্যন্ত বাবাকে কথা দিতে হলো আগামী বছর আমরা আবার এখানে বেড়াতে আসবো। বাস চলতে শুরু করলে মা মোবাইলে একটা গান চালিয়ে হেডফোনের একটা অংশ আমার কানে আর আরেকটা অংশ রিন্তির কানে লাগিয়ে দিল। আমরা চোখ বন্ধ করে গান শুনছি, ‘এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাব......।’

লেখক পরিচিতি:  শিক্ষার্থী, পঞ্চম শ্রেণি, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ

এই লেখকের আরও লেখা

আমার বোন রিন্তি

রিন্তির স্কুলে ভর্তি হওয়ার গল্প

রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া কুকুরছানা

 

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  আমার কাজ