১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

প্রবাসের চিঠি: রান্না শুরুর করুণ গল্প

  • মাহবুব মানিক, জার্মানি থেকে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2017-11-06 13:07:38 BdST

bdnews24

তখন আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন সকালবেলা খুব পরোটা খেতে ইচ্ছা করলো।

মাকে ডেকে মনের ইচ্ছাটা বললাম। মা সাথে সাথে একটা বকা দিলেন। কারণ ততোক্ষণে মা ভাত আর আলু ভাজি জাতীয় কিছু একটা রান্না করে ফেলেছেন। এদিকে পরোটা খাওয়ার জন্য প্রাণটা উশখুশ করছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁতও মাজিনি। সেদিকে আমার খেয়াল নাই। পরোটা খেতেই হবে, এটাই মনে হচ্ছিলো শুধু। অগত্যা নিজেই চলে গেলাম রান্নাঘরে।

আসলে, পরোটা খাওয়ার থেকে বেশি রোমাঞ্চিত ছিলাম পরোটা বানানোর কৌশলটা নিয়ে। কারণ, আগের দিন একটা খাবার হোটেলের সামনে প্রায় আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে পরোটা বানানোর কৌশলটা রপ্ত করেছিলাম।

ওই হোটেলের পরোটা বানানোর পদ্ধতির সাথে মায়ের পরোটা বানানোর পদ্ধতিগত অনেক পার্থক্য দেখেছিলাম। দোকানের পরোটা গোল আর মায়ের পরোটা চারকোণা। তবে মা প্রথমে গোল করে বেলে তার উপর তেল মাখিয়ে চারকোণা ভাজ করে আবার বেলে চারকোণা কাঠামো দেন। মায়ের পরোটা সৃজনশীলতায় পরিপূর্ণ, কিন্তু দোকানেরটা শুধুই পেশাগত।

মাকে দেখেছি, পরোটা ভাজতেন গোল কড়াইয়ের মধ্যে। ব্যাপারটাতে আমার ঘোর আপত্তি ছিলো। কারণ, খাবার হোটেলগুলোতে দেখতাম, পরোটা ভাজা হতো সমতল বড় একটা তাওয়ায়। মাকে অনেক বুঝিয়েছি, কিন্তু মা আমার যুক্তি পাতলা পলিথিনে ফু দেওয়ার মতো উড়িয়ে দিতেন। মায়ের রান্নাঘরে একটা তাওয়া ছিলো। যদিও সেটা খুব প্রশস্ত ছিলো না। মা সেটা দিয়ে শুধু রুটি সেঁকার কাজ করতেন।

জীবনে এটাই ছিলো প্রথমবারের মতো রান্নাঘরে ডিম ভাজি বাদে অন্যকিছু একটা বানানো। অ্যালুমিনিয়ামের (মা বলতেন সিলভারের গামলা) গামলাতে আটা মাখিয়ে গোল্লা বানাতে শুরু করলাম। আটা তো নয়, যেন আঠা! আঙ্গুলের ফাঁকে ও হাতের তালুতেই সবটা লেগে বসে আছে। সেদিন বুঝেছিলাম, আমাদের বিদ্রোহী কবি কী কষ্ট করেই না জীবিকা নির্বাহ করতেন!

অনেক কষ্টে হাত থেকে ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে গোল্লাটা বানিয়েছি। গোল্লাটা বেশ শক্ত পোক্তও হয়েছে। তখনই ছোট আপা পেছন থেকে বললো, “দে ভাই, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।” আমি তখন মনে মনে হিসাব করতে লাগলাম। যে আটা মাখিয়েছি, তাতে পরোটা হবে বড়জোর চারটা। ওকে যদি হাত লাগাতে দেই, নির্ঘাত দুইটা ও খেয়ে নেবে। নাহ, এইট মানা সম্ভব না!

সামান্য পরোটাই তো, বানানো কঠিন কিছু না। আমি নিজেই পারবো। যোগ-বিয়োগ-গুণ বাদ দিয়ে ভাগটাই পছন্দ হলো। এই ভাগ আসলে পরোটা ভাগাভাগি নয়, ওকেই ভাগিয়ে দেওয়া। যা ভাগ! ভাগ নিতে আসছে!

শেষমেষ কোনোরকমে পরোটার একটা কাঠামো দাঁড় করালাম। যদিও রুটি বানানো অনেক বেশি কঠিন। কারণ পূর্ণিমার চাঁদের মত গোল আকার দেওয়া খুবই অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার ব্যাপার। অভিজ্ঞরা ছাড়া গোল সাইজ করতে সহজে কেউ পারে না।

দোকানের পরোটা যেহেতু চাঁদের মতো গোল, তাই আমার পরোটাও গোল বানানোর আপ্রাণ চেষ্টা ছিলো। তবে আমারটা গোল না হলেও অনেকটা শ্রীলংকার মানচিত্রের মতো মনে হচ্ছিলো।

তাওয়ার তেল ততোক্ষণে গরমে তেতিয়ে উঠেছে। গরম বাষ্প ওঠা তেলের কাছে যেতেও ভয় লাগছিলো। পরোটাটা কোনোরকমে দূর থেকেই ছুড়ে মারলাম। আমার বাম হাতের টিপ আবার ছোটবেলা থেকেই প্রশংসনীয়। পঞ্চাশ মিটার দূর থেকেও টিপ করে বড় ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার রেকর্ড আমার আছে। সুতরাং পরোটা সঠিক জায়গাতে ফেলতে কোনো ভুল হলো না।

কিন্তু তাওয়ার উপর পরোটার আকস্মিক চাপে পরোটার তলা থেকে ফুটন্ত গরম তেলের খানিকটা ছুটে এসে আমার বাম পায়ের পাতার উপর পড়লো। আমি ভয় পেয়ে ছুটে চলে গেলাম মায়ের কাছে। তখনও জায়গাটাতে জ্বলন শুরু হয়নি।

ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের কাছে আমি মোটামুটি মাপের একটা মিথ্যার জাহাজ না হলেও ছোটখাটো ডিঙ্গি নৌকা বলা চলে। মা-বাবাকে ইমোশনাল করে দেওয়ার জন্য বানিয়ে বানিয়ে সব সময় মিথ্যা বলতাম।

সেদিন আমার অবস্থা হয়েছিলো সেই গল্পের মিথ্যাবাদী রাখালের মতো। আব্বা তখন অফিসে। মা দেখলাম ফ্যান চালিয়ে চুপ করে শুয়ে আছেন। মাকে গিয়ে বললাম, “মা, তেলে আমার পা পুড়ে গেছে।”

মা কিছুক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে আবার যেভাবে ছিলো সেভাবেই শুয়ে রইলেন। এবার চামড়ার ভেতর থেকে পোড়া জায়গাটা হঠাৎ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। মা লাফিয়ে উঠলেন, এমনকি আশেপাশে যে যেখানে ছিলো সবাই ছুটে এলো।

দগদগে পোড়া ক্ষত নিয়ে বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে অষ্টম শ্রেণিতে উঠে গেলাম, তাও ক্ষত সারে না। সে পোড়া ক্ষত সারতে আমার টানা দুই মাস লেগেছিলো। ক্ষত চিহ্নটা এখন পায়ে স্থায়ী ট্যাটুর মতো রয়ে গেছে। একদিক দিয়ে বেশ ভালোই হয়েছে। যখন কোথাও সনাক্তকারী চিহ্ন দিতে বলা হয়, নিশ্চিন্তে বাম পা এগিয়ে দেখিয়ে দেই।

সেদিনের পর থেকে রান্নাঘরে যাবার দুঃসাহস আমার হয়ে উঠেনি। যখন দেশ ছাড়লাম, তখন একটাই দুঃশ্চিন্তা ছিলো। কী রান্না করবো, কী খাবো! প্রথম কয়েকটি দিন ডিম ভাজি করেই খেয়েছি। আমার অবস্থা সেই ঘর পোড়া গরুর মতো, যে সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ভয় পায়।

ডিম ভাজি করতে গিয়েও আমার লেজে-গোবরে অবস্থা! গরম তেলে ডিম ঠাস ঠাস শব্দ হতো, মাঝে মাঝে ফুস করে উঠতো। ফুটন্ত তেলে পানির ছিটা পড়লে যে বিস্ফোরণটা হয়, সেটা আমার কাছে আণবিক বিস্ফোরণের মতোই লাগে।

না জানি আলীবাবা গল্পের চল্লিশ চোর কী পরিমাণ যন্ত্রণা সহ্য করে মরেছে! চুলার কাছে দাঁড়িয়ে হাতের খুন্তি মনে হতো তলোয়ার, আর ফ্রাই প্যানের ঢাকনা হতো ঢাল আর আমি আধুনিক শহরের গ্লাডিয়েটর!

ছোটবেলা থেকেই বাম হাতে লেখালিখি থেকে শুরু করে আঁকিবুকি- সব কিছুতেই মোটামুটি দক্ষতা ছিলো আমার। প্রতিভা ছিলো অনেকটা ছাইচাঁপা আগুনের মতো। কেউ ফুঁ দিলেই উপর থেকে ছাই উড়ে যেতো, আর আমি আগুনের ফুলকি হয়ে জ্বলতাম। দুর্ভাগ্য আমার, ফুঁ দেওয়ার জন্য একটা মানুষও এগিয়ে আসেনি!

অনেক আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পের রোমান্টিকতা আর  হুমায়ুন আহমেদের গল্পের চরিত্রগুলোর বাচনভঙ্গি আমাকে মুগ্ধ করতো। রবীন্দ্রনাথের মতো একজন বুড়ো মানুষ কেমন করে এত রোমান্টিক হতে পারে, এটা নিয়ে ঢের গবেষণা করেছি। প্রবাসে এসে বুঝেছি, মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্তের বুকের ক্ষত কতোটা যন্ত্রণাদায়ক ছিলো। দেশের প্রতি ভালোবাসা যে কতোটা প্রখর হতে পারে, সেটা দেশ না ছাড়লে বোঝা মুশকিল। 

দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকতে ইঁচড়ে পাকা ধরনের একটা রোমান্টিক গানও লিখেছিলাম। “আকাশটা কি মেঘাচ্ছন্ন ছিলো, তুমি কেনো আসলে না.....।” গান লেখা খসড়া কাগজটা পড়লো গিয়ে মাথা-ফাটিয়ে দেওয়া বড় ভাইয়ের হাতে! সে আমার ছাই চাঁপা আগুনের ছাই না ফেলে উল্টো ঘপাঘপ করে এক বদনা পানি ঢেলে দিলো!

আমাকে সামনে পেলেই বড় ভাই চোখ-মুখ বিকৃত করে ওই গান শোনাতো। শুধু নিজে শুনিয়েই ক্ষান্ত হতো না, তার যত বন্ধু-বান্ধব, চ্যালা-চামুণ্ডা আছে, সবাই মিলে কোরাস গাওয়া শুরু করতো। তাদের হাতে অন্য কোনো ইস্যু না আসা পর্যন্ত কয়েকটা দিন কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচেছিলাম।

আঠারো বছর আগের সেই রোমান্টিক গানের ইস্যু তারা আজও ভোলেনি। আমার বউয়ের কানেও পৌঁছে গেছে গানের লিরিক। সে এখন কোনো ইস্যু খুঁজে না পেলেই ওই গান শোনায়।

আমার রান্নার গল্পেই ফিরে আসি। এত প্রতিভা নিয়ে সামান্য রান্নায় ক্ষান্তি দেই কেমন করে! আমার ছাই চাঁপা আগুনে রান্নার পাতিল বসিয়ে রান্না শুরু করে দিলাম। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ, শহর, বন্দর-নগর যেখানে যত রকমের পরিচিত খাবার পাওয়া যায়, তার প্রায় সবগুলোই আমি বানিয়েছি।

শনিবার ও রোববার ছুটির দু’টো দিন ছিল আমার রান্নার দিন। আলু সিঙ্গাড়া, কলিজা সিঙ্গাড়া, লুচি, ডাল পুরি, পরোটা, আলুর দম, চটপটি, ফুচকা, মোগলাই পরোটা, রসগোল্লা, কালোজাম, নিমকি, খোরমা, জিলাপি থেকে শুরু করে বোরহানি, বিরিয়ানি, তেহারি, ফ্রাইড রাইস (বাসি ভাত ভাজি), কেক, পুডিং, গাজরের হালুয়া, সুজি বরফি, নারকেল বরফি, রোস্ট, মাছের ঝোল, মাছের ফ্রাই, ডিমের কোর্মা, মাংস ভূনা, ঝাল মাংস ইত্যাদি সবই রেঁধেছি।

তপ্ত গরম তেল এখন বডি লোশন মনে হয়। পেঁয়াজের ঝাঁজ এখন আমার চোখের পানি বের করতে পারে না। উল্টো পেঁয়াজের পানি বের করে ছেড়ে দেই ব্লেন্ডার দিয়ে। আমার রান্নায় আমি একজন স্বঘোষিত বিজেতা।

 

লেখক: মাহবুব মানিক, বৈজ্ঞানিক গবেষক, মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সাইন্স, জার্মানি

এই লেখকের আরও লেখা

প্রবাসের চিঠি: জার্মান জীবনে শিষ্টাচার

জার্মানির প্রাচীন বৃক্ষ-বাগানের ইতিকথা

 অচল পয়সার বাজার ও চকলেট প্রথা

কাপড়ের ভাঁজে যেখানে বাংলাদেশ লেখা

প্রবাসের চিঠি: প্রিয় অসৎ মানুষেরা!

না ফেরার দেশে প্রিয় বাবার স্মৃতি

প্রবাসীর স্মৃতিকথা: স্কুলের ডং ডং ঘণ্টা ও টিফিন

মায়ের কাছে জার্মান প্রবাসীর খোলা চিঠি

চিকিৎসা সেবার এপার-ওপার

যত দূরে থাকে প্রিয়া, ততো কাছে রাখে তারে হিয়া

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!