১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বজ্র ড্রাগনের দেশে

  • মুস্তাফিজ মামুন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2016-05-20 20:44:43 BdST

bdnews24
পাহাড়ের পাদদেশে ভুটানের থিম্পু শহর।

হিমালয় পর্বতমালার পূর্বপাশে অবস্থিত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সুন্দর দেশ ভুটান। বজ্র ড্রাগনের দেশ নামে পরিচিত দেশটির প্রায় ৩৮,৩৯৪ বর্গকিলোমিটারের পুরোটাই ভ্রমণ স্বর্গ।

ভুটানের উত্তরে চীনের তিব্বত অঞ্চল। দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারত। চীনের সঙ্গে ভুটানের প্রায় ৪৭০ কিমি এবং ভারতের সঙ্গে প্রায় ৬০৫ কিমি সীমানা রয়েছে।

ভুটান শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘ভূ-উত্থান’ থেকে এসেছে যার অর্থ ‘উঁচু ভূমি’।

ভুটান ভ্রমণের প্রধান প্রধান শহর হল থিম্পু, পুনাখা, বুমথাং এবং পারো। প্রতিটি শহরেই আছে চোখ ধাঁধানো প্রাচীন জং, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে দর্শনীয় অনেক স্থান, বৌদ্ধ মন্দির আর সর্বত্রই ভালো কিছু মানুষ।

তবে ভুটানের সবখানেই আকর্ষণীয় প্রাচীন এই জংগুলোই। এগুলো আসলে প্রাচীন দুর্গ। এখন সেখানে থাকেন ভিক্ষুরা। অনেক জং’য়ে এখনও চলে প্রশাসনিক কাজকর্ম। প্রাচীন এ জংগুলোর নির্মাণশৈলী যেমন অপরূপ তেমনি এর কারুকার্যময়। প্রতিটি জংয়ের সারা শরীর জুড়ে শোভিত নানান শিল্পকর্ম।

ভুটানের রাজধানী থিম্পু। অতীতে এই শহর দেশটির শীতকালীন রাজধানী ছিল। ১৯৬২ সালে শহরটিকে দেশের স্থায়ী রাজধানী করা হয়। এ শহরে অনেক জংয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিমতোখা জং।

শহর থেকে প্রায় তিন মাইল দক্ষিণে অবস্থিত এ জংয়ের প্রতিষ্ঠাতা সাবড্রং গুয়াং নামগিয়াল। ১৬২৯ নির্মিত এই জং ভুটানের অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা। এছাড়াও আছে ১৬২৭ সালে নির্মিত থিম্পু ভ্যালির গেটওয়ে।

রাতের থিম্পু শহর।

রাতের থিম্পু শহর।

থিম্পু শহরে আছে মেমোরিয়াল চোর্টেন, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, টেক্সটাইল মিউজিয়াম, ক্লক টাওয়ার, ফারমার্স মার্কেটসহ আরও অনেক দর্শনীয় স্থান। শহরের পাশে পাহাড়ের এক চূড়ায় বসে থিম্পুকে দেখভাল করেন বিশাল আকৃতির এক বুদ্ধমূর্তি।

শহরের যে কোনো জায়গা থেকেও এটিতে দেখা যায়। সুউচ্চ পাহাড়ের উপরে প্রায় ২০০ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তি ছাড়াও ব্রোঞ্জের তৈরি নানা মূর্তি আছে এখানে। জায়গাটির নাম বুদ্ধা পয়েন্ট।

থিম্পু শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভুটানের সবচেয়ে উঁচু স্থান পুনাখা। হিমালয় দেখার আদর্শ স্থান এটি।

থিম্পু থেকে পুনাখার পথে ৩০ কিলোমিটার দূরে দোচুলা পাস। ৩,৯৮৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এ জায়গা ভুটানের মানুষের কাছে একটি পবিত্র স্থান।

২০০৩ সালে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত ভুটানের সৈন্যদের স্মরণে নির্মিত ১০৮টি চোর্টেন এখানকার মূল আকর্ষণ। জায়গাটিতে নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে বরফ পড়ে।

এছাড়া দোচুল পাসের আরেকটি আকর্ষণ হল ড্রুক ওয়াংগাল লাখাং মন্দির। দোচুলা পাহাড়ি পথে ৪০ কিলোমিটার সামনে গেলে পুনাখা। পুনাখা জং, ফার্টিলিটি টেম্পল, পো চু এবং মো চু নদীর বৈচিত্রময় রূপ পুনাখার অন্যতম আকর্ষণ।

ভুটানের দুই নদী মো চু এবং পো চু। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে বয়ে চলেছে নদী দুটি। ভুটানের মানুষের বিশ্বাস মো চু নারী। আর পো চু পুরুষ। পো চু এবং মো চু এসে মিলেছে পুনাখায়। স্থানীয় ভাষায় চু শব্দের অর্থ নদী।

থিম্পু শহরের পাশে বৃদ্ধা পয়েন্টে বুদ্ধমূর্তি।

থিম্পু শহরের পাশে বৃদ্ধা পয়েন্টে বুদ্ধমূর্তি।

এই দুই নদীর মাঝখানে ঐতিহাসিক পুনাখা জং। সেখানে ভিক্ষুদের বসবাস। অন্যান্য সময়ে পুনাখা জং পর্যটকদের দেখার সুযোগ নেই। তবে গ্রীষ্মে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা থিম্পু চলে গেলে পর্যটকদের তখন প্রবেশাধিকার থাকে এই জংয়ে।

পুনখার এই জংয়েই ভুটানের বর্তমান রাজার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল ২০১১ সালে। ১৯৬২ সালের আগ পর্যন্ত পুনাখা ছিল ভুটানের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী।

পারো শহরের এক প্রান্তে পারো ভ্যালির ৯০০ মিটার উপরে বৌদ্ধ মন্দির টাইগার্স নেস্ট। স্থানীয়দের বিশ্বাস, গুরু রিন পোচে এক বাঘিনির পিঠে চড়ে এ পাহাড় চূড়ায় পৌঁছে সাধনায় বসেছিলেন। এরপর থেকেই এই জায়গাটি পরিচিতি পায় ‘টাইগার্স নেস্ট’ নামে।

তবে এর আরেক নাম তাকশাং বৌদ্ধ বিহার। জায়গাটি বেশ দুর্গম, বড় একটা অংশ উঠতে হয় পায়ে হেঁটে।

পারো শহরেই ভুটানের একমাত্র বিমানবন্দর। এই শহরের আরেক বিশেষ জায়গা হল পারো জং বা রিনপুং জং। পারোর সবচেয়ে বড় জং এটি। ১৬৪৬ সালে ভুটানের পশ্চিমাঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র ও ভিক্ষুদের বসবাস কেন্দ্র হিসেবে এই জংটি নির্মাণ করেন সাবড্রং গুয়াং নামগিয়াল।

থিম্পু ফারমার্স মার্কেট।

থিম্পু ফারমার্স মার্কেট।

পারো জংয়ের পাশেই আছে টা জং। ১৬৫১ সালে নির্মিত দুর্গ আকৃতির এই ভবন একসময় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হত। ১৯৬৭ সাল থেকে এটি জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভুটানের আরেকটি সুন্দর শহর বুমুথাং। একে বলা হয় ভুটানের ধর্মীয় নগরী। বেশ কিছু প্রাচীন দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ মন্দির আছে এ শহরে।

যাতায়াত ও থাকা

বাংলাদেশ থেকে সড়ক ও আকাশপথে ভুটান জাওয়ায় যায়।

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ড্রুক এয়ারের বিমান যায় ভুটান।

ভাড়া ২০ থেকে ২৪ হাজার টাকা। সময় লাগে দেড় ঘণ্টা।

এছাড়া সড়ক পথে ভারতের শিলিগুড়ি হয়ে ফুন্টসলিং দিয়ে ভুটান প্রবেশ করা যায়।

সে ক্ষেত্রে ভারতের ট্রানজিট ভিসার প্রয়োজন হবে।

ভুটানে বাংলাদেশি পর্যটকদের পোর্ট এট্রি ভিসা দেওয়া হয়।

প্রতিটি শহরেই বিভিন্ন মানের হোটেল আছে। সাধারণ মানের হোটেলগুলোর প্রতি দিনের ভাড়া ৮শ’ থেকে ২ হাজার নু (ভুটানের টাকা)।

থিম্পু থেকে দোচুলার পথে সড়কের পাশে পাইন গাছেন বন।

থিম্পু থেকে দোচুলার পথে সড়কের পাশে পাইন গাছেন বন।

প্যাকেজ ভ্রমণ

ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় ভুটানে ভ্রমণ কষ্টসাধ্য। তাই অভিজ্ঞ কোন ভ্রমণ সংস্থার সহায়তায় নিলে সুবিধা হবে।

যাতায়াত, থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থাই তারা করে দেবে।

ভুটানের বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত প্যাকেজ ভ্রমণ পরিচালনা করে থাকে ভ্রমণ সংস্থা ট্রাভেল কাইটস (০১৬১৩৫৫৫৯৫৫-৬)। এ প্রতিষ্ঠানের ৩৫ থেকে ৫১ হাজর ৫শ’ টাকায় ভুটানের বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিত প্যাকেজ ভ্রমণ আছে।

প্রয়োজনীয় তথ্য

ভুটানে ভ্রমণে সবচেয়ে ভালো সময় মার্চ থেকে মে এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস।

তবে অন্যান্য সময়েও যেতে পারেন। অগাস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে গেলে বাগানে আপেল পাওয়া যাবে।

থিম্পু, পুনাখা কিংবা পারো শহরের দোকান পাট সন্ধ্যার পর পরই বন্ধ হতে শুরু করে। কেনাকাটা থাকলে আগেভাগেই সেরে ফেলা উচিৎ।

ভুটানের বেশিরভাগ দোকানে ভারতীয় রূপির প্রচলন আছে। এছাড়া স্থানীয় মুদ্রা ‘নু’র মূল্যমানও ভারতীয় মুদ্রার মতোই।

পারো ভুটানের একমাত্র বিমানবন্দর। সরকারী বিমান সংস্থা ‘ড্রুক এয়ার’ ছাড়া অন্য কোনো যাত্রবাহী বিমান এ বন্দরে ওঠানামা করে না।

দেশটির সর্বত্রই পর্যটকদের সমাদর আছে।

ছবি: লেখক।

ভুটানের ছবির গ্যালারি দেখতে ক্লিক করুন।