করোনাভাইরাস: ইতালিতে গৃহবন্দি প্রবাসীর ডায়েরি, পর্ব ২

  • ফাতেমা আখতার মিতু, ইতালি থেকে,  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-03-20 11:49:52 BdST

বাসার ঠিক উল্টোদিকেই বাস স্টপ। প্রতি ১৫ মিনিট পর পর বাস ছাড়ে। নাহ! লোকজনের কমতি নেই। সবাই খুব রিলাক্সড।

আমি আর রবি ভাবছি লোকজন ব্যাপারটাকে এতো হালকাভাবে কিভাবে নিচ্ছে! এখন পর্যন্ত এখানে যারা মারা গেছেন তাদের বেশিরভাগই বৃদ্ধ অথবা অনেকেই প্রি-একজিস্টিং কন্ডিশান যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ কিংবা হৃদরোগে ভুগছিলেন। সবার একটা ধারণা, বয়স কম আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকলে এ ভাইরাসের সঙ্গে ফাইট করা ব্যাপার না। তাহলে ইচ্ছামতো বার, রেস্টুরেন্ট, কফি শপে যেতে, বাইরে যেতে বাধা কই?

আমাদের কমপ্লেক্সের মানুষও দিব্যি বাইরে আসা যাওয়া করছে। বিকেলের দিকে বুড়ো-বুড়িরা সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে বাইরে হাঁটতে বের হচ্ছে। প্রতিদিন যেখানে এক-দুই হাজার করে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, মনে হচ্ছিলো চীনকেও ছাড়িয়ে যাবে ইতালি। আউটব্রেকের ২ সপ্তাহের মধ্যে রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০১১ এর মতো আর মৃতের সংখ্যা ৪৬৩, মৃত্যুহার যেখানে ৪% এরও বেশি।

ইতালির জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট অনুসারে, ভাইরাসের কারণে মারা যাওয়া করোনভাইরাস রোগীদের গড় বয়স ৮১ বছর। পুরো বিশ্বে জাপানের পরেই ইতালিতে বয়স্ক লোকের সংখ্যা বেশি। ফলে মৃত্যুর হার বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

গত একটা সপ্তাহ আমরা মানসিকভাবে খুব ডাউন ছিলাম। তাছাড়া দুই বাসা থেকেই বাবা মায়েরা চিন্তা করছিলেন। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, প্রিয় কিছু মানুষ আমাদের খোঁজ নিচ্ছেন নিয়মিত। প্রতিদিন একই প্রশ্ন- কী অবস্থা সেখানে, তোমরা ঠিক আছো? আমরা যেহেতু বাইরে কোথাও বের হচ্ছি না, আল্লাহর রহমতে আমাদের কন্টামিনেট হবার সম্ভাবনা নেই। উত্তর একটাই- বাসায় বন্দি, বের হতে পারছি না।

নিয়ম করে পাবলিক বাস চলছে (ঘর থেকে বাইরের জগত)

নিয়ম করে পাবলিক বাস চলছে (ঘর থেকে বাইরের জগত)

ইতিমধ্যে আমরা চেষ্টা করছি করোনা জ্বর থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসার। রবি বাসায় বসে অনলাইনে মিটিং চালিয়ে যাচ্ছে, রিসার্চের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। আমিও আমার পড়াশোনা, কিছু প্রজেক্টের কাজ করার চেষ্টা করছি। ঠিক করলাম, আগের মতো নিচে টেবিল টেনিস খেলতে যাওয়া শুরু করবো। আপাতত জিম অফ রাখবো, যেহেতু কমপ্লেক্সের আরো অনেকেই জিম ব্যবহার করে। বাসায় ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ, ইয়োগা শুরু করবো। এক রোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে বাসায় বসে আরো কিছু রোগকে শরীরে বাসা বাধতে দেওয়া যাবে না।

নিজেরা কিছু প্রোটোকল তৈরি করে নিলাম, যেমন:

১. নিচে ইন্ডোর গেইমস রুমে যতক্ষণ থাকবো ভুল করেও হাত মুখের কাছে আনবো না, নাকে বা চোখে হাত দেবো না। যেহেতু নাক, মুখ আর চোখ এই তিনটি মাধ্যম দিয়ে সহজে ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। তাই হাত খুব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।

২. মোবাইল নিয়ে গেইমস রুমে না যাওয়া।

৩. কেউ যদি গেইমস রুমে আসে মিনিমাম ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করা।

৪. ঘরের চাবি ও টেবিল টেনিসের সামগ্রী ঘরের একটা নির্দিষ্ট স্থানে রাখা এবং পরেরদিন খেলতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত হাত না দেওয়া।

৫. বাসায় এসেই স্যানিটাইজার ব্যবহার করা বা হাত সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে প্রথম কাজ হলো দরজার নবে ডিজইনফেক্টেন্ট স্প্রে করা। তারপর একবারে শাওয়ার নিয়ে জামাকাপড় ধুয়ে ফ্রেস হয়ে ঘরে আসা।

২৩ তারিখে কিছু বাজার করেছিলাম। নন-পেরিসেবল কিছু আইটেম একটু বেশি করে কিনলাম। পেরিসেবল আইটেম কতোদিন ভালো থাকে? অবশ্য সবজি আর মাছ মাংস জাতীয় খাবার ফুরিয়ে আসছিলো। তাছাড়া ২ মাসের কথা চিন্তা করে বাজারও করিনি। প্রায় ২ সপ্তাহ হতে চললো বন্দি অবস্থায় আছি। পরিস্থিতি ভালোর দিকে যাবার কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। ‘কারেফুর স্টোরে’ অনলাইনে অর্ডার করলাম যেহেতু তাদের হোম ডেলিভারি অপশান আছে। একদিন পর বাজার সদাই হাতে পেলাম। ইন্টারন্যাশনাল নিউজ চ্যানেলগুলোয় খুব প্রচার করছিলো হ্যান্ড স্যানিটাইজার, রাবিং অ্যালকোহল, ডিজইনফেক্টেন্ড ওয়াইপ্স বা স্প্রে স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে না।

বাসার সামনে লোকজনের হাঁটাচলা

বাসার সামনে লোকজনের হাঁটাচলা

সুখকর বিষয় হলো, যেহেতু ব্যক্তিগত হাইজিন আর ঘরদোর পরিষ্কারের জন্য এসব সরঞ্জামাদি সবসময় আমার বাসায় থাকে তাই আমাকে নতুন করে কিনতে হয়নি। যেহেতু অনলাইনে সহজে অর্ডার করা যাচ্ছে তাই আমরা বেশি করে কিনে স্টক করার কথাও ভাবিনি। ঠিক করলাম, পরের সপ্তাহেও একই কাজ করবো। কী একটা মনে করে ৭ তারিখে ‘কারেফুর’ এর ওয়েবসাইটে ঢুকতে গিয়ে দেখি আর কাজ করছে না। বুঝলাম সবাই আসলে দোকানের ভিড় এড়াতে চাইছে, যার কারণে ওয়েবসাইট হ্যাং হয়ে আছে।

সঙ্গে সঙ্গে ‘এসেলুঙ্গা’ (ইতালিয়ান চেইন স্টোর) সাইটে গেলাম। প্রয়োজনীয় জিনিস অর্ডার করতে গিয়ে দেখলাম ডেলিভারি ১০দিনের আগে দিতে পারবে না। এর আগে তাদের কোনো স্লট খালি নেই। চোখ বন্ধ করে অর্ডার করে ফেললাম। যাক ইনশাআল্লাহ ১৭ তারিখে সব হাতে পাবো।

এদিকে ৮ মার্চ সরকার লম্বার্ডি অঞ্চলসহ আরো ১৪টি প্রদেশকে লকডাউনের ডিক্রি জারি করলো। পাভিয়া যেহেতু লম্বার্ডি অঞ্চলের একটি শহর, আমরাও আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দির খাতায় নাম লিখালাম। প্রয়োজন ছাড়া শহর থেকে বের হওয়া নিষেধ, তবে কাজের প্রয়োজনে ‘প্রুভেন ওয়ার্কিং পেপার’ দেখিয়ে শহরের বাইরে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শহরের ভিতরে চলাচলে কোনো নিষেধ ছিলো না। লকডাউন লঙ্ঘনকারীদের জন্য তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডের নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেওয়া হয়েছে, এমনকি জরিমানার আদেশও দেওয়া হয়েছে।

সুপার স্টোর বা গ্রোসারি স্টোর, ফার্মেসি, রেস্টুরেন্ট, বার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। তবে এক মিটার দূরত্ব রেখে কেনাকাটা বা যোগাযোগে কোনো বাধা নেই। সাংস্কৃতিক, বিনোদনমূলক, খেলাধুলা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন বিয়ে, ব্যেপ্টিজম, ফিউনারেল অর্থাৎ যেসব জায়গায় জনসমাগম বেশি হবে সেসব অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। এ পদক্ষেপটি ইউরোপের ইতিহাসের বৃহত্তম লকডাউন হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

তার পরের দিন ৯ মার্চ, জরুরি ভিত্তিতে পুরো দেশ জুড়ে লকডাউন ঘোষণা করা হলো। সবাইকে ঘরে থাকার জন্য অনুরোধ করা হলো, সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম ৩ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হলো। ভাইরাস আউটব্রেকের ১৬ দিন পর পুরো দেশের মানুষ আজ থেকে গৃহবন্দি।

(চলবে)

 

আগের পর্ব

করোনাভাইরাস: ইতালিতে গৃহবন্দি প্রবাসীর ডায়েরি, পর্ব ১  

 

লেখক: প্রবাসী বাংলাদেশি। বসবাস করেন ইতালির পাভিয়া প্রদেশের ভিয়া জিওভান্নি তাভাজ্জানি এলাকায়। পেশায় একজন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।