করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি ‘স্বল্পস্থায়ী’: গবেষণা

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-06-22 09:06:01 BdST

করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রশ্নটি বিজ্ঞানীদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ভাইরাসে সংক্রমিত সবার শরীরেই কি অ্যান্টিবডি তৈরি হয়? আর যদি হয়ও, সেটি কত দিন স্থায়ী হয়?

নেচার মেডিসিনে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় শরীরে তৈরি অ্যান্টিবডি বা প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন কেবল দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে; বিশেষত এমন ব্যক্তিদের মধ্যে, যারা আক্রান্ত হলেও কোনো উপসর্গ প্রকাশ পায়নি।

এর মানে এই নয় যে এই মানুষগুলো দ্বিতীয়বারের মতো আক্রান্ত হতে পারেন। কারণ বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, স্বল্প মাত্রার শক্তিশালী অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও তা ভবিষ্যতে সুরক্ষা দিতে পারে। আর অ্যান্টিবডি ছাড়াও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় আছে ‘টি সেল’ ও ‘বি সেল’।

তবে নিবন্ধের লেখকরা সতর্ক করে বলেছেন, কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠলেই কেউ ‘ইমিউনিটি সার্টিফিকেট’ পেয়ে যাবেন, তা ভাবাটা ঠিক হবে না।

সার্স ও মার্স রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসসহ অন্যান্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে দেহে তৈরি অ্যান্টিবডিগুলো প্রায় এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয় বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী নতুন করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডিগুলোও অন্তত একই সময় স্থায়ী হতে পারে।

আগের বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, উপসর্গ প্রকাশ পেয়েছে এমন কোভিড-১৯ রোগীদের বেশিরভাগের শরীরেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। তবে এই অ্যান্টিবডিগুলো কতদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয় তা স্পষ্ট নয়।

নতুন গবেষণাটি হয়েছে আক্রান্ত কিন্তু উপসর্গ প্রকাশ পায়নি এমন মানুষদের দেহে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতিক্রিয়া দেখতে।

গবেষকরা চীনের ওয়াংজু অঞ্চলের উপসর্গ ছাড়া আক্রান্ত ৩৭ জনের সঙ্গে উপসর্গসহ সমসংখ্যক আক্রান্তের তুলনা করেছেন। তারা দেখেছেন যে যাদের উপসর্গ ছিল না তাদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া উপসর্গসহ আক্রান্তদের চেয়ে দুর্বল।

এ গবেষণায় অবশ্য নমুনার আকার ছোট। আর গবেষকরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে সক্ষম ইমিউন সেলের নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থাকে হিসেবে ধরেননি।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে কোষীয় পর্যায়েও দৃঢ় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট অ্যাঞ্জেলা রাসমুসেন বলেন, “বেশিরভাগই সাধারণত ‘টি সেল ইমিউনিটি’ সম্পর্কে অবগত নন। তাই বেশিরভাগ আলোচনার কেন্দ্রে থাকছে অ্যান্টিবডির মাত্রা।”

ভাইরাসে মারতে সক্ষম ‘টি সেল’ ছাড়াও আক্রান্তদের দেহে ‘বি সেল’ তৈরি হয়। ‘বি সেল’ এর কাজ হচ্ছে প্রয়োজনের সময় অ্যান্টিবডি তৈরির প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো।

করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডিগুলো নিয়ে বেশ কয়েকটি গবেষণা চালানো মাউন্ট সিনাইয়ের আইকান স্কুল অফ মেডিসিনের ভাইরোলজিস্ট ফ্লোরিয়ান ক্র্যামার বলেন, “যদি ‘বি সেল’ আবার ভাইরাসের উপস্থিতি টের পায় তবে তারা তাদের স্মৃতি থেকে খুব দ্রুত অ্যান্টিবডিগুলো তৈরি করতে শুরু করে।”

চীনা গবেষণায় দেখা গেছে, ভাইরাসের প্রোটিনের বিরুদ্ধে কাজ করা কিছু অ্যান্টিবডি শনাক্তযোগ্য মাত্রার নিচে চলে গেছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনকে আক্রমণ করতে সক্ষম আরেক সেট অ্যান্টিবডির উপস্থিতি রয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, কম মাত্রায় উপস্থিত থাকলেও অ্যান্টিবডিগুলো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে যথেষ্ট।

করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ২০ থেকে ৫০ শতাংশের অসুস্থতার বাহ্যিক লক্ষণ কখনোই দেখা না যেতে পারে।

গবেষণাটিতে দেখা গেছে, আক্রান্ত কিন্তু উপসর্গ নেই অর্থাৎ অ্যাসিম্পটম্যাটিক রোগীরা ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়। এবং তারা যাদের উপসর্গ দেখা দিয়েছে তাদের চেয়ে বেশি সময় ভাইরাস ছড়াতে পারে।

তবে ড. রাসমুসেন ও অনান্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাসিম্পটম্যাটিক রোগীরা বেশি ভাইরাস ছড়ালেও সেই ভাইরাস অন্যদের আক্রান্ত করতে সক্ষম কিনা তা স্পষ্ট নয়।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরাল ইমিউনোলজিস্ট আকিকো ইওয়াসাকি বলেন, “অ্যাসিম্পটম্যাটিক রোগীরা সংক্রমণ করতে সক্ষম ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে নাকি কেবল মৃত ভাইরাসের অবশিষ্টাংশ ছড়াচ্ছে তা জানাটা জরুরি।”

ডা. ইওয়াসাকি নতুন দুটি গবেষণাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “এই নিবন্ধগুলো শক্তিশালী ভ্যাকসিন তৈরির প্রয়োজনীয়তার উপর আলোকপাত করছে। কারণ সংক্রমণ চলার সময় প্রাকৃতিকভাবে বিকাশ ঘটে এমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে কম এবং বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে কম সময় স্থায়ী হয়।

তার মতে, প্রাকৃতিকভাবে সবার মধ্যে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যাবে - এমনটা আশা করা যাবে না।