সিঙ্গাপুরে প্রবাসীর সততার গল্প

  • ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-11-19 10:28:17 BdST

সিঙ্গাপুরে সততার পরিচয় দিয়ে আলোচনায় এসেছেন প্রবাসী এক বাংলাদেশি। সেখানকার কয়েকটি জাতীয় পত্রিকা তাকে ‘বাংলাদেশি হিরো’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ ছেপেছে।

তার নাম রহমত উল্লাহ রাজীব, বাড়ি শরীয়তপুরে। তিনি সিঙ্গাপুরে টাউন কাউন্সিলে ৯ বছর ধরে কাজ করছেন৷

রাজীব জানান, কয়েকমাস আগে তিনি তার কর্মক্ষেত্রের কার পার্কে একটি ব্যাগ কুড়িয়ে পান। ব্যাগের ১০ হাজার ডলার ছিল যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ লাখ টাকার উপরে৷

রাজীব চিন্তা করলেন টাকা মালিকের কাছে ফেরত দেবেন৷ টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি কার পার্কে প্রায় ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেন৷ কিন্তু কেউ হারানো ব্যাগ খুঁজতে আসেনি, মালিকের সাক্ষাৎ পেলেন না রাজীব।

টাকা হাতে নিয়ে বাসায় ফিরে যান তিনি৷ কিন্তু তার ঘুম হয় না। মালিকের কাছে টাকাটা ফেরত দেওয়ার জন্য তিনি অস্থির হয়ে আছেন৷ তিনি মোবাইল হাতে বসে আছেন, কারণ কাজের ব্লকে কিছু হারানো গেলে হয়ত টাকার মালিক তার বসকে কল দেবেন এবং বস তাকে কল দিয়ে টাকার কথা জিজ্ঞেস করবেন।

কিন্তু কারো কল আসে না৷ মালিকের কাছে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে সময় পার করতে থাকেন রাজীব৷ এরপর দুইদিন সময় করে কার পার্কে মালিকের সন্ধানে এসে বসে থাকেন তিনি৷

কিন্তু কারো দেখা পান না। উপায় না পেয়ে অফিসে বসকে টাকা পাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেন রাজীব। বস তার কথা শুনে অবাক হন৷ বলেন, ‘এতগুলো টাকা তুমি কেন ফেরত দিতে চাও? নিজের কাছেই রেখে দাও৷’

কিন্তু রাজীব নাছোড়বান্দা। সে মালিকের কাছে টাকা ফেরত দিতে চায়৷ বস পরিশেষে তাকে নিয়ে পুলিশ স্টেশনে হাজির হন। পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার কর্মজীবনে এই প্রথম কাউকে দেখছি এতগুলো টাকা ফেরত দিতে৷ তোমার ১০ মাসের বেতন এই টাকা। এই টাকা দেশে পাঠিয়ে তুমি কিছু করতে পারতে। কিন্তু তুমি তা না করে ফেরত দিতে আসছো৷ তোমার সততাকে স্যালুট জানাই৷’

পুলিশ মানিব্যাগে থাকা পরিচয়পত্র থেকে টাকার মালিকের নাম্বারে কল দেন, কিন্তু কেউ কল রিসিভ করে না। দ্বিতীয় নাম্বারে কল দিলে একজন মহিলা কল রিসিভ করে বলেন, তিনি টাকার মালিকের বোন৷ পুলিশের কাছে সব শুনে ওই নারী কেঁদে ফেলেন। তিনি জানান, এই টাকা তার ভাই সংগ্রহ করেছিল তার মায়ের চিকিৎসা করানোর জন্য৷

টাকা হারানোর পর ভাই আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। ভাই ভেবেছে আমি তার টাকা চুরি করেছি৷ শুধু এই টাকার জন্য ভাই-বোন একে অপরের শত্রু হয়েছি৷

পরদিন টাকার মালিক পুলিশ স্টেশন এসে টাকা সংগ্রহ করে রাজীবের বসকে কল করেন৷ রাজীবের বস রাজীবকে সঙ্গে করে পুলিশ স্টেশন হাজির হন৷ টাকার মালিক চারশ ডলার পুরস্কার দেন রাজীবকে। রাজীবের সততার পুরস্কার হিসেবে টাউন কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ‘সততার সার্টিফিকেট’ তুলে দেন সিনিয়র স্টেট মিনিস্টার হেং চি হাউ।

রহমত উল্লাহ রাজীব শরীয়তপুর জেলার জাজিরা থানা গফুর মোল্লার কান্দি গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম আবদুল মোতালেব মোল্লা। তারা দুই ভাই ও এক বোন।

এ ব্যাপারে রাজীবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে রাজীব বলেন, “ভাই, টাকা পয়সা আজ আছে কাল নেই৷ কিন্তু আমি এই যে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলাম এটাই আমার জীবনের সেরা অর্জন। আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই৷ আমি অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে চাই৷ কিন্তু কোন প্লাটফর্ম পাচ্ছি না৷”

রাজীব জানান, এর আগেও তিনি একজনকে ৫০ গ্রাম স্বর্ণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন৷

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!