পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

লালন দর্শন ও একজন রব ফকির

  • মো. ইয়াকুব আলী, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-10-23 17:31:28 BdST

bdnews24
রব ফকির

রব চাচাকে নিয়ে কখনও লিখবো ভাবিনি। কারণ রব চাচার মতো নিভৃতচারী মানুষ আমি আমার এই ছোট জীবনে দ্বিতীয়টি দেখিনি আর রব চাচার মতো বড় মানুষেরও সাক্ষাৎ পাইনি।

উনার সঙ্গে আমার কখনও সরাসরি কথা হয়েছে এমন কোন স্মৃতির কথা আজ আর মনে পড়ে না, মানুষটা এতটাই নিভৃতচারী ছিলেন। উনাকে নিয়ে লিখতে গেলে একেবারে আমার শৈশবের দিনগুলোতে ফিরে যেতে হবে যখন সব প্রকার উৎসবেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ দিতাম।

একদিন মা বললেন, ‘চলো ফকিরপাড়ায় একটা ওরশ হচ্ছে দেখে আসি।‘ আমাদের বাড়াদী গ্রামটা আমার খুব প্রিয়। কারণ এটাকে আমরা বলি গ্রাম, কিন্তু এটা আবার শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। আমাদের গ্রামটা কুষ্টিয়া পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত। আমাদের গ্রাম থেকেই বারখাদা ইউনিয়ন পরিষদের সীমানা শুরু। গ্রামে একদিকে যেমন পাকা রাস্তা আছে আবার আমাদের বাড়ির ঠিক পেছন থেকেই শুরু হয়েছে অবারিত সবুজ ফসলের ক্ষেত। তাই আমি সবাইকে বলতাম আমাদের বাড়িতে বেড়াতে গেলে তুমি শহরতলীর প্রকৃত রূপটা ধরতে পারবে।

আমাদের গ্রামে অনেকগুলো পাড়া বা মহল্লা আছে এবং পাড়ার নাম শুনেই বোঝা যায় সেই পাড়ার মানুষদের জীবিকা কী? যেমন ফকিরপাড়া, শাহপাড়া, খালপাড়া, ধোপাপাড়া ইত্যাদি। ফকিরপাড়ার নামকরণ নিয়ে শুরুতে আমার ধারণা ছিল ওই পাড়ার সবলোক ভিক্ষা করে। পরে বুঝতে পারলাম ওই পাড়ার প্রায় সবাই ফকির লালন শাহের অনুসারী বাউল, তাই এমন নামকরণ।

ফকির পাড়ার যে বাড়িতে ওরশের আয়োজন করা হয়েছিল সেটা ছিল রব চাচাদের বাড়ি। রব চাচার ছোটভাই আল্লেক আমার মেজো ভাই ইউনুসের সঙ্গে একই ক্লাসে পড়তো। আর রব চাচার মা ছিলেন আমাদের গ্রামের বিখ্যাত ধাত্রী। একবার অনেক রাতে পাশের বাড়ির চাচির দ্বিতীয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার সময় উনাকে অনেক রাতে ডাকতে গিয়েছিলাম। উনি তক্ষুণি আমাদের সঙ্গে রওয়ানা দিয়ে দিয়েছিলেন।

রব চাচার ছেলে পরান ছিল আমাদের খেলার সাথী। আমি যদিও বয়সে একটু বড় ছিলাম, কিন্তু কনিষ্ঠদের সঙ্গে মিশতাম বলে পরানের সঙ্গে আমার সখ্যতা ছিল। উপরন্তু ফুপাতো ভাই জাহিদ যাকে আমরা ছোটনানা বলে ডাকি উনি হচ্ছে পরানের অনেক কাছের মানুষ, সেইসূত্রেও অনেক বেশি হৃদ্যতা আছে পরানের সঙ্গে। জাহিদ নানাও গানপাগল মানুষ, নিজে গানের চর্চা করেন, আবার পাড়ার সবাই মিলে মাঝেমধ্যে গানের আসর বসান। এমনকি আমি দেশ ছাড়ার আগমুহূর্তে উনার বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি সেখানেও গানের আসর বসেছে অবধারিতভাবে। বাংলাদেশি বিয়ের ঐতিহ্যের একেবারে ষোলোকলা পূর্ণ করে উনি নিজের বিয়ের আয়োজন করেছিলেন।

রব চাচা শারীরিকভাবে ছিলেন শীর্ণকায়। গ্রামের মানুষদের সঙ্গে তেমন একটা মেলামেশা করতে দেখিনি, তবে যেটুকু দেখেছি উনার কথাবার্তা ছিল অনেক ধীরস্থির এবং নিচুস্বরের। চাচাকে দেখতাম রাস্তার একপাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে উনার কর্মস্থল কুষ্টিয়া সুগারমিলে যাচ্ছেন। আবার মাঝেমধ্যে ঘাড়ে দোতরা ঝুলিয়ে সাইকেল চালিয়ে কোথাও যাচ্ছেন। ছোটবেলায় রব চাচার সঙ্গে স্মৃতি বলতে এটুকু।

এরপর একসময় আমি কুষ্টিয়া ছেড়ে ঢাকায় এসে থিতু হলাম, তাই আর রব চাচার বা পরানের তেমন কোন খবর রাখা হয়নি। মাঝেমধ্যে কুষ্টিয়াতে গেলে পরানের সঙ্গে দেখা হত আর শুনতাম রব চাচা হয়তোবা ঢাকা অথবা দেশের বাইরে গেছেন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তখন মনে মনে ধারণা হত চাচা হয়তোবা অনেক বড় মাপের বাউল।

বাংলাদেশের লোকঘরানার জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘বাংলা’ তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব’ উৎসর্গ করেছিল লালনকে। আর সেই ব্যান্ডে বাংলা ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছিলেন রব চাচা। সিডি কিনে গানগুলো শুনতে গিয়েই বুঝতে পারলাম আমাদের গ্রামেই ঠিক কতবড় মাপের একজন লালন সাধক রয়েছেন। প্রত্যেকটা গানের শুরুতে সেই গানের বিষয়বস্তু নিয়ে সামান্য আলোচনা করে গানটা শুরু করা হয়েছে। সেখানে সবাই তাদের মতামত জানাচ্ছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এ সিডির গানগুলোর চেয়ে আলোচনাগুলো আমাকে বেশি টানতো।  বারবার আলোচনাগুলো শুনতাম আর লালনের দর্শন বোঝার চেষ্টা করতাম।

কিন্তু উনার সম্পর্কে জানার প্রকৃত আগ্রহ তৈরি হলো যখন উনার মারা যাওয়ার খবর পেলাম জাহিদ নানার কাছ থেকে। মাঝেমধ্যে নানাকে ফোন দিই কুশলাদি জিজ্ঞেস করার জন্য। এমনই একদিন কথা প্রসঙ্গে নানা বললেন রব কাকা মারা গেছেন। রব চাচার দর্শনের পরিচয় পেতে হলে আমাদেরকে আগে লালনের কাছে ফিরে যেতে হবে। রব চাচা তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন লালনের দর্শন প্রচারে।

কী ছিল সেই দর্শন? আবুল আহসান চৌধুরী তার ‘লোকজাগরণের নায়ক’ প্রবন্ধে খুব সুন্দরভাবে লালনের দর্শন তুলে ধরেছেন- “লালন সারাজীবন মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন, মানবতাবাদী দর্শনকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, ঘুণেধরা সমাজটাকে বদলাতে চেয়েছিলেন, জাত-ধর্মকে দূরে সরিয়ে মানুষকে মানবিকবোধে বিকশিত করার ব্রত নিয়েছিলেন। সামান্য মরমি ফকিরের এসব উল্টো ধারার কর্মকাণ্ড বরদাশত করবেন কেন সমাজের উচ্চবর্ণের মানুষ! তাই তিনি দুশমন হয়েছিলেন তাঁদের। পাষণ্ড, ব্রাত্য, ন্যাড়া, বেশরা, জারজ- এইসব গালমন্দ, আরোপিত কলঙ্ক আর নিন্দা তাঁকে শুনতে-সইতে হয়।”

রব চাচাও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এমনটা বলেছেন। ‘বাংলালিংক বাংলার পথে’ অনুষ্ঠানের টিঙ্কু চৌধুরী যখন উনার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য উনার বাড়িতে হাজির হন তখন আমরা দেখতে পাই একজন বাউল সাধকের সাদামাটা জীবনযাপন প্রণালী, কিন্তু তার কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে লালনের মহান মানবতবাদের বাণী। শীর্ণকায় মানুষটার চোখের দিকে তাকালে টের পাওয়া যায় কতখানি গভীর বিশ্বাস থেকে উনি একেকটা শব্দ উচ্চারণ করে চলেছেন। বলার মধ্যে এমন এক ধরণের শান্ত ভঙ্গি যে মুহূর্তেই যেকোন শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো উনার কথা শুনতে বাধ্য হবেন।

উনি একে একে বলে যাচ্ছিলেন দোতরার কথা, সাধুসঙ্গের কথা, বাউল সাধক হয়ে ওঠার কথা। উনার প্রত্যেকটা কথায় অনেক বেশি তথ্যবহুল। বাউল আসলে অনেক সাধনার পর হওয়া যায়। আর একজন বাউলের কর্তব্য বা করণীয় কী সেটাও উনার বক্তব্য থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। আর অবধারিতভাবে উঠে আসে লালনের জীবন এবং জীবন দর্শন। এ সাক্ষাৎকারটা দেখলে আরও একটা জিনিস খুবই পরিষ্কার বোঝা যায়, সেটা হচ্ছে একজন বাউল সাধকের অনাড়ম্বর জীবন প্রণালীর। একটা টিনের ঘরের মেঝেতে শুধু কাপড় বিছিয়ে মানুষকে আপ্যায়ন করা হচ্ছে। খাবার হিসেবে দেওয়া হচ্ছে মোটা চালের ভাত আর একটামাত্র মাছের তরকারি। আর যে প্লেট বা বাটিতে খাবার দেওয়া হচ্ছে সেগুলোও টিনের। উনি যে মাপের বাউল সাধক ছিলেন যদি উনি চাইতেন তাহলে জাগতিক জশ, খ্যাতি, ধনসম্পদ অনেক কিছু অর্জন করতে পারতেন, কিন্তু উনি সেগুলো না করে নিজেকে জাগতিক মহামায়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন আর নিবিষ্ট মনে করে চলেছেন বাউল সাধনা।

রব চাচার বাউল সাধনার শুরু ১৯৭২ সাল থেকে। আব্দুর রহিম বয়াতি ছিলেন রব চাচার গুরু। পিতার কর্মসূত্রে রব চাচা কুষ্টিয়া সুগার মিলে চাকরি শুরু করলে পরিচয় হয় উনার গুরুর সঙ্গে। রব চাচার ভাষায় লালন শাহ সবসময় কর্মকে ভালবেসেছেন। কর্মহীন জীবনে কোন ভজন সাধন নেই। কর্ম ছাড়া জীবন ছন্নছাড়া। ধর্মের একটা অংশ হচ্ছে কর্ম। কর্ম শেষে অবসর সময়ে যতটুকু সাধনা করা যাবে সেই সময়টুকুই সাধনার কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে। রব চাচার ভাষায়, যারা লালন সাইজির মুরিদ তাদের কোন জাতি ভেদাভেদ নাই। সব মানুষই তাদের কাছে মানুষ।

রব চাচা আরও বলে চলেছেন, সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট প্রকৃতি দেখে যেন আমরা সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে না যাই। সাঁইজি বলেছেন, “জগৎ মুক্তিতে ভুলালেন সাঁই। /ভক্তি দাও হে যাতে চরণ পাই।” সঙ্গগুণে মানুষের চরিত্র নির্ধারণ হয়। যে যেইরকম সঙ্গ ধরে তার রঙ সেইরকমই হয়। যদি কেউ সাধুর কাছে যায় তাহলে সে সাধু হয়, যদি কেউ চোরের কাছে যায় তাহলে সে চোর হয়। এজন্য আমাদের মুরুব্বিরা বলে থাকেন, বাবা সকল যাই করিস মাঝেমাঝে একটু সৎসঙ্গ করিস। সৎসঙ্গ বলতে সৎ-কথা আলোচনা করাকে বোঝানো হয়েছে, কিন্তু এ সৎ-কথা সব মানুষের মুখে আসে না। কিছু কিছু মুখ দিয়ে সৎ কথা আসে, সেই মানুষগুলোর কাছে মাঝে মাঝে যেতে হবে। তার জন্য যদি দশ মাইল গাড়িতে করে ভ্রমণ করতে হয় তবু যেতে হবে। সেইজন্য সব মানুষেরই একজন সৎ গুরুর দরকার, যেমন লালনের গুরু ছিলেন সিরাজ সাঁই। তাই লালন সাঁই বলেছেন, “ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার/ সর্বসাধন সিদ্ধি হয় তার।”

“সহজ মানুষ ভজে দেখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে।/ পাবি রে অমূল্যনিধি বর্তমানে।”

“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।/ মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।”

রব চাচার ভাষায়, “মানুষের মাথায় লাঠি মেরে কিছু হবে না। মানুষকে ভালবেসেই সবকিছু করতে হবে। এজন্য একজন মানুষগুরু দরকার। জীবনে একজন শিক্ষাগুরু থাকা প্রয়োজন।” এ মানুষগুলোই প্রকৃত বাউল সাধক যারা শুধু নিজেদের কল্যাণের জন্য চিন্তা না করে সমগ্র মানবজাতির কথা চিন্তা করে যাচ্ছেন।

কিডস পাতায় বড়দের সঙ্গে শিশু-কিশোররাও লিখতে পারো। নিজের লেখা ছড়া-কবিতা, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি, মজার অভিজ্ঞতা, আঁকা ছবি, সম্প্রতি পড়া কোনো বই, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা ও নিজ স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক খবর যতো ইচ্ছে পাঠাও। ঠিকানা kidz@bdnews24.com। সঙ্গে নিজের নাম-ঠিকানা ও ছবি দিতে ভুলো না!