ভোট দেবেন যেভাবে

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2018-12-29 21:13:16 BdST

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন দেশের প্রায় সাড়ে দশ কোটি ভোটার, যাদের ভোটে নির্বাচিত হবে পরবর্তী সরকার।

রোববার দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা-৬, ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৯, রংপুর-৩, খুলনা-২ এবং সাতক্ষীরা-২ আসনে ভোটগ্রহণ হবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম)। বাকি ২৯৩টি আসনে সনাতন পদ্ধতিতে ব্যালট পেপার ব্যবহার করে ভোট হবে। 

এবারের ১০ কোটি ৩৮ লাখ ২৬ হাজার ৮২৩ জন ভোটারের মধ্যে সোয়া দুই কোটি ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। গত ১০ বছরে ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া এই তরুণ নাগরিকদের মধ্যে অনেকেই প্রথমবার ভোট দেবেন এবার।

ভোট দিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন পড়বে না। তবে ভোটারের এনআইডি নম্বর, ভোটার নম্বর বা স্মার্ট কার্ড সঙ্গে থাকলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বের করতে সুবিধা হবে।

ভোটারদের কেন্দ্র ও ভোটার নম্বর জেনে নেওয়ার সুবিধার জন্য ওয়েবসাইটের পাশাপাশি এসএমএস সেবা চালু করেছে নির্বাচন কমিশন।

একাদশ সংসদ নির্বাচন: ঘটনা প্রবাহ, ফলাফল, বিশ্লেষণ

ব্যালটে ভোট

ব্যালটে সিল মেরে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে বাছাই করা ভোটের সনাতনি পদ্ধতি, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে ভোট সম্পন্ন করতে হয়।

নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়ালের মাধ্যমে ব্যালটে ভোটদানের নির্দিষ্ট ধাপগুলো ইতোমধ্যে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

এক্ষেত্রে ছবিসহ ভোটার তালিকায় ক্রমিক নম্বর, ভোটার নম্বর, ভোটার এলাকা ও কেন্দ্রের নাম ভোটারকে আগেই জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইসি।

আর তা জানা না থাকলে ভোটকেন্দ্রের বাইরে দায়িত্বরত ব্যক্তিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

ভোটারকে নির্ধারিত কেন্দ্রে যেতে হবে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে। ভোটকক্ষে ঢুকলে প্রথমে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ভোটারকে শনাক্ত করবেন। পোলিং এজেন্টরা ভোটার শনাক্তকরণ কাজে সাহায্য করবেন এবং ভোটগ্রহণ দেখবেন।

শনাক্তকরণের পর ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ভোটারের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে অমোচনীয় কালির চিহ্ন লাগিয়ে দেবেন।

ভোটারকে ব্যালট পেপার দেওয়ার আগে ব্যালট পেপারের অপর পৃষ্ঠায় অফিসিয়াল সিল দিয়ে অনুস্বাক্ষর করবেন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার। ব্যালট পেপারের সঙ্গে দেবেন বর্গাকৃতির রাবার স্ট্যাম্প।

ভোটার ব্যালট পেপার পাওয়ার পর নির্ধারিত গোপন কক্ষে যাবেন। যে প্রার্থীকে ভোট দিতে চান, ব্যালট পেপারে তার নামের পাশে বরাদ্দ প্রতীকের ওপর সিল দেবেন। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার সরবরাহ করা বর্গাকৃতির রাবার স্ট্যাম্প দিয়েই ওই সিল দিতে হবে তাকে।

ব্যালট পেপারে সিল দেয়ার পর সিলের কালি যাতে অন্য প্রতীকের ঘরে বা অন্য কোথাও না লাগে সেজন্য সিল দেওয়া প্রতীকের ঘরের মাঝামাঝি লম্বা ভাঁজ দিয়ে পরে ইচ্ছেমত ভাঁজ দেওয়া যাবে।

এরপর ভাঁজ করা ব্যালট পেপার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার সামনে রাখা স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ফেলতে হবে।

ভোট দেওয়ার পর মার্কিং সিলটি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার কাছে ফেরত দিয়ে তখনই ভোটকেন্দ্র ত্যাগ করবেন।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কোনো ভোটার অমোচনীয় কালির কলমের চিহ্ন লাগাতে অস্বীকৃতি জানালে অথবা তার যে কোনো আঙ্গুলে অমোচনীয় কলমের কালির চিহ্ন থাকলে তাকে ব্যালট পেপার দেওয়া হবে না।

ভোট দেয়ার পর আঙুলে লাগানো হবে অমোচনীয় কালি

ভোট দেয়ার পর আঙুলে লাগানো হবে অমোচনীয় কালি

ভোট দেয়ার পর আঙুলে লাগানো হবে অমোচনীয় কালি

ভোট দেয়ার পর আঙুলে লাগানো হবে অমোচনীয় কালি

ইভিএম

ছয়টি আসনের মাধ্যমে এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে নতুন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করছে নির্বাচন কমিশন।

একই ধরনের যন্ত্র এর আগে রংপুর, খুলনা, গাজীপুর ও বরিশাল সিটি নির্বাচনে স্বল্প পরিসরে ভোট হয়েছিল।

ছয়টি আসনের মোট ২১ লাখ ২৪ হাজার ৫৫৪ জন ভোটার রয়েছেন। ৮৪৫টি কেন্দ্রের ৫ হাজার ৪৫টি ভোটকক্ষে তাদের ভোটের আয়োজন হয়েছে।

বিএনপিসহ অধিকাংশ দল জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে আপত্তি করলেও নির্বাচন কমিশন স্বল্প পরিসরে ছয়টি আসনে এই ভোট করছে।  বিভ্রান্তি দূর করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইভিএম মেলা এবং ভোটের মহড়ার আয়োজনও করা হয়েছে।

এ যন্ত্রে আঙ্গুলের ছাপ, ভোটার নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর বা স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে ভোটার শনাক্ত করা হয়। নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ভোটকক্ষে একজন পোলিং অফিসার ভোটার ভেরিফিকেশনের কাজটি করেন ।

ডেটাবেইজে ভোটার বৈধ বা অবৈধ হিসেবে শনাক্ত হলে প্রজেক্টরের মাধ্যমে তা দেখতে পান পোলিং এজেন্টরা।

ভোটার বৈধ হলে মেশিনে কুইক রেসপন্স কোড (QR CODE) এবং কিছু তথ্য সম্বলিত একটি টোকেন প্রিন্ট হবে, যা ভোটারকে দেওয়া হয়।

ভোটার টোকেন নিয়ে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছে গেলে ভোটিং মেশিনের QR CODE স্ক্যানারের মাধ্যমে তার টোকেন শনাক্ত করে গোপন কক্ষে থাকা ব্যালট ইউনিটে ব্যালট ইস্যু করা হবে।

ভোটার গোপন কক্ষে গিয়ে ব্যালট ইউনিট দেখে ভোটার পছন্দের প্রার্থী ও প্রতীকের ডান  পাশের সাদা বোতাম চেপে সিলেক্ট করবেন। এরপর সবুজ রংয়ের CONFIRM বোতাম চেপে  দিলেই তার ভোট দেওয়া হয়ে যাবে।

কখনো ভুল প্রতীক সিলেক্ট করা হলে ব্যালট ইউনিটের লাল রংয়ের CANCEL বোতাম চেপে পরে যে কোনো প্রার্থীকে আবার সিলেক্ট করা যাবে।

এভাবে দুই বার CANCEL করা যাবে, তৃতীয়বার যেটি সিলেক্ট করা হবে সেটি বৈধ ভোট হিসেবে গৃহীত হবে।

ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের কাজ কী

ভোটের দিনে ভোটকেন্দ্রের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ করা প্রিজাইডিং অফিসারের নেতৃত্বে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা।

ভোটের দিন তারা কী দায়িত্ব পালন করবেন, তা জানাতে প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া ভোটের আগে প্রকাশিত নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়ালেও তাদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগপত্র পাওয়ার পরপরই প্রিজাইডিং অফিসারকে তার সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করতে হবে। ‍সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ভোটগ্রহণের জন্য সে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার তা তিনি যথাসময়ে গ্রহণ করবেন।

প্রিজাইডিং অফিসার তার সহকর্মীদের নিয়ে আগের রাতেই ভোটকেন্দ্রে ‍পুলিশসহ অবস্থান করবেন।  রাতে অবস্থানকালে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, তার এজেন্ট কিংবা সমর্থকদের কাছ থেকে খাবার বা কোনো সুযোগ-সুবিধা নেওয়া যাবে না। এ ধরনের সুবিধা নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।

ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো প্রার্থী যাতে নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন এবং নির্বাচনী প্রচারণামূলক কোনো তৎপরতা চালাতে না পারেন, তা প্রিজাইডিং কর্মকর্তা নিশ্চিত করবেন।

প্রিজাইডিং অফিসার তার সহকর্মী ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ভোটকক্ষের সাজসজ্জার ব্যবস্থা করবেন। গোপন বুথ এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে কোনো ভোটার ভোট কাকে ভোট দিলেন সেটা দেখা না যায়।

ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই প্রিজাইডিং অফিসারকে পোলিং এজেন্টদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।

ভোটগ্রহণ শুরুর কমপক্ষে আধঘন্টা আগে উপস্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী/নির্বাচনী এজেন্ট/পোলিং এজেন্টদের দেখাতে হবে যে ব্যালট বাক্সটি খালি আছে।

এরপর তা সবার সামনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সিলগালা করে নির্ধারিত স্থানে রাখা হবে। প্রিজাইডিং অফিসার কতগুলো ব্যালট পেপার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে নিয়েছেন, তাও উপস্থিত সবাইকে দেখাতে হবে।

ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত সব নির্বাচনী কর্মকর্তা প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশ অনুসারে যাবতীয় কার্য সম্পাদন করবেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশ মেনে চলবেন।

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মঙ্গলবার ভোট দিচ্ছেন এক ভোটার। ছবি:মোস্তাফিজুর রহমান

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মঙ্গলবার ভোট দিচ্ছেন এক ভোটার। ছবি:মোস্তাফিজুর রহমান

নির্ধারিত সময়ের মধ্য যদি ভোটগ্রহণ বিঘ্নিত হয় এবং তা যদি পুনরায় শুরু করা সম্ভব না হয় অথবা ব্যালট পেপারসহ স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স যদি ছিনতাই হয়ে যায় অথবা হারিয়ে যায় অথবা কেউ যদি নষ্ট করে ফেলে- তাহলে প্রিজাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে পারবেন। সঙ্গে সঙ্গে তা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা বা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে।

ভোটকেন্দ্রে কেউ বিশৃঙ্খলা করলে প্রিজাইডিং অফিসার তাকে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করতে পারবেন।

ভোটকেন্দ্রে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়োজিত পুলিশ বা অন্য কাউকে তিনি নির্দেশনা দিতে পারবেন।

ভোটগ্রহণ কাজ শেষ হওয়ার পর প্রিজাইডিং অফিসার ভোটকেন্দ্রেই ভোট গণনার কাজটি করবেন। কোনো অবস্থাতেই ভোটকেন্দ্রের বাইরে অন্য কোথাও গণনার কাজ করা চলবে না।

প্রিজাইডিং অফিসার প্রয়োজন মনে করলে স্ব-উদ্যোগে কিংবা উপস্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্বাচনী এজেন্টের অনুরোধে ফলাফল পুনঃগণনা করতে পারবেন।

ভোটগণনা শেষ হওয়ার পর প্রিজাইডিং অফিসার উপস্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, তার নির্বাচনী এজেন্ট অথবা পোলিং এজেন্টদেরকে ভোটগণনার বিবরণীর সত্যায়িত কপি দেবেন।

প্রত্যেক বিবরণী, প্যাকেট ও অন্যান্য নথিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অথবা নির্বাচনী এজেন্ট অথবা পোলিং এজেন্টদের সই নিতে হবে।

গণনার বিবরণী অবশ্যই ভোটকেন্দ্রের দর্শনীয় স্থানে টানিয়ে দিতে হবে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের।

কেন্দ্রে কেন্দ্রে গণনা শেষে প্রিজাইডিং অফিসাররা লিখিত ফলাফল রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠাবেন। রিটার্নিং অফিসাররা তা ইসিতে পাঠাবেন।

ঢাকায় নির্বাচন ভবনের ফোয়ারা প্রাঙ্গণে বিশেষ মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করা হবে।