পাটকলে লোকসানের জন্য কার শাস্তি হয়েছে, প্রশ্ন বাম জোটের

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-07-07 01:46:16 BdST

bdnews24

পাটকলগুলোতে লোকসানের জন্য যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত না করে কারখানা বন্ধ করে শ্রমিকদের বেকার করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার ‘পাট শিল্পের ভবিষ্যৎ ও করণীয়’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল মতবিনিময় সভা করে বাম দলগুলো।

সভায় তেল-গ্যাস সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ বলেন, পাট শিল্পে লোকসানের ‘প্রধান দায়’ অর্থ মন্ত্রণালয়,পাট মন্ত্রণালয় ও  বিজেএমসির।

“পাট কেনার মৌসুমে পাটকলগুলো পাট কেনার জন্য টাকাটা পায় না। না পাওয়ার কাঁচা পাট কিনে,যাতে বড় ক্ষতি হয়। একই ঘটনা যখন বারবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পরও ঘটতে থাকে, তখন বুঝতে হবে এটা ভুল বা দুর্ঘটনা না, এটা আসলে সিদ্ধান্ত। তারা ইচ্ছা করেই এটা করে, যাতে পাটকলের লোকসানটাই প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়।

“পাটখাতে লোকসানের জন্য কজন মন্ত্রীর শাস্তি হয়েছে? কজন আমলার শাস্তি হয়েছে?  বিজেএমসির কয় কর্মকর্তার শাস্তি হয়েছে? মন্ত্রী, আমলা, কনসালটেন্ট, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার ছিল।”

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “সরকারের ছত্রছায়ায় আজকে পাট কেনা, দাম নির্ধারণ ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রে যে বিপুল পরিমাণ দুর্নীতি হয়, সেটা বন্ধ করা উচিৎ।

“আমাদের একটা মাথাভারী প্রশাসন ….শ্বেতহস্তি পোষা হচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকা সেখানে অপচয় হয়ে যাচ্ছে। এটা আগে থেকে বন্ধ করা উচিৎ ছিল।

তিনি বলেন, “তারা বলছে, জুট সেক্টর লোকসানে চলছে, আধুনিকায়ন করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছি। এত দিন নেন নাই কেন? হাজার হাজার কোটি টাকা আপনার আমলারা পাচার করে দিল, সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন না কেন?

“যদি আধুনিকায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধি আপনার লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে অপচয় দূর করার জন্য অনেক আগেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ ছিল।”

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল ও পাটকল আধুনিকায়নের দাবিতে বিক্ষোভে বাম গণতান্ত্রিক জোট। (ফাইল ছবি)

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল ও পাটকল আধুনিকায়নের দাবিতে বিক্ষোভে বাম গণতান্ত্রিক জোট। (ফাইল ছবি)

শ্রমিকদের উদ্দেশে সিপিবি সভাপতি বলেন, “অতীতের ঘটনাবলী দেখেছি, আদমজীর সময়ে….  এ ব্যুরোক্রেসি …এই বিশ্ব ব্যাংক …. তারা বলেছিল… আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না। “তারপর এটা (পাওনা) আদায় করার জন্য মাসের পর মাস, বছরের পর বছর লেগেছে। আপনাদের ঠকায়ে সমস্ত কিছু লুটপাট করার জন্য এটা করা হয়েছে। সুতরাং ফাঁদে পড়বেন না।”

বিজেএমসিকে পুনর্গঠনের প্রস্তাবনার পাশাপাশি ১২০০ কোটি টাকা খরচ করে সরকারি পাটকলগুলো আধুনিকায়নের প্রস্তাবও দেন তিনি।

হুট করে পাটকল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, “করোনা পরবর্তীকালে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে দাঁড় করাতে গেলে, অভ্যন্তরীণ  যে চাহিদা ও জনগণের কর্মসংস্থানসহ সবকিছু মিলে সেখানে যে বিষয়ের উপর গুরুত্ব বেশি দেওয়া দরকার, কার্যক্রম যেটা জরুরি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ পরিপন্থি  এ কার্যক্রম।

“আমরা যদি নির্বাক হয়ে থাকি, এভাবে চলতে দিলে করোনা পরবর্তী কালে প্রাণহানি হবে না খেয়ে, বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে বাধ্য হবে অনেকে।”

অর্থনীতির অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, “সরকারের লক্ষ্যটা হচ্ছে দেশি-বিদেশি কিছু দাতা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া। যে জমিগুলোর মধ্যে পাট শিল্প বিকশিত হতে পারত, সে জমির দিকে যাদের দৃষ্টি, তাদের স্বার্থ রক্ষা করা সরকারের কাজ।

“রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর জমিতেই পাটশিল্পের সম্প্রসারণ, নবায়ন সম্ভব ছিল, নতুন কর্মসংস্থান সম্ভব ছিল। বিজ্ঞানের গবেষণা থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন পাট নতুন নতুন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, তখন পরিবেশবান্ধব শিল্প না করে পরিবেশ বিধ্বংসী শিল্পের দিকে গিয়ে বাংলাদেশকে মহাবিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।”

সরকার বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)  কথা শুনে পাটকলগুলো বন্ধ করেছে বলে মনে করেন তিনি।

সরকার বলছে, উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করে সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্বে (পিপিপির) পরিচালনা করবে।

এনিয়ে আনু মুহম্মদ বলেন, “বেসরকারি পাটকলে শ্রমিক নিয়োগ না করে দিনমজুর নিয়োগ করে। অনেক কারখানাতে দৈনিক ভিত্তিতে মজুরি দেয় .. তারা কি দিনমজুর হয়ে যাবে?

“তাদের যে এত দিনের দক্ষতা, এটা তো একটা জাতীয় সম্পদ। সে সম্পদ ব্যবহার করাই তো একটা দেশের বা কর্তৃপক্ষের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিৎ। এমনকি কেউ যদি একটা পুঁজিবাদী পথেও একটা অর্থনীতিতে বিকশিত করতে চায়, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিকের যে কর্মদক্ষতা, সেটা ব্যবহার করার দিকেই তার নজর থাকবে।”

সভা সঞ্চালনা করেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ। আলোচনায় যুক্ত হয়েছিলেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি সহিদুল্লাহ চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, বাসদ নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।