১১০ কোটি টাকার বাড়িওয়ালাকে দেখছে না দুদক: ফখরুল

  • জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-20 21:43:50 BdST

bdnews24

বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে ইঙ্গিত করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, যিনি ১১০ কোটি টাকার বাড়ি বানিয়েছেন, শত শত কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন তাকে দেখতে পায় না দুদক।

সেখানে জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছেন তিনি।

২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি আবদুল হাই বাচ্চু। আর তখনই ব্যাংকটির দিলকুশা, গুলশান ও শান্তিনগর শাখা থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকা উত্তোলন ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটে।

বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে ১১০ কোটি টাকা দিয়ে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট বাজার এলাকার শহীদ সরণিতে দেড় বিঘা জমির ওপর একটি বাড়ি কিনেছিলেন বলে দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, শেখ আবদুল হাই একক কর্তৃত্বে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিলেন। সেই ঋণের একটি বড় অংশ ‘ঘুষ হিসেবে’ নিয়েছেন তিনি। সেই টাকা দিয়েই কেনা হয়েছে এই বাড়ি।

“এত বড় বাড়ি কেনার জন্য আবদুল হাই এত টাকা কোথায় পেলেন- বাংলাদেশ ব্যাংক তার উৎস অনুসন্ধান করে সাত বছর আগেই একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। দুর্নীতির দায়ে অনেকের সম্পত্তি জব্দ করলেও আবদুল হাইয়ের এ সম্পত্তি জব্দের ব্যাপারে দুদক কিছুই করেনি। তার বিষয়ে তদন্ত ও মামলা করার জন্য আদালতের দেওয়া সময়সীমা কয়েকবার পার করে দুদক এখন চুপচাপ আছে।”

বৃহস্পতিবার এক আলোচনা সভায় বক্তব্যে এই প্রসঙ্গে কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল।

তিনি বলেন, “আজকে অর্থনীতি প্রায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলা যায়। দুর্নীতির এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যেখানে আজকে পত্রিকা খুললেই দেখবেন যে, ১১০ কোটি টাকা দিয়ে ব্যাসিক ব্যাংকের এক চেয়ারম্যান বাড়ি কিনেছেন। আজকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিচার হয়, সাজা হয় ২ কোটি টাকার একটা মিথ্যা মামলার জন্য।

আবদুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে ‘ঘুষের’ ১১০ কোটি টাকা দিয়ে ঢাকায় বাড়ি কিনেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে

আবদুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে ‘ঘুষের’ ১১০ কোটি টাকা দিয়ে ঢাকায় বাড়ি কিনেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে

“অথচ যিনি ১১০ কোটি টাকার বাড়ি বানিয়েছেন, শত শত কোটি টাকা যিনি লুটপাট করে নিয়েছেন তাকে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক দেখতে পায় না, এখন পর্যন্ত তাকে একটা নোটিশ পর্যন্ত করা হয়নি। এই হচ্ছে এদেশের অবস্থা।”

দেশকে ‘পরনির্ভরশীল রাখতে’ সুপরিকল্পিতভাবে অর্থনীতি ‘ধ্বংস করা হচ্ছে’ বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বুধবার গাজীপুরে পুলিশ হেফাজতে এক নারীর মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশে ‘ত্রাস ও ভয়ের’ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ধরবার জন্যে তার বাড়ি থেকে তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে এসেছে, ৪০ বছর তার বয়স। তুলে নিয়ে এসে তাকে থানার মধ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।

“এ রকম ঘটনা আমরা আগে কখনও শুনতে পাইনি। এখন এই সরকারের আমলে সেগুলো দেখছি যে, এখানে নারীদের কোনো সম্মান নেই, এখানে মানুষের কোনো সম্মান নেই, এখানে জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। আজকে চতুর্দিকে এ রকম ভয়াবহ একটা পরিস্থিতি, ত্রাসের পরিস্থিতি, ভয়ের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে।”

সরকারের পররাষ্ট্র নীতির সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “আজকে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে একটা নতজানু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে পারে না, আমাদের পানি সমস্যার সমাধান হয় না। আমাদের সীমান্তে মানুষ হত্যা করা হয়, তার কোনো বিচার হয় না এবং একটা কথা বলতে পর্যন্ত সাহস পায় না। এই একটা অবস্থায় নিয়ে এসছে দেশকে।”

এই ‘সংকট’ শুধু বিএনপির নয়, পুরো জাতির সংকট বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল।

“সমগ্র জাতি আজকে পরাধীন হয়ে যাচ্ছে, সমগ্র জাতি আজকে তাদের অর্জনগুলোকে হারাচ্ছে। তাই আমাদের সকলকে উঠে দাঁড়াতে হবে, উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে হবে, সোচ্চার হতে হবে, রাস্তায় দাঁড়াতে হবে এবং আমাদের সমস্ত অর্জনগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে,” বলেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে ‘মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস’র এই আলোচনা সভায় ভাষা শহীদদের স্মরণ করে আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া ও ‘গণতন্ত্র’ মুক্ত করার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান ফখরুল।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবিতে যে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, তার চেতনাকে ধারণ করে সবাইকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

খালেদার জামিনের বিষয়ে আশাবাদী মওদুদ

খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনে নতুন ‘গ্রাউন্ড’ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে এবার সফল হওয়ার আশা করছেন তার আইনজীবী ও বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ।

আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “আমরা বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য দরখাস্ত করেছি। জজ সাহেব বললেন, এটা তো আমরা আগেই দেখেছি আবার কেন আনলেন? আমরা বললাম যে, উনার (খালেদা জিয়া) যে গত দুই মাসে কত অবনতি হয়েছে সেটা আপনাদের দৃষ্টিতে আনা দরকার এবং এখন তার অবস্থা অনেক খারাপ। দুই মাস আগে আপনি রিফিউজ করেছেন, আপনি দেননি জামিন। আমরা এখন নতুন গ্রাউন্ড নিয়ে এসছি, আমরা শুনানি করতে চাই।”

“আমরা বলেছি, আপনি আমাদের এটা শুনেন, এটাতে আপনি নতুন গ্রাউন্ড পাবেন।”

সুপ্রিম কোর্ট একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে খালেদা জিয়াকে জামিন দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

“আর যদি না দেন, আন্দোলন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নাই আমাদের কাছে। তখন আমাদেরকে বাধ্য করা হবে একটা কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে।”

বর্তমান সরকারকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী বলেন, “তার (খালেদা জিয়া) স্বাস্থ্যগত অবস্থার এমন অবনতি ঘটেছে, এটা একটা অমানবিক সরকার। অনেক ফ্যাসিস্ট সরকার আছে, অনেক কর্তৃত্ববাদ সরকার আছে যারা এতটা অমানবিক না। অন্তত মানবতাবোধ অনেক সরকার দেখিয়েছে, অতীতে আমরা দেখেছি।

“এই সরকার একেবারে মানবতাবিহীন একটি সরকার। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো কিছুতে তারা বিশ্বাস করে না। প্রত্যেকটা জিনিস তারা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছেন এবং একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে… এখানে মিডিয়া ভাইয়েরা আছেন আপনারাও জানেন, কী রকমের কন্ট্রোল, নিয়ন্ত্রণ যাকে বলে, নানাভাবে এই নিয়ন্ত্রণ হয়, সেই নিয়ন্ত্রণ এখন বাংলাদেশে চলছে।”  

আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ‘সম্পূর্ণভাবে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে’ বলেও মন্তব্য করেন মওদুদ আহমদ।

বিএনপি মহাসচিবের সভাপতিত্বে এবং প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সহ-প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিমের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবউদ্দিন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, তাঁতী দলের আবুল কালাম আজাদ, মৎস্যজীবী দলের আবদুর রহিম, যুব দলের গোলাম মাওলা শাহিন, ছাত্র দলের ফজলুর রহমান খোকন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি নিয়ে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম।

অনুষ্ঠানে শিরিন সুলতানা, সেলিম ‍ভুঁইয়া, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, মাহবুবুল আলম নান্নু, সেলিমুজ্জামান সেলিম, অমলেন্দু দাস অপু, আমিরুজ্জামান শিমুল, বিলকিস ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমীন, জেড এম মুতর্জা চৌধুরী তুলা, রফিক শিকদার, খন্দকার মারুফ হোসেন নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।