বিদ্বেষের আগুন থেকে ৬ মুসলিমকে বাঁচিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন প্রেমকান্ত

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-28 01:05:44 BdST

সাম্প্রদায়িকতার আগুনে যখন পুড়ছে ভারতের রাজধানী দিল্লি, সেই সময় আরও অনেকের মতো মুসলিম প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করেছেন এক হিন্দু যুবক।

প্রেমকান্ত বাঘেল নামের দিল্লির শিব বিহার এলাকার ওই যুবক জ্বলন্ত ঘরে আটকে পড়া প্রতিবেশী ছয়জন মুসলমানকে বাঁচিয়েছেন। এই কাজ করতে গিয়ে শরীরের ৭০ শতাংশ দগ্ধ হয়ে এখন তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন বলে ইন্ডিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের আগে রোববার রাজধানী দিল্লিতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) সমর্থক ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি মিছিল থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার রূপ নেয়।

টানা চার দিন ধরে দাঙ্গায় এখন পর্যন্ত ৩৮ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

ইন্ডিয়া টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেমকান্ত যখন প্রতিবেশী মুসলমানদের ঘর পুড়তে দেখেন তখন তিনি তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যান। তিনি বলেন, শিব বিহারে হিন্দু-মুসলমানরা সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে, কিন্তু এই দাঙ্গা এক ভিন্ন চিত্র নিয়ে এসেছে।

দুর্বৃত্তরা পেট্রোল বোমা ছুড়ে মুসলমানদের ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। ঘটনাটি জানার সঙ্গে সঙ্গে ওই সব ঘরে আটকে পড়াদের উদ্ধার করতে ছুটে যান প্রেমকান্ত।

নিজের জীবন বিপন্ন করে ছয় প্রতিবেশীকে বাঁচান তিনি। জ্বলন্ত ঘরের মধ্যে আটকাপড়া খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর বৃদ্ধা মাকে বের করতে গিয়ে পুড়ে যান।

এই ঘটনার পর দগ্ধ প্রেমকান্ত বাঘেল হাসপাতালে যাওয়ার জন্য কোনো গাড়ি পাননি। প্রতিবেশীরা অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেও তা আর পৌঁছায়নি। দগ্ধ শরীর নিয়ে সারা রাত ঘরের মধ্যে কাটাতে হয় তাকে।

সকালে তাকে নিয়ে দিল্লির জি টি বি হাসপাতালে ভর্তি করেন বন্ধু-স্বজনরা। সেখানে বার্ন ইউনিটে তার চিকিৎসা চলছে।

নিজের এই অবস্থা হলেও প্রেমকান্ত বাঘেল বলেন, বন্ধুর মায়ের জীবন বাঁচাতে পেরে তিনি খুশি।

দিল্লিতে ভয়াবহ এই সন্ত্রাস থেকে বাঁচতে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালানো মুসলিমদের আশ্রয় দিতে খুলে দেওয়া হয়েছে গুরুদুয়ারার দরজা।

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের চিত্র

দিল্লিতে ধর্মের নামে দলবেঁধে যে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস চালানো হয়েছে, তার একটি চিত্র তুলে ধরেছেন টাইমস অব ইন্ডিয়ার আলোকচিত্রী অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।

দাঙ্গার মধ্যে একদিন দুপুরে উত্তরপূর্ব দিল্লির মৌজপুর মেট্রো স্টেশনে গিয়ে ভয়াবহ এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

তিনি জানান, বেলা সোয়া ১২টার দিকে সেখানে যাওয়ার পর হঠাৎ হিন্দু সেনার এক সদস্য তার কাছে এসে কপালে তিলক দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এতে তার কাজ করা ‘সহজ হবে’।

ওই যুবক ক্যামেরা দেখে তাকে একজন আলোকচিত্রী ধরে নিয়েছিলেন বলে মনে করছেন অনিন্দ্য।

তার ভাষ্য মতে, তার পরেও তিনি ছিলেন অনড়।

“ভাইয়া, আপনিও একজন হিন্দু। পরলে (তিলক) সমস্যা কোথায়?”

এর মিনিট ১৫ পরে দুই পক্ষের মধ্যে পাথর ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। ‘মোদী, মোদী’ শ্লোগানের মধ্যে আকাশ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যেতে দেখেন তিনি।

এ সময় জ্বলন্ত একটি ভবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে শিব মন্দিরের কাছে কয়েকজন এসে তার পথ রোধ করেন। তাদের ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলতেই বারণ করেন তারা।

“ভাই, আপনিও একজন হিন্দু। ওখানে কেন যাচ্ছেন? আজকে হিন্দুরা জেগে উঠেছে,” বলেন তাদের একজন।

তখন পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন এই আলোকচিত্রী।

“যখনই আমি ছবি তুলতে শুরু করেছি, বাঁশের রড ও লাঠি হাতে কয়েকজন লোক আমাকে ঘিরে ধরে। তারা আমার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন আমার রিপোর্টার সহকর্মী সখী চাঁদ আমার সামনে এসে আমাকে আগলে দাঁড়ায় এবং তারা যাতে আমার গায়ে হাত না দেয় সেজন্য ভয় দেখায়। তখন তারা সটকে পড়ে।”

এর কিছুক্ষণ পর আবারও কয়েকজন তাকে অনুসরণ করছে বলে বুঝতে পারেন অনিন্দ্য।

“এক যুবক আমার কাছে এসে বলে, ভাই, আপনি খুব স্মার্ট ভাব দেখাচ্ছেন। আপনি কি হিন্দু না মুসলিম?”

তার ধর্ম সম্পর্কে নিশ্চিত হতে প্যান্ট খোলার হুমকি দেওয়া হয় বলে জানান অনিন্দ্য।

“তখন আমি হাত জোড় করে বলি, আমি খুব সাধারণ একজন আলোকচিত্রী।”

এরপর নানা হুমকি-ধমকি দিয়ে তাকে যেতে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

দ্রুত ওই এলাকা ত্যাগ করে অফিসের গাড়ি খুঁজে না পেয়ে কিছু দূর এগিয়ে একটি অটোরিকশা নেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।

অটোরিকশায় চড়ে অফিসের পথ ধরার পর তিনি বুঝতে পারেন, এই অটোতে যা লেখা আছে তাতে আবারও সমস্যায় পড়তে হবে। কিছু দূর যেতে না যেতেই চারজন তাদের থামায়।

“তারা আমাদের কলার ধরে অটো থেকে নামায়। আমি প্রেসের লোক এবং অটোচালক নিরীহ মানুষ বলে আমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাদের কাছে অনুনয়-বিনয় করি।”

অনিন্দ্য জানান, অটোচালক যখন তাকে নামিয়ে দিয়ে যান, তখন তিনি বুঝতে পারেন লোকটি কতটা ভয় পেয়েছিলেন।  

“আমার জীবনে এইভাবে কখনও কেউ আমার ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করেনি,” বলে নিজের পথ ধরেন ওই চালক।