ছোটগল্প: কলির ভাষা শেখা

  • জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-08-11 12:49:20 BdST

bdnews24
আঁকিয়ে: সুবাইতা তাজমিন (৮), দ্বিতীয় শ্রেণি, সিলভার বেলস কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড গার্লস হাই স্কুল

ওর নাম কলি। হ্যাঁ ফুলের যে কুঁড়ি ফুটে ফুল হয় তারই আর একটা নাম হলো কলি। কলি ওর বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে।

তবে কলি কারো সঙ্গে একদম কথা বলতে চায় না। আসলে ব্যাপার হয়েছে কি জানো! কলির বাবা ও মা দুজনই কথা বলতে পারেন না। মানে বাক প্রতিবন্ধী। ওদের একমাত্র ফুটফুটে রাজকন্যা মেয়েটি হলো কলি।

জন্মের পর কলির নানি-দাদি ওর কানের কাছে একটু শব্দ করে দেখেছিল ও শুনতে পায় এমন কিছু বোঝা যায় কিনা। ওরা দেখেছিল সেই খুব ছোট্ট শিশু ঘুমের ভেতর বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে অঁয়াও-ইঁয়াও শব্দে কেঁদে উঠেছিল।

আসলে ওকে কাঁদাতে চায়নি ওর নানু অথবা দাদু, ওনারা চেয়েছিলেন যে ও শুনতে পায় কিনা এটা বুঝতে চেষ্টা করা।

এরপর কলিকে নিয়ে ঢাকায় একটা খুব সাধারণ বাসায় ওর বাবা-মা থাকতো। কলির বাবা-মা যেহেতু কথা বলতে পারে না সেই কারণে ওরা প্রতিবেশী কারও বাসায় প্রায় যেতোই না, কলির বাবা একটা কারখানায় চাকরি করত আর কলির মা সারাদিন ঘরের কাজ করার পর অনেক ধরণের সেলাই করতো। ওদের বাসায় টিভি পর্যন্ত ছিল না।

কলির যখন বয়স ৫ বছর তখন একদিন ওকে স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে গেল কলির মা এবং কলি একজন মামী, যিনি ওর নানাবাড়ি থেকে ওদের বাসায় বেড়াতে এসেছিল। স্কুলের হেড-ম্যাডাম একজন শিক্ষিকাকে ডাকলেন কলিকে কিছু প্রাথমিক প্রশ্ন করার জন্য। কিন্তু কলি একটা কথারও উত্তর দিলো না, শুধুই শিক্ষকের মুখের দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকলো। একথা শুনে হেড-ম্যাডাম কিছুতেই ভর্তি করতে চাইলেন না। কিন্তু যে ম্যাডাম ওর পরীক্ষা নিলেন সেই ম্যাডাম বললেন, ও কয়েকদিন স্কুলে আসলেই অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে কথা বলতে শুরু করবে।

কলি তখন স্কুলে ভর্তি হলো। কিন্তু ও ক্লাসে একটাও কথা বলত না, শিক্ষক যখন সব বাচ্চাদেরকে একসঙ্গে পড়তে বলতেন তখনও ও চুপ করে থাকতো। এভাবে তো স্কুলে ওকে পড়ানো যায় না। তাই শিক্ষকরা ওর বাবা-মাকে চিঠি পাঠালেন যে ওকে বিশেষ শিশুদের স্কুলে ভর্তি করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তখন কলির আর স্কুলেও যেতে ইচ্ছে করতো না। এভাবে ওকে পরপর ২ বছর স্কুলে ভর্তি করেছে ওর মামা-মামী। কিন্তু স্কুলে গিয়ে কলির একটা কথাও বলতে ভালো লাগতো না, তাই দুই মাস পরই সেই স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়েছে।

একদিন ওদের মহল্লায় একটা অন্যরকম স্কুল শুরু হলো। এ স্কুলে কোন বেঞ্চ, টেবিল-চেয়ার নেই। একজন আপা অনেক ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বেশ বড় শিশুদের নিয়ে ক্লাস করান, কিন্তু এ শিশুদের কয়েকজনের প্রতিবন্ধিতা আছে, কয়েকজনের নেই। তবে ওরা একইসঙ্গে একই ক্লাসে পড়ে। ওদের একটাই ক্লাসরুম, মেঝেতে পাটি বিছিয়ে সবাই গোল হয়ে বসে পড়ে।

সেই স্কুলে গিয়ে কলির খুব ভালো লাগলো। এখানে ওদের কোনও বই নেই, শিক্ষক ছবি এঁকে দেন, তার পাশে একটা অক্ষর লিখে দিয়ে সেই অক্ষর নিয়ে গল্প বলেন। ওরা খিলখিল করে হেসে সেই গল্প শোনে, তারপর কেমন করে যেন শব্দটা মনের ভেতরে থেকে যায়। এভাবে ওরা এক মাসের মধ্যেই সবগুলো বাংলা আর ইংরেজি শব্দ শিখে ফেলল।

আর মজার কথা হলো, ওরা সবাই এক মাসে তিনটা ছড়া বলতে শিখেছে। একদিন ওদের শিক্ষক রানি আপা ক্লাসে আসার সঙ্গে সঙ্গে কলি গিয়ে বলল, আপা আজ আমি ক্লাসে ছড়া পড়ে শুনাই? রানি আপা খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললেন, হ্যাঁ শুনাও। কলি বলল, সবাই আসুক, তারপর। সবাই আসার পর রানি আপা আগে সবাইকে শরীরচর্চা করালেন, এরপর ক্লাস শুরু হলো। তখন জিজ্ঞেস করলেন আজ যদি আমরা ক্লাসে কোন পড়া না শিখে বরং ছড়া আবৃত্তি করি, নাচ শিখি, তাহলে কেমন হবে?

কলি আর তার বন্ধুরা খুশিতে হাততালি দিয়ে ওঠে। কলি সেদিন প্রথম ক্লাসে সব শিশুদের সামনে দাঁড়িয়ে কবি জসীম উদদীনের ‘মামার বাড়ি’ ছড়াটা আবৃত্তি করে শোনায়। কলি শুধু ছড়াটা আবৃত্তি করে না, ও হাত দিয়ে এতো সুন্দর করে অভিনয় করে যে তা দেখে সব বাচ্চাদের সঙ্গে রানি আপা হাততালি দিলেন অনেক জোরে জোরে।

জানো, সেইদিন স্কুল থেকে ফিরে কলি এতো খুশি ছিল যে ও খুব চাইছিলো ওর মাকে ঘটনাটা বলবে। কিন্তু ওর বাবা-মা কেউই একদম শুনতে পায় না, তাই ওর সেদিনের আনন্দের কথা আর মাকে বলা হয় না। রাতে মায়ের পাশে শুয়ে ওর মনটা হঠাৎ খুব খারাপ লেগে ওঠে। ও ভাবে- আচ্ছা, তাহলে তো আমার বাবা-মা নিজেরাও খুশি হতে পারে না, কারণ বেশিরভাগ খুশির কথা ওরা বুঝতে পারছে না।

তখন ও মনে মনে ভাবে এ বিষয়টা নিয়ে রানি আপার কাছে জানতে চাইবে কী করা যায়? পরদিন ও সবার আগে স্কুলে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে রানি আপা আসার জন্য। আপাকে দেখামাত্র ও ছুটে গিয়ে বলে, গতকাল ওর মন খারাপ হয়েছিল সেই কথা আর ওর মনে যে প্রশ্ন এসেছে সেই কথা।

তখন রানি আপা বলেন, হ্যাঁ তুমি যখন বড় হবে তখন তুমি ইশারা ভাষায় কথা বলা শিখতে পারবে, এটা শিখে তুমি তোমার বাবা-মাকে শিখাতে পারবে এবং ওদের সঙ্গে সব বিষয়ে কথা বলতে পারবে। এ খবরটা শুনে সেইদিন থেকে কলি একটাই স্বপ্ন দেখতো ও একদিন ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলবে। ওর সব খুশির খবর ওর বাবা-মাকে বলবে।

একদিন কলি সত্যি সত্যি বড় বড় হলো, ও ইশারা ভাষা শিখেছে। সেই ভাষা শিখে ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে সব বিষয়ে কথা বলে। কলি আজ আমাদের দেশের প্রায় সব বড় বড় অনুষ্ঠানে যারা বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি থাকেন তাদের জন্য ইশারা ভাষায় সব ব্যাখ্যা করতে পারে। দেখেছো, যে শিশুরা নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে খুশির কথা বলতে সব বাধা দূর করতে চেষ্টা করে সেই শিশুরা একদিন দেশের আরো কতো মানুষের উপকার করতে শেখে!

 

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!

ট্যাগ:  দাদাইয়ের গল্প