১৯ এপ্রিল ২০১৯, ৬ বৈশাখ ১৪২৬

প্রবাদের গল্প: মগের মুল্লুক

  • >>
    Published: 2014-12-28 15:51:43 BdST

bdnews24

যখন কেউ কথা বলে তখন দেখবে হুট করে সে এমন একই শব্দ বা বাক্য বলে। বাক্যটা হয়ত তার কথার বিষয়বস্তুর সঙ্গে একদম আলাদা কিন্তু কথার মধ্যে বাক্যটি বেশ মানিয়েই যায়।

যেমন ধর, তুমি তুমি কোথাও বেড়াতে গেছ, সেদিন সেখানে তোমার এক বন্ধুও গেছে। কেউই জানতে না অন্যজন যে সেখানে যাবে, কিন্তু যেভাবেই হোক সময়টি মিলে গিয়েছে। এই ঘটনাকে তুমি বললে, কাকতালীয় ঘটনা। এখন এখানে কাকই বা কথা থেকে এলো আর তালই বা কোথা থেকে পরল?

এই শব্দ বা বাক্যগুলোকেই বলে প্রবাদ-প্রবচন। এই প্রবাদ প্রবচন কিন্তু সব ভাষাতেই কম-বেশি আছে। বড় ভাষাবিদরা বলেন, এটা আসলে একটি জাতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে ভাষায় যুক্ত হয়ে যায়। আর তারা কোনো ঘটনাকে আগের অন্য একটি ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেই বিশাল একটা বিষয়কে এক বাক্যে বর্ণনা করে দিতে পারেন। এই ঘটনাগুলোর পিছনে যেমন মজার গল্প আছে, আছে তিক্ত অভিজ্ঞতাও।কিছু কিছু প্রবাদ আবার বেশ শিক্ষাও বহন করে।

আজকে আমরা সেরকম একটি প্রবাদের পিছনের গল্প শুনব। এই প্রবাদটি হল, মগের মুল্লুক। এর অর্থ বিশৃঙ্খল অবস্থা বা অরাজক পরিস্থিতি। যেরকম পরিস্থিতিতে কেউ কারও তোয়াক্কা করে না, কেউ কারও কথা শুনে না। তবে এত কথা থাকতে ‘মগ’-এর মুল্লুকই কেন হল, গ্লাস বা জগের মুল্লুকও তো হতে পারত তাই না? কেন যে মগের মুল্লুক হল সেটা জানতে হলে আগে আমাদের জানতে হবে এই মগ জিনিসটা কী?

এই মগ কিন্তু চা-পানি খাওয়া বা গোসল করার মগ থেকে আসেনি। এই মগ হচ্ছে আরাকানের জলদস্যু। এই আরাকান দেশটি কোথায় জান? আজ যে দেশটিকে তোমরা বার্মা বা মায়ানমার নামে চেন প্রাচীনকালে সে দেশের নামই ছিল আরাকান।

১৬২৫ সালের দিকে যখন আমাদের বঙ্গভূমি খুব সমৃদ্ধশালী ছিল তখন, পর্তুগিজ আর মগ জলদস্যুরা পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ এখন যেটা বাংলাদেশ তার দক্ষিণ অংশ বা নিম্নাঞ্চলে খুব লুটপাট চালায়। তখন এ ভূখণ্ড শাসন করত মুঘল সুবেদাররা। তারা এসেছিল সেই আফগান ভূমি থেকে আর তাদের শাসনের কেন্দ্র ছিল দিল্লি। তারা যেদিকের মানুষ সেদিকের মানুষেরা আসলে সমুদ্র বা নৌপথের সঙ্গে তত অভ্যস্থ ছিল না। এদিকে মগেরা নৌপথে যুদ্ধ করে খুব পটু। তাই মুঘল সুবেদাররা কখনওই মগেদের সঙ্গে পেরে উঠেনি।

ঢাকার সুবেদার তখন খান-ই-দুরান। মানুষ হিসেবে তিনি একটু ভীতু ছিলেন এমন কথিত আছে। তিনি তো মগদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দূরে থাকুক কোনো প্রতিবাদও করেননি। মগদের ভয়ে উল্টা রাজমহল পালিয়ে যান।

এই সুযোগে মগরা আমাদের ভূমিতে একদম যা ইচ্ছে তাই রকমের লুটপাট, অত্যাচার নির্যাতন করে। শুধু লুটপাট করেই তারা ক্ষান্ত দেয়নি। আমাদের দেশের মানুষদের ওরা ধরে ধরে নিয়ে যেত, এরপর সেই মানুষদের অন্যান্য দেশে নিয়ে বিক্রি করে দিত। নিপাট, নিরীহ, নির্বিবাদ একজন গৃহস্থ মানুষের সব তো তারা কেড়ে নিয়ে রাতারাতি তাকে অন্যের কৃতদাস করে দিত।

মুঘল আমলের শেষে, সুলতানি আমলেও মগেদের এই অত্যাচার অব্যাহত ছিল। পুরো বাংলা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে, তারা আসামেও অনেক অত্যাচার করে। ১৮২৪ সালের দিকে এই অত্যাচার চরম আকার ধারণ করে। তারপর তাদের সঙ্গে শাসক এবং সাধারণ মানুষের অনেকগুলো যুদ্ধ হয়। ১৮২৪, ১৮৫২ এবং ১৮৮৫ সালের যুদ্ধের পরে মগেদের শক্তি বেশ কমে আসে। এভাবে আস্তে আস্তে তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পায় এই ভূখণ্ডের মানুষ।

যদিও মগদের এক সময় ঠিকই আমরা মগেদের অত্যাচার থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছি, তবুও প্রায় দুইশ বছর তারা আমাদের যার পর নাই অত্যাচার করেছে। বঙ্গবাসী কখনও এ অত্যাচারের উপযুক্ত প্রতিকার বা বিচারও পায়নি। তাই এখনও যখন আমাদের সমাজে কেউ যেমন-তেমনভাবে অন্যের উপর প্রভাব খাটায়, অত্যাচার করে, দুর্বল মানুষকে কষ্ট দেয় তখন মগেদের সময়ের কথার সঙ্গে সেটা তুলনা করা হয় আর বলা হয়, মগের মুল্লুক।