ভোটারদের চাওয়া, ইভিএম যেন গড়বড় না করে

  • তাবারুল হক, নিজস্ব প্রতিবেদক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2018-12-22 09:39:01 BdST

যন্ত্রে কীভাবে ভোট দিতে হয়, তা শিখে সহজ মনে হলেও নির্বাচনের দিন ইভিএম মেশিন ঠিক থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ী ঢাকা-১৩ ও ঢাকা-৬ আসনের অনেক ভোটার।

আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে যে ছয়টিতে যন্ত্রে ভোটগ্রহণ হবে, তার দুটি ঢাকা-১৩ ও ঢাকা-৬ আসন। এই দুই আসনের ছয় লাখ ৪২ হাজার ৪৫ ভোটারের সবার ভোটই নেওয়া হবে যন্ত্রে।

ইভিএমে ভোটগ্রহণের সঙ্গে পরিচয় করাতে আসন দুটির কেন্দ্রে কেন্দ্রে ইভিএম (ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন) প্রদর্শন করছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তা চলবে।

জাতীয় নির্বাচনে প্রথম ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসির এই প্রদর্শনীতে ভোটারদের দেখানো হচ্ছে, কীভাবে সহজে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে যন্ত্রের মাধ্যমে ভোট দেওয়া হয়।

ঢাকা-১৩ আসনের আগারগাঁওয়ে সরকারি সংগীত কলেজ কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার ইভিএম প্রদর্শনীতে এসেছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী খলিল ইব্রাহিম।

ইভিএম সম্পর্কে কী ধারণা পেয়েছেন- জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা তো খুব ইজি ব্যাপার। একবার দেখিয়ে দিলে যে কেউ পারবে।”

“ইভিএমে আমি যখন ভোট দিচ্ছি, স্ক্রিনে তখন আমার ছবি দেখানো হচ্ছে। পরে বাটন চেপে ভোট দেওয়া হল,” উচ্ছ্বাস নিয়েই বলেন তিনি।

শ্যামলী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ‘মক ভোট’ দিতে এসেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মুকুল সরকার; তার কাছে ‘মোবাইল টেপার চেয়েও সহজ’ মনে হয়েছে ইভিএমে ভোট দেওয়া।

“তবে এটি যেহেতু যন্ত্র, নির্বাচনের দিন ঠিকটাক মতো কাজ করলেই হয়,” বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন তিনি।

বাংলাদেশে ইভিএমের যাত্রা শুরু ২০০৮ সালে। তারপর স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হলেও জাতীয় নির্বাচনে এবারই প্রথম।

ইভিএমে ভোটগ্রহণ দ্রুত এবং ফল সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া গেলেও স্থানীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণের সময় ইভিএমে যান্ত্রিক গোলযোগের ঘটনাও ঘটেছে, যা আবার ভোটগ্রহণ বিঘ্নিত করেছে।

ঢাকা-৬ আসনের হামিদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ইভিএম প্রদর্শনীতে এসেছিলেন সাবেক ব্যাংকার ষাটোর্ধ্ব আবু বক্কর সিদ্দিক।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সবই তো দেখলাম, বুঝলাম। কিন্তু নির্বাচনের দিন যদি মেশিনগুলো ডিস্টার্ব করে এবং পর্যাপ্ত মেশিন যদি না রাখা হয়, তাহলে তো মহা মুশকিল হবে। তখন নির্বাচন কমিশনের কী করার আছে? সেটাও ভাবতে হবে।”

ভোটারদের সংশয়ের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব ও এনআইডি উইংয়ের পরিচালক আব্দুল বাতেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভোট গ্রহণের জন্য প্রতিটি ভোট কক্ষে একটি করে ইভিএম থাকবে। তার সঙ্গে আরও একটি ইভিএম ‘রিজার্ভ’ রাখা হবে।

এর বাইরে প্রতি ভোটকেন্দ্রে আরও কয়েকটি মেশিন রাখা হবে বলে জানান তিনি, যাতে কোনো ধরনের জটিলতার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়।

তবে ইভিএম কেন্দ্রেগুলোতে মেশিনের বিকল্প মেশিনই রাখা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “বিকল্প হিসেবে এসব কেন্দ্রে ব্যালট পেপার রাখা হবে না।”

বর্তমানে ইসি যে ইভিএম ব্যবহার করছে, তাতে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা করছেন না বাতেন।

তিনি বলেন, “সবগুলো মেশিন আমরা পরীক্ষা করেই দিচ্ছি। প্রতিটি কেন্দ্রে টেকনিক্যাল টিম থাকবে, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী থাকবে।”

এবারে ভোটের প্রস্তুতি পর্ব থেকে আলোচনায় এই ইভিএম। বিএনপি যন্ত্রে ভোটগ্রহণের ব্যবহারের ঘোর বিরোধী হলেও আওয়ামী লীগের সমর্থনের মধ্যে ইসি সংসদ নির্বাচনে প্রথম ইভিএম ব্যবহারে এগিয়ে যায়।

ঢাকা-৬ আসনের টিকাটুলি কামরুন্নেছা সরকারি বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার, রাজধানীর হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজের স্নাতকের শিক্ষার্থী আমিনুর রহমান শাওন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যন্ত্রের মাধ্যমে ভোট দেওয়া খুবই সহজ। তবে গণনা ও ফলাফল কেমন হবে, সেই বিষয়ে তো আমাদের কোনো ধারণা নেই।”

ঢাকার টিকাটুলির কামরুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার ইভিএমে পরীক্ষামূলক ভোট দিচ্ছেন ঢাকা-৬ আসনের এক ভোটার। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

ঢাকার টিকাটুলির কামরুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার ইভিএমে পরীক্ষামূলক ভোট দিচ্ছেন ঢাকা-৬ আসনের এক ভোটার। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

শাওনের সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া গেল ঢাকা-১৩ আসনের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একাডেমি কেন্দ্রের ইভিএম প্রদর্শনীতে আসা ভোটার আলভি জাহানের কথায়।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইভিএম মূলত অপারেট করবেন নির্বাচন কর্মকর্তা, এখন তারা যেভাবে অপারেট করবেন সেইভাবেই তো হওয়ার কথা। সেখানে যদি কোনো কারচুপি হয়, তাহলে তো আমাদের দেখার বা বোঝার সুযোগ থাকবে না।”

ইভিএমে কোনো কারচুপির অভিযোগ উঠলে নির্বাচন কমিশন কী করবে- জানতে চাইলে যুগ্ম সচিব বাতেন বলেন, “না না, কীভাবে কারচুপি? মুখে বললেই তো হবে না, সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ লিখিতভাবে অভিযোগ দিতে হবে। তখন তাকেই (অভিযোগকারী) প্রমাণ করে দেখাতে হবে।

“যদি প্রমাণ না দেখাতে পারেন তখন তার বিরুদ্ধে উল্টো নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নির্বাচন কমিশনের এই কর্মকর্তা বলেন, কোনো ‘ত্রুটিপূর্ণ জিনিস’ তারা জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চান না। কিন্তু ত্রুটি না থাকলে তার দায়ও ইসি নেবে না।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে নির্বাচন কমিশন জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ আনার পর থেকেই বিএনপি এর ঘোর বিরোধিতা করে আসছে।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গত ৩১ অগাস্ট এক বক্তব্যে ইভিএমকে ‘ভোটচুরির যাদুর বাক্স’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একাডেমি কেন্দ্রের ভোটার সিহাবুল ইসলাম শাহিন ইভিএমকে একটি সুযোগ দেওয়ার পক্ষে। 

তিনি বলেন, “ইভিএম যেহেতু আমাদের এবার নতুন, একবার ভোট দেওয়ার পর বোঝা যাবে এর প্রকৃত অবস্থাটা কী দাঁড়ায়।”

ইভিএম প্রদর্শনীতে যা হচ্ছে

ঢাকা-৬ আসনের ৯৮টি কেন্দ্রের ইভিএম প্রদর্শনীর দায়িত্বে আছেন সূত্রাপুর থানা নির্বাচন কর্মকর্তা মাহবুবা আক্তার। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, গত ৮ ডিসেম্বর থেকে স্বল্প পরিসরে ছিল প্রদর্শনী, ১৮ ডিসেম্বর থেকে ব্যাপক পরিসরে শুরু হয়েছে।

“আমরা প্রদর্শনীতে মূলত একজন ভোটার কত সহজে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট দিতে পারেন, সেই বিষয়গুলো দেখিয়ে যাচ্ছি। যেসব এলাকায় এখন পর্যন্ত আমরা গেছি, সেসব এলাকার বহু ভোটার আগ্রহ নিয়ে ইভিএম দেখতে এসেছেন, তারা মক ভোট দিয়েছেন।”

কেন্দ্রে কেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ইভিএম প্রদর্শনীর পাশাপাশি ইভিএমে ভোট দেওয়ার বিষয়ে সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি হচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৪ এবং ৩৭ থেকে ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড, মোট ১১টি ওয়ার্ড নিয়ে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেণ্ডারিয়া, কোতোয়ালি ও বংশাল থানার একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-৬ আসনে ভোটার মোট দুই লাখ ৬৯ হাজার ২৭৬ জন। এই আসনে মোট প্রার্থী আটজন।

ঢাকা-১৩ আসনে ১৩৪টি ভোট কেন্দ্র রয়েছে। এর অর্ধেকের মতো কেন্দ্রে ইভিএম প্রদর্শনী হয়েছে, ২৭ ডিসেম্বরের মধ্যে সবগুলো কেন্দ্রে ভোটারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বলে মোহাম্মদপুর থানা নির্বাচন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮ থেকে ৩৪ নম্বর, সাতটি ওয়ার্ড নিয়ে মোহাম্মদপুর, আদাবর, আগারগাঁও এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৭২ হাজার ৭৬৯ জন। এই আসনে মোট প্রার্থী ১০ জন।

ইভিএমে ভোট হয় যেভাবে

নির্বাচন কমিশন আসন্ন সংসদ নির্বাচনে যে ইভিএম ব্যবহার করবে, একই ধরনের যন্ত্র এর আগে রংপুর, খুলনা, গাজীপুর ও বরিশাল সিটি নির্বাচনে ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়া যন্ত্রে ভোটগ্রহণ নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইভিএম মেলারও আয়োজন করেছে নির্বাচন কমিশন।

এ যন্ত্রে আঙ্গুলের ছাপ, ভোটার নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর বা স্মার্ট পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভোটার শনাক্ত করা হয়। নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ভোটকক্ষে একজন পোলিং অফিসার ভোটার ভেরিফিকেশনের কাজটি করেন ।

ডেটাবেইজে ভোটার বৈধ বা অবৈধ হিসেবে শনাক্ত হলে প্রজেক্টরের মাধ্যমে তা দেখতে পান পোলিং এজেন্টরা।

ভোটার বৈধ হলে মেশিনে কুইক রেসপন্স কোড (QR CODE) এবং কিছু তথ্য সম্বলিত একটি টোকেন প্রিন্ট হবে, যা ভোটারকে দেওয়া হয়।

ভোটার টোকেন নিয়ে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছে গেলে ভোটিং মেশিনের QR CODE স্ক্যানারের মাধ্যমে তার টোকেন শনাক্ত করে গোপন কক্ষে থাকা ব্যালট ইউনিটে ব্যালট ইস্যু করা হবে।

ভোটার পছন্দের প্রার্থী ও প্রতীক দেখে বাঁ দিকের বোতামে চাপ দিয়ে সিলেক্ট করবেন। ওই ব্যালট ইউনিটে সবুজ রংয়ের CONFIRM বোতামে চাপ দিলে তার ভোট দেওয়া হয়ে যাবে।

কখনও ভুল প্রতীক সিলেক্ট করা হলে, ব্যালট ইউনিটের লাল রংয়ের CANCEL বোতাম চেপে পরে যে কোনো প্রার্থীকে আবার সিলেক্ট করা যাবে।

এভাবে দুই বার CANCEL করা যাবে, তৃতীয়বার যেটি সিলেক্ট করা হবে, সেটি বৈধ ভোট হিসেবে গৃহীত হবে।