পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

তরুণ বঙ্গবন্ধুর ছয় বছরের কলকাতাবাস

  • ফয়সাল আতিক, নিজস্ব প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-11-09 14:33:57 BdST

যে কলকাতা শহরে বসে বৃহত্তর বাংলাকে ঘিরে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু, দেশ ভাগের জটিল সমীকরণে পশ্চিমবঙ্গ হাতছাড়া হওয়ার পর ভগ্ন হৃদয়ে ফিরতে হয়েছিল তাকে।

পাকিস্তান সৃষ্টির এক মাসের মাথায় ঢাকায় এসে থিতু হলেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে ‍মুসলিম লীগের সমমনাদের নিয়ে যে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করলেন, তার হাত ধরেই ২৩ বছরের বন্ধুর পথ মাড়িয়ে ধরা দিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন জাতির জনক।

কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে মুসলিম লীগের তরুণ কর্মী হিসাবে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে ভারতবর্ষ চষে বেড়িয়েছেন তরুণ মুজিব, জীবনবাজি রেখে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার মাঝখানে দাঁড়িয়েছেন মানবঢাল হিসাবে।

তারুণ্যের ছয়টি বছর (১৯৪২ থেকে ১৯৪৭) কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সক্রিয়তা খুব সহজেই তাকে পরিচিত করে করে তোলে বৃহত্তর বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে। ‘শহীদ সাহেবের’ স্নেহভাজন হিসাবে শেখ মুজিব হয়ে উঠেন কলকাতায় মুসলিম লীগের প্রভাবশালী ছাত্রনেতা।

বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে দেখা যায়, ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জের মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে বঙ্গবন্ধু চলে যান কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে। তখন তার বয়স ছিল ২২ বছর। জন্মস্থান গোপালগঞ্জে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্ব নিরসনের বিভিন্ন ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়া শেখ মুজিব কলকাতায় গিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেন মুসলিম লীগের কর্মী হিসাবে।

ছোটবেলা থেকেই মুসলিম লীগের বঙ্গ অঞ্চলের শীর্ষনেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভক্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সোহরাওয়ার্দীর শহর কলকাতায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে শেখ মুজিব হয়ে উঠেন ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির তরুণ নেতা।

বৃটিশ ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বসে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা ছিল এরকম- “অখণ্ড ভারতে যে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না, এটা আমি মন প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতাম। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হিন্দু নেতারা ক্ষেপে গেছে কেন? ভারতবর্ষেও মুসলমান থাকবে এবং পাকিস্তানেও হিন্দুরা থাকবে। সকলেই সমান অধিকার পাবে। পাকিস্তানের হিন্দুরাও স্বাধীন নাগরিক হিসাবে বাস করবে। ভারত বর্ষের মুসলমানরাও সমান অধিকার পাবে।”

দেশভাগের সময় আজকের পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তর ভারতের সঙ্গে মিশে যাওয়া বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের কতটা আহত করেছিল, তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- “১৯৪৭ সালের জুন মাসে ঘোষণা করা হল বাংলা ভাগ হবে। কংগ্রেস ভারতবর্ষকে ভাগ করতে রাজি হয়েছে এই জন্য যে, বাংলাদেশ ও পাঞ্জাব ভাগ হবে। আসামের সিলেট জেলা ছাড়া আর কিছুই পাকিস্তানে আসবে না। বাংলাদেশের কলকাতা এবং আশপাশের জেলাগুলোও ভারতবর্ষে থাকবে। মওলানা আকরাম খাঁ সাহেব ও মুসলিম লীগ নেতারা বাংলাদেশ ভাগ করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেন। বর্ধমান ডিভিশন আমরা নাও পেতে পারি, কলকাতা কেন পাব না? কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করল। আমরাও বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না, এর জন্য সভা করতে শুরু করলাম। আমরা কর্মীরা কি জানতাম যে কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতারা নিয়েছে এই ভাগের ফর্মুলা? বাংলাদেশ যে ভাগ হবে বাংলাদেশের নেতারাও তা জানতেন না। সমস্ত বাংলা আসাম পাকিস্তানে আসবে এটাই ছিল তাদের ধারণা। আজ দেখা যাচ্ছে, মাত্র আসামের এক জেলা- তাও যদি গণভোটে জয়লাভ করতে পারি। আর বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি কেটে হিন্দুস্থানে দেওয়া হবে। আমরা হতাশ হয়ে পড়লাম। কলকাতার কর্মীরা ও পশ্চিম বঙ্গের কর্মীরা এসে আমাদের বলত, তোমরা আমাদের ছেড়ে চলে যাবে, আমাদের কপালে যে কী হবে খোদাই জানে। সত্যিই দুঃখ হতে লাগল ওদের জন্য। গোপনে গোপনে কলকাতার মুসলমানরা প্রস্তুত ছিল, যা হয় হবে, কলকাতা ছাড়া হবে না। শহীদ সাহেবের পক্ষ থেকে বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতা আমাদের রাজধানী থাকবে। দিল্লি বসে অনেক পূর্বেই যে কলকাতাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, একথা তো আমরা জানতামও না আর বুঝতামও না।”

কলকাতায় ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিব পাকিস্তান সৃষ্টির পর কী কারণে, কীভাবে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুরোধা হয়ে উঠলেন? বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এ প্রশ্ন ছিল ইতিহাসের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের কাছে।

খুব সংক্ষেপে তার বিশ্লেষণ ছিল এরকম- “হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তার রাজনৈতিক গুরু। তিনি সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বাংলার আনাচে কানাচে ঘুরে মুসলিম লীগের পক্ষে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। তাদের ধারণা ছিল পাকিস্তান হলে দরিদ্র্য বাঙালির ভাগ্য ফিরবে। এই কারণে তিনি মুসলিম লীগের সদস্য হিসাবে নিজে শ্রম দিয়েছিলেন; সময় দিয়েছিলেন।

“কিন্তু যখন পাকিস্তান সৃষ্টি হল তখন দেখা গেল যে তিনি যেভাবে পাকিস্তান চেয়েছিলেন লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী সেভাবে পাকিস্তান হয়নি। এখানে তিনিই প্রথম রাজনীতিক যিনি আপন দূরদর্শিতায় সবার আগে পাকিস্তানি মোহ থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন।”

“তাই বলা যায়, ছোটবেলা থেকেই তার নেতৃত্ব বিকশিত হয়েছে নানা ঘটনা পারিক্রমার মধ্য দিয়ে। এই বাংলায় এসে মুসলিম লীগ ছেড়ে যখন আওয়ামী লীগে এলেন তখন বাঙালির ভবিষ্যত স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে একটি নতুন পাটাতন খুঁজে পেলেন। এভাবে ক্রমাগতভাবে শুধু আওয়ামী লীগ বিকশিত হয়নি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বও বিকশিত হয়েছে,” এভাবেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক বিকাশ ব্যাখ্যা করেন অধ্যাপক আনোয়ার।

কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি

১৯৪২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই বছরে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে এই কলেজ থেকেই তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন।

কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার এক বছরের মধ্যেই বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের (অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের শাখা) কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর মুসলিম লীগের মধ্যে যে রাজনৈতিক সন্দেহ অবিশ্বাস দেখা দেয়, তার আগ পর্যন্ত নিরলসভাবে মুসলিম লীগের হয়ে কাজ করে গেছেন বঙ্গবন্ধু।

দিল্লি কনফারেন্সে যোগদান

সেই সময় পুরো ভারতবর্ষে ১১টি প্রদেশ ছিল। এর মধ্যে কেবল বাংলায় মুসলিম লীগ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে পেরেছিল। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অন্য প্রদেশগুলোর মধ্যে পাঞ্জাবে খিজির হায়াত খান তেওয়ানার নেতৃত্বে ইউনিয়নিস্ট সরকার, সীমান্ত প্রদেশে খান সাহেবের নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার এবং সিন্ধুতে আল্লাহ বক্সের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ বিরোধী সরকার গঠন করা হয়। এসব প্রদেশে প্রধান বিরোধী দল মুসলিম লীগ।

১৯৪৩ সালে নির্বাচনের পর ৭, ৮, ৯ এপ্রিল দিল্লিতে সারা ভারতে মুসলিম লীগপন্থি কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের কনভেনশন ডাকেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

বাংলা ও আসামের মুসলিম লীগ এমএলএ ও কর্মীরা হাওড়া থেকে একটি ট্রেনে চেপে যাত্রা করলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানও (অন্য ১০/১৫ জনসহ) একজন ছাত্রকর্মী হিসাবে ওই ট্রেনযাত্রীদের দলে ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খালাত বোনের ছেলে মুন্সিগঞ্জের মীর আশরাফ উদ্দিন মাখন। নিখিল ভারতের মুসলিম নেতারা এই কনফারেন্সে বক্তব্য রাখেন।

এই সম্মেলনের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু লেখেন- “হাওড়া থেকে দিল্লি রওনা হলাম। এই প্রথমবার আমি বাংলাদেশের বাইরে রওয়ানা করলাম। দিল্লি দেখার একটা প্রবল আগ্রহ আমার ছিল। দিল্লির লালকেল্লা, জামে মসজিদ, কুতুব মিনার ও অন্যান্য ঐতিহাসিক জায়গাগুলো দেখতে হবে। নিমাজুদ্দিন আউলিয়ার দরগায় যাব। …আমরা দিল্লি পৌঁছালে মুসলিম লীগ সেচ্ছাসেবক দল আমাদের পৌঁছে দিল এ্যাংলো এ্যারাবিয়ান কলেজ প্রাঙ্গণে।

“সমস্ত ট্রেনকে সাজিয়ে ফেলা হল মুসলিম লীগ পতাকা ও ফুল দিয়ে। ছাত্ররা দুষ্টামি করে বগির সামনে লিখে দিল শেখ মুজিবুর ও পার্টির জন্য রিজার্ভড। এই লেখার উদ্দেশ্য হল আর কেউ যেন এই ট্রেনে না উঠে। আর আমার কথা শুনলে শহীদ সাহেব কিছুই বলবে না।”

ইসলামিয়া কলেজের সাধারণ সম্পাদক

১৯৪৬ শেখ মুজিবুর রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে মূল ধারার রাজনীতিতে সক্রিয় বঙ্গবন্ধু খুব বেশি দিন এই পদে ছিলেন না। পদে না থাকলেও ছাত্রদের ওপর তার ছিল ব্যাপক প্রভাব। কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে বঙ্গবন্ধু একটা সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “এই সময় আমি বাধ্য হয়ে কিছুদিনের জন্য ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হই। দুই গ্রুপই অনুরোধ করল আমাকে সাধারণ সম্পাদক হতে। …. আমি বাধ্য হয়ে রাজি হলাম এবং বলে দিলাম তিন মাসের বেশি আমি থাকব না। কারণ পাকিস্তান ইস্যুর ওরপ ইলেকশন আসছে, আমাকে বাইরে বাইরে কাজ করতে হবে। কলেজে আসতেও সময় পাব না। আমি তিন মাসের মধ্যে পদত্যাগপত্র দিয়ে আরেকজনকে সাধারণ সম্পাদক করে দিই।”

মিল্লাত পত্রিকা প্রকাশ

দৈনিক আজাদ ছিল তখন একমাত্র বাংলা খবরের কাগজ, যা মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান সমর্থন করত। এর প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক মওলানা আকরাম খাঁ, বাংলা প্রদেশের মুসলিম লীগ সভাপতি। মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিম সাহেবকে তিনি পছন্দ করতেন না। তাই আজাদ পত্রিকায় হাশিমপন্থিদের খবর খুব কম ছাপা হত।

হাশিমপন্থিরা একটি সপ্তাহিক পত্রিকা বের করার উদ্যোগ নিলে তা বাস্তবায়নের জন্য যেসব তরুণ যুক্ত হলেন শেখ মুজিব ছিলেন তাদের একজন।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “মুসলিম লীগ অফিসের নিচ তলায় অনেক খালি ঘর ছিল। হাশিম সাহেব নিজেই সম্পাদক হলেন, কাগজ বের হল। আমরা অনেক কর্মীই রাস্তায় হকারি করে কাগজ বিক্রি করা শুরু করলাম। সমস্ত বাংলাদেশেই আমাদের প্রতিনিধি ছিল। তারা কাগজ চালাতে শুরু করল। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়রে কাছে কাগজটা বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে লাগল। হিন্দুদের মাঝেও অনেকে কাগজটা পড়তেন। এর নাম ছিল মিল্লাত।”

মুসলিম ছাত্রলীগের হয়ে ফরিদপুরে

ছাত্রলীগের কর্মী শিবিরের জন্য কলকাতার নেতাদের যখন জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হল, বঙ্গবন্ধুর ভার পড়ল ফরিদপুর মহকুমায়। এই প্রথম তিনি বড় কোনো দলীয় দায়িত্ব নিয়ে ফরিদপুরে আসেন।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমাকে কলেজ ছেড়ে ফরিদপুর চলে আসতে হল, আমরা রওনা হয়ে চলে এলাম সাইকেল, মাইক্রোফোন, হর্ন, কাগজপত্র নিয়ে। আমাকে ভার দেওয়ায় মোহন মিয়া সাহেব ক্ষেপে গেলেন। তিনি মুসলীম লীগ সভাপতি কিন্তু আমাকে চান না।”

‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ দিবস

মুসলিম লীগ নেতৃত্ব নিজেদের শক্তির জানান দেওয়ার জন্য ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ নামের একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। ২৯ জুলায় মুম্বাইয়ে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিল থেকে জিন্নাহ এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচি পালন করাকে কেন্দ্র করে কলকাতায় মুসলিম ছাত্রদের ওপর মোড়ে মোড়ে চড়াও হয় হিন্দু ছাত্ররা।

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সেদিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর দায়িত্ব পড়েছিল কলকাতার মুসলিম ছাত্রদের জড়ো করা। সকাল ১০টায় ইসলামিয়া কলেজে তাদের জড়ো করা হয়েছিল। এর আগে সকাল সাড়ে ৭টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মুসলীম লীগের পতাকা উত্তলনের। বঙ্গবন্ধু ও নুরুদ্দিন সাইকেলে চড়ে গিয়ে পতাকা সফলভাবে তুলে দিয়ে এসেছিলেন। পরে তারা আসার পর সেটা ছিড়ে ফেলা হয়েছিল বলে শোনা যায়।

সেদিন বউবাজার এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা হয়। ইসলামিয়া কলেজের বেকার হোস্টেলের সামনে সেদিন মুন্নুজান হোস্টেল থেকে মুসলিম ছাত্রলীগের নারীকর্মীরাও সমবেত হয়েছিল।

সেদিন গড়ের মাঠের ওই সমাবেশকেকেন্দ্রে করে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় মোড়ে মোড়ে মুসলিম লীগ কর্মীদের ওপর উগ্র হিন্দুরা হামলা করেছিল। কারণ তারা মনে করত এটা হিন্দু বিরোধী আন্দোলন।

ছবি: mujib100.gov.bd থেকে

ছবি: mujib100.gov.bd থেকে

পাটনা বিহারের দাঙ্গাদমন

কলকাতার দাঙ্গা বন্ধ হতে না হতেই নোয়াখালীতে দাঙ্গা শুরু হল হিন্দুদের ওপর। ঢাকা ও বিহারে দাঙ্গা আগে থেকেই লেগে ছিল।

বঙ্গবন্ধুকেসহ একটি প্রতিনিধি দলকে পাঠানো হল পাটনায় দাঙ্গা পরিস্থিতি সামাল দিতে। তিনি সেখানে শতশত উদ্ধার কর্মী দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দীর পক্ষ থেকে। সেখানে দেড়মাস অবস্থান করে কলকাতায় ফিরে তিনি।

সেই সময় কলকাতায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু ঘন ঘন সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করতে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা পরিস্থিতি দমনে ভূমিকা রাখেন। মহাত্মা গান্ধী, মনু গান্ধি আভা গান্ধির সাথে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা দমনে অবদান রাখেন। ফটোগ্রাফার বন্ধু ইয়াকুবকে নিয়ে মহাত্মা গান্ধীকে দাঙ্গার ছবি উপহার দেন।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “এসব ফটোর মধ্যে ছিল মুসলমান মেয়েদের স্তন কাটা, ছোট শিশুদের মাথা নাই এমনই আরও অনেক কিছু। মহাত্মাজী দেখুক, কীভাবে তার লোকেরা দাঙ্গাহাঙ্গামা করছে এবং নিরীহ লোককে হত্যা করছে।”

কলকাতায় কঠিন সময়

দেশ ভাগের পর বৈরী পরিস্থিতিতে কলকাতায় রাজনৈতিক কাজ চালানো বঙ্গবন্ধুর পক্ষ কঠিন হয়ে ওঠে।

তার ভাষ্যে, “আমাদের পক্ষে কলকাতার থাকা সম্ভবপর না, কারণ অনেককে গ্রেপ্তার করেছে। জহিরুদ্দিনের বাড়ি তল্লাশি করেছে। আমাদেরও ধরা পড়লে ছাড়বে না। ভাগতে পারলে বাঁচি। … শহীদ সাহেবের কাছে বিদায় নিতে গেলাম। তাকে রেখে চলে আসতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল।

“আমি ভাবতাম, পাকিস্তান কায়েম হয়েছে, আর চিন্তা কী? এখন ঢাকায় যেয়ে ল ক্লাসে ভর্তি হয়ে কিছুদিন মন দিয়ে লেখাপড়া করা যাবে। চেষ্টা করব সমসস্ত লীগ কর্মীদের নিয়ে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা না হয়।”

কিছুদিন গোপালগঞ্জে থাকার পর সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধু। ওঠেন পুরান ঢাকার মোগলটুলীতে মুসলিম লীগের অফিসে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কর্মীদের সংঘবদ্ধ করতে একটি সম্মেলনের ডাক দেন শামসুল হক। সেই সম্মেলনকে সামনে রেখেই গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধু্।

বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, “পূর্বে দুএকবার এসেছি বেড়াতে। পথ ঘাট ভাল করে চিনি না। আত্মীয় স্বজন যারা চাকরিজীবী, কে কোথায় আছেন জানি না। ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে প্রথমে উঠব ঠিক করলাম।”

শুরু হল শেখ মুজিবের নতুন অধ্যায়, আর তাই তাকে পরিণত করে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায়।