কোভিড-১৯: দ্বিতীয় ঢেউয়ে কেন বিপর্যস্ত ভারত

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-04-21 15:17:49 BdST

করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে প্রবল চাপে পড়েছে ভারত। হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। অক্সিজেনের মজুদ সংকটে বেসামাল রাজধানী দিল্লি।

সংক্রমণ বাড়ার হারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারছে না করোনাভাইসার টিকার উৎপাদন, ফলে অনেক রাজ্যেই কমবেশী থমকে গেছে টিকাদান কর্মসূচি। কেনো এই বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়তে হলো ভারতকে তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে বিবিসি।

তথ্যউপাত্ত তুলে ধরে বিবিসি বলছে, বেশ কিছু রাজ্যে কোভিড-১৯ মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ অনেক বেশি সংক্রামক ও প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দিয়েছে। যদিও ভারতে এখনও পর্যন্ত এই মহামারীতে মৃত্যুহার তুলনামূলক কম।

তবে সংক্রমণের হার অনেক বেড়ে যাওয়ায় দেশটির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নাজুক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে সুরঙ্গের শেষ প্রান্তের আলো তাদের নজরে আসছে না।”

সংক্রমণের হারে হঠাৎ উল্লম্ফন

মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ার যে হার তা অভাবনীয়।

গত বছর ১৮ জুন, ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হিসেবে ১১ হাজার মানুষকে নথিভুক্ত করা হয়। পরের ৬০ দিনে গড়ে দৈনিক ৩৫ হাজার নতুন সংক্রমণের হিসাব যুক্ত হতে থাকে।

দ্বিতীয় ঢেউয়ের একদম শুরুতে এ বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি সেদেশে করোনা সংক্রমিত হিসেবে ১১ হাজার জনকে চিহ্নিত করা হয় আর পরের ৫০ দিনে, দৈনিক সংক্রমিতের সংখ্যা ছিলো গড়ে ২২ হাজার। কিন্তু তারপরের ১০ দিনে হঠাৎ একলাফে তা বেড়ে গড়ে দৈনিক সংক্রমণ পৌঁছায় ৮৯ হাজার ৮০০ জনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হঠাৎ এই উল্লম্ফন থেকে বোঝা যাচ্ছে দেশজুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ অনেক বেশি দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে।

কেরালা রাজ্যের কোভিড-১৯ টাস্কফোর্সের সদস্য ড. এ ফাতাহউদ্দিন বলেন, সংক্রমণের সংখ্যা এভাবে বাড়ার ঘটনাটি পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরের দৈনিক ৯০ হাজার গড় সংক্রমণ থেকে জানুয়ারিতে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা যখন ২০ হাজারের নীচে নেমেছিলো তখন ভারত সরকার তাদের সুরক্ষাবিধি অনেকটাই তুলে দেয়।

ধর্মীয় সমাবেশ, জনসমাগমস্থল খুলে দেওয়া ও জনাকীর্ণ নির্বাচনি সমাবেশ আয়োজন এই উল্লম্ফনের জন্য অনেকটাই দায়ী বলে জানান তিনি। ড. ফতাহউদ্দিন বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে সতর্ক হওয়ার জন্য ইঙ্গিত ছিলো, কিন্তু  আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের কাজটি করতে পারিনি।”

তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারিতে আমি বলেছিলাম কোভিড কোথাও যায়নি এবং জরুরি পদক্ষেপ না নিলে একটি সুনামি আমাদের আঘাত করতে পারে। দুঃখজনকভাবে সুনামি আমাদের আঘাত করেছে।

“স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার এক ভ্রান্তচিন্তা আমাদের পেয়ে বসেছিলো, জনগণ এবং প্রশাসন, কেউ দ্বিতীয় ঢেউ থামানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়নি।”

হাসপাতালে শয্যার ঘাটতি

ভারতের বিভিন্ন শহরে হাপাতালে শয্যার দারুন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর প্রমাণ মিলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাহায্যের জন্য মরিয়া হয়ে জানানো আকুতির বার্তায়। যথাসময়ে চিকিৎসা না মেলায় অনেকেই মারা যাচ্ছেন, এ ধরনের মর্মান্তিক তথ্য উঠে আসছে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে।

বিভিন্ন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ করছেন; কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।

বুধবার পর্যন্ত গত সাত দিন ধরে দেশটিতে গড়ে দৈনিক দুই লাখের বেশি মানুষ মহামারীতে সংক্রমিত হয়েছেন।

দিল্লি, মুম্বাই ও আহমেদাবাদের মতো শহরগুলোতে হাসপাতালে প্রায় কোনো শয্যা ফাঁকা নেই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দিল্লির উপমূখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের মজুদ দিয়ে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে।

অন্যান্য শহরের পরিস্থিতিও খুব আলাদা নয়। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অনন্ত ভান জানান, লক্ষ্ণৌ, ভোপাল, কলকাতার মতো বড় শহরগুলোতেও সংক্রমণ যখন কম ছিলো সেসময়ে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাড়তি অবকাঠামো ও সুবিধা যোগ করার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অনন্ত ভান বলেন, “মহামারীর প্রথম ঢেউ থেকে আমরা শিক্ষা নেইনি। প্রথম ঢেউয়ের সময়েও আমাদের কাছে খবর এসেছিলো হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে এবং যথেষ্ট কারণ ছিলো দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার।”

অক্সিজেন ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের যোগান ও সরবরাহ নিয়ে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতের বিভিন্ন শহরে আইসিইউ সুবিধাও অত্যন্ত সংকটে আছে। অনেক শহরে তাড়াহুড়ো করে সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য হোটেল ও স্টেডিয়ামে অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু আইসিইউ সুবিধা সম্বলিত শয্যা দ্রুত প্রস্তুত করা সহজসাধ্য নয়।

ড. ফাতাহউদ্দিন বলেন, “শুধু শয্যা বাড়ালেই সংকট কাটবে না। এসব শয্যার সঙ্গে অক্সিজেন সুবিধা চাই। অতিরিক্ত আইসিইউ ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের আরও চিকিৎসক ও সেবিকা দরকার।

ভারতের বিভিন্ন এলাকায় মৃত্যুর হার অনেক বেড়ে গেছে। শ্মশানে মরদেহ সৎকারের সংখ্যাও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। তবে এসব মৃত্যুর অনেকগুলোই নথিভুক্ত হচ্ছে না। ফলে করোনাভাইরাসে প্রকৃত প্রাণহানি সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

সংক্রমণ বাড়ায় ভূমিকা রাখছে করোনাভাইরাসের ধরন

গত ২৫ মার্চ ভারতের গবেষকরা ঘোষণা করে যে তারা করোনাভাইরাসের একটি “ডাবল মিউট্যান্ট” ধরন চিহ্নিত করেছেন। বিভিন্ন রাজ্য থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা করে এই রূপের খোঁজ পেয়েছেন তারা।

ভাইরোলজিস্ট শহিদ জামিল ব্যাখ্যা করেন, “ভাইরাসের প্রোটিন কাঠামোতে দ্বিগুণ মিউটেশন ভাইরাসটির সংক্রমণের সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেয় এবং এটা মানবদেহের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ফাঁকি দিতে পারে।”

তিনি বলেন, সংক্রমণের হারে হঠাৎ উল্লম্ফনের পেছনে ভাইরাসের ধরনের এই পরিবর্তনই একমাত্র ‘যৌক্তিক ব্যাখ্যা’। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এখন গবেষণা করে দেখছেন আদৌ একটি দ্বিগুণ মিউটেশন দ্রুত হারে সংক্রমণ বাড়াতে এবং টিকার প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম কিনা।