উপেক্ষিত এক বলকান স্বর্গ শহরে

  • রাকিব হাসান রাফি, স্লোভেনিয়া থেকে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2021-06-12 22:10:18 BdST

লন্ডন, প্যারিস, আমস্টারডাম, বার্লিন, লিসবন, বার্সেলোনা, মাদ্রিদ, কোপেনহেগেন, স্টোকহোম, রোম, মিলান, মিউনিখ কিংবা ভিয়েনার মত শহরের ভিড়ে ‘নিশ’ নামটি উপেক্ষিত থেকে যায়।

এমনকি যে সকল ভ্রমণপিপাসু মানুষ ইউরোপে বেড়াতে আসেন তাদের কারও ভ্রমণ তালিকায় ‘নিশ’ সেভাবে গুরুত্ব পায় না। তবে আপনি যদি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক আশ্চর্য মেলবন্ধনের সন্ধান লাভ করতে চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই নিশে পা ফেলতে হবে। পূর্বাঞ্চলীয় রোমান সাম্রাজ্য, যাকে অনেকে বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য হিসেবেও অভিহিত করেন সে বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে অটোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এ শহরের বুকে। এমনকি এখন পর্যন্ত যারা ‘নিশ’ ভ্রমণ করেছেন অনেকে সার্বিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম এ শহরটিকে বলকানের বিষ্ময় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

"ইউরোপ মহাদেশের সীমানা শুরু হয় বলকান অঞ্চলকে ঘিরে আর এ বলকানের হৃদপিণ্ড হচ্ছে নিশ। সত্যি নিশ ভয়ানক এক সুন্দর শহর, একবার নিশে যার পদাচরণা পড়বে, তিনি আজীবন এ শহরে থেকে যেতে চাইবেন। বলকানকে বুঝতে হলে নিশ ভ্রমণ করা অত্যাবশক”, একদিন ক্লাস শেষে আড্ডার ফাঁকে আমার এক সার্বিয়ান বন্ধু ইলিয়া এভাবে নিশের বর্ণনা তুলে ধরেছিলেন আমাদের সকলের সামনে।

এমনকি আজকের থেকে তিন বছর আগে যখন বুলগেরিয়া ঘুরতে যাই তখন আমার সাথে কনোর কাউফোর্ড নামক এক অস্ট্রেলিয়ান পর্যটকের পরিচয় হয়। তিনিও আমাকে নিশ ভ্রমণের পরামর্শ দিয়েছিলেন।

অটোমান শাসনামলে নির্মিত বালি-বেগ মসজিদ, বর্তমানে এটিকে জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারিতে রূপ দেওয়া হয়েছে।

অটোমান শাসনামলে নির্মিত বালি-বেগ মসজিদ, বর্তমানে এটিকে জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারিতে রূপ দেওয়া হয়েছে।

তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ইস্টার্ন থ্রেস থেকে শুরু করে সার্বিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এক সুবিশাল অঞ্চলকে সামগ্ৰিকভাবে বলকান অঞ্চল হিসেবে অভিহিত করা হয়। তুরস্কের ইস্টার্ন থ্রেস ও সার্বিয়া ছাড়াও বুলগেরিয়া, মেসিডোনিয়া, গ্রিস, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, মন্টিনিগ্রো, আলবেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও কসোভোসহ হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয়েছে এ বলকান অঞ্চল। স্থানীয় বলকান পর্বতমালার নাম অনুসারে এ অঞ্চলটিকে ‘বলকান’ নামে অভিহিত করা হয়। যদিও স্থানীয় ভাষায় স্লাভরা এ সকল পর্বতমালাকে ‘স্টারা প্ল্যানিনা’ নামে সম্বোধন করেন।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের চোখে ইউরোপ মহাদেশের সীমানা কেবলমাত্র জার্মানি, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড , ইতালি, স্পেন কিংবা অস্ট্রিয়ার মতো কয়েকটি উন্নত দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই হঠাৎ করে আমাদের দেশের কোনও সাধারণ মানুষ যদি বলকান উপদ্বীপের কোনও দেশে বেড়াতে আসেন রীতিমতো তার চোখ কপালে উঠবে।

বলকান অঞ্চলটিকে ইউরোপের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনুন্নত অবকাঠামো, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অপরিচ্ছন্ন ও জীর্ণশীর্ণ রাস্তাঘাঁট এ সব কিছু যেনও এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই বলে বলকানের দেশগুলোকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কাতারে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। মোটামুটিভাবে এ দেশগুলোকে এখনও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তকমা দেওয়া যায়।  

বলকান উপদ্বীপের এ দেশগুলো আমাকে বারবার আকর্ষণ করার কারণ এ অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। তাই হাঙ্গেরি ও সার্বিয়ার সীমান্তবর্তী শহর সুবোটিচা থেকে যখন সার্বিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর নিশের দিকে যাত্রা শুরু করি রাস্তার দুই ধারের দৃশ্য থেকে চোখ সরাতে পারিনি এক সেকেন্ডের জন্যও। বলকান পর্বতমালার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য যে কোনো মানুষের চিত্ত হরণ করতে বাধ্য, একবার যিনি এ সৌন্দর্যের স্বাদ পেয়েছেন তিনি বাধ্য হয়ে বারবার এ সৌন্দর্যের খোঁজে বলকান উপদ্বীপের কোনও দেশে ফেরত আসতে চাইবেন। এ ধরনের সৌন্দর্য ইউরোপ তো বটেই পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেনও আপনার মনে হবে কোনো এক শিল্পী তাঁর সুনিপুণ তুলির আঁচড়ে পুরো বলকান পেনিনসুলাকে সাজিয়েছেন।

সুবোটিচা থেকে নিশ যাওয়ার পথে রাস্তার দুই ধারে এ ধরনের দৃশ্য হরহামেশা দেখা যায়, বলকান অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যি অতুলনীয়।

সুবোটিচা থেকে নিশ যাওয়ার পথে রাস্তার দুই ধারে এ ধরনের দৃশ্য হরহামেশা দেখা যায়, বলকান অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যি অতুলনীয়।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত যে কোনও দেশের বৈধ ভিসা কিংবা রেসিডেন্ট পারমিট থাকলে কোনও ধরণের ভিসা ছাড়া সার্বিয়া ভ্রমণ করা যায়। সার্বিয়াতে প্রবেশের সময় সেখানকার ইমিগ্রেশনের পক্ষ থেকে কেবলমাত্র পাসপোর্টে একটি অ্যারাইভাল সিল দেওয়া হয়। বিপরীতক্রমে সার্বিয়া থেকে যখন অন্য কোনও দেশে প্রবেশ করা হয় তখন ইমিগ্রেশন পুলিশ পাসপোর্টে একটি ডিপার্চার সিল দেন।

এয়ারবিএনবির সাহায্যে আগের থেকে থাকার জায়গা ঠিক করে রেখেছিলাম। নিশের সিটি সেন্টারের কাছে সেডমগ ইউলা নামক এক জায়গায় এক রাত থাকার জন্য একটি রুম ভাড়া করেছিলাম। যিনি এ রুমের মালিক ছিলেন অর্থাৎ যার থেকে এ রুমটি ভাড়া নিয়েছিলাম তার নাম ছিল মিলান গোলুবোভিচ। মিলান নিশের স্থানীয় অধিবাসী। এক রাত থাকার জন্য আমাকে ১৫ ইউরো গুনতে হয়েছিল।

মিলান আমাকে আগের থেকেই মেসেজ দিয়ে রেখেছিলেন যে আমাকে রিসিভ করার জন্য তিনি নিশের বাস স্টেশনে অপেক্ষা করবেন। তাই সুবোটিচা থেকে যখন নিশের উদ্দেশ্যে আমাদের বাসটি ছেড়ে গেল কিছুক্ষণ পর পর মিলান মেসেজের মাধ্যমে আমার সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছিলেন। বাসের ভেতর ফ্রি ওয়াইফাই থাকায় মিলানের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমার তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি।

সুবোটিচা থেকে বাসে নিশপর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় সাত ঘণ্টা সময় লেগেছিল। এতো লম্বা সময় জার্নি করার পর শরীর ক্লান্ত থাকবে স্বাভাবিক। তাই হালকা ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। মিলান আমার জন্য অবশ্য হালকা জলখাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে না উঠতে দেখি মিলান আমার জন্য সকালের নাস্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমার জন্য তিনি বুরেক নিয়ে এসেছিলেন। বলকান দেশগুলোর মানুষের কাছে একটি জনপ্রিয় খাবারের আইটেম হচ্ছে বুরেক। বুরেককে পাই কিংবা আমাদের দেশের জনপ্রিয় ফাস্টফুড আইটেম পেটিসের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের বুরেক রয়েছে, যেমন- চিজ বা পনিরের বুরেক, স্পিনাচ বা পালং শাকের বুরেক, মাংসের কিমার বুরেক ইত্যাদি। বুরেকের জন্য নিস গোটা বলকান অঞ্চলে বেশ প্রসিদ্ধ এবং বেশিরভাগ সার্বিয়ানদের মতে  সমগ্র বলকান অঞ্চলে সবচেয়ে ভালোমানের বুরেক তৈরি হয় নিশে। স্থানীয়ভাবে যাকে ‘নিশবুরেক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। সকালের নাশতা শেষ করে মিলানের সাথে বেরিয়ে পড়লাম নিশ শহরটিকে ঘুরে দেখার জন্য।

মিলান অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ, তাই তিনি শুরুটা করলেন নিশের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ অর্থোডক্স চার্চ হলি ট্রিনিটি ক্যাথেড্রাল দিয়ে।

সান্ধ্যকালীন আড্ডা শেষে নেভেনা স্টোইকোভিচ ও লেখক।

সান্ধ্যকালীন আড্ডা শেষে নেভেনা স্টোইকোভিচ ও লেখক।

সার্বিয়ার বেশিরভাগ মানুষ খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী। বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের আধিপত্যের কারণে সার্বিয়াতে ক্যাথলিক চার্চের তুলনায় অর্থোডক্স চার্চের বিস্তৃতি ঘটেছে অনেক বেশি। ঢাকা শহরে যেমন কয়েক গজ ব্যবধানে মসজিদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় ঠিক তেমনি সার্বিয়াতে কয়েক গজ পার হতে না হতেই চোখের সামনে ভেসে উঠে ছোটো বড় বিভিন্ন আয়তনের অর্থোডক্স চার্চ। দেশটির রাজনীতিতে অর্থোডক্স চার্চের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি প্রতিবেশি দেশ মন্টিনিগ্রোসহ অর্থোডক্স ভাবাদর্শের দেশগুলোতে সার্বিয়ান অর্থোডক্স চার্চের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে।

নিশাভা নদীর নাম অনুসারে শহরটির নাম রাখা হয়েছে ‘নিশ’।  বাইজেনটাইন সম্রাট প্রথম কনসটানটিন এ শহরটির গোড়াপত্তন করেন। রোমান সাম্রাজ্য বলতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা ইতালির রাজধানী রোমকে বুঝি অথচ শুনে অবাক হবেন যে রোমান সাম্রাজ্যের আঠারো জন শাসকের জন্ম হয়েছিল সার্বিয়াতে। বিখ্যাত রোমান সম্রাট কনস্টান্টিনের জন্ম হয়েছিল এ নিশে।

পৃথিবীর প্রত্যেক শহরের একটি নিজস্ব ল্যান্ডমার্ক থাকে, এ ল্যান্ডমার্ক দ্বারা শহরটিকে পৃথিবীর অন্যান্য শহরের থেকে আলাদা করা হয় এবং বলাবাহুল্য এ ল্যান্ডমার্কটি মূলত শহরটির প্রতিনিধিত্ব করে। আমাদের ঢাকা শহরের ল্যান্ডমার্ক হচ্ছে মতিঝিলের শাপলা চত্বর, ঠিক একইভাবে নিশ শহরের ল্যান্ডমার্ক হচ্ছে ‘নিশ দুর্গ’। একেবারে নিশাভা নদীর পার ঘেঁষেই এ  নির্মাণ করা হয়েছে। অটোমান শাসনামলে নির্মিত এ দুর্গটি সত্যি অসাধারণ স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। নিশ দুর্গ থেকে ভেতরের দিকে একটু পা বাড়ালেই দেখা মিলবে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে নির্মিত বালি বেগ মসজিদ। বর্তমানে অবশ্য মসজিদটি পরিত্যক্ত, সার্বিয়ার সরকার সংস্কারের মাধ্যমে মসজিদটিকে আর্ট গ্যালারির রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

বালি বেগ মসজিদের পাশাপাশি অটোমানদের সময়ে নির্মিত অনেক নিদর্শনও আপনি এখানে খুঁজে পাবেন। বর্তমানে অবশ্য সরকারিভাবে নিশে কেবল একটি মসজিদ রয়েছে, ১৭২০ সালে নির্মিত এ মসজিদটির নাম ইসলাম আগা মস্ক। তবে ২০০৪ সালে এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, পরবর্তীতে ২০১৩ সালে সংস্কারের মাধ্যমে মসজিদটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। এখনও এ মসজিদে নিয়মিত নামাজের আয়োজন করা হয়।

নিশ দুর্গ থেকে আমরা স্কাল টাওয়ারের দিকে ছুটে গেলাম, মূলত এ স্কাল টাওয়ার দেখার উদ্দেশ্যে বেশিরভাগ দর্শনার্থী নিশে হাজির হন।বর্তমানে নিশের এ স্কাল টাওয়ারে ৫৮টির মতো মাথার খুলি রয়েছে।

১৮০৯ সালে নিশের উপকণ্ঠে অবস্থিত চেগার পর্বতমালায় স্টেভান সিন্ডেলিচের নেতৃত্বে একদল বিদ্রোহী সার্ব সৈন্য একত্রিত হন। সার্বিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসন থেকে মুক্ত করতে তিনি যুদ্ধের ঘোষণা দিলেও অটোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত সেনাবাহিনী তার হাতে ছিল না। তাই অটোমান সেনাবাহিনী স্টেভান সিন্ডেলিচ ও তার সাথে থাকা বিদ্রোহী সেনাদলকে সহজে ঘিরে ফেলে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে স্টেভান সিন্ডেলিচ আত্মঘাতী আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কোনওভাবেই অটোমানদের কাছে আত্মসমর্পণের পক্ষপাতি ছিলেন না। আগের থেকে মজুদ করে রাখা গান পাউডারে তিনি আগুন ধরিয়ে দেন, ফলে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয় এবং স্টেভান সিন্ডেলিচসহ আশেপাশে থাকা সকল বিদ্রোহী সার্ব ও অটোমান সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়।

নিশের সিটি সেন্টারের উপকণ্ঠে অবস্থিত টিংকারস অ্যালে, এ সড়কটি অটোমান শাসনামলে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে কারুশিল্পের জন্য এক প্রসিদ্ধ স্থান  হিসেবে গড়ে উঠেছিল।

নিশের সিটি সেন্টারের উপকণ্ঠে অবস্থিত টিংকারস অ্যালে, এ সড়কটি অটোমান শাসনামলে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে কারুশিল্পের জন্য এক প্রসিদ্ধ স্থান  হিসেবে গড়ে উঠেছিল।

যদিও সে যাত্রায় তাদের স্বাধীনতা আন্দোলন আলোর মুখ দেখেনি, তবে বিশাল সংখ্যক অটোমান সেনাসদস্যের মৃত্যু স্থানীয় গভর্নর হুরশিদ পাশাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। গভর্নর হুরশিদ পাশা তাই সেনাপতি স্টেভান সিন্ডেলিচসহ তার অধীনে থাকা সার্ব সেনাদের মৃতদেহ থেকে মাথাকে বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন এবং সেখান থেকে মাথার খুলিকে অবমুক্ত করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সেগুলোকে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মেহমুদের আছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সুলতান দ্বিতীয় মেহমুদ এ সকল মাথার খুলিকে পুনরায় নিশে ফেরত পাঠান।

পরবর্তীতে অটোমানরা এ সকল মাথার খুলিকে একত্রিত করে একটি টাওয়ার নির্মাণ করেন। মূলত বিদ্রোহী সার্বদের মাঝে ভীতির সঞ্চার করতে অটোমানরা এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক মতামত ব্যক্ত করেছেন।

স্কাল টাওয়ার থেকে আমাদের গন্তব্য ছিলো বুবানি ন্যাশনাল পার্ক। নিশের দক্ষিণ-পশ্চিমে নিশ ও স্কুপিয়ের সংযোগ সড়কে এর অবস্থান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনী কর্তৃক নিশ ও এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে প্রায় দশ থেকে বারো হাজার মানুষের প্রাণবিয়োগ ঘটেছিল। বুবানির এ স্থানটি ছিল মূলত একটি এক্সিকিউশন স্কোয়াড যেখানে তাদের হত্যা করা হয়েছিল ও তাদের মৃতদেহকে গণকবর দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিহত এ সকল মানুষকে স্মরণ করতে পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে এখানে একটি মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়েছে।

নিশের সিটি সেন্টারটি আয়তনে খুব বড় না হলেও অত্যন্ত পরিপাটি। সার্বিয়াতে সিরিলিক এবং লাতিন দুই ধরনের বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়। নিশের সিটি সেন্টারের মূল চত্বরভূমিটি প্রাথমিকভাবে ‘কিং মিলানস স্কয়ার’ নামে পরিচিত। ১৮৬৮ সাল থেকে ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত সার্বিয়ার শাসনভার তার অধীনে ছিল।

তার হাত ধরে সার্বিয়া অটোমান সাম্রাজ্যের থেকে স্বাধীনতার স্বাদ পায়। নিশের সিটি সেন্টারে তার স্মরণে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ‘কিং মিলানস স্কয়ার’ থেকে সামান্য কয়েক গজ হাঁটলে ‘স্টেভান স্রেমাক অ্যান্ড কালচা মনুমেন্ট’ নামে আরও একটি বিখ্যাত ভাস্কর্য দেখতে পাবেন। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে স্টেভান স্রেমাক একজন জনপ্রিয় লেখক হিসেবে পরিচিত। আর কালচা হচ্ছে স্টেভান স্রেমাক রচিত বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইভকোভা স্লাভা’ এর অন্যতম আলোচিত চরিত্র।

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার শ বছরের অটোমান শাসন সার্বিয়ার স্থানীয় হস্তশিল্প ও সিরামিক শিল্পকে করেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নিশের সিটি সেন্টারের উপকণ্ঠে অবস্থিত টিংকারস অ্যালে নামক সড়কটি অটোমান শাসনামলে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে কারুশিল্পের জন্য এক প্রসিদ্ধ স্থান হিসেবে গড়ে উঠেছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কৌচসার্ফিং এর মাধ্যমে আগের থেকে আমার সাথে নেভেনা স্টোইকোভিচ নামক এক তরুণীর পরিচয় হয়েছিল। বিকালে নেভেনার দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী তার সাথে দেখা করতে যাই।

বিদায়ের সময় মিলান গোলুবোভিচের সাথে লেখক

বিদায়ের সময় মিলান গোলুবোভিচের সাথে লেখক

বলকান দেশগুলোতে এক ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চা আমি লক্ষ্য করেছি। যখন বিপরীত লিঙ্গের দুইজন ব্যক্তি একে অন্যের সাথে সাক্ষাৎ করে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে এবং একজনের গালের সাথে অন্য জনের গাল লাগিয়ে চুমো খায়। একে বলা হয় ‘চিক কিস’। আমাকে দেখার সাথে সাথে নেভেনা জড়িয়ে ধরলো এবং আমার গালে চুমু আঁকলো। আমি একইভাবে তাকে জড়িয়ে ধরলাম এবং তার গালে চুমু আঁকলাম।

বয়সের দিক থেকে নেভেনা আমার চেয়ে ১৪ বছরের বয়োজ্যেষ্ঠ। রূপ লাবণ্যের দিক থেকে নেভেনা কোনও অংশে বলিউড কিংবা হলিউডের নায়িকাদের থেকে কম নয়। নেভেনা মনোবিজ্ঞানের ওপর স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। যদিও বর্তমানে তিনি একজন স্কুল শিক্ষক এবং তিনি মূলত বাচ্চাদেরকে ইংরেজি ও চায়নিজ শেখান। নেভেনা সার্বিয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক আমার কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করলেন।

সার্বিয়া তথা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সংস্কৃতিতে আরও দুইটি জিনিস লক্ষ্য করলাম যা সচরাচর ইউরোপের অন্যান্য দেশে দেখা যায় না। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে দেখা হয়, সচরাচর আমরা রক্ষণশীল দেশগুলোতে যে রকম দেখি। যেমন- সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া, বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, গ্রিস, মন্টিনিগ্রো, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়ায় আপনি যদি কোনও মেয়েকে ডেটিং এর জন্য প্রস্তাব দেন এবং তাকে কোনও রেস্তোরাঁয় আমন্ত্রণ জানান, তাহলে আপনাকে ওই মেয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। এমনকি রেস্তোরাঁর খাবার গ্রহণ শেষে তার বিলও আপনাকে পরিশোধ করতে হবে। আমাদের এ উপমহাদেশের মতো এ সকল দেশের মেয়েরাও বিয়ের পূর্বে ছেলের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে। বলকান উপদ্বীপের দেশগুলোতে পরিবার প্রথা এখনও জোরালোভাবে প্রচলিত। আরেকটা জিনিস, সার্বিয়া কিংবা বলকান রাষ্ট্রগুলোতে আপনি যদি জুতা পায়ে কারও গৃহে প্রবেশ করেন তাহলে এ বিষয়টিকে সেখানকার মানুষ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবেন না। আপনাকে জুতা খুলে বাহিরে রাখতে হবে অথবা আপনার জুতা যুগলকে খুলে হাতে নিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে।  

ফেরার সময় নেভেনাকে জড়িয়ে ধরলাম এবং তার সাথে স্মৃতি হিসেবে কিছু ছবি রাখলাম।

বলকান অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কতোটা অনন্য সাধারণ সেটা নিশে না আসলে কোনও দিনও বুঝতাম না। নিশের প্রেমে সত্যি আমি দেওয়ানা, তাই যখন মস্তিষ্কের স্মৃতিপটে নিশের সে রঙিন মুহূর্তগুলো ভেসে উঠে কেনও জানি তখন নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মাঝে-মধ্যে আফসোস হয়, যদি নিশ ভ্রমণের প্রত্যেকটি মুহূর্তকে ভিডিও এর মতো রেকর্ড করে রাখতে পারতাম।

বলকান উপদ্বীপের সৌন্দর্য যিনি আবগাহন করতে পেরেছেন তিনি কোনও দিনও তা ভুলতে পারেন না, তাই পৃথিবীর অন্য কোনও দেশ তার কাছে ভালো লাগে না। এজন্য মিলান কয়েকবারের চেষ্টার পরও ডেনমার্কে গিয়ে থিতু হতে পারে নি, তাকে ফিরে আসতে হয়েছে নিশের ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে। সার্বিয়ার প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি ততোটা নমনীয় নয়। কিন্তু নিশের প্রতি আমি সব সময় দুর্বল। ক্লাসমেট ইলিয়ার কথাগুলোর তাৎপর্য আমার চোখের সামনে কখনও ধরা দিত না যদি না নিশ ভ্রমণের সুযোগ হতো। বলাবাহুল্য আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর শহরগুলোর মধ্যে নিশ একটি।

লেখক: শিক্ষার্থী, ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন ফিজিক্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

ইমেইল: rakib.rafi786@gmail.com

ছবি: রাকিব হাসান রাফি

প্রবাস পাতায় আপনিও লিখতে পারেন। প্রবাস জীবনে আপনার ভ্রমণ,আড্ডা,আনন্দ বেদনার গল্প,ছোট ছোট অনুভূতি,দেশের স্মৃতিচারণ,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক খবর আমাদের দিতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা probash@bdnews24.com। সাথে ছবি দিতে ভুলবেন না যেন