পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

পশুরা কেন মানুষের বিপক্ষে বিদ্রোহ করে

  • শাফায়েত হোসেন রুবেল, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-08-01 00:41:55 BdST

bdnews24

বই: অ্যানিমেল ফার্ম, লেখক: জর্জ অরওয়েল, অনুবাদক: শাহ আলম চৌধুরী, প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স, মূল্য: ৯০ টাকা

জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ প্রথম প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়ে ১৯৪৫ সালের ১৭ অগাস্ট যুক্তরাজ্যে। উপন্যাসটিকে আপাতদৃষ্টিতে নিছক রূপকথার গল্প মনে হলেও মূলত এটি রুশ বিপ্লবের পরবর্তী রাশিয়ার অবস্থা নিয়ে একটি বিদ্রূপাত্মক উপন্যাস।

উপন্যাসটির সংক্ষিপ্ত কাহিনি: ম্যানর ফার্মের মালিক মি. জোনস ফার্মের জন্তুদের উপর নানাভাবে অত্যাচার করতো। তাদেরকে দিয়ে কাজ করাতো বেশি, কিন্তু খাবার দিতো কম। জন্তুদেরকে ন্যূনতম খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতো কেবল তাদেরকে দিয়ে কাজ করানোর জন্য।

একসময় ফার্মের জন্তুগুলো বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। মূলত ফার্মের সবচেয়ে প্রবীণ জন্তু ‘বুড়ো মেজর’ নামের এক শূকর জন্তুদের মধ্যে এই বিদ্রোহের বীজ বপন করে। এক রাতে মি. জোনস যখন নেশা করে ঘুমাচ্ছিলো, তখন বুড়ো মেজর এক গোপন সভার আয়োজন করে ফার্মের বার্নে। একে একে কুকুর ব্লুবেল, জেসি, পিনশার, শূকরের দল, ঘোড়া বক্সার আর ক্লোভার, ছাগল মুরিয়েল, গাধা বেনজামিন, মুরগি ও কবুতরের দলসহ ফার্মের অন্যান্য সব জন্তু সভায় উপস্থিত হলো।

সবার সামনে বক্তৃতা দিলো মেজর। সে সব জন্তুদের চোখে নতুন এক স্বপ্ন এঁকে দিলো। যে স্বপ্ন স্বাধীনতার, যে স্বপ্ন মানুষের অত্যাচার থেকে মুক্তির। মেজর সব জন্তুদের বোঝাতে লাগলো যে মানুষ পশুদের দিয়ে সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করায়, প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার দেয়, কাজ করার শক্তি হারিয়ে ফেললে কসাইখানায় বিক্রি করে দেয়। মানুষের কারণে গরুরা তাদের বাচ্চাদের সাধ্যমত দুধ দিতে পারে না, মুরগিরা তাদের ডিম থেকে সাধ্যমত বাচ্চা উৎপাদন করতে পারেনা।

মেজর পশুদের বোঝায় যে মানুষেরা পশুদের শত্রু। এই শত্রুদের মোকাবেলা করে নিজেদের স্বাধীন করতে হবে। সভার শেষের দিকে মেজর সব জন্তুদের ‘বিস্টস অব ইংল্যান্ড’ নামের একটা গান শিখিয়ে দেয়। এই গানটাই জন্তুদেরকে বিপ্লবের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তোলে।

এ সভার কিছুদিন পর মারা যায় মেজর। কিন্তু জন্তুদের চোখে থেকে মুছে যায়নি তার দেখানো স্বপ্ন, কণ্ঠ থেকে হারিয়ে যায়নি তার শেখানো ‘বিস্টস অব ইংল্যান্ড’। মেজরের দেখানো স্বপ্নকে তারা নাম দিলো ‘জন্তু মতবাদ’। এই মতবাদ অনুসারে- মানুষ জন্তুদের শত্রু। জন্তুরা সবাই সমান। জন্তুরা সবাই মিলে উৎপাদনকার্যে অংশ নেবে আর নিজেদের উৎপাদন নিজেরা ভোগ করবে। জন্তরা সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। জন্তু মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্রোহ করতে হবে।

অবশেষে একদিন ফার্মের সব জন্তুরা মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শূকর স্নোবল, নেপোলিয়ন আর স্কয়েলারের নেতৃত্বে মি. জোনসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলো আর মি.জোনস তার চাকরবাকর নিয়ে ফার্ম থেকে পালিয়ে গেল। প্রতিষ্ঠিত হলো ‘জন্তু মতবাদ’। ‘ম্যানর ফার্ম’ এর নাম বদলে রাখা হলো ‘অ্যানিমেল ফার্ম’। স্নোবল আর নেপোলিয়ন জন্তুদের নেতৃত্ব গ্রহণ করলো। জন্তুদের জন্য সাতটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হলো, যা লিখে দেওয়া হলো ফার্মের দেয়ালে।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো নীতিগুলো শূকররা ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে দিল। একটি নীতিও শেষপর্যন্ত টিকলো না। পশুদের মধ্যে শূকর শ্রেণি ছিল তুলনামূলক বুদ্ধিমান আর চালাক। তাই তারাই জন্তুদের নেতৃত্ব দিতে লাগলো। ধীরে ধীরে শূকর শ্রেণি স্বার্থপর হয়ে উঠতে লাগলো। জন্তু মতবাদ অনুসারে সব জন্তুর সমান খাবার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শূকররা নিয়ম করে দিল যে আপেল আর গরুর দুধ কেবল শূকররাই খাবে। অন্য জন্তুরা খাবে না। কারণ হিসেবে শূকর স্কয়েলার ব্যাখ্যা দিলো যে- শূকরেরা পশুদেরকে আর খামারকে পরিচালনা করে আর এটা অনেক কঠিন একটা কাজ। এই কাজের জন্য শরীরকে সুস্থ রাখা জরুরি। দুধ আর আপেল শরীরের জন্য পুষ্টিকর। তাই শূকররাই কেবল এসব খাবে। বোকা পশুগুলো এই ব্যাখ্যাতে সন্তুষ্ট হলো।

ওদিকে মি. জোনস পালিয়ে গিয়ে হাত পা গুটিয়ে বসে রইলো না। একদিন সে দলবল নিয়ে এসে অ্যানিমেল ফার্মে আক্রমণ করলো। জন্তুরাও তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। শেষমেশ মি. জোনস আবারও পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেল। পশুরা এই যুদ্ধের নাম দিলো ‘গো-শালার যুদ্ধ’।

স্নোবল আর নেপোলিয়নের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিলো না। বিভিন্ন ব্যাপারে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা লেগেই ছিল। বিশেষ করে উইন্ডমিল প্রতিষ্ঠা নিয়ে দুজনের মধ্যে তুমুল বিরোধ হয়েছিলো। যার পরিপ্রেক্ষিতে নেপোলিয়নের পোষা কিছু কুকুর একদিন অতর্কিতভাবে আক্রমণ করে স্নোবলের উপর। স্নোবল কোনমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়।

তারপর থেকে শুরু হয় নেপোলিয়নের স্বৈরশাসন। সে নিজেকে শূকর কমিটির তথা পশুদের নেতা ঘোষণা করে। স্কয়েলার দুধ আর আপেলের মতোই স্নোবলকে বিতাড়িত করার আর নেপোলিয়নের নিজেকে নেতা ঘোষণা করার পক্ষে চাতুর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়, এমনকি স্নোবলের নামে কুৎসা রটিয়ে দেয়, যা বোকাসোকা পশুরা মেনে নেয়। এরপর থেকে উপন্যাসে আর কখনও স্নোবলকে দেখা যায় না। তবে বিভিন্ন সময়ে ফার্মে রব ওঠে যে স্নোবল আশপাশে কোথাও লুকিয়ে আছে আর অ্যানিমেল ফার্মের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে।

নেপোলিয়ন পশুদের উপর নানা ধরণের অন্যায় করতে থাকে আর স্কয়েলার সেসবের মুখরোচক ব্যাখ্যা দেয়, যা পশুরা সরলমনে মেনে নেয়। উইন্ডমিল প্রতিষ্ঠার জন্য নেপোলিয়ন পশুদের কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলো। এমনকি ছুটির দিনও পশুদের উপর কাজ চাপিয়ে দিলো। এক সময় সে মানুষের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করলো, যা ছিলো জন্তু মতবাদের নীতিবিরোধী। কিন্তু স্কয়েলার বরাবরের মতোই একাজের ব্যাখ্যা দিলো জন্তুদের কাছে।

এক সময় নেপোলিয়ন মানুষের কাছে খামারের মুরগিদের ডিম বিক্রি শুরু করলো। তাতে কিছু মুরগি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত হলো। নেপোলিয়ন বিদ্রোহী মুরগিগুলোকে হত্যা করে ফেলল। অন্যান্য কিছু পশুদেরকেও সে নানা অভিযোগে হত্যা করলো। পশুদের বিভিন্ন সভায় ‘বিস্টস অব ইংল্যান্ড’ গাওয়া হতো। কিন্তু নেপোলিয়ন গানটা নিষিদ্ধ করে দিলো আর তার স্থলে চালু করলো শূকর কবি মিনিমাস রচিত ভিন্ন একটি গান।

জন্তু মতবাদের নীতিগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগলো। শূকরেরা বিছানায় ঘুমাতে আরম্ভ করলো, ফিতা পড়তে লাগলো, মদ্যপান আরম্ভ করলো- এসবই ছিলো জন্তু মতবাদের নীতিবিরোধী।

এক সময় অ্যানিমেল ফার্মে উইন্ডমিল প্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু পরবর্তীতে উইন্ডমিলের যুদ্ধে উইন্ডমিলটি ধ্বংস করে দেয় পাশের খামারের মালিক ফ্রেডরিকের বাহিনি। অবশ্য এই যুদ্ধে জিতেছিলো জন্তুরা।

অ্যানিমেল ফার্মের শক্তিশালী ঘোড়া বক্সার ছিল কঠোর পরিশ্রমী আর নেপোলিয়নের একনিষ্ঠ বাধ্যগত। কিন্তু বুড়ো হয়ে সে যখন কাজের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে তখন নেপোলিয়ন তাকে কসাইখানায় বিক্রি করে দেয় আর স্কয়েলার জন্তুদেরকে বোঝায় যে অসুস্থ বক্সারকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এভাবেই শোচনীয় জীবনাবসান ঘটে বক্সারের।

উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে দেখা যায় নেপোলিয়ন পার্শ্ববর্তী খামারের মালিক পিলকিংটনের সঙ্গে এক বৈঠকে যোগ দেয় এবং পারস্পরিক সম্পর্কের কথা পাকাপাকি করে। এই বৈঠকে সে ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ এর নাম পরিবর্তন করে পুনরায় ‘ম্যানর ফার্ম’ রাখে।

উপন্যাসটিকে আপাতদৃষ্টিতে নিছক রূপকথার গল্প মনে হলেও জর্জ অরওয়েল মূলত এ উপন্যাসে রুশ বিপ্লব ও রুশ বিপ্লব পরবর্তী রাশিয়ার অবস্থাকেই চিত্রায়িত করেছেন। শূকর বুড়ো মেজরকে লেখক ভ্লাদিমির লেলিনের রূপক হিসেবে তুলে ধরেছেন। যেসব জন্তুরা মি. জোনসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলো মেজর। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের বিদ্রোহীদেরকেও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন লেলিন।

মি. জোনসকে চিত্রায়িত করা হয়েছে রাশিয়ার সর্বশেষ সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাস হিসেবে, রুশ বিপ্লবে যার পতন হয়। মি. জোনস যেমন অত্যাচারী খামার মালিক ছিলেন, তেমনি দ্বিতীয় নিকোলাসও এতোই অত্যাচারী শাসক ছিলেন যে তার রাজনৈতিক শত্রুরা তার নাম দিয়েছিলো ‘নিকোলাস দ্যা ব্লাডি’। উপন্যাসের ‘জন্তু মতবাদ’ দ্বারা রূপায়িত করা হয়েছে সমাজতন্ত্রকে, যা রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

রুশ বিপ্লবের ফলে বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতায় আসে। এ বলশেভিকরা নিজেদেরকে রাশিয়ার বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণির নেতা হিসেবে বিবেচনা করতো। কাজেই তাদের প্রতিমূর্তি ফুটে ওঠে উপন্যাসের শূকর শ্রেণিদের মধ্যে। স্নোবল আর নেপোলিয়ন মূলত যথাক্রমে লিওন ত্রোতস্কি ও জোসেফ স্তালিনেরই রূপক। স্তালিন ১৯২৯ সালে মতবিরোধের কারণে ত্রোতস্কিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে নির্বাসিত করেন, যা নেপোলিয়ন কর্তৃক স্নোবলকে বিতাড়িত করার ঘটনায় চিত্রায়িত হয়েছে।

স্তালিন ১৯৩০ সালে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন। তিনি নিজের ক্ষমতা শক্ত করার জন্য নানারকম নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেন, নেপোলিয়নের কর্মকাণ্ডে যার প্রতিফলন দেখা যায়। স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানিকে পরাজিত করে। উপন্যাসে হিটলারকে চিত্রিত করা হয়েছে ফ্রেডরিক হিসেবে, উইন্ডমিলের যুদ্ধে নেপোলিয়ন যাকে পরাজিত করে। উপন্যাসের বক্সার দ্বারা চিত্রিত করা হয়েছে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণিকে, যারা স্তালিনের কথায় উঠতো-বসতো ও কঠোর পরিশ্রম করতো।

এভাবেই উপন্যাসটির অন্যান্য ঘটনাও রুশ বিপ্লবের পরবর্তী রাশিয়ার বিভিন্ন ঘটনাকে ফুটিয়ে তুলেছে, যা বিজ্ঞ পাঠকরা একটু মনোযোগ সহকারে পড়লেই বুঝতে পারবেন। উপন্যাসটি রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে যেমন বড়রা উপভোগ করতে পারবেন, তেমনি শিশুরাও উপন্যাসটিকে রূপকথার গল্প হিসেবে পড়ে আনন্দ পাবে।

আলোচক: শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণী, কাদিরদী কলেজ, বোয়ালমারী, ফরিদপুর

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!