ভারতের পিএমসি ব্যাংক: ‘প্রথমে গেল টাকা, তারপর ছেলে’

  • নিউজডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-09-25 17:48:32 BdST

এক বছর আগে ভারতের পাঞ্জাব অ্যান্ড মহারাষ্ট্র কো-অপারেটিভ ব্যাংক (পিএমসি) বন্ধ করে দেওয়া হলে প্রায় ১০ লাখ গ্রাহক মুহূর্তে তাদের জীবনের সব সঞ্চয় হারিয়ে বসেন।

ব্যাংক বন্ধ ঘোষণার পর  এক বছর পেরিয়ে গেলেও বহু গ্রাহক এখনো নিজেদের অর্থ ফেরত পাননি।

বিবিসির বিশেষ এক প্রতিবেদনে সেইসব গ্রাহকদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

‘ফিক্সড ডিপোজিট’ এ লোভনীয় সুদের ফাঁদে ধরা দিয়ে বহু মানুষ নিজেদের সব সঞ্চয় নিয়ে পিএমসি ব্যাংকে জমা রাখেন। মুম্বাইয়ের রওনক মোদী তেমনই একজন।

২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নিজের জমানো সব অর্থ এবং বাড়ি বিক্রির অর্থ নিয়ে পিএমসি ব্যাংকের অ্যকাউন্টে জমা দেন তিনি।

স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান নিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় তিনি নতুন একটি ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু মাত্র তিন দিনের মাথায় তার জীবন নেমে আসে কঠিন বিপর্যয়।

বাড়িতে বসে টেলিভিশনের খবর তিনি দেখতে পান, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিএমসি ব্যাংকের সব অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ করে দিয়েছে।

খবরে বলা হয়, পিএমসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপকদের দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে। সেই অংক পৌঁছেছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি রুপিতে।

খবর দেখার পরপরই রওনক ব্যাংকে ছুটে যান এবং সেখানে গিয়ে দেখতে পান তার মত শত শত গ্রাহক অ্যাকাউন্টের অর্থ তুলে নিতে ব্যাংকের সামনে জড় হয়েছেন। পুরো দেশজুড়ে পিএমসি ব্যাংকের শাখাগুলোতে গ্রাহকরা একইভাবে জড়ো হন।

বিবিসি জানায়, এক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পিএমসি ব্যাংকের নয় লাখের বেশি গ্রাহক এখনো ব্যাংকে জমা রাখা তাদের সব অর্থ ফেরত পাননি। পিএমসির গ্রাহকদের বেশিরভাগই ছিলেন মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত খেটে খাওয়া শ্রেণীর মানুষ।

রওনকের আত্মহত্যার দায় কার?

বিবিসি জানায়, অর্থ ফেরত না পাওয়ার হতাশায় এ মাসের শুরুতে আত্মহত্যা করেন রওনক। ২৫ বছরের তরতাজা ছেলেকে এভাবে হারিয়ে দিশেহারা তার পরিবার।

রওনকের বাবা রাজেন্দ্র মোদী বলেন, “আমি বুঝতে পারিনি এটা তাকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন সকালে সে বলতো, ‘আমার মনে হয় আজ ভালো কিছু হবে’। আমাদের দেশের শাসন ব্যবস্থার ওপর তার খুব আস্থা ছিল।”

কিন্তু রওনক ধীরে ধীরে আশা হারাতে শুরু করেন। তার মধ্যেই ভারতে শুরু হয় করোনাভাইরাস মহামারী।

তার বাবা বলেন, “গত এপ্রিল থেকে সে আশা ছেড়ে দেয়। তার বিয়েও ভেঙে যায়। তারপরও সে ব্যাংক থেকে টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছিল।”

পিএমসির লাখো গ্রহক এখনো নিজেদের সঞ্চয় ফেরত পাওয়ার লড়াই করছেন। তারা বিক্ষোভ করছেন, আদালতে যাচ্ছেন, কর্মকর্তা এবং নেতাদের টুইট করছেন, চিঠি লিখছেন।

তাদের অনেকে বয়সে রওনকের মত তরুণ, ‍মাত্র যাদের কর্মজীবন শুরু হচ্ছে। কারো কারো বয়স ৬০ বছরের বেশি। কর্মজীবন শেষে জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রেখে তার উপর নির্ভর করে অবসর উপভোগ করতে চেয়েছিলেন তারা। কারো কারো বয়স ৮০ ছাড়িয়েছে। তারা বিকল্প কিছু ভাবার মত অবস্থায় নেই।

রওনকের বাবা জানান, তারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি, অর্থের চিন্তা তাদের ছেলেকে ভেরতে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছে।

“আমরা সব হারিয়ে ফেলেছি। প্রথমে আমাদের অর্থ গেল, এখন তো ছেলেও চলে গেল।”

ব্যাংক বন্ধের খবর শুনে ৬৪ বছরের কুলদীপ করের স্ট্রোক করে। ৮৩ বছরের মুরলিধর ধারারের হার্টের অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। ব্যাংকে অর্থ আটকে যাওয়ায় তার পরিবার অস্ত্রোপচারের অর্থ যোগাড় করতে পারেনি, মারা যান মুরলিধর। ৭৪ বছরের অ্যান্ড্রু লোবো অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যান।

জমা অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবিতে পিএমসির গ্রাহকদের এক বিক্ষোভে অংশ নিতে গিয়ে সেখানেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান ৫১ বছরের সঞ্জয় গুলাটি।

পিএমসির কী হয়েছিল?

১৯৮৪ সালে যাত্রা শুরু করা পিএমসি ব্যাংকের শতাধিক শাখা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কো-অপারেটিভ ব্যাংকের জনপ্রিয়তার কারণ, এই ব্যাংক থেকে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নেওয়া যায় এবং তারা উচ্চসুদের প্রস্তাব দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে।

কিন্তু পিএমসির ভেঙে পড়ার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে যথাযথ নজদারির অভাবে এ ধরনের ব্যাংক বছরের পর বছর নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। পিএমসি ব্যাংকও ঠিক এ কাজটিই করেছিল, যার দায় এখন গ্রাহকদের মেটাতে হচ্ছে।

পিএমসি ব্যাংক হাউজিং ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটিড (এইচডিআইএল) নামে একটি আবাসন কোম্পানিকে মৃত গ্রাহকদের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট দেখিয়ে কোটি কোটি রুপি ঋণ দেয়। একসময় ওই কোম্পানি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা বন্ধ করে দেয়। অভিযোগ উঠেছে, তারপরও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ শুরুতে এইচডিআইএল এর ঋণ পরিশোধ না করার বিষয়টি চেপে যায়।

এইচডিআইএল এর বিনিয়োগের ৭৫ শতাংশই ছিল পিএমসির ঋণ। অথচ, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) নিয়ম অনুযায়ী কোনো একটি কোম্পানি তাদের মোট বিনিয়োগের মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যাংক ঋণ নিতে পারবে।

এইচডিআইএল এর বেলায় সেই নিয়মের তোয়াক্কা করেনি পিএমসি। ধীরে ধীরে সুদের পরিমাণ বাড়তে থাকে। বেকায়দায় পড়া পিএমসি বাধ্য হয় আরবিআইকে খেলাপি ঋণের খবর জানাতে। ‌ঋণের অর্থ আদায়ের মত কোনো জামানতও এইচডিআইএল দেয়নি।

টনক নড়ে আরবিআই কর্তৃপক্ষের। তারা পিএমসি ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। গ্রাহকরা যাতে হুড়োহুড়ি করে অর্থ তুলে না নেয় সেজন্য ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক নোটিসে বলা হয়, আগামী ছয় মাস একজন গ্রাহক একবারে এক অ্যাকাউন্ট থেকে মাত্র এক হাজার রুপি তুলে পারবেন। কিছু দিন ধরে ওই সীমা এক লাখ রুপি হয়েছে।

‘আমরা ভিক্ষুক নই, এটা আমাদের টাকা’

পিএমসির ঘটনার পর ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কো-অপারেটিভ ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে নজরদারি বাড়িয়েছে। কিন্তু গ্রাহকরা বলছেন, এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

৬০ বছরের অনিতা লোহিয়া বলেন, “আত্মীয় ও বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে এখন আমাদের সংসার চলছে। গত ছয় মাস ধরে আমরা যে ভবনে থাকছি, তার বিল পর্যন্ত পরিশোধ করতে পারছি না।”

অনিতা ও তার স্বামী দুজনই চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। মুম্বাইয়ে পিএমসি ব্যাংকের একটি শাখায় তাদের চারটি অ্যাকাউন্ট আছে, যেখানে তারা নিজেদের সব সঞ্চয় জমা করেছিলেন।

অনিতা বলেন, “আমাদের বয়স হয়েছে। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, ডাক্তার দেখাতে হয়। কে আমাদের এসবের বিল দেবে?”

বারবার কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেও কাজ হচ্ছে না জানিয়ে ক্ষুব্ধ অনিতা বলেন, “আমরা ভিক্ষুক নই। এটা আমাদের টাকা, যেটা ব্যাংকে আটকে গেছে।”

৬০ বছরের কল্যাণী বলেন, “যদি এটা নিরাপদ না হয় তবে কেন এটাকে চলতে দেওয়া হল? আরবিআই কী করছে?”

খেলাপি ঋণ খুঁজে বের করে সেই তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করতে ২০১৬ সালে ভারতে নতুন একটি আইন পাস হয়। তারপরও ব্যাংক খাতে বাজে ঋণের সঙ্কট কমেনি।

আরবিআই বলছে, পিএমসি ব্যাংকের সঙ্কট কাটতে আরো অনেক সময় লাগবে। ব্যাংকটির অবস্থা এতটাই খারাপ যে কেউ সাহায্যের জন্য এখানে বিনিয়োগ করতেও রাজি হচ্ছে না।

বিবিসির প্রতিবেদক লিখেছেন, “পিএমসি ব্যাংকের গ্রাহকদের এই দুর্ভোগ দেখার কেউ কি নেই? রওনকে মৃত্যুর দায় আসলে কার?”