করোনাভাইরাস: এখনও যা জানার বাকি

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-04-03 11:05:26 BdST

ঘরবন্দি মানুষের মনে হতেই পারে, এই দুঃসময় চলছে বহু যুগ ধরে; কিন্তু এই বিশ্ব আসলে নতুন করোনাভাইরাসের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে মাত্র তিন মাস আগে।

এই তিন মাসে নভেল করোনাভাইরাস বিজ্ঞানীদের কাছে রীতিমত সাধনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তারপরও এ ভাইরাসের অনেক দিক এখনও তাদের বোঝার বাকি।

আতঙ্ক আর সচেতনার অভাবে মানুষ কান দিচ্ছে নানা গুজবে। বিজ্ঞানীদের মত সাধারণ মানুষের মধ্যেও রয়েছে নানা প্রশ্ন, যার উত্তর খুঁজছে পুরো বিশ্ব।

এক প্রতিবেদনে এমন কিছু প্রশ্ন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে বিবিসি।

আসলে আক্রান্ত কত?

এটা খুবই মৌলিক প্রশ্ন, কিন্তু উত্তরটা সহজ নয়।

ইতোমধ্যে পরীক্ষা করে লাখ লাখ মানুষের শরীরে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তবে গবেষকদের অনেকেরই ধারণা, ওই সংখ্যাটি মোট আক্রান্তের একটি অংশ মাত্র।

বিষয়টিকে আরও বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে সেই সব রোগীদের সংখ্যা, যাদের মধ্যে সংক্রমণ ঘটেছে, কিন্তু উপসর্গ সেভাবে প্রকাশ পায়নি।

কারও শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে সাধারণভাবে তার শরীরে ওই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি হয়। যদি সেই এন্টিবডি তৈরি করার একটি ভালো পদ্ধতি পাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে হয়ত আক্রান্তের সংখ্যা সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া যাবে।

কতটা প্রাণঘাতী এ ভাইরাস?

কত মানুষের দেহে সংক্রমণ ঘটেছে তা নিশ্চিত করে জানা না গেলে মৃত্যুহারও সঠিকভাবে বলা সম্ভব না। বিভিন্ন দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান হিসাব করে বলা যায়, এখন পর্যন্ত মৃত্যুহার ৫ শতাংশের কম। তবে আক্রান্ত হলেও উপসর্গ দেখা যায়নি এমন রোগীর সংখ্যা বেশি হলে মৃত্যুহার কমে আসবে। 

উপসর্গ আসলে কী কী

জ্বর ও শুকনো কাশিই নভেল করোনাভাইরাসজনিত রোগ কোভিড-১৯ এর প্রাথমিক উপসর্গ, যেগুলো থাকলে সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

এছাড়া গলাব্যথা, মাথাব্যথা এবং কারো কারো ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার মত উপসর্গের কথাও এসেছে। কিছু ঘটনায় রোগীর গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পাওয়ার কথাও এসেছে।

আবার সর্দি কিংবা হাঁচির মত উপসর্গ, যেগুলো সাধারণ ফ্লুতে দেখা যায়, সেরকমও অনেকের মধ্যে দেখা যেতে পারে।

গবেষণা বলছে, উপসর্গ প্রকাশ না পাওয়ায় অনেকেই হয়ত নিজেদের অজ্ঞাতে ভাইরাসটি বহন করছেন এবং অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। 

শিশুদের থেকে এই ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কতটুকু?

শিশুদের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটবে না এমন নয়। তবে পরিসংখ্যান বলছে, এই ভাইরাসে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যুর হার অন্য বয়সশ্রেণির তুলনায় অনেক কম।

ঝুঁকির বিষয় হচ্ছে, শিশুদের থেকে বড়দের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। কারণ তারা বড়দের কাছে যায়, মাঠে খেলতে যায়।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল বাড়িয়ে চলা কভিড-১৯ শিশুদের মাধ্যমে কতটা ছড়াচ্ছে, সেই চিত্রটি এখনও স্পষ্ট নয় গবেষকদের কাছে। 

নভেল করোনাভাইরাস কোথা থেকে এল

গত ডিসেম্বরের শেষে চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে এক বাজার থেকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়, যেখানে বন্যপ্রাণীও কেনাবেচা হত।

সার্সের করোনাভাইরাসের জ্ঞাতি ভাই এ নতুন ভাইরাসকে সার্স-সিওভি-২ নামেও ডাকা হচ্ছে। বাদুরে এই ভাইরাস দেখা গেলেও একটি মধ্যবর্তী কোনো প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের শরীরে এসেছে বলে মনে করা হয়।

কিন্তু সেই যোগসূত্রটি এখনও স্পষ্ট নয় গবেষকদের কাছে। আর যতদিন তা অজানা থাকবে, নতুন প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

গরমে ভাইরাসের প্রকোপ কমে আসবে?

শীতকালে জ্বর-সর্দি সহজেই কাবু করে মানুষকে। গরমে এই সমস্যা কম হয়। তবে গরমকালে নভেল ভাইরাসের সংক্রমণ কমবে কি না- নিশ্চিত করে তার উত্তর দেওয়ার মত প্রমাণ গবেষকরা এখনও পাননি।

যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঋতু বদল এই ভাইরাসের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। তবে প্রভাব যদি থেকেও থাকে, তা সাধারণ জ্বর-সর্দি বা ফ্লুর ভাইরাসের ক্ষেত্রে যে প্রভাব, তারচেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। 

গরমে যদি সংক্রমণের হার সত্যি সত্যি অনেক কমে যায়, তাহলে এই আশঙ্কাও থাকবে যে শীতে হয়ত সংক্রমণের হার আবার বেড়ে যাবে। আর ওই সময়টায় এমনিতেই হাসপাতালে সাধারণ ফ্লুর রোগীর ভিড় লেগে থাকে।

কারো কারো অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয় কেন?

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই মৃদু অসুস্থতা অনুভব করেন। তবে ২০ শতাংশের অসুস্থতা গুরুতর রূপ পায়।

এর একটি কারণ হতে পাারে ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। ওই ক্ষমতা যার যত সক্রিয়, তার মধ্যে অসুস্থতার মাত্রা হয়ত তত কম। এক্ষেত্রে জেনেটিক গঠনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ বিষয়গুলো বোঝা গেলে রোগীকে আইসিইউতে না রেখেও চিকিৎসা দেওয়ার পথ পাওয়া যেতে পারে।

একবার সেরে উঠলে আবার হতে পারে?

এ বিষয়ে যত জল্পনা কল্পনা আছে, প্রমাণ তেমন কিছুই বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কারও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একবার জয়ী হলে, সেই এন্টিবডি যে স্থায়ী হবে, সেই নিশ্চিয়তাও তাই পাওয়া যাচ্ছে না।

এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরাদের মধ্যে কারও কারও পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার খবর কিছু জায়গায় এসেছে। সেক্ষেত্রে পরীক্ষায় ভুল থাকার সম্ভাবনা থেকেই যায়। অর্থাৎ এমন হতে পারে যে, পরীক্ষায় করোনাভাইরাস নেগেটিভ আসায় রোগীকে যখন ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, তখনও হয়ত তার মধ্যে সংক্রমণ ছিল।

আর এই ভাইরাসের সঙ্গে গবেষকদের পরিচয় যেহেতু মাত্র তিন মাসের, সেহেতু নিশ্চিত করে কিছু বলার মত পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্তও গবেষকদের হাতে নেই।

তবে ভবিষ্যতে এ ভাইরাসকে মোকাবেলা করার জন্যই এন্টিবডির বিষয়ে ফয়সালা হওয়াটা জরুরি।

এ ভাইরাস কি নিজেকে বদলাচ্ছে?

ভাইরাসের ক্ষেত্রে জিনগত পরিবর্তন খুব সাধারণ ঘটনা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিনকাঠামোতে ওই পরিবর্তন খুব বড় কোনো পার্থক্য তৈরি করে না।

সাধারণভাবে মনে হতে পারে যে যত দিন যাবে, এ ভাইরাস মানুষের জন্য তত কম ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তবে সেটা যে হবেই, সেই নিশ্চয়তাও দেওয়া সম্ভব না।

সমস্যাটা হচ্ছে, এ ভাইরাস যদি নিজেকে বদলে ফেলতে পারে, তাহলে শরীরে আগে তৈরি হওয়া এন্টিবডি হয়ত আর তাকে চিনতে পারবে না। তখন পুনরায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।