পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

শঙ্কু সমগ্র

  • >> এম এস নিলয়
    Published: 2014-09-04 14:01:15 BdST

bdnews24

প্রোফেসর শঙ্কু সিরিজ লেখক: সত্যজিৎ রায় প্রকাশক: আনন্দ পাবলিশার্স (ভারত) প্রকাশকাল: ১৯৬১ থেকে ১৯৯৫

বই পড়েন অথচ প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুকে চেনেন না-- বাংলাভাষী এমন কোনো পাঠক আদৌ আছেন কি না সন্দেহ! সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি, প্রতিভাবান এই বাঙালি বিজ্ঞানীকে নিয়ে ৩৮টি ছোট-বড় গল্প লেখা হয়েছে। বলতেই হবে, প্রতিটি গল্পই একেকটি মাস্টারপিস। ফেলুদার তুলনায় খ্যাতি একটু কম হলেও শঙ্কুকে অগ্রাহ্য করা এক কথায় অসম্ভব। কারণ ফেলুদার বাস্তবভিত্তিক গোয়েন্দাগিরির চাইতে শঙ্কুর বৈচিত্র্যময় একেকটি অভিযানের প্লট কম আকর্ষণীয় নয়।

প্রফেসর শঙ্কুর কথা বলতে শুরু করলে কোত্থেকে যে শুরু করব, তাই ভেবে পাই না। আগে তার আবিষ্কারের কথা বলব নাকি তার উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ করব? তারচেয়ে নাহয় সংক্ষেপে প্রথমে তাঁর পরিচয়টিই দিয়ে দেই। আগেই বলেছি, প্রফেসর শঙ্কু একজন বিজ্ঞানী। তবে বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট কোনও শাখায় তার কাজ সীমাবদ্ধ নয়, বরং সব শাখাতেই তিনি সমান পারদর্শী। বিজ্ঞানীর চেয়ে তাঁকে আবিষ্কারক বললেই বোধহয় বেশি মানাবে! কারণ এই ভদ্রলোকের সর্বমোট আবিষ্কারের সংখ্যা ৭২টি! তার মাঝে সর্বধ্বংশী অ্যানাইহিলিন গান, ক্ষুধানাশক বটিকা ইণ্ডিকা, সর্বরোগের উপশমকারী মিরাকিউরল, অত্যাধুনিক বিমান শ্যাঙ্কোপ্লেন ইত্যাদির কথা না বললেই নয়। এছাড়াও ৬৯টি ভাষায় অনর্গল কথা বলে যেতে পারেন তিনি!

বিহারের গিরিডি শহরে প্রফেসর শঙ্কুর আবাস। চিরকুমার। সর্বক্ষণের সঙ্গী নিউটন নামের পোষা বেড়াল ও তাঁর চাকর প্রহ্লাদ। প্রতিবেশী বিজ্ঞান-বিমুখ অবিনাশবাবু। কিন্তু বিজ্ঞান বিমুখ হলে কী হবে, কখনও কখনও সেও হয়ে যায় প্রফেসর শঙ্কুর অভিযানের সঙ্গী। প্রফেসরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের তালিকায় রয়েছেন জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেলম ক্রোল, ইংরেজ বিজ্ঞানী সণ্ডার্স ও অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী নকুড়বাবু। তিনি অবশ্য প্রফেসারের একদম বাবার আমলের সঙ্গী। তাই নকুড়বাবু প্রফেসরকে তার বাবার দেয়া ডাক নামেই ডাকেন। আর চরিত্রদের কথা আসলে যার কথা না বললেই না সে হচ্ছে প্রফেসরের বানানো রোবট বিধুশেখর। মজার এই রোবটটি সাধু ও চলিত বাংলায় কথা বলে তাক লাগিয়ে দেয়। প্রতিটি চরিত্রই এত আকর্ষণীয় যে পড়তে বসলে এক মুহূর্ত দম ছাড়ার ফুরসত পাবে না তুমি।

তবে চরিত্র হিসেবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রফেসর শঙ্কু নিজেই। প্রাচীন মুনি-ঋষিদের মতো অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য রয়েছে তাঁর মাঝে, কিন্তু তার আড়ালে রয়েছে বেশ রসিক একটি মন। হঠাৎ হঠাৎ যখন তাঁর হিউমার প্রকাশ পায়, তখন এমন মজা লাগে; ঠিক যেমন অনুভূতি হয় স্কুলের সবচেয়ে কড়া টিচার কখনও হেসে ফেললে। মানুষ হিসেবে শঙ্কু অত্যন্ত সৎ, বিনয়ী, মৃদুভাষী, পরোপকারী, বন্ধুবৎসল ও বুদ্ধিমান। কখনও কোনো কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন না তিনি, করেন না নিজের আবিষ্কার নিয়ে অহংকার।

প্রতিটি কাহিনীতেই থাকে অদ্ভুত কোনো ঘটনার বিবরণ। প্রতিবারই অদ্ভুত বিচিত্র সব বস্তু বা প্রাণীর সঙ্গে জড়িয়ে পরেন শঙ্কু। কিংবা বের হয়ে যান অবিশ্বাস্য কোনো অভিযানে। শঙ্কুর গল্পগুলো সাধারণত লেখা আছে ডায়েরির আদলে, উত্তম পুরুষে। মনে হবে যেন খুব পরিচিত একজন নিজের কথা তোমাদের বলে যাচ্ছেন। যেমন একশৃঙ্গ অভিযানে ইউনিকর্নের খোঁজে গেছেন শঙ্কু, গোলক রহস্যে দেখা পেয়েছি মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম গ্রহের সন্ধান, হিপনোজেনে তিনি জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন মৃত একজন মানুষের মাঝে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে শেষ করা যাবে না।

সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হল, পুরো সিরিজটাই লেখা হয়েছে তোমাদের মতো ছোটদের জন্য। প্রৌঢ় একজন নায়ককে নিয়ে এত পরিণত ও জটিল প্লট দিয়ে বাচ্চাদের জন্য লেখা যেতে পারে, সেটা আবার পাঠকপ্রিয়তাও পাবে, বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। কিন্তু এই অবিশ্বাস্য কাজটিই করে দেখিয়েছেন সত্যজিৎ রায়। প্রতিটি গল্পের সঙ্গে আছে তাঁর নজরকাড়া অলঙ্করণ, সেটা বাড়তি পাওয়া। ক্লাস ফোর/ফাইভে থাকতে ‘স্বয়ং প্রোফেসর শঙ্কু’ দিয়ে এই অদ্ভুত বিজ্ঞানীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম, আজও সেই ঘোর কাটেনি। সত্যজিৎ রায় ২ টি শঙ্কু কাহিনী অসম্পূর্ণ রেখেই হঠাৎ মারা গেলেন; কী যে অপূরণীয় ক্ষতি ছিল সেটা!

সবমিলিয়ে ৩৮টি শঙ্কু কাহিনী লিখেছেন সত্যজিৎ রায়। বেশিরভাগই সন্দেশ ও পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায়। পরে সেগুলো আটটি সংকলনে প্রকাশ পায়-- ছ’টি তাঁর জীবদ্দশায়, শেষ দুটি তাঁর মৃত্যুর পরে। নীচে সংকলনগুলোর নাম দিয়ে দিলাম:

১. প্রোফেসর শঙ্কু (১৯৬৫)

২. প্রোফেসর শঙ্কুর কাণ্ডকারখানা (১৯৭০)

৩. সাবাস প্রোফেসর শঙ্কু (১৯৭৪)

৪. মহাসংকটে শঙ্কু (১৯৭৭)

৫. স্বয়ং প্রোফেসর শঙ্কু (১৯৮০)

৬. শঙ্কু একাই ১০০ (১৯৮৩)

৭. পুনশ্চ প্রোফেসর শঙ্কু (১৯৯৩)

৮. সেলাম প্রোফেসর শঙ্কু (১৯৯৫)

 

বলি কী, একবারে শঙ্কু সমগ্রটাই কিনে ফেল। কয়েকটা পড়ার পর যদি অন্যগুলো হাতের কাছে না পাও, তবে মন খারাপ করে অজ্ঞানই হয়ে যাবে সে কিন্তু আগেই বলে দিলাম।

শঙ্কুর ফ্যান্টাসি জগতে তোমাকে স্বাগতম।