পছন্দের খবর জেনে নিন সঙ্গে সঙ্গে

আফগানিস্তান: যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তালেবান

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-07-27 17:46:28 BdST

bdnews24

আফগানিস্তানের ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেওয়ার দুই দশকের মধ্যে গত দুই মাসেই তালেবান দেশটির সবচেয়ে বেশি এলাকার দখল নিতে সক্ষম হয়েছে।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাঁড়াশি অভিযানে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল তালেবান; এর পরের ২০ বছরে আফগানিস্তানে কাদের নিয়ন্ত্রণ কতখানি, তার মানচিত্র বারবার বদলেছে।

এখনকার চিত্র বলছে, মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তালেবানদের দাপট বেড়েছে, তারা সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে অনেকগুলো জেলার নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পেরেছে। 

এখন দেশটির বিভিন্ন অংশে বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং গজনি ও ময়দান ওয়ারদাকের মতো মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে তালেবানের শক্ত উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে বলে বিবিসি আফগান বিভাগের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

বিদ্রোহী এ দলটি কুন্দুজ, হেরাত, কান্দাহার ও লস্কর গাহ-র মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোরও কাছে চলে এসেছে। 

বিবিসি মূলত সেসব জেলাকেই তালেবানের নিয়ন্ত্রণে আছে বলছে, যেগুলোর প্রশাসনিক কেন্দ্র, পুলিশ সদরদপ্তর ও অন্য সব সরকারি প্রতিষ্ঠান সশস্ত্র এ গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানো আল কায়েদার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনসহ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠীটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে তালেবান আশ্রয় দিয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় একই বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের নেটো ও আঞ্চলিক মিত্ররা আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে।

পরের দুই দশক ধরে দেশটিতে আন্তর্জাতিক বাহিনীর ধারাবাহিক উপস্থিতি, আফগান সরকারি বাহিনীর জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহায়তা ও প্রশিক্ষণের পরও তালেবানরা সেখানে পুনরায় সংগঠিত হয়ে একের পর এক দুর্গম এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্রমাগতভাবে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে।

দক্ষিণ এবং দক্ষিণপশ্চিম উত্তরের হেলমান্দ, কান্দাহার, উরুজগান ও জাবুল প্রদেশের মতো পুরনো ঘাঁটি অঞ্চলগুলোতেই মূলত তালেবান প্রভাব বিস্তার করে আসছে; এর পাশাপাশি উত্তরপশ্চিমের ফারিয়াবের দক্ষিণাঞ্চলীয় পাহাড় ও উত্তরপূর্বের বাদাকশানের পর্বতেও তাদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী।

২০১৭ সালে বিবিসির এক অনুসন্ধানে সেসময় আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটি জেলা তালেবানের দখলে ছিল বলে উঠে এসেছিল।

দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীটির সক্রিয় উপস্থিতি এবং সপ্তাহ বা মাসের বিরতিতে হামলা চালানোর তথ্যও ওই অনুসন্ধানে মেলে; যাতে বোঝা যায় গোষ্ঠীটির সক্ষমতা সম্পর্কে আগে যে ধারণা করা হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে তাদের সক্ষমতা তার চেয়ে অনেক অনেকগুণ বেশি।

২০০১ সালের পর এখনই তাদের নিয়ন্ত্রণে আফগানিস্তানের সবচেয়ে বেশি এলাকা থাকলেও মাঠের চিত্র কিন্তু একেবারেই সরল নয়।

তালেবান যোদ্ধাদের চাপে টিকতে না পেরে সরকারি বাহিনী বেশকিছু জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়েছে; বাকিগুলো অবশ্য বিদ্রোহীরা লড়াই করেই দখলে নিয়েছে।

এর মধ্যেও যেখানে যেখানে সরকার তার বাহিনীকে পুনর্গঠিত করতে পারছে বা স্থানীয় মিলিশিয়াদের যুক্ত করতে পারছে, সেসব জায়গার কয়েকটিতে তারা হারানো এলাকা পুনর্দখল করতে পেরেছে। কোথাও কোথাও এখনও যুদ্ধ চলছে।

এদিকে জুনেই বেশিরভাগ মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ছাড়লেও, এখনও ক্ষুদ্র একটা অংশ কাবুলে রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীকে গত কয়েকদিন ধরে তালেবানের বিভিন্ন অবস্থানে বিমান হামলা চালাতেও দেখা গেছে।

আফগান সরকার জানিয়েছে, তারা তালেবান হামলার ঝুঁকিতে থাকা সব বড় শহরে অতিরিক্ত সেনা পাঠিয়েছে; তালেবান যোদ্ধারা যেন রাতের আঁধারে শহরে হানা দিতে না পারে, তার জন্য দেশের প্রায় সব অঞ্চলে মাসব্যাপী রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়েছে।

তালেবান যোদ্ধারা হেরাত ও কান্দাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর নিকটে চলে এলেও এখন পর্যন্ত সেগুলোর দখল নিতে পারেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে তারা যেসব ভূখণ্ডের দখল নিয়েছে তা ক্ষমতাকেন্দ্রীক দরকষাকষিতে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করবে এবং কর উত্তোলন বা লুটপাটের মাধ্যমে তাদের আয় বাড়াতে সহায়তা করবে বলে মত অনেক পর্যবেক্ষকের।

চলতি বছরের প্রথম অর্ধেই আফগান সরকারি বাহিনী ও তালেবান বিদ্রোহীদের লড়াইয়ে রেকর্ড সংখ্যক বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নিহত এক হাজার ৬০০ জনের বেশিরভাগই তালেবান ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর হাতে হয়েছে বলে অভিযোগ জাতিসংঘের।

সংঘাতের কারণে এ বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ আফগান বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে বাদাকশান, কুন্দুজ, বাল্খ বাগলান ও তাখারের মতো যেসব প্রদেশের ব্যাপক অংশ তালেবানের নিয়ন্ত্রণে সেসব প্রদেশের অসংখ্য মানুষ দেশের ভেতরেই অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন।

এদের মধ্যে কেউ কেউ গ্রামে বা আশপাশের জেলাগুলোতে পালিয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর নিজের বাড়িতে ফিরলেও অনেকে দীর্ঘ সময় ধরে উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছেন।

তালেবানের অগ্রগতির কারণে আফগান শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, এমনকী সরকারি বাহিনীর অনেক সদস্য সীমান্ত টপকে তাজিকিস্তানে আশ্রয় নিচ্ছে বলে ফ্রান্সভিত্তিক একটি বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

তালেবান যোদ্ধারা সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে ঢোকার প্রবেশপথ স্পিন বোলডাকসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিংয়েরও দখল নিয়েছে।

এসব ক্রসিং দিয়ে যেসব পণ্য আফগানিস্তানে প্রবেশ করে তার শুল্ক এখন তালেবানদের হাতে যাচ্ছে, যদিও ওই ক্রসিংগুলো দিয়ে এখন ঠিক কী পরিমাণ পণ্য পারাপার হচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তালেবান ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওইসব ক্রসিং দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ অনেক কমে এসেছিল।

আমদানি-রপ্তানিতে এ বিঘ্ন আফগানিস্তানের বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিশেষ করে জ্বালানি এবং খাদ্যদ্রব্যের বাজারেও প্রভাব ফেলছে।