করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আসলে কতদূর?

  • মো. রওশন আলম, যুক্তরাষ্ট্র থেকে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-13 12:46:59 BdST

bdnews24
ছবি রয়টার্স

কদিন আগেও যে পৃথিবীটা ছিল উত্তাল, তা যেন হঠাৎ করেই নীরব ও নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। প্লেনের পাখা থেমে গেছে, গাড়ির চাকা থেমে গেছে। মানুষের ঘর থেকে বাইরে না বেরুনোর নির্দেশনাও জারি হয়েছে দেশে দেশে।

ঘরের মধ্যে থাকতে থাকতে চেনার জগতটাও তাই যেন অচেনা হতে শুরু করেছে। করোনাভাইরাসের অমোঘ মেঘ আচ্ছন্ন করে বসে আছে আমাদের অনেকের মন-মানসিকতাকে। কখন যে সেই মেঘ কেটে যাবে তা কেউ জানে না। শুধুই অপেক্ষার পালা। কখন হবে এই পৃথিবী করোনাভাইরাসমুক্ত?

আপন মনে নিজেকে প্রশ্ন করি। করোনাভাইরাসমুক্ত পৃথিবী কি আদৌ ফিরে পাবো? কবে ফিরে পাবো, তা জানি না। করোনাভাইরাসের আগের পৃথিবীতে ফিরতে পারবো কিনা, তাও জানি না। একদিন দুদিন করে দিনের পর দিন জীবন থেকে ঝড়ে যাচ্ছে। সেই দিনগুলো করোনাভাইরাসের খাতায় জমা পড়ছে। জীবনের খাতায় বাদবাকি যে দিনগুলো পড়ে আছে, সেখান থেকে আর কতদিন করোনাভাইরাসের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে, তাও জানি না। তবে যেটা জানি, তা হচ্ছে এভাবে জীবন চলতে পারে না। জীবন চালানোর জন্য উপকরণের প্রয়োজন হয়। যার নাম জীবিকা। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এসব জীবিকার উপাদান। জীবিকা আসে শ্রমের মাধ্যমে। সেই শ্রম যখন থেমে যায়, জীবিকাও থেমে যায়।

কিন্তু জীবিকার জন্য ঘরের বাইরেও তো বের হওয়া নিরাপদ নয়। তাতে অদৃশ্য করোনাভাইরাসের সঙ্গে দেহের যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। ভাইরাসের সঙ্গে দেহের যে যুদ্ধ তা মূলত অ্যান্টিবডির সঙ্গে যুদ্ধ। ইমিউন সিস্টেম যদি মজবুত হয়, তাহলে দেহ টিকে যাবে। আর ইমিউন দুর্বল হলে দেহ ভাইরাসের কাছে হেরে যাবে। সেই হারের নাম এই পৃথিবীর নাম-নিশানা থেকে দূরে চলে যাওয়া, ঠিক ওই দূরের পৃথিবীর দিকে ছুটে যেতে হবে, যার নাম পরপার। ভাইরাস জয়ী হলে পাঠিয়ে দিবে পরপারে।

মনে রাখতে হবে যে, কোনো নতুন ড্রাগ আবিষ্কার রাতারাতি হয় না। ভ্যাকসিন তো নয়ই। সায়েন্টিস্টরা বছরের পর বছর ধরে নিরলস প্রচেষ্টায় গবেষণার মাধ্যমে একটি ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে থাকেন। সেই ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে কোনো শর্টকাট প্রোসেস নেই।  প্রি-ক্লিনিক্যাল এবং হিউম্যান ট্রায়াল অর্থাৎ ক্লিনিক্যাল স্টাডি যেমন ফেজ-১, ফেজ-২, ফেজ-৩ এর মতো ধাপগুলো উতরিয়ে যেতে হয়।

তারপর লারজ স্কেল মেনুফেকচারিং প্রোসেস ভ্যালিডেশনসহ ড্রাগ অথরিটির (যেমন এফডিএ) কাছ থেকে অ্যাপ্রুভাল বা অনুমোদন। একটি নিরাপদ ও কার্যকরী ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এসবই হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি এক প্রক্রিয়া বা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদেরকে তাই অফুরন্ত ধৈর্য্যের পরীক্ষা দেবার পাশাপাশি মন-মানসিকতাকেও সেভাবে গড়ে তোলা উচিত।

তাই বলে বিজ্ঞানীরা যে বসে আছেন তা তো নয়। তাদের রাত-দিনের বিনিদ্র চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট ইতোমধ্যে প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টাডি উতরিয়ে হিউম্যান ট্রায়ালে এগুচ্ছে। যেমন, ‘mRNA-1273’। এটি একটি এক্সপিরিমেন্টাল ভ্যাকসিন। করোনাভাইরাস যখন প্যান্ডেমিকের চূড়ায়, তখন এই ‘mRNA-1273’ ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটই গত মার্চে সর্বপ্রথম ফেজ-১ হিউম্যান ট্রায়ালে যায়।

বোস্টনের মডার্না থেরাপিউটিকস ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের সায়েন্টিস্টরা এই সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের পিছনের কাণ্ডারি। আশার কথা হচ্ছে যে, গত ৭ মে ‘এফডিএ মডার্না থেরাপিউটিকসকে’ ফেজ-২ ট্রায়েলের জন্য অনুমোদন দেয় (৬০০ জন পার্টিসিপেন্টের উপর গবেষণার জন্য)। শুধু তাই নয়, এর উদ্ভাবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সায়েন্টিস্টরা এই গ্রীষ্মেই এই সম্ভাব্য ভ্যাকসিনটিকে ফেজ-৩ ট্রায়ালের জন্যও আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

উপরন্ত প্রতি বছর যাতে এক বিলিয়ন ডোজ ম্যানুফেকচার করা সম্ভব হয়, সেই লক্ষ্য সাধনের জন্যও মডার্না ইতোমধ্যে সুইজারল্যান্ডের ড্রাগমেকার ‘লঞ্জা’ এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এতো তাড়াহুড়া বা এসবেরই মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যে, এটি যদি ভ্যাকসিন হয়, তাহলে ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস আক্রান্ত মানুষের হাতে হাতে এই ভ্যাকসিনটিকে যাতে পৌঁছে দেওয়া যায়। 

আরেকটি গবেষকের দল করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন নির্ণয়ের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে আছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি টিম। তাদের ভ্যাকসিন কোডটি হচ্ছে ‘ChAdOX1 nCoV-19’। এই ক্যান্ডিডেটটি হচ্ছে অ্যাডেনোভাইরাস অর্থাৎ এটি জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারিং একটি ভাইরাস। এটিকে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেহের ভিতরে দেওয়া হবে করোনাভাইরাসের (সার্স-কভ-২) বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য। যদিও এই ধরণের অ্যাপ্রোচ নতুন কিছু নয়।

অতীতে জেনেটিক্যালি মডিফাইড ভাইরাস অন্তত ১০টি রোগের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন নির্ণয়ের জন্য প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, তাদের কোনটিই ভ্যাক্সিনের আলো আজও দেখেনি। তথাপি বিজ্ঞানীদের আশা ও প্রত্যাশা তো থেমে থাকবে না। প্রিক্লিনিক্যাল ডাটা আশা জাগানিয়া বিধায় অক্সফোর্ড টিমের এই ‘ChAdOX1 nCoV-19’ ক্যান্ডিডেটটি যদি পরীক্ষামূলক ফেজগুলো উতরিয়ে যায়, তাহলে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এটিকে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসার জন্য ব্যবহার উপযোগী হবে। 

আমাদের মনে আছে, কিছুদিন আগে জিলিয়েডের রেমডিসিভির সাড়া জাগিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। আহামরি কোনো ডাটা ছিল না, তবুও। সংক্রমণবিরোধী এই ওষুধটি অতীতে ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে পুরোপুরি অকার্যকর ছিল। তা সত্ত্বেও কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে মানুষের মনে ক্ষীণ আশা বাঁচিয়ে রেখেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে যে, প্রাথমিক স্টাডিতে ১১.৬% থেকে ৮% মৃত্যুহার কমাতে সাহায্য করেছে এবং রোগীর সুস্থতার মেয়াদ ১৫ দিনের জায়গায় ১১ দিনে কমিয়ে আনতে সহায়তা করেছে এই রেমডিসিভির। এখনো এই ওষুধটির ব্যাপক স্টাডি চালাচ্ছেন জিলিয়েডের সায়েন্টিস্টরা। আশা তারা জিয়ে রেখেছেন। আমরাও আশায় বুক বাঁধি।

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য সাড়া বিশ্বে একাধিক ল্যাবরেটরিতে এরূপ গবেষণা চলছে। কেউ জানে না কখন একটি কার্যকরী ভ্যাকসিন মানুষের হাতে এসে পৌঁছবে, যা মানুষের জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রাখবে, লাশের সারি কমাবে। উপরন্ত আমরা এও জানি না দেশে দেশে করোনাভাইরাসের সুনামি শেষ হয়ে গিয়াছে নাকি আরো বড় ধরণের সুনামি অপেক্ষা করছে। যতদিন না ভ্যাকসিন এসে পৌঁছাবে, ততদিন ভাইরাসের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াই তাই শেষ হয়ে যাচ্ছে না।

যে কোনো যুদ্ধই যখন শুরু হয়ে যায়, তখন দেখা যায় যে তাতে সন্মুখভাগের সৈনিকরাই আগে জীবন দেয়। করোনাভাইরাস প্যান্ডেমিকও তার ব্যতিক্রম নয়। এই প্যান্ডেমিকে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ ও সাংবাদিকরা হচ্ছেন ফ্রন্ট লাইনার। তাদের কর্তব্য ও অদম্য নিষ্ঠা মানবিকতাকে বাঁচিয়ে রাখে। স্যালুট জানাই তাদেরকে।

পরিশেষে বলব, ভাইরাস এবং মানুষ প্রথমটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ও পরেরটি বৃহৎ। আকারে কত বড় বা ছোট তা বিবেচ্য বিষয় নয়। কথায় আছে, ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’। প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে মেনে চলার মাধ্যমেই টিকে থাকতে হবে। যুগ যুগান্তর ধরে টিকে থাকার লড়াইয়ে মানুষ সর্বদাই অগ্রগামী। তাই করোনাভাইরাসকেও প্রতিহত করে মানুষ টিকে থাকবে অনন্তকাল, সেই আশা যেমন আমার মনে তেমনি আপনার অন্তরেও।

লেখক: বোস্টনের একটি ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন!