প্রবাসে করোনাভাইরাসময় দিনগুলি

  • শুভংকর বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়া থেকে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-03-21 21:12:14 BdST

- ভাই কি ওয়ার্ক অ্যাট হোম করছেন?

– হ্যাঁ ভাই।

– তাহলে আজ  সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় ডিনারের দাওয়াত নেন?

– কেন?

– বাহ রে! আপনি না ওয়ার্ক অ্যাট হোম করছেন?

– হ্যাঁ, তো?

– তো আপনি এখন অফিসের চাপ মুক্ত। তাছাড়া কোভিড-১৯ এর কারণে সরকারও ‘সোশাল গ্যাদারিং’ নিষিদ্ধ করেছে। এভাবে কি আর বেশিদিন বাসায় থাকতে ভালো লাগে, বলুন? আপনি আসলে একটু আড্ডাও দেওয়া যাবে।

কীভাবে বোঝাবো, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে দেশকে বাঁচাতে অস্ট্রেলিয়ান সরকার সোশালাইজেশন বন্ধ করে জনগনকে যথাসম্ভব আইসোলেশনে থাকতে বলেছে। আর প্রায় সকল অফিসেই সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে তাদের কর্মীদের ‘ওয়ার্ক অ্যাট হোম’ করতে বলেছে, দাওয়াত খেয়ে বেড়াতে বলেনি।

আপনারা যারা বিদেশে বসবাস করছেন, এই দাওয়াত কালচার নিয়ে তাদেরকে নতুন করে বলার কিছু নেই। যারা এ ভয়ংকর দাওয়াত কালচার সম্পর্কে জানেন না, তাদেরকে বলি, প্রবাসীরা সারা সপ্তাহ কাজ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিচিত-স্বল্পপরিচিত মানুষরা একে অন্যের বাসায় খাওয়ার দাওয়াত দেয় বা নেয়। অনেকে আবার দাওয়াত দিয়ে মানুষ খাওয়ানোকে সামাজিক মর্যাদা হিসেবে গণ্য করে থাকেন। কাউকে না বলার শর্তে আরেকটা গোপন কথা আপনাদেরকে বলি- দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ দাওয়াতের উপসংহার টানা হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বা ধর্মীয় বিতর্কের মাধ্যমে। সেটা সম্ভব না হলে দাওয়াতে অনুপস্থিত ব্যক্তিরা সমালোচনা করে উপস্থিত সবাই মনোরঞ্জন করেন। এই সব কর্মকাণ্ড খাবার হজমীকরণে সাহায্য করে বলে অনুমান করা হয়! আর সার্বিকভাবে এটাকেই প্রবাসী দাওয়াত কালচার বলা হয়।

যে জন্য দাওয়াত কালচারের অবতারণা করেছিলাম, করোনা ভাইরাসের এই বিপদ-সংকুল দিনেও প্রবাসীদের দাওয়াত দেওয়া বা নেওয়া তো কমেই-নি, বরং ‘ওয়ার্ক অ্যাট হোম’ করার সুবাদে কর্মদিবসগুলিকেও ছুটির দিন বানিয়ে মহাসমারোহে চলছে দাওয়াত উৎসব। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আইসোলেশন নিয়ে তারাই সবচেয়ে বেশি সরব!

দুই

করোনাভাইরাস কোথা থেকে কিভাবে উৎপত্তি হয়ে কোন অলি-গলি দিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, এই বিষয়ে আমাদের করণীয় কী- সেটা আমার থেকে পাঠকরাই ভালো জানেন। তাই করোনাভাইরাসের সাতকাহন আলোচনা না করে আমার কিছু প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা পাঠকদের সাথে ভাগাভাগি করতে চাই।

চাকরির সুবাদে আমি চীনের একটি মাত্র শহর, হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান ভ্রমন করেছি। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, সেটাই করোনাভাইরাসের এপিসেন্টার! ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমরা তিনজন সহকর্মী চীনের উহানে গিয়েছিলাম। যার মধ্যে একজন অস্ট্রেলিয়ান, আরেকজন ইরানিয়ান, আর এই অধম বিশুদ্ধ বাংলাদেশি। প্রথমদিনেই আমরা চীনের স্থানীয় এক সহকর্মীকে নিয়ে উহানের এক জনপ্রিয় রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেতে গিয়েছলাম। রেস্তোরাঁটি ছিল ‘হট পট’ এর জন্য বিখ্যাত। যারা ‘হট পট’ সম্পর্কে জানেন না- তাদেরকে বলছি, ‘হট পট’ হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের চাইনিজ রন্ধন প্রণালী, যেখানে হাড়িসদৃশ একটি পাত্রের মধ্যে মসলাযুক্ত স্যুপ রেখে খাবারের টেবিলে পরিবেশন করা হয়। আর নিচ দিয়ে গ্যাস-বার্নারের সাহায্যে তাপ দিয়ে স্ফূটনাংকের নিচে স্যুপের তাপমাত্রা বজায় রাখা হয়। এবার আমাদের পছন্দমত খাবার, যেমন, বিভিন্ন ধরনের সবজি, কাটাবিহীন মাছ বা মাংসের স্টেক (সবজি, মাছ বা মাংসেরছোট ছোট টুকরা একটি লম্বা শলাকা দ্বারাফুটিয়ে একত্রে আবদ্ধ রাখা হয়) নিয়ে ওই হট পটে রান্না করে (কিছুক্ষণ ভিজিয়ে) খেতে হয়। সবজি, মাছ বা মাংস কাঁচা অথবা আধা-সেদ্ধ হতে পারে।

যাইহোক, আমাদের চার জনের খাদ্যের সংস্কৃতি আলাদা হওয়ায় চারজন চারটি ভিন্ন শ্রেণির খাবার বেছে নিলাম। আমি সবচেয়ে নিরাপদ মাশরুম, ফুলকপি ও পনিরের স্টেক বেছে নিলাম। অস্ট্রেলিয়ান সহকর্মী শুকরের স্টেক, ইরানি সহকর্মী গরুর মাংসের স্টেক, আর চাইনিজ সহকর্মী বেছে নিয়েছিলেন ঝিনুকের ভিতরের মাংসের স্টেক- সবজিও সাথে ছিল। মুশকিল হয়েছিল, সবাই অন্যের খাবারের ব্যাপারে সচেতনভাবে সম্মান প্রদর্শন করলেও হট পট তো একটাই! অগত্যা সবাই মুখ বুঁজে নিজ নিজ স্টেক একই পাত্রে একই স্যুপে রান্না করে খেয়েছিলাম। করোনাভাইরাস আক্রান্ত দিনগুলিতে সেইসব বিভীষিকাময় স্মৃতি এখনও মানসপটে ভেসে ওঠে! বুঝতে পারি, শুরুর দিকে কোন বাহনে চড়ে সংক্রমণসমূহ ছড়িয়ে এতদূর পর্যন্ত গড়ায়!

তিন

করোনাভাইরাসের কারণে অস্ট্রেলিয়া আজ প্রায় অবরুদ্ধ। প্রায় সকল স্টেট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রিয় সরকার বড় ধরনের জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে (অন্দর মহলে ১০০ জন বা অধিক ও উন্মুক্ত স্থানে ৫০০ জন বা অধিক)।

তাছাড়া বিদেশ থেকে যে-ই আসুক না কেন তাকে বাধ্যতামূলক ১৪দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। কোয়ারেন্টিনের নিয়ম না মানলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। সকল অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সুযোগ থাকলে ওয়ার্ক অ্যাট হোম করতে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণও অনেক সচেতন। তারা নিজেরাও সকল নির্দেশনা পালন করে সরকার তথা নিজেদেরকে সাহায্য করছে।

যেমন, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও অফিসগুলো তাদের কর্মীদের ‘ওয়ার্ক অ্যাট হোম’ এর ব্যবস্থা করেছে। বড় বড় কর্মশালা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে, পূর্ব নির্ধারিত কনসার্ট বন্ধ করা হয়েছে, যেসব খেলা হঠাৎ করে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, যেখানে দর্শক ছাড়া খেলার আয়োজন করা হয়েছে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার রাস্তাঘাট প্রায় জন-মানবশুন্য হয়ে পড়েছে। আরেকটা কথা না বললেই নয়। অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসেলসহ অনেক স্থানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মসজিদ কমিটি স্বপ্রণোদিত হয়ে মুসলিমদের মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্য না আসতে অনুরোধ করেছেন (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা কোনদিন কল্পনা করা যায়!)।

যাইহোক, এত কিছুর পরেও জীবন ধারনের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অপ্রতুলতা নিয়ে একটা কিন্তু থেকে যায়।বিশেষত টয়লেট টিসু, পেপার টাওয়েল, হ্যান্ড ওয়াশ/ স্যানটাইজার, পাস্তা, কুকিং ওয়েল, কুকিং সল্ট, দুধ ইত্যাদি।

আমি বেশ কিছুদিন ধরে এর কয়েকটি কেনার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ভাগ্য সহায় না থাকায় এখনও কেনা সম্ভব হয়নি! কিছু কিছু আবেগপ্রবণ সাধারণ মানুষ তাদের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি দ্রব্যাদি বাসায় নিয়ে গুদাম করে রেখেছে। যার কারণে সুপার শপগুলো বাজারের চাহিদা মতো জোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, সাধারণত অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে!

জীবন ধারণের জন্য দৈনন্দিন বাজার করার ব্যাপারে আমি বরাবরই উদাসীন। এই নিয়ে আমার বিরুদ্ধে আমার বৌয়ের যেন অভিযোগের অন্ত নেই! আয়তনে বাংলাদেশের প্রায় ৪২ গুণ বড় অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা আড়াই কোটির একটু বেশি। এক কুইন্সল্যন্ডেই যে পরিমান কৃষিজ দ্রব্য তৈরি হয় তা দিয়ে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করে থাকে।

অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী কিছুটা নিজেরা উৎপন্ন করে, কিছুটা চীন বা অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করে মাত্র এই আড়াই কোটি মানুষের দিব্যি চলে যায়। এজন্য যখন যেটা দরকার এক দৌড়ে সুপার শপ থেকে নিয়ে আসি, বাজার করার ক্ষেত্রে এত সিরিয়াস হওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু কখনও বাজার করতে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হবে, এটা কস্মিনকালেও ভাবিনি!

চার

একটা গল্প বলে শেষ করি। একজন লোক দেহ ত্যাগ করে পরলোকে গমন করেছেন। উনি ইহকালে প্রায় পুরোটা সময় খুব ভালো কাজে ব্যয় করেছেন। এই জন্য খুশি হয়ে স্বর্গের রাজা ইন্দ্র লোকটিকে বললেন- "তুমি তো ইহ জগতে বহুত ভালো কাজ করেছো হে বৎস! তোমার কাজে দেবতারা সবাই তুষ্ট। এখন তোমার ইচ্ছা অনুযায়ী তুমি যেখানে থাকতে চাও বেছে নাও।”

লোকটি তখন স্বর্গের রাজার কাছে কী কী বিকল্প আছে জানতে চাইলে ইন্দ্র বললেন- "স্বর্গ ও নরক"।

শুনে লোকটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই জায়গা দুইটি পরখ দেখতে চাইলেন। "তথাস্তু"- বলে অনুমতি দিলেন ইন্দ্র।

লোকটা রাজাকে কুর্ণিশ করে প্রথমে নরক দেখতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন একটা টেবিলে অনেক সুস্বাদু খাবার, ফলমূল ইত্যাদি রাখা আছে। কিন্তু নরকবাসীর কেউই তা খেতে পারছে না। কারণ, টেবিলের চারিদিকে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া। সেই বেড়ার ফাঁক দিয়ে কোনক্রমে একটা হাত ঢুকিয়ে খাবার তোলা যায় বটে, কিন্তু কোনক্রমেই সেই হাত খাবারসহ বেড়ার ফাঁক দিয়ে বের করা যায়না! যার কারণে নরকবাসীর কেউই খেতে পারে না, ফলে সবাই নিজেদের মধ্যে হইচই, মারামারি ইত্যাদি করছে।

লোকটি এবার স্বর্গে গেলেন। দেখলেন এখানেও নরকের মতো সেই একই খাদ্য-খাবার একই টেবিলবিন্যাসে সাজানো। কিন্তু আশ্চর্য, স্বর্গের বাসিন্দারা কেউই হইচই করছে না! সবাই খুব হাসিখুশি। কিছুক্ষণ পর লোকটি খেয়াল করলেন, যখনই কারও ক্ষুধা পাচ্ছে, টেবিলের কাছে গেলে অপর পাশ থেকে অন্য একজন তাকে খাইয়ে দিচ্ছে। তখন লোকটা অনুধাবন করলেন, বস্তুত স্বর্গ ও নরক একই। তারতম্য শুধু এর বাসিন্দাদের আচরণে। এই আচরণের কারণে স্বর্গের মানুষ সুখী, আর নরকের মানুষ দুঃখী। লোকটি পরবর্তীতে স্বর্গে থাকার জন্য ইন্দ্রের কাছে আর্জি জানালেন।

সুপ্রিয় পাঠক, অস্ট্রেলিয়ায় জনসংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও গুটিকতক স্বার্থপর মানুষের জন্যে আমাদের মতো আপামর জনসাধারণ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনতে পারছে না। আর ১৬ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে একবার কোভিক-১৯ ভাইরাস বহুল অংশে ছড়িয়ে পড়লে ভাইরাস নয়, গল্পের নরকবাসীর মতো আমাদের স্বার্থপর আচরণের কারণে খাবার সংকটে দেশে দুর্ভিক্ষ ঘটবে নাতো?

লেখক পরিচিতি: গবেষক ও প্রকৌশলী

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!