পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

শাল পিয়ালের কান্না

  • মিলন বনিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-10-05 12:25:41 BdST

bdnews24
কোলাজে ব্যবহৃত অলঙ্করণ: সমর মজুমদার

পিয়াল খুব রাগ করেছে। বাবাকে কত করে বলেছে বাসা পাল্টাতে। পিয়ালের বাবা রহমান সাহেব, কিছুতেই ব্যাপারটা বুঝতে চাইছেন না।

পিয়ালই বা হঠাৎ বাসা বদলের ব্যাপারে এত উৎসাহী কেন? হরিশ্চন্দ্র বাই লেনে রহমান সাহেবের পৈতৃক বাড়ি এটি। স্কুল জীবন শেষ করে মা-বাবা, ভাই-বোনসহ সবাই এই বাড়িতে এসে উঠেছিলেন।

তখন কেমন যেন ভয় ভয় করত। চারদিকে নিরিবিলি। শান্ত পরিবেশ। আশপাশে অন্য কোন বাড়ি ছিল না। চারপাশে সব নানা জাতের গাছ-গাছালি। নানা রকম ফুলের বাগান। ফলের গাছ। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসেতো সব ছেলেরা এই বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করত।  সন্ধ্যেবেলায় ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দ আর হাস্নাহেনার গন্ধে মন ভরে যেত। পিয়ালের দাদা-দাদি দুজনেই বাসার সামনে বৈঠকখানায় বসে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করত।

বাড়িটা হলুদ রঙের। পুরানো ধাঁচে গড়া ইটের দোতলা বাড়ি। বড় বড় বারান্দা। ঘরগুলোও অনেক বড়। রহমান সাহেবের বাবার হাতে গড়া বাড়ি। আজকাল নিজের বাড়ি ছেড়ে কেউ কি ভাড়া বাসায় থাকতে চায়? পিয়ালের মা রেবেকাও এই বাড়ি ছেড়ে যেতে নারাজ। চট্টগ্রাম শহরে পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগির পর পিয়ালদের ভাগ্যে এই তিন কাঠার বাড়িটি জুটেছে। পাশের প্লটটা খালি পড়ে আছে। পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে ক্রিকেট ফুটবল খেলে। দিনের বেশিরভাগ সময় চিৎকার চেঁচামেচি লেগে থাকে। হৈ হুল্লোড় আর খেলার আনন্দে সারাক্ষণ মেতে থাকে।

পিয়ালের জন্মও এখানে। দাদা দাদির হাত ধরে জন্ম থেকে এ মাঠের সঙ্গে পিয়ালের সখ্যতা। এ মাঠের ধুলো কাদা গায়ে মেখে পিয়াল হামাগুড়ি দিতে শিখেছে। আছাড় খেয়ে আবার হাঁটতে শিখেছে। পিয়ালের যখন সাত বছর বয়স তখন দাদা মারা যায়। তার দুবছর পর দাদি।

এখন পিয়াল বড় একা। সারাক্ষণ শুধু দাদা আর দাদির কথা মনে পড়ে। এখন পিয়ালের জন্য মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকার কেউ নেই। অবশ্য পিয়াল এখন বড় হয়েছে। স্কুল ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে এই মাঠে খেলাধুলা করে সময় কাটে।

সামনে পিয়ালের পিএসসি পরীক্ষা। পিয়ালের মধ্যে ইদানীং এক বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন রহমান সাহেব। সে সারাক্ষণ দোতলার বারান্দায় চেয়ারে বসে খোলা মাঠটার দিকে অপলক চেয়ে থাকে। আর কী যেন ভাবে। কথাবার্তাও খুব একটা বলে না। বাবার সঙ্গে কথা হলে বলে বাসা পাল্টাতে। এই বাসায় নাকি তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখে বড় বড় লরিগুলো অনেক ভারি ভারি যন্ত্রপাতি নিয়ে আসছে, যাচ্ছে। সারাক্ষণ মেশিনের গড় গড় শব্দ। কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে।

খোলা মাঠটাতে আর কোন শিশুর কোলাহল নেই। হৈ চৈ নেই। সারাক্ষণ শুধু যন্ত্রপাতির শব্দ। ইট ভাঙ্গার শব্দ। এক এক করে সব গাছগুলো কেটে ফেলেছে। বিরান হয়ে আছে মাঠটা। চারপাশে টিনের বেড়া পড়েছে। যেদিন ফুলের বাগানটা জঙ্গলের মত সাফ করছিল সেদিন মাকে জড়িয়ে ধরে পিয়াল খুব কাঁদছিল। এখন আর একটি পাকা আমও কুড়িয়ে খেতে পারবে না। পাখিগুলো সব কষ্টে চিৎকার চেঁচামেচি করে আকাশে ঘুরছে। কোথাও বসতে পারছে না।

কয়েকটা পাখি পিয়ালদের বাড়ির কার্ণিশে এসে বসেছিল। আর পিয়াল পাখিগুলোর সামনে গিয়ে বারবার বলছিল-আমরা মানুষরা খুব খারাপ। আমরা তোমাদের ভাষা বুঝি না, তাই তোমাদের কষ্টও কেউ বুঝে না। পিয়ালের পড়ায় মন বসছে না। মা বাবা বুঝতে পারছে না হঠাৎ ছেলেটার কী হলো? প্রথম প্রথম ভেবেছে দাদা দাদি না থাকাতে বুঝি ছেলেটার কষ্ট হচ্ছে।

পিয়াল একটা পাখিকে কাছে ডেকে বলল- ভাই কিছু মনে করো না। তোমাদের তো ডানা আছে। তাই তোমরা ইচ্ছেমতো উড়তে পারো। আমাদের তাও নেই। তাই ইচ্ছা থাকলেও কোথাও উড়ে যেতে পারি না। বাবাকে কত করে বলেছি বাসা বদলাতে। এখানে আমার আর ভালো লাগছে না। চোখের সামনে মাঠ, ফল, ফুল বাগানের উপর এত অত্যাচার দেখে আমার শুধু কান্না পায়। খোলা মাঠে তোমাদের সঙ্গে আমরাও খেলতাম। আজ তোমরা গৃহহারা। আর আমরা গৃহবন্দি। আমার একদম ভালো লাগছে না।

পিয়ালের একরোখা জেদ দেখে মা-বাবা অনেক বুঝিয়েছে। বলেছে, দ্যাখো আমাদের অল্প বেতনের চাকরি। তাই দিয়ে সংসার চালাতে হয়। আলাদা বাসা ভাড়া নিতে গেলে সংসার চালাবো কী করে? তাছাড়া এটা আমাদের নিজেদের বাড়ি। ইচ্ছে করলে তুমি সারা বাড়িতে ইচ্ছেমতো খেলতে পারো। ফল-ফুলের বাগান করতে পারো। ছাদেও ইচ্ছা করলে পছন্দমত ফুলের বাগান করতে পারো।

পিয়াল জানতে চাইলো- শাল গাছ লাগাতে পারবো?

শাল গাছতো অনেক বড় হয়। তুমি চাইলে আমি একটা চারা এনে দেবো। আমাদের বাড়ির এক কোণায় লাগাতে পারবে।

মাঠের ওই শালগাছটা আমার খুব প্রিয় ছিল। কত রকমের পাখি বসে গান গাইতো। অথচ ওরা কি নির্মমভাবে গাছটা কেটে ফেললো। তাই দেখেইতো আমার আরও খারাপ লাগছে। পাখিগুলো খেলতো ওই গাছের ডালে ডালে। আজ পাখিগুলোর বসার জায়গা নেই। দেখছো না কেমন এলোমেলো ভাবে ঘোরাঘুরি করছে।

পিয়াল একটু থেমে বলল-বাবা আমার জন্য বড় দুটো কাঠের বাক্স আনবে?

বাক্স দিয়ে কী করবি?

ছাদে বসিয়ে দিয়ে পাখিগুলোকে থাকার জায়গা করে দেবো।

বাহ! খুব সুন্দর আইডিয়া তো। আমি কালই তোর জন্য দুটো বাক্স আর কিছু চারাগাছ নিয়ে আসবো।

বাবার কথায় সান্ত্বনা খুঁজে পেল পিয়াল। অল্প কিছুদিনের মধ্যে পিয়ালদের পুরো বাড়িটা বাগান আর ফলে ফুলে ভরে উঠলো। পাখিগুলো এক এক করে জানালার কার্ণিশে বাসা বাঁধতে শুরু করলো। পিয়ালের আনন্দ আর ধরে না। স্কুল থেকে ফিরে সারাক্ষণ বাগানে ফুল পাখিদের সঙ্গে কথা বলে। তার সময় ভালোই কেটে যায়।

পিয়ালের বন্ধু তরী আর সাগর আসে দেখতে। সঙ্গে মামাতো ভাইবোনরাও আসে। ওরা অনেক দুঃখ করে বলে- তোর ভাগ্যটা অনেক ভালো পিয়াল। নিজের বাড়িতে আছিস। তাই ইচ্ছেমতো যা খুশি করতে পারছিস। আমাদের তো ভাড়া বাসা। নিজের ইচ্ছেমতো কিছুই করতে পারি না। সারাক্ষণ ঘরের মধ্যে টিভি দেখে সময় কাটে। বলতে পারিস, একরকম গৃহবন্দি হয়ে আছি। টবে একটা গাছ লাগাবো, তারও উপায় নেই। জমিদারের কথা শুনতে হয়। বলে কিনা বাড়ি ময়লা হয়ে যাবে। ওসব এখানে চলবে না। ভাই বোন মিলে মন খুলে হৈ চৈ করতে পারি না। অমনি জমিদার গিন্নি এসে হাজির। শাসিয়ে যায়, বাড়িতে কী ডাকাত পড়েছে নাকি? এত চিৎকার চেঁচামেচি কিসের? এরকম কথা পিয়াল স্কুলের বন্ধুদের মুখেও শুনেছে।

বাড়ির সীমানা দেওয়ালের ভেতরে লাগানো শাল গাছটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে। পিয়াল প্রতিদিন পানি দেয়। ইদানীং পিয়াল খেয়াল করেছে, বাবার সঙ্গে প্রতিদিন কারা যেন আসা যাওয়া করছে। বাড়িটা কয়তলা হবে, ডিজাইন কেমন হবে এসব নিয়ে সবাই কথা বলে। পিয়াল ওসব বুঝতে চায় না। সে শুধু এই শাল গাছ আর ফুল পাখিদের নিয়ে থাকতে চায়।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে পিয়াল দেখলো তাদের বাড়ির সামনে একটা বড় লরি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িতে অনেকগুলো যন্ত্রপাতি।  পিয়াল দৌড়ে গিয়ে প্রিয় শালগাছটাকে জড়িয়ে ধরে।

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!