২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

চার্লস নদীতে ড্রাগনবোট ফেস্টিভাল

  • গৌরব দাশ নয়ন, যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-06-16 15:15:38 BdST

bdnews24

৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনে অনুষ্ঠিত হলো ‘৪০তম ড্রাগনবোট ফেস্টিভাল’। ব্যস্ত মার্কিন শহরতলীর বুক চিরে বয়ে চলা চার্লস নদীতে অনুষ্ঠিত এ ‘নৌকাবাইচ’ এর শেকড় কিন্তু আসলে চীন দেশে।

শহর যুক্তরাষ্ট্রের আর উৎসব চীনা হলেও লোকে লোকারণ্য এই মিলনমেলায় দেখা গেল বোস্টন ও আশপাশের অঙ্গরাজ্যে বাস করা বিশ্বের প্রতি কোণার মানুষজনদেরই। প্রতি বছর মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুনের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিত হয় এই ‘বোস্টন ড্রাগনবোট ফেস্টিভাল’, অনেকে বলেন ‘বোস্টন-হংকং ড্রাগন বোট ফেস্টিভাল’।

চার্লস নদী বোস্টন শহরের যতটুকু ধরে প্রবাহিত, তার সিংহভাগ জুড়েই এই প্রতিযোগিতা চলে, দেখাও যায় দুই পার থেকে। তবে সবচেয়ে ভালো দেখা যায় রিভারসাইড-ওয়েস্টার্ন অ্যাভিনিউ এর পাশে অবস্থিত নদীর উপরের দুটি ব্রিজ থেকে এবং সেখানেই অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চ ও দুই ধারে মেলার মতো, বলাই বাহুল্য যে লোকে লোকারণ্য।

এই চীনা নৌকাবাইচের সময় সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। বেলা ১১টার দিকে গিয়ে দেখা গেল, ব্রিজের উপর উৎসাহী মানুষের ভিড়, নদীর দুই ধারে সারি সারি তাঁবু। তবে নদীর বুকে ছোট দুই একটা ওয়াচ স্টিমার ছাড়া আর কিছু দেখলাম না!

প্রতিযোগিতা শেষ কিনা সে চিন্তা নিয়ে ব্রিজ পার হয়ে কিনারার দিকে গেলাম যেখানে বিভিন্ন রঙের তাঁবু, লোকজনের উৎসাহী চাহনি নদীর দিকে, কেউ কেউ ঘুরে ঘুরে দেখছে ছোট ছোট দোকানপাট, যার বেশির ভাগই প্রতিযোগী বোটার বা প্রচারণামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির। এটা দেখে ‘রথ দেখা আর কলা বেচা’ প্রবাদটির আধুনিক রূপ মনে হলো, ‘নৌকাবাইচ দেখা আর ইন্স্যুরেন্স বেচা!’

কিনারার বিভিন্ন ফুড স্টল আর আশু প্রতিযোগিদের কসরত দেখতে দেখতে চোখ পড়ল আরেক ব্রিজের ধারে বড় একটি প্যান্ডেলে যেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে বলে মনে হলো। তবে এরই মধ্যে লোকজন হুমড়ি খেয়ে ধেয়ে গেলো নদীর দিকে, গগনবিদারী ড্রামের আওয়াজ ভেসে এলো। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দৃশ্যমান হলো ড্রাগনের মাথা আর লেজওয়ালা কয়েকটি নৌকা।

দুই সারি করে বসা প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন লোক বাইছে ড্রাগনরূপী নৌকা আর তাদের সামনে বসা একজন সজোরে ড্রাম বাজিয়ে যাচ্ছে। ছেলে-মেয়ে, যুবক-বৃদ্ধ সবার সমন্বয়ে প্রতিটি দল গঠিত। কতক্ষণ পর দেখতে পেলাম এক নৌকায় প্রতিযোগিরা উঠছে, লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম তাদের মধ্যে একজন ক্যাপ্টেন, একজন ড্রামার আর বাকিরা সাধারণ বোটার।

এখানে প্রতিযোগিতারও তেমন বালাই নেই বোঝা গেল। তবে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে যখনই শুরু করুক, যে কম সময়ে নদী চক্কর দিয়ে আসতে পারে সে-ই জেতে। এখানে শৌখিনদের চেয়ে পেশাগত ক্লাবগুলোই বেশি অংশ নেয়, শুধু এই স্টেটের নয় পাশাপাশি অনেক স্টেটের।

ড্রাগনের আধিক্য দেখে সহজেই অনুমেয় ছিল এটি চীনা কোনো অনুষ্ঠান। তবে এর মূল কাহিনী জানতে খুব ইচ্ছা জাগে মনে। নদীতে অনেকক্ষণ ধরে যখন নৌকা নেই, লোকেরা কড়া রোদ থেকে বাঁচতে গাছের ছায়ার দিকে অগ্রসর হলো। এক গাছের নিচে জিরোতে দেখলাম এক চীনা বৃদ্ধকে। তার হাসি মুখ দেখে অভিবাদন জানিয়ে এই ড্রাগনবোট ফেস্টিভালের নেপথ্য কাহিনী জানতে চাইলে তিনি উৎসাহী হয়ে যে কাহিনী জানালেন তা সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরলাম।

এই প্রতিযোগিতাটি প্রায় দুই হাজার বছর আগে জন্ম নেওয়া দেশপ্রেমিক চীনা লেখক ও দার্শনিক কু ইউয়ানের জীবন ও কর্মের প্রতি উৎসর্গ করে করা হয়। চীন দেশে হাজার বছর ধরে এই নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা কালক্রমে চীনা প্রবাসী ও অভিবাসীদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে।

কু ইউয়ান প্রাচীন চীনের চু প্রদেশের অধিবাসী ছিলেন। দেশপ্রেমিক এই কবি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। রাজার বিভিন্ন আইনের সমালোচনা করে শাসকদের বিরাগভাজন হয়ে একসময় দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। চীনা উপকথা অনুসারে, নির্বাসিত থাকাকালে যখন জানতে পারেন তার দেশ আক্রান্ত, তখন সহ্য করতে না পেরে মি লু নদে আত্মত্যাগ করেন তিনি।

তার আত্মত্যাগের কথা শুনে হাজারে হাজারে ভক্ত আর অনুরাগীরা সেই নদের দিকে ছুটে গেল। তখন থেকেই কু ইউয়ানের প্রতি উৎসর্গ করে এই ঐতিহাসিক ড্রাগনবোট ফেস্টিভ্যালের শুরু।

ভাঙা ইংরেজিতে কাহিনীটি বলতে বলতে বৃদ্ধের চোখ যেন ছলছল করে উঠল। তিনি জানালেন পাশের বড় মঞ্চে চৈনিক নাচ গানের পাশাপাশি কু ইউয়ানের জীবনী মঞ্চস্থ করা হবে। সত্যিই, রাজার সম্মান শুধু তার দেশেই, বহুলাংশে তার জীবনকালেই আর একজন প্রকৃত গুণীর সম্মান সর্বত্র সবসময়।

লেখক: গণস্বাস্থ্য গবেষক ও কৃষিবিদ, এমপিএইচ, সেইন্ট জন’স ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

এই লেখকের আরও লেখা

বোস্টনের হে মার্কেট: এক টুকরো কাঁচাবাজার

মনোমুগ্ধকর নায়াগ্রা জলপ্রপাতে

ছয় হাজার ফুট উঁচুতে মাউন্ট ওয়াশিংটনের চূড়ায়

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রতীক ‘লিবার্টি বেল’

বোস্টনে বিরল সাদা কাঠবিড়ালির দেখা