বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: প্রশাসন-জনতার যৌথ প্রতিবাদ, এক সপ্তাহ দখলে বরগুনা

  • মুহাম্মদ শামসুল হক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-09-15 22:13:59 BdST

bdnews24
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৮ জানুয়ারি, ১৯৭৪। ছবি: নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম

১৯৭৩-৭৫ সালে বরগুনার (বর্তমানে জেলা) মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) ছিলেন সিরাজ উদ্দীন আহমেদ। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শুনে ওইদিন থেকেই প্রথম প্রকাশ্যে প্রতিবাদ ও সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত হয় বরগুনায়।

হত্যাকাণ্ডের পরদিনই অর্থাৎ ১৬ অগাস্ট এসডিওর বাসায় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্মান জানিয়ে মিলাদ ও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। এসডিওর নেতৃত্বে এ প্রতিবাদ-বিদ্রোহে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ছাড়াও পুলিশ-রক্ষীবাহিনীর সদস্যরাও অংশ নেন। রক্ষীবাহিনী বরগুনা শহর ৭ দিন তাদের দখলে রাখে। স্থানীয় তিনজন সংসদ সদস্য এবং অন্য সরকারি কর্মকর্তারাও এতে সমর্থন দেন। জানা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-বিদ্রোহে অংশ নেওয়ায় সিরাজউদ্দিন আহমদকে ২৪ সেপ্টেম্বর সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পুনর্বহাল করা হয় ৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তার আগে তাকে কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত ও ক্ষমা প্রার্থনার জন্য বলা হলে তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান।

অন্যদিকে বরখাস্তের পর বিদ্রোহে যুক্ত থাকার অভিযোগে তদন্ত করা হলেও তার বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষী দেননি। পরবর্তী সময়ে এসডিও সিরাজ উদ্দীনের  নামে বরগুনা টাউন হলের নাম ‘সিরাজ উদ্দীন মিলনাতন’ এবং অপর একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। বরগুনার বঙ্গবন্ধু প্রেমিকেরা এখনো সিরাজ উদ্দিনের নাম স্মরণ করেন।

এ বিষয়ে ২০২০ সালের ২৭ জুলাই এক সাক্ষাৎকারে (টেলিফোনে) ঘটনার বিবরণ দিয়ে সিরাজ উদ্দীন আহমেদ বলেন, “১৫ অগাস্ট সকাল ৭টায় বরগুনার ছাত্রলীগ নেতা আবদুল মোতালেব হঠাৎ আমার বাসায় এসে বলে- ‘স্যার, বঙ্গবন্ধু নেই, তারে মেরে ফেলছে।’ প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না। রেডিও খুলে মেজর ডালিমের কণ্ঠে শুনলাম- সত্যিই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। দেশে সামরিক আইন ও কার্ফু জারি করা হয়েছে।”

“মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, বেআইনি সরকারের আদেশ মানব না, এ হত্যার প্রতিবাদ করব। আমি তাড়াতাড়ি কাপড় পরে রিভলবারটা নিয়ে এসডিপিও (মহকুমা পুলিশ অফিসার) ফারুক আহমদের বাসায় গিয়ে তাঁকে ঘটনা খুলে বলি এবং থানায় গিয়ে পুৃলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করি। তিনি তার পোশাক পরে থানায় গিয়ে পুলিশ আমাদের সঙ্গে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন। বরগুনা মহকুমায় রক্ষীবাহিনীর সদস্য ছিল প্রায় তিনশ জন।”

“ওই দিনই ফোনে তাদের লিডারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বললাম বরগুনা মহকুমা দখলে রাখতে। বরগুনায় তাদের ক্যাম্প ছিল ওয়াপদা অফিসে। ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে জিপে করে ওই ক্যাম্পে গিয়ে সভা করে বিদ্রোহের কথা বললে সবাই সাড়া দিয়ে আমার সঙ্গে যোগ দেয়। বরগুনা মহকুমার প্রায় সব থানার বাকশালের নেতা-কর্মীরা এ প্রতিবাদে অংশ নেন। আমাদের সমর্থন দেন মহকুমার ৩ জন সংসদ সদস্য-আসমত আলী সিকদার, শাহাজাদা আবদুল মালেক খান ও নিজাম উদ্দিন আহমেদ। মহকুমার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও আমার সঙ্গে ছিলেন।”

এই প্রতিরোধ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, তালতলি কড়ইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক ও বর্তমানে বরগুনা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি নুর উদ্দিন আহমদ। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “১৫ অগাস্ট সকালে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর শোনামাত্র আমি কান্না ধরে রাখতে পারিনি। পাগলের মতো ছুটে যাই আমাদের নেতাকর্মীদের কাছে। অন্যরাও খবর পেয়ে জ্ঞানরঞ্জন ঘোষের বাড়িতে জড়ো হয়ে আহাজারি করতে থাকে। জ্ঞানরঞ্জন ঘোষ তখন ছিলেন বরগুনা মহকুমা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তার বাড়িতে সমাবেশ শেষে ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবিরের নেতৃত্বে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিই।”

“ছাত্র ইউনিয়নের কয়েকজন নেতা-কর্মীও ছিল আমাদের সঙ্গে। সবার নাম এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলে প্রতিবাদ বিক্ষোভ, শোকসভা মিলাদ ইত্যাদি। বরগুনার এমপিরা আমাদের সমর্থন করেছিল। তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক সিরাজুদ্দিন আমাদের সাহস যুগিয়েছেন। তার কারণে পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীসহ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাও আমাদের পক্ষে ছিল। সপ্তাহখানেক পর বরগুনায় সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর পুলিশি অভিযান ও ধরপাকড় শুরু হয়। এ অবস্থায় আমরা সবাই দীর্ঘদিন আত্মগোপন থাকতে বাধ্য হই।”

কিশোরগঞ্জে প্রতিবাদ ১৫ অগাস্ট

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ওইদিনই প্রতিবাদ-মিছিল ও স্লোগানে রাজপথে নেমেছিলেন কিশোরগঞ্জের তৎকালীন প্রগতিশীল সাহসী যুবকেরা। বেতারে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শুনে শহরের স্টেশন রোডের রঙমহল সিনেমা হলসংলগ্ন ছাত্র ইউনিয়নের অফিসের সামনে একে একে জড়ো হন সংশ্লিষ্ট যুবকেরা। সকাল ৯টার দিকে তারা স্লোগান তোলেন, ‘ডালিমের ঘোষণা -মানি না, মানব না’, ‘মুজিব হত্যার পরিণাম-বাংলা হবে ভিয়েতনাম’, ‘মুজিব হত্যার বদলা নেব, বাংলার মাটিতে’ ইত্যাদি।

মিছিলটি পুরান থানা, একরামপুর, বড় বাজার, ঈশা খাঁ রোড, আখড়াবাজার কালিবাড়ি মোড় হয়ে থানার সামনে দিয়ে রঙমহল সিনেমা হলের সামনে এসে শেষ হয়। এই প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেন কমিউনিস্ট নেতা  আমিরুল ইসলাম, বুপেন্দ্র ভৌমিক সদোলন, অশোক সরকার, হালিমদাদ খান রেজোয়ান, হাবিবুর রহমান, এনামুল হক ইদ্রিস, সেকান্দর আলী ভূঁইয়া, পীযুষ কান্তি সরকার, অলক ভৌমিক, আকবর হোসেন খান, গোলাম হায়দার চৌধুরী, রফিক উদ্দিন পনির, নুরুল হোসেন সবুজ, স্বপন গোপাল দাস, আলী আজগর স্বপন, সাইদুর রহমান মানিক, নির্মলেন্দু চক্রবর্তী, মতিউর রহমান, আবদুল আহাদ, অরুণ কুমার রাউত, সৈয়দ লিয়াকত আলী বুলবুল প্রমুখ। 

মিছিল শেষে প্রতিবাদকারীরা স্থানীয় জাহেদের টি স্টলে চা পান করছিলেন এমন সময় এক ট্রাক পুলিশ এসে উপস্থিত হলে সবাই সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।  (সূত্র: সমকাল ১৫ অগাস্ট, ২০১৯)  

পাবনায় মিছিল সমাবেশ

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে বিরাট সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় পঁচাত্তরের ৫ নভেম্বর।  সমাবেশে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা ছাড়াও ৫-৭ জন আওয়ামী লীগ নেতা উপস্থিত হন। আওয়ামী লীগ নেতারা সভা পরিচালনার  দায়িত্ব দেন ন্যাপ নেতা রণেশ মৈত্রকে। একজন ছাত্র ইউনিয়ন ও একজন ছাত্রলীগ নেতার বক্তব্য দেওয়ার এক পর্যায়ে পুলিশ  বাধা দেয়ার চেষ্টা করে।

পরে ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে আলোচনা মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষ করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়ে ছাত্র ও দলীয় নেতা-কর্মীরা পুলিশের উপস্থিতি উপেক্ষা করে রাস্তার দুই ধারে লাইনে দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে। কোনও রকম উস্কানি ছাড়া স্লোাগানে স্লোগানে সারা শহর কাঁপিয়ে মিছিলটি হেড পোস্ট অফিস হয়ে অনন্তবাজার দিয়ে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর নবনির্মিত বাসভবনের আঙ্গিনায় পৌঁছে। সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট গোলাম হাসনায়েন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিতে দোয়া পাঠ ও মোনাজাত পরিচালনা করেন। এরপর রণেশ মৈত্র বক্তব্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ করার সময় একজন ছাত্র ছুটে এসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার নৃশংস হত্যার খবর জানালে সবাই শোকে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং আবারও মিছিল নিয়ে সারা শহর প্রদক্ষিণ করার দাবি জানান। কিন্তু আবার মিছিল শুরু হলে তা সহজেই বিক্ষুব্ধ ও উশৃঙ্খল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকে সবাইকে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করে নতুন একটি তারিখে শোক ও প্রতিবাদ দিবস পালন করার আশ্বাস দিয়ে সমাবেশ শেষ করা হয়। (সূত্র: দৈনিক সংবাদ ১৫ অগাস্ট, ২০১৮)

প্রতিরোধ যুদ্ধে নিহত ১০৪, আহত তিন শরও বেশি

প্রতিরোধযুদ্ধের প্রধান আয়োজক কাদের সিদ্দিকীর মতে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত চলমান ওই প্রতিরোধ-সংগ্রামে ১০৪ জন বীরযোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে তার হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের মৌলভী সৈয়দ, গাইবান্ধার মুন্না, দুলাল দে বিপ্লব, বগুড়ার সারিয়াকান্দির আবদুল খালেক খসরু, সাখাওয়াত হোসেন মান্নান, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, আলী আজম আলমগীর, নজিবর রহমান নিহার, রেজাউল করিম, ফনেস সাংমা, অ্যালসিন মারাক, সুধীন মারাকরা অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজের জীবন।

কাদের সিদ্দিকী বলেন, “বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও আওয়ামী লীগ নেতাদের পূর্ণাঙ্গ সমর্থনের অভাবে আমরা সফল হতে পারিনি। তবু চলতে থাকে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম। কিন্তু ভারতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ইন্দিরা গান্ধীকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন মোরারজি দেশাই। জিয়াউর রহমান তার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে প্রতিরোধ-সংগ্রামীদের প্রতি দেশটির সমর্থন বন্ধের ব্যবস্থা করেন। শুধু তা-ই নয়, ওই সময় মোরারজি দেশাই সরকার অসংখ্য প্রতিরোধ-সংগ্রামীকে ধরে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়।” (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৫.৮.২০১৩)

ঢাকায় মিছিল-সমাবেশ ও লিফলেট বিতরণ অক্টোবর-নভেম্বরে

১৬ অক্টোবর (১৯৭৫) ঘাতকদের রিং লিডার খন্দকার মোশতাক বঙ্গভবনে এমপিদের বৈঠক ডেকেছিলেন। আওয়ামী লীগের কয়েকজন তরুণ নেতা, ছাত্র ইউনিয়ন, ডাকসু ও ছাত্রলীগের নেতারা সংসদ সদস্যদেরকে মোশতাকের ডাকে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।

১৬ অক্টোবর সকালে প্রায় ১০০ জন এমপি নাখালপাড়ার এমপি হোস্টেলে সমবেত হন। তাদের নিবৃত্ত করার জন্য সেখানে যান ছাত্রনেতাদের কয়েকজন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমপিরা বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন এবং প্রতিবাদের মধ্যে কুমিল্লার সিরাজুল হক শুধু বলেছিলেন মোশতাককে- ‘আপনি যদি সত্যিই রাষ্ট্রপতি থাকতে চান, তাহলে বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করা হয়েছে তা আমাদের জানাতে হবে। আইন অনুযায়ী আপনাকে বৈধ রাষ্ট্রপতি বলা যায় না।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতৃত্বের অভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ না হলেও নানাভাবে এই নির্মম ও বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ সংগঠিত হতে থাকে। তরুণ ছাত্র-কর্মীরা চুপ করে বসে ছিল না। সম্ভবত ২৪ অথবা ২৫ অগাস্টেই মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের কিছু নেতা-কর্মী জমায়েত হয়েছিলেন প্রতিবাদে। সেখানে ডাকসু সাধারণ সম্পাদক মাহবুব জামান সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়েছিলেন। প্রথমবারের মতো ঢাকায় একটি ঝটিকা প্রতিবাদ মিছিলও করেছিলেন পুলিশ-মিলিটারি টের পাওয়ার আগেই। ১৫ অগাস্টের কিছুদিন পরই ঢাকায় শোনা যায় কাদের সিদ্দিকী তার বাহিনী নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই শুরু করেছে। এই প্রচারের মধ্যে যে সত্যতা ছিল তাও পরে প্রমাণিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে একটি-দুইটি করে দেয়াল লিখনও চোখে পড়ে। এরই মধ্যে প্রধানত সিপিবির উদ্যোগে বাকশাল তথা আওয়ামী লীগ নেতা যারা মোশতাকের গ্রেপ্তার এড়াতে পেরেছিলেন তাদের সঙ্গে এবং ন্যাপ (মো.) নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয় অক্টোবরের শেষ দিকে। প্রধানত ডাকসু এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রকাশ্য উদ্যোগে জাতীয় শোক দিবস পালন করা হবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদস্বরূপ। পরে প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ থাকায় ৪ নভেম্বর জাতীয় শোক দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রচারের উদ্দেশ্যে দুটো লিফলেট ছাপানো হয়- একটি নিউজপ্রিন্টে, অন্যটি সাদা কাগজে। একটি লিফলেটে বাকশাল কর্মসূচি ও তার ব্যাখ্যাসহ বঙ্গবন্ধু হত্যার কথা এবং অন্যটিতে ৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় শোক দিবস পালনের আহবান ছিল। কর্মসূচি ছিল সকাল ১০টায় ডাকসুর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ৩২ নম্বর বাড়ির উদ্দেশ্যে মৌন মিছিল যাবে।

সাদা কাগজের লিফলেটটি ছাপানো হয় মগবাজারের একটি প্রেসে। প্রেসের মালিক তার সমস্ত কর্মচারীকে ছুটি দিয়ে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে সাথে নিয়ে নিজেই লিফলেটটি কম্পোজ করেন এবং ঝুঁকি নিয়ে সারারাত ধরে নিজেরাই ছাপেন। পরদিন সকাল ১০টায় একজন ব্রিগেডিয়ারের ফোক্সওয়াগন গাড়িতে করে লিফলেটগুলো স্থানান্তরিত করা হয়। ব্রিগ্রেডিয়ার তাঁর গাড়িটি ধার দিয়েছিলেন এক আত্মীয়কে। তার অজান্তেই তার গাড়িতে করে ৪ নভেম্বরের লিফলেট স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীকালে এই লিফলেটগুলো বিলি করতে গিয়ে বেশকিছু ছাত্রকর্মী গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন।

৪ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় বড় জমায়েত হয়। এতে প্রধানত ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মী থাকলেও সিপিবি, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ নেতাদেরও কেউ কেউ, কিছু ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক নেতাকর্মী এবং কয়েকজন নারী নেত্রী উপস্থিত ছিলেন। ।

এদিকে এর আগের দিন অর্থাৎ ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান ঘটে। অনেকের ধারণা ছিল অভ্যুত্থানটি আওয়ামী লীগপন্থি। ১৫ অগাস্টের অভ্যুত্থান এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা যেহেতু হয়েছিল বাকশাল তথা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এবং ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ১৫ অগাস্টের হোতা খুনি মেজর এবং খুনি মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে, সেই কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় উপস্থিত অনেকের মধ্যে (বিশেষত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতৃত্বের মধ্যে) বেশ উৎফুল্ল ভাব দেখা যায়।

প্রতিবেদনে জানা যায়, ৪ নভেম্বর সকাল ১০টার একটু পরে মিছিল রওনা হয় বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ির উদ্দেশ্যে। মিছিলকারীরা কালো ব্যাজ পরেছেন। অনেকের হাতে ফুল। শুরুতে দুই একজন ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিলেও পরে তাদের থামিয়ে দেয়া হয় শোক মিছিল, মৌন মিছিল বলে। বটতলা থেকে বেরোনো মিছিলটিকে নীলক্ষেত ফাঁড়ির সামনে আটকে দেয়া হলে মিছিলের সামনের কাতারে থাকা ডাকসু ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং ছাত্রনেতাদের সঙ্গে ২০-২৫ মিনিট পুলিশের বাকবিতণ্ডা হয়।

এক পর্যায়ে (সম্ভবত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পর) পুলিশ রাস্তা ছেড়ে দেয়। ধীরে ধীরে মিছিলটি নিউমার্কেটের সামনে দিয়ে ৩২ নম্বরের দিকে যতই এগুতে থাকে ততই বড় হতে থাকে। রাস্তার দুই পাশ থেকে অনেক সাধারণ মানুষ মিছিলে যোগ দেন। কলাবাগান থেকে মিছিলে যোগ দেন সাংসদ মোশাররফের মা এবং ভাই রাশেদ মোশাররফ। এ থেকেই রটানো হয় খালেদ মোশাররফের মার নেতৃত্বে মিছিল হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে কলাবাগান থেকে ৩২ নম্বর পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া ছাড়া খালেদ মোশাররফের মা এবং রাশেদ মোশাররফদের মিছিলের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক ছিল না। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেইট ছিল বন্ধ। সামনে ছিল পুলিশ। কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এক অভূতপূর্ব শোক বিহ্বল দৃশ্যের অবতারণা হয় ৩২ নম্বরের বাড়িটির গেটের সামনে। কান্নার রোল পড়ে যায়। সমস্ত পরিবেশ হয়ে পড়ে শোকাভিভূত। এরই মধ্যে মানুষ ফুল অর্পণ করে ৩২ নম্বরের বন্ধ করা গেইটের সামনে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ‘যদিও শোক প্রকাশের উদ্দেশ্যে মৌন মিছিল তবুও এটা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ’। (সূত্র: সচিত্র বাংলাদেশ জুলাই-আগস্ট-২০০৯)

র আ ম ওবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী

অক্টোবর-নভেম্বরে আয়োজিত এ প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং এতে অংশ নেওয়া নেতা-কর্মীদের সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায় তৎকালীন ছাত্র ও যুবলীগ নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাংসদ র আ ম ওবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরীর লেখায়। প্রথম আলোতে প্রকাশিত ওই লেখায় তিনি লিখেছেন, ‘এসময় জাতীয় যুবলীগ ও জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকা আমরা কয়েকজন এবং সাংসদদের মধ্যে মধ্যস্তরের কয়েকজন নেতা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের হোতাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেই। ছাত্র ইউনিয়নের যেসব নেতা জাতীয় ছাত্রলীগে ছিলেন, তাদের সঙ্গে কাজ করা শুরু করলাম। আমরা গ্রুপে গ্রুপে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাজ শুরু করলাম। এসময় আমরা যারা সক্রিয়ভাবে কাজ করছিলাম, তাদের মধ্যে ছিলেন, এস এম ইউসুফ, মরহুম শফিকুল আজিজ মুকুল, ফকির আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ।… এরমধ্যে খুনি চক্রের প্রধান খোন্দকার মোশতাক বঙ্গভবনে এমপিদের বৈঠক ডাকেন। সেই বৈঠক বয়কটের আহ্বান জানিয়ে আমরা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ব্যাপক তৎপরতা চালাই। ছাত্রনেতাদের মধ্যে ইসমত কাদির গামা, রবিউল আলম চৌধুরী, মোমতাজ হোসেন, নুরুল ইসলাম, কাজী আকরাম হোসেন, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বেশ তৎপর ছিলেন।”

“তারা এমপিদের মোশতাকের বৈঠক বয়কট করার আহ্বান জানান। আমাদের বাধা সত্ত্বেও বৈঠকটি হয়েছিল। এটি সফল করতে তৎপর ছিলেন, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কে এম ওবায়দুর রহমান, রাফিয়া আখতার ডলি প্রমুখ। কিন্তু বৈঠকটি ব্যর্থ হয়। মোশতাক কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রবীণ নেতা ও আইনজীবী সিরাজুল হক মোশতাক সরকারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করলে সবকিছু ভণ্ডুল হয়ে যায়।”

“এ সময় আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সারির নেতাদের অনেকে নিজেদের সংগঠিত করার জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শামসুদ্দিন মোল্লা, সিরাজুল হক, আনোয়ার চৌধুরী, এম এ মালেক, মফিজুল ইসলাম চৌধুরী, রওশন আলী, কামরুজ্জামান (শিক্ষক নেতা), ময়েজউদ্দিন আহমদ, খালেদ মোহাম্মদ আলী প্রমুখ এ সময় সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। মোশতাকের শাসনের পরও অনেকে প্রতিবাদকারীদের কাতারে শামিল হয়েছিলেন।”

“…আমরা নিজেদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করলাম অতি অল্প সময়েই। মোমতাজ হোসেনের পুরোনো পল্টনের বাড়িতে, তার মা-বাবার স্নেহে-প্রশ্রয়ে আওয়ামীপন্থি ছাত্র-যুবরা প্রায়ই বৈঠক করতাম এবং কখনো-সখনো আর্থিক সহায়তাও নিতাম। আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আত্মীয়ের বাসায়। এছাড়া আমরা এস এম ইউসুফের নিমতলীর বাসায় ও রাজু ভাইয়ের ইস্কাটনের বাসায় অনেক বৈঠক করেছি। বৈঠক করেছি বকশীবাজারের ভুট্টো ভাইয়ের বাসায়। ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব অধিকাংশ সময় মহিউদ্দিন সাহেবের বড় ভাইয়ের বাসা ও অন্যান্য স্থানে বৈঠক করতো। এসময় আমরা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার দিন ২০ অক্টোবর জাতীয় ছাত্রলীগের ব্যানারে প্রথম মিছিল করার সিদ্ধান্ত নিই।”

“২০ অক্টোবর ১৯৭৫ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে একটি লাল দিন। খুনি মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে এদিন আমরা প্রথম মিছিল বের করেছিলাম। মিছিলে আরও যাঁরা ছিলেন তারা হলেন, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাহবুব জামান, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কাজী আকরাম হোসেন ও অজয় দাশগুপ্ত, ছাত্রলীগ নেতা রবিউল আলম চৌধুরী, মমতাজ হোসেন, খালেদ খুররম এবং বিশ্বদ্যিালয় ও নগর ছাত্রলীগ নেতা শহীদুল আলম বাদল, মৃণাল সরকার, কামরুল আহসান খান, খ ম জাহাঙ্গীর, বাহলুল মজনু চুৃন্নু হাবিবুর রহমান খান, মুকুল বোস, সম সালামসহ ৪০-৫০ জন ছাত্রকর্মী। পরের দিনও আমরা সমবেত হয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। ২১ অক্টোবর যখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করি তখনই আমরা দেখতে পাই কতগুলো গুণ্ডা দেশি অস্ত্রশস্ত্র যেমন হকিস্টিক, কাঠের লাঠি ইত্যাদি নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। আমরা মধুর ক্যান্টিনে যেই গিয়ে বসেছি, অমনি আমাদের ওপর হামলা হয়। আমরা তাদের এই ঘৃণ্য হামলায় ঘাবড়ে যাইনি। বরং এই হামলা প্রহিতত করে এদিনও একটি মিছিল করতে সক্ষম হই। আমাদের মিছিল অনেক বড় হয়েছিল। কয়েকশ ছাত্রছাত্রী মিছিলে শামিল হয়েছিল। জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ থেকে আমাদের কর্মীরা এসেছিল। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা  মাহবুব জামান, কাজী আকরাম, অজয় দাশপুপ্ত এবং আমি বক্তৃতা করেছিলাম সমাবেশে। এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কর্মতৎপরতা ও উপস্থিতি বেড়ে যায়। নগরের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের কাজ ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে আমরা বঙ্গবন্ধু ভবনে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা প্রতিনিধিদল ভাগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে বক্তব্য দিতে শুরু করি। আমার ভাগে পড়েছিল কলাভবন। আমরা এসময় আওয়ামী লীগকেও সংগঠিত করার কাজে তৎপর হই। দিকনির্দেশনাহীন এক বিশাল কর্মী বাহিনী ও দেশ প্রেমিক জনগণকে সংঘবদ্ধ করে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি।”

“… আমরা যেদিন মিছিলের তারিখ নির্ধারণ করেছিলাম সেদিনই খালেদ মোশাররফ এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মোশতাক শাসনের অবসান ঘটান। ৪ নভেম্বর ১৯৭৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে লাল তারকাখচিত আর একটি দিন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে এ মিছিল শেষ হয়েছিল বঙ্গবন্ধু ভবনে এবং সেদিন মোনাজাত পরিচালনা করেছিলেন মাওলানা জেহাদী।”

এক সময়ের ছাত্র ইউনয়ন নেতা, বর্তমানে সাংবাদিক আবদুল কাইয়ুমের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় আন্দোলন গড়ে তোলা কঠিন ছিল। তাই বিশ্ববিদ্যালয় খোলার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সিপিবি ও ন্যাপের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রেখে ও তাদের পরামর্শে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও অন্য কয়েকজন ছাত্রনেতা প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ করছিলেন। তারা ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরপরই আন্দোলন শুরু করার উদ্যোগ নেন। ২০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার দিন পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রনেতা-কর্মীরা জড়ো হয়ে সেখান থেকে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করে। ২২ অক্টোবরও একইভাবে মিছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের করিডরে ঝটিকা মিছিলে নেতৃত্ব দেন ছাত্রনেতা মাহবুব জামান। স্লোগান ছিল ‘মুজিব হত্যার বিচার চাই।’, ‘এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে’।

ছাত্রকর্মীরা ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ ঠিক করেছিল ৪ নভেম্বর মৌন মিছিল বের করবে। ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় শোক ও শ্রদ্ধা জানাবে। ১৬ ও ১৭ অক্টোবর কারফিউর মধ্যেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চিকা মারেন।

৪ নভেম্বর মৌন মিছিলের জন্য ছাত্ররা ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ শিরোনামের একটি লিফলেট বের করেন। লিফলেটটি লাখখানেক ছাপানো ও বিভিন্ন স্থানে বিতরণের দায়িত্ব ছিল ছাত্র ইউনিয়ন মহানগর কমিটির নেতা ও পরে জাতীয় ছাত্রলীগের মহানগর কমিটির সম্পাদকমণ্ডলির সদস্য শওকাত হোসেনের। বেশ ঝুঁকি নিয়ে তিনি উর্দু রোডের পূর্ববঙ্গ প্রেসে লিফলেট ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। ৩০ অক্টোবর লিফলেট বিতরণের সময় তাকে এবং ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কাজল ব্যানার্জিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরদিন সেগুন বাগিচায় এজি অফিসে লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা চামেলি বাগের আবু সিদ্দিক ও শাহ জামাল। এই চার জনের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চলে এবং তারা দুই-তিন মাস জেল খাটেন। পরবর্তী সময়ে কাজল ব্যানার্জি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক শওকাত হোসেন, ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক ট্রেইনার আবু সিদ্দিক ব্যবসায়ী এবং শাহ জামাল সরকারি কর্মকর্তা হন। তারা চার জনই সাহসিকতার প্রতীক। ( সূত্র: প্রথম আলো, ১৫-০৮-২০১৪) 

মুক্তাগাছার যুদ্ধে প্রাণ দিলেন পাঁচজন:  বিশ্বজিতকে ফাঁসির আদেশ

বঙ্গবন্ধূ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী যুদ্ধ সংঘটিত হয় ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা সীমান্তে এলাকায়।  ১৯৭৬ সালের ১৪ অগাস্ট এ যুদ্ধে পাঁচ প্রতিবাদী যোদ্ধা নিহত হন। আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ নন্দী। নিহতরা হলেন, সহযোদ্ধা জুবেদ আলী, সুবোধ ধর, দীপাল দাস, মফিজ উদ্দিন ও নিখিল। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে সামরিক আদালতে বিশ্বজিতের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ হয়। এরশাদের আমলে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে ফাঁসির আদেশ মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে।  

ভৈরব: মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে বাধা, গ্রেপ্তার ২২

১৯৭৬ সালে সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর ভয়ভীতি উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের আয়োজন করেছিল কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এ উপলক্ষে ১৫ অগাস্ট মিলাদ, কোরান খতম ও দোয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ এসে বাধা দেয় এবং উপস্থিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের ২২ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে অমানুষিক নির্যাতনের পর পাঠিয়ে দেওয়া হয় কারাগারে। ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত কারাভোগের পর তারা মুক্তি পান। দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী সেদিন আয়োজকদের অপরাধ ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে মিলাদ পড়ানো।

প্রতিবাদী আন্দোলন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায়

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ আন্দোলন হয়েছিল শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলায়। এতে প্রায় পৌনে চারশ কারও কারও মতে তিনশ যুবক যোগ দেন। তাদের অনেকে ধরা পড়ে জেল খেটেছেন, ভোগ করেছেন  অমানুষিক নির্যাতন।

 উপজেলা প্রতিরোধযোদ্ধা পরিষদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়,  ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে উপজেলার চৌকিদারটিলায় একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। সেখানে উপজেলার ৩৭৫ জন যুবক বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে এক মাস প্রশিক্ষণ নেন। পরে সংগঠনের সদস্যরা কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় নানা কর্মকাণ্ড চালান। তখন সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানে বিডিআর ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ২২ মাস পর নানা নির্যাতন ও পরাজয়ের গ্লানি ভোগ করে তাঁরা ফিরে আসেন। এদের মধ্যে আজগর আলী, শফিকুল ইসলাম, জিনাত আলী, গৌরাঙ্গ পাল ১০ বছর করে কারাভোগ করেন। এছাড়া বৈদ্যনাথ কর ও মোফাজ্জল হোসেন দুই বছর করে কারাভোগ করেন। এরপর তারা উপজেলা প্রতিরোধযোদ্ধা পরিষদ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন।