করোনাভাইরাস: ইতালিতে গৃহবন্দি প্রবাসীর ডায়েরি, পর্ব ১

  • ফাতেমা আখতার মিতু, ইতালি থেকে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-03-18 23:36:21 BdST

সপ্তাহের শুরুতেই আমাদের ঠিক করা হয়ে যায় ছুটির দুই দিন কী কী করবো। তেমনি ২২ ফেব্রুয়ারি শনিবারের প্ল্যান ছিলো পাভিয়া শহরের কয়েকটা স্পটে ঘুরে বেড়াবো আর ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও স্থাপত্য নিদর্শন ক্যামেরাবন্দি করবো।

সকালে নাস্তার পর যথারীতি বের হলাম দুজন, আমি আর আমার বর ড. সৈয়দ মেহেদী হাসান (রবি)। আজ সকাল থেকেই বেশ ঝলমলে রোদ। পাভিয়া শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে তিচিনো নদী। নদীর পাড়ে বসে বেশ সুন্দর সময় কাটানোর ব্যবস্থাও আছে। সেখানে গিয়ে দেখলাম পাভিয়ার মোটামুটি বেশ অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে পিকনিক করছে আর ভিটামিন ডি গায়ে মাখছে।

ছোটছোট বাচ্চারা এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। জেলাটোর গাড়ি গান বাজিয়ে জানান দিচ্ছে কড়া শীত যাই যাই, আসুন সবাই জেলাটো খাই। ইটালিয়ান ভাষায় আইসক্রিম মানে ‘জেলাটো’। দুজন গল্প করতে করতে নদীর তীর ঘেঁষে বেশ অনেকটা পথ হাঁটলাম। নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠা শহরকে যুক্ত করেছে ১৩৫৪ সালে তৈরি কভার্ড একটা ব্রিজ। ইটালিয়ান ভাষায় এর নাম ‘পোন্তে কোপেরতো’। ‘পোন্তে’ মানে ব্রিজ আর ‘কোপেরতো’ মানে কভার্ড বা ঢাকনাবৃত। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো ব্রিজটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৫৪ সালে নতুনরূপে আবার চালু হয় ব্রিজটি।

শত বছরের পুরনো একটা শহরের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে এর অবদানও কম নয়। মিলান থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণের একটা ছোট্ট শহর পাভিয়া। আমার ফিজিসিস্ট বর পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চার হিসেবে কাজ করছে ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’ (আইএনএফএন) এ। চার মাস হলো আমরা ইতালির পাভিয়ায় এসেছি। মন্দ লাগছে না শহরটাকে, বন্ধুসুলভ মানুষগুলোকে। সবে শীতের আমেজ কাটিয়ে উঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো শহরটা, চারদিকে যেন প্রাণ ফিরে আসছিলো।

ঠিক তারপরের দিন রোববার ২৩ ফেব্রুয়ারি, আমাদের খুব সকালে আম্মু-আব্বু কল দিয়ে জানালো ইতালিতে ‘কোভিড-১৯’ এর আউটব্রেকের কথা। তার কিছুক্ষণ পরই রবিদের বাসা থেকে বাবা-মা একই সংবাদ জানালেন। দুজন মিলে লোকাল নিউজ কী বলছে তা শুনতে বসলাম। জানলাম ইতালিতে ৭৯ জন করোনা ভাইরাসের রোগী পাওয়া গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো যেসব শহরে পাওয়া গেছে তার প্রতিটা শহরই আমাদের থেকে ৪০-৫৫ মিনিট দূরে।

এক সপ্তাহ আগে মানে ১৫ তারিখে আমরা মিলান গিয়েছিলাম আমাদের এক ইতালিয়ান বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। টুরিস্ট স্পট দুয়োমো, সেম্পিউনি পার্ক, শপিং মল গ্যালারিয়া ভিত্তোরিয়ো ইমানুয়েলেসহ অন্যান্য ব্যস্ততম স্পটগুলোতে অসংখ্য মানুষের ভীড় দেখেছি। মেট্রোগুলোতে দাঁড়ানোর মতো জায়গা ছিলো না। কাউকেই মনে হয়নি করোনাভাইরাস নিয়ে বিচলিত। কারণ ১৫ তারিখ পর্যন্ত পুরো ইতালিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিলো মাত্র ৩।

জনশূন্য রাস্তা

জনশূন্য রাস্তা

এমনকি ২২ তারিখে যখন আমরা পাভিয়ায় ঘুরে বেড়িয়েছি, কাউকে দেখিনি মাস্ক পড়তে। তবুও আমরা কয়েকটা ফার্মেসিতে এন ৯৫ মাস্ক খুঁজেছিলাম সেদিন। পাইনি। এখানে লোকজনকে দেখে মনেই হয়নি তারা খুব বিচলিত ব্যাপারটা নিয়ে।

২৩ তারিখে চারদিকের খবর ঘেঁটে বুঝতে আর বাকি রইলো না সামনে কী হতে চলেছে। দুজন মিলে চিন্তা করছি কাল থেকে কী হবে! কী করা দরকার আমাদের! কিছুটা প্যানিক করছিলাম এটা সত্যি, কারণ চীনে আউটব্রেকের পর থেকে টুকটাক খবর রাখছিলাম কী হচ্ছে সেখানে।

দুইজন বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। মনস্থির করা খুব প্রয়োজন, ঘাবড়ালে চলবে না। অন্তত কিছু বাজার তো করে রাখা দরকার। ‘ইটালমার্ক’ আর ‘কারেফুর’ সুপার শপ দুইটা আমাদের বাসা থেকে ১৫ মিনিটের দূরত্বে। কিন্তু সমস্যা হলো রেস্টুরেন্ট, কফি শপ আর কিছু সুপার স্টোর ছাড়া অন্যান্য স্টোর রোববার দুপু্র ১২টার পর বন্ধ থাকে। কিছু রুটের বাসও বন্ধ থাকে। সোমবার সকালে বাজার করবো বলে ঠিক করলাম।

ইউরোপের মোটামোটি ৮০ শতাংশ মানুষ পাবলিক ট্রান্সপোর্টের উপর নির্ভরশীল। বাইরে যাওয়া মানেই পাবলিক বাস ব্যবহার করা, যেটা আমাদের জন্য এই মুহূর্তে বিপদজনক। নাহ, মাস্ক কিনতেই হবে। অনলাইনে ‘এন ৯৫ মাস্ক’ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। এন ৯৫ মাস্ক- যে মাস্ক ৯৫ শতাংশ জীবাণু ফিল্টার করে আমাদের মুখের ভিতরে ঢুকতে দেয় না। মাস্ক নিয়ে মোটামুটি রিসার্চ শেষে বের করলাম যে ৯৪ শতাংশ জীবাণু ফিল্টার করতে পারে এমন রেস্পিরেটর আর ফিল্টার প্যাড হলেও কাজ চালানো যাবে।

কিনে ফেললাম, হাতে পেতে আরো চার পাঁচদিন সময় লাগবে। ২২ তারিখ রোববার সন্ধ্যার মধ্যে রবির অফিস থেকে জানালো আগামী এক সপ্তাহ ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ মানে বাসায় বসে অফিস করতে। কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। রাতের মধ্যে জানতে পারলাম লম্বার্ডি অঞ্চলের ১০টি শহর (যেগুলো আমাদের পাশের শহর) আর ভেনেতো অঞ্চলের একটি শহরকে ‘রেড জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

অন্যান্য শহরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, রেড জোনের প্রতিটি এন্ট্রি আর একজিট পয়েন্টে পুলিশ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে, এর মধ্যে যাদের করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিবে তাদের সরাসরি হাসপাতালে না গিয়ে নির্দিষ্ট দুইটি নাম্বারে কল করে জানাতে বলা হয়েছে। রবি এর মধ্যে ইতালি সরকার থেকে আদেশকৃত বেশ কিছু নির্দেশাবলী ইমেইলে পেয়ে গেলো। কী করবো কী হবে সামনে এসব ভাবতে ভাবতে প্রথম দিন পার করলাম।

২৪শে ফেব্রুয়ারি, সোমবার। সকালে বাজারে গিয়ে দেখি লোকজনের মধ্যে একটা নিরব আতংকের ছাপ। ভীত, কিন্তু প্রকাশ করছে না। সবার কার্টেই প্রয়োজনের চাইতে পরিমাণে একটু বেশি জিনিসপত্র। পারলে সবাই কোনো রকম চেকআউট করে দৌড়ে বাসায় ঢুকে। বাসায় এসে ভাবছি কতোদিন এভাবে থাকতে হবে! যদিও আমাদের শহরে কোনো রোগী পাওয়া যায়নি, তারপরও এতো প্রিকশান নেওয়ার একটাই কারণ, রেড জোনের প্রতিটা শহরই আমাদের শহরের খুব আশপাশে।

২২ ফেব্রুয়ারি তোলা ছবি, তখনো জানি না দুইদিন পর কী নেমে আসছে!

২২ ফেব্রুয়ারি তোলা ছবি, তখনো জানি না দুইদিন পর কী নেমে আসছে!

যেহেতু করোনাভাইরাসের লক্ষণ বা উপসর্গগুলো মানুষের শরীরে সর্বোচ্চ ১৪ দিন পর থেকে প্রকাশ পাওয়া শুরু করে, এই ১৪ দিনের মধ্যে রেড জোন এলাকা থেকে আমাদের শহরে কেউ এসেছে কিনা বা এমন কারোর সংস্পর্শে এসেছে কিনা আমরা জানি না। হিসাব করে ফেললাম, হয়তো সামনের সপ্তাহ থেকে আমাদের শহরকেও রেড জোন ঘোষণা করবে। সব মিলিয়ে একটা অস্থির অবস্থার মধ্যে সময় কাটছিলো।

বিবিসি, আল জাজিরা থেকে শুরু করে লোকাল নিউজ পোর্টাল সবকিছুতে চোখ রাখছি প্রতিনিয়ত নতুন খবর পাওয়ার জন্য। কোন শহরে কতজন মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, তাদের কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, হাসপাতালে এসব রোগীর জন্য কেমন ব্যবস্থা এসব জানার জন্য মরিয়া হয়ে পরেছি। প্যানিক করছি না, কিন্তু অনিশ্চিত আগামীর চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

পৃথিবীতে মহামারীর সংখ্যা কিন্তু কম নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮ সালে ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ মহামারীর রূপ নিয়েছিলো। এতে দুই বছরে সারা বিশ্বে মারা যায় ৫ কোটি মানুষ। এতো দূরে না গিয়ে একবিংশ শতাব্দীর কথা যদি বলি, একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই কিন্তু মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট রোগ ‘সার্স’ (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেস্পিরেটরি ডিজিজ) প্রথম উঁকি দেয় যা ‘করোনাভাইরাস ডিজিজ’ বা ‘সার্স কোভিড ২’ নামে পরিচিত। ২০০২-২০০৩ সালে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার দুই ডজনেরও বেশি দেশে মোট ৮ হাজার জনেরও বেশি আক্রান্ত হয়েছিলো। আর মারা গিয়েছিলো প্রায় ৮০০ জন।  ২০০৯ সালে এলো সোয়াইন ফ্লু।

‘নোভেল করোনাভাইরাস ১৯’ হলো ‘করোনাভাইরাস’ পরিবারের আরেকটি নতুন ভাইরাস যা ‘কোভিড ১৯’ নামে পরিচিত। এতোদিনে সবাই মোটামুটি জেনে গেছি এটি একটি সংক্রামক রোগ। এ ভাইরাসের কারণে কাশি, জ্বর ও আরও মারাত্মক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া জাতীয় লক্ষণগুলোর সঙ্গে শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতা (ফ্লুর মতো) দেখা দিতে পারে।

যুক্তরাজ্য থেকে বড় মামা, মামানী আর আমার দুই কাজিন সারজাহ, সাদুনের বেড়াতে আসার কথা ছিলো ২০ মার্চের দিকে। টিকেট সব কনফার্ম, কোথায় ঘুরতে যাবো, কাজিনদের সঙ্গে ইন্টার মিলানের খেলা দেখার প্ল্যান মোটামুটি সব কনফার্ম ছিলো। আমি দিন গুণছিলাম। আউটব্রেকের খবর শুনে বড় মামা প্রতিদিন আমাদের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। যুক্তরাজ্যে তখনও করোনাভাইরাস  ছড়ানোর খবর পাওয়া যায়নি। আমাদের অবস্থা দিনদিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও।

২৯ ফেব্রুয়ারি লিপ ইয়ার ডেতে ‘লেক কোমো’ বেড়াতে যাবার প্ল্যান করেছিলাম অনেক আগেই। দেশের পরিস্থিতি খারাপ বলে আমরা সেটাও ক্যান্সেল করে দেই। আমাদের প্রথম সপ্তাহ গেলো কোন শহরে কতজন নতুন রোগী পাওয়া গেছে, সেসব রোগীরা কিভাবে ইনফেক্টেড হয়েছে সেসব খোঁজ করে। বাসার নিচতলায় ইনডোর গেইমস, জিম, মিউজিক রুমের ব্যবস্থা আছে। আমরা সাধারণত প্রতিদিন বিকেলের দিকে সেখানে সময় কাটাতাম। ভাইরাস আউটব্রেকের খবর শুনে আমরা নিচে পর্যন্ত যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। কি এক অবরুদ্ধ জীবন কাটানো শুরু হলো আমাদের! বাসাটাকে মোটামুটি একটা উন্নতমানের জেলখানা মনে হতে লাগলো।

১ মার্চ, রোববার। আমাদের বন্দিজীবনের সাতদিন অতিবাহিত হলো। প্রতিদিন সকালে রুটিন করে ইতালিসহ অন্যান্য যেসব দেশে ভাইরাস ছড়িয়েছে তাদের খোঁজ নিচ্ছি। সন্ধ্যায় একবার, রাতে ঘুমাতে যাবার আগে আরেকবার খোঁজ নিচ্ছি। এর মধ্যে রবির অফিস থেকে নির্দেশ এলো আরো সাতদিন বাসা থেকে অফিস করার জন্য, মানে ৯ মার্চের মধ্যে পরস্থিতির উন্নতি না হলে এটা এক্সটেন্ড হতে পারে।

‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’ (আইএনএফএন) এর অন্যান্য কলিগরা আমাদের খোঁজখবর রাখছিলেন নিয়মিত। কোনো ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছি কিনা অ্যাডমিন থেকে রুটিন করে জানতে চাইছে। পার হয়ে যাওয়া একটা সপ্তাহ এখানকার স্থানীয়রা কী করেছে? বাজার যা করেছিলাম সেটা কি আমাদের আরো এক বা দুই সপ্তাহ চলার জন্য যথেষ্ট ছিলো?

(চলবে)

লেখক: প্রবাসী বাংলাদেশি। বসবাস করেন ইতালির পাভিয়া প্রদেশের ভিয়া জিওভান্নি তাভাজ্জানি এলাকায়। পেশায় একজন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।