পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

‘তার মত মহান নেতার সান্নিধ্য আমাকে মুগ্ধ করেছে’

  • মমতাজুল ফেরদৌস জোয়ার্দার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-08-14 23:09:22 BdST

bdnews24
৯৭২ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের সাথে বঙ্গবন্ধু (বামের ছবিতে)। ওই সফরে বঙ্গবন্ধু বিশেষ বিমানে আগে জর্জিয়া গিয়েছিলেন। বাংলা ভাষা জানায় তাকে স্বাগত জানানোর দায়িত্ব পড়েছিল রবীন্দ্র গবেষক ডানিলচুকের ওপর (ডানে)।

অধ্যাপক আ. পে. নাচুক দানিলচুক বাংলা ভাষার উপর প্রথম ডক্টরেট  অর্জনকারী রুশ নাগরিক। তার বাবা ছিলেন রাশিয়ার রেড-আর্মির কর্মকর্তা। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি বাবাকে হারান। তার মা ছিলেন বেলারুশের সংগীত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা। অধ্যাপক দানিলচুক ১৯৩৬-৩৭ সালে রুশ ভাষায় রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী পড়া শুরু করেন।

১৯৪৫ সালে তিনি মাতৃভূমি জর্জিয়া থেকে মস্কো আসেন এবং মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে তিনি প্রথম রুশ ভাষায় রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠি অনুবাদ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি মস্কো প্রাচ্যবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষায় রেড ডিপ্লোমা লাভ করেন। এই ডিপ্লোমা হল মাস্টার্স ডিগ্রির সমান। আর যে ছাত্র কোন বিষয়ে এ গ্রেডের নিচে পান না তিনিই রেড ডিপ্লোমাধারীর সম্মানে সম্মানিত।

১৯৫৪ সালে তিনি মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বাংলা ভাষার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৬-৫৭ সালে তিনি ভারত সফর করেন। ১৯৬৩ সালে রবীন্দ্রনাথের উপর লেখা থিসিসের জন্য মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে পিএইচডি দেয়। ১৯৮৫ সালে ভারত সরকার রবীন্দ্রনাথের ১২৫তম জন্মদিনে কবির উপর তার গবেষণার জন্য ডি-লেট উপাধি প্রদান করে।

অধ্যাপক দানিলচুক বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। প্রথমবার বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে তিনি বলেন, “১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে তখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নতুন রাষ্ট্রের সূচনা হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে দেখেছি। বাংলাদেশ বাঙালীদের দেশ। বাঙালীরা বিশ্বে প্রথম একটা রাষ্ট্র পেয়েছে। রাশিয়া প্রথম বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাঙালীদের দেশে প্রথম এসে নিজেকে গর্বিত মনে করেছি। সেই সফরের স্মৃতি, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বার বার মনে পড়ে।”

বাংলা একাডেমির আমন্ত্রণে চতুর্থবারের মত ঢাকায় এসেছিলেন তিনি ১৯৯৫ সালে। তারপর তিনি ১৯৯৭ সালে পঞ্চমবারের মত বাংলাদেশ সফর করেন।

বঙ্গবন্ধুর সাথে ড. দানিলচুকের পরিচয় পর্বটা ছিল ঐতিহাসিক। তিনি বলেন, “সেই দিনের পরিচয়ের স্মৃতিবহ ঘটনা বর্ণনা করা কঠিন। আজ যখন আপনারা বঙ্গবন্ধুর কথা জানতে চান, আমি বিশ্বাসই করতে পারি না তিনি নেই। এত বড় একজন হৃদয়ের মানুষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী মহান নেতাকে কেউ হত্যা করতে পারে। আমি বিশ্বাস করতে পারি না।”

১৯৭২ সালের  মার্চ মাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি বিশেষ বিমানে জর্জিয়ার রাজধানী তিবিলিসে পৌঁছেছিলেন।  সেটা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর। জর্জিয়ার সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ড. দানিলচুককে। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান। সম্ভবত বাংলা ভাষার কারণে, জর্জিয়ান সরকার তাকে বাঙালি নেতাকে স্বাগত জানানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানিয়ে বাংলায় কথা বলতে শুরু করেন। তার মুখে বাংলা কথা শুনে বঙ্গবন্ধু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।  তাৎক্ষণিকভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেও, শেখ মুজিব তাকে জড়িয়ে ধরেন।

১৯৯৭ সালে এক সক্ষাৎকারে ড. দানিলচুক বলেন, ”সেই স্মৃতি আমাকে আজও নাড়া দেয়। বঙ্গবন্ধু সেই সফরে পাঁচদিন ছিলেন। পাঁচদিনের সফরে বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকসহ রাশিয়ার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠক করেন। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ওইসব দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে আমাকে দোভাষীর দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এই পাঁচদিনের কথাবার্তায় বুঝতে পেরেছিলাম বঙ্গবন্ধু কত বড় হৃদয়ের মানুষ ও রাষ্ট্রনায়ক। এরপর বেশ কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তার মত মহান নেতার ভালোবাসা এবং সান্নিধ্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এটা আমার জীবনের এক মূল্যবান দুর্লভ স্মৃতি।”

তথ্যসূত্র: বিচিত্রা ২৭ জুন, ১৯৯৭।

লেখক পরিচিতি: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অল ইউরোপিয়ান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন এবং জার্মান বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন।