তবুও তো ঈদ

  • শান্তা মারিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-25 11:14:28 BdST

bdnews24
ঈদের আগের দিন জাতীয় ঈদগাহ তালাবদ্ধ কি কেউ আগে দেখেছে? করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে এবার ঈদের নামাজ ঈদগাহ বা খোলা জায়গার পড়ায় নিষেধাজ্ঞা, তাই এই তালা।

জীবনে এই প্রথম চাঁদরাতে বাইরে গেলাম না।

ঘরের ভেতর স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে আছি আজ প্রায় তিন মাস। একটি দিনের জন্যও ঘরের বাইরে পা রাখিনি।

ঘরে বসে ফেইসবুক আর ফোনে আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবদের ঈদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। জুম, ডিংটক, ভাইবার, হোয়টস অ্যাপে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করছি, আড্ডা দিচ্ছি।

আমি ঢাকাইয়া। আমার কাছে ঈদ মানেই নবাবী ঐতিহ্য আর আনন্দের ছোঁয়া। শৈশব থেকে দেখে এসেছি ঈদ মানেই চাঁদ রাতে হাতে মেহেদির নকশা আঁকা। বংশাল, মৌলভি বাজার, চক সুপার মার্কেট, গাউছিয়া নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, আজিমপুর, বঙ্গ বাজারে ঈদের কেনাকাটা। ঈদ শপিং যত আগেই হয়ে যাক না কেনো, চাঁদ রাতে কেনাকাটা বা বাইরে না ঘুরলে ঢাকাবাসীর ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায় না।

কিন্তু এ বছর সবই উল্টো। করনা-বিপদ চলছে। তবে সব রকম পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই তো চলতে হবে। এবছর তাই অল্প বিস্তর খাবার দাবার কেনাকাটা করেছি অনলাইনে। না, নতুন পোশাক নয়। গত বছরের ঈদের পোশাকটাই এ বছরে পরছি। ঘরেই তো। বাইরে বেড়ানোর বালাই নেই। ঘরেই একটু হালকা সাজগোজ। কে জানে এটাই জীবনের শেষ ঈদ কিনা। আর ঈদ শপিংয়ের বেঁচে যাওয়া টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি গ্রামের দরিদ্র মানুষদের জন্য। এই বিপদে বিলাসিতার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না।  

অন্যান্য বার ঢাকায় ঈদ মানেই খাওয়া দাওয়ার ধুম পড়ে। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার হল শাহি বিরিয়ানি, কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, কোপ্তা পোলাও, শাহি পোলাও, মোরগ পোলাও ইত্যাদি। কোরমা আর রেজালাও চাই। মুরগির রোস্ট, টিক্কা কাবাব, খাসীর পায়ের রোস্ট, গরুর কাবাব, হান্ডি কাবাব– যে যত রকমের পারেন।

সকালে চাই ফিরনি, জর্দা, সেমাই, দুধসেমাই আর বাখরখানি। বিকেলে চটপটি, ঘুগনি, দহিবড়া। পানীয় থাকবে বোরহানি, লাচ্ছি, শরবত, পেস্তার সরবত।

ঢাকার খাবারের নাম বলে শেষ করা যাবে না। তবে এ বছর পুরো বিশ্বই বিপদের মধ্যে। চেনা জানা অসংখ্য মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর খবরে মনটা বিষণ্ন। এর মধ্যে কি আর উৎসবের আয়োজন করতে ইচ্ছা করে?

সেমাই, প্লেইন পোলাও, মাংসের রেজালা, মুরগির রোস্ট, আলুর চপ-ব্যস। এটাই আমার এবারের ঈদের আয়োজন।

মনে পড়ে ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে চকের মেলায় যাওয়ার স্মৃতি। বেগম বাজারের মোড়েই আমার দাদার বাড়ি। চকের মোড় থেকে শুরু করে ঈদের মেলা বসত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনের রাস্তা ধরে নাজিমউদ্দিন রোডের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত।

অন্যদিকে চক সার্কুলার রোড, উর্দু রোড, আলি নেকির দেউরি, সাত রওজা পর্যন্ত মেলার পসরা ছড়িয়ে থাকতো। কত রকম খেলনা যে পাওয়া যেত মেলায়। মাটির পুতুল, হাঁড়ি পাতিলের সেট, ঢোল, ডুগডুগি, টিনের তলোয়ার, বাঁশি কি নেই।

ঈদের সালামি পেতাম চাচা-চাচীদের কাছ থেকে। সেই সেলামির টাকায় হাতভরে খেলনা কিনতাম। চকের মোড়েই ছিল নাগর দোলা। মেলায় গিয়ে নাগর দোলা চড়বো না, তা আবার হয় নাকি? আর মেলায় বিক্রি হতো মুরলি, কটকটি, বাদাম তক্তি।

নতুন ঢাকার ঈদ আবার ছিল একটু অন্য রকম। রমনা পার্কে বেড়াতে যেত তরুণ তরুণীরা। ফুচকা চটপটি বিক্রি হত পার্কের গেটে। পুরান ঢাকার তরুণ-তরুণীরা ঈদের বিকালে যেত আহসান মঞ্জিল, লালবাগ দুর্গ, বুড়িগঙ্গার নৌবিহারে। ঈদের দিন সিনেমাও দেখতেন অনেকে।

আর চাঁদ রাতে ঘুরতে গিয়ে চকের ইমিটেশন মার্কেট থেকে গয়না, চুড়ি কেনাটা ছিল দারুণ আনন্দের।

চাঁদ রাতে পাড়ার মেয়েরা একসঙ্গে বসে চলতো মেহেদি লাগানোর পালা, সঙ্গে কত রকম গান আর হাসি তামাশা। আমি অবশ্য এই করোনার দুর্যোগের মধ্যেও ঘরে বসেই হাতে মেহেদির নকশা এঁকেছি। ঈদ বলে কথা। দূরত্ব বজায় রেখেই যতটুকু আনন্দ করা যায়।

চাঁদ রাতে ঘরে বসে পরিবারের সদস্যদের নিয়েই লুডু খেললাম। টিভি, নেটফ্লিক্স, ইউটিউবই এবারের বিনোদনের উৎস। আর শুনলাম সেই চির পুরানো চির নতুন গান ‘ও মন রমজানের এই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’।

ছোটবেলায় এই গান টিভিতে বা রেডিওতে শুনলেই বুঝতাম ঈদের চাঁদ উঠেছে। খুশিতে ভরে উঠতো মন। ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে মহল্লায় শুরু হয়ে যেত পটকা বাজি ফুটানো।

মিটফোর্ডের পেছনে আরমানি টোলা আর আতরপট্টিতে ভিড় জমতো আতরের দোকানে। গোলাপখাস, মিশকামবার, দিলখোশ, শাহিখুশবু কত রকম আতর। চোখে সুরমা লাগানোর রেওয়াজও ছিল। কত রংবেরংয়ের আতরদানি ও সুরমাদানি।

এ বছর সব কিছুই বন্ধ। তবে হতাশার কিছু নেই। এই করোনা-বিপদ একদিন দূর হবে। আবার হাসিগানে ভরে উঠবে আমাদের জীবন। সেদিনের প্রত্যাশায় আজকের ঈদটা না হয় কাটুক ঘরে বসেই।

লেখক প‌রি‌চি‌তি: শান্তা মা‌রিয়া সাংবা‌দিকতা ক‌রে‌ছেন বহু‌দিন। এখন লেখা‌লি‌খির পাশাপা‌শি চীনের ইউননান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা কর‌ছেন। ছু‌টি‌তে বর্তমা‌নে দে‌শে র‌য়ে‌ছেন।


ট্যাগ:  প্রতিবেদন  লাইফস্টাইল