২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বদলে যাওয়ার গল্প শোনালেন জামাল

  • মোহাম্মদ জুবায়ের চট্টগ্রাম থেকে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2019-10-19 20:54:20 BdST

জন্ম, বেড়ে ওঠা ডেনমার্কে। ফুটবলে হাতে খড়ি, ফুটবলার হয়ে ওঠা এফসি কোপেনহেগেনের আঙিনায়। কিন্তু জামাল ভূইয়ার এখন অনেক কিছুই বাংলাদেশকে, এদেশের ফুটবলকে ঘিরে। জাতীয় দলের অধিনায়ক; নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় ২৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার ভাঙা-ভাঙা বাংলায়, বাংলা-ইংরেজির মিশেলে বললেন অনেক কথাই। যেখানে উঠে এলো ডেনমার্ক ছেড়ে বাংলাদেশে আসা, কোপেনহেগেনে গুলি খাওয়া, ফের ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠা, বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন ও আরও অনেক কিছু।

সংবাদ সম্মেলনে কলকাতার সাংবাদিকরা তো বোঝাতে চাইল আপনি বাংলাদেশি নন। সেটা অবশ্য আপনার বাংলা বলার ধরণ শুনে। এগুলো কী পীড়া দেয়?

জামাল ভুইয়া: আমি এগুলো নিয়ে ভাবি না। আমার বাবা-মা দুজনই বাঙালি। বিষয়টা যেমন মেসুত ওজিল, সামি খেদিরা, চিয়াগো আলকানতারার মতো। আমি মোটামুটি পাঁচ ভাষায় কথা বলতে পারি-সুইডিশ, ড্যানিশ, নরওয়ে, ইংলিশ এবং বাংলা। বাবা-মা বাড়িতে বাংলায় কথা বলত। কিন্তু আমি এখানে এসে বেশি বাংলা শিখেছি। যদিও ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলি; কিন্তু যোগাযোগে কোনো সমস্যা হয় না।

এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে খেলা, এরপর সেই গুলির ঘটনা, যেটি আপনার জীবনের বাঁক বদলে দিতে বসেছিল, সেটা নিয়ে একটু বলুন।

জামাল: আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে খেলেছি। একটা গোলও করেছিলাম। সেই গোলের দুই দিন পর তাদের সঙ্গে চুক্তি হলো। সবসময় আমি তাদের হয়ে খেলতে চাইতাম। কেননা, ওটা ডেনমার্কের সবচেয়ে বড় ক্লাব। তখন বয়স ছিল ১৪ বছর।

২০০৭ সালে যখন আমার বয়স ১৬/১৭, তখন আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। যে এলাকাটায় আমি বেড়ে উঠেছি, সেটা খুব ভালো ছিল না, কিন্তু যেহেতু আমি সেখানে বেড়ে উঠেছি, নিরাপদ অনুভব করতাম। ওই দিন একজন বলল, দ্রুত বাড়ি ফিরে যাও, কিন্তু আমি বিপদটা উপলব্ধি করতে পারিনি। কয়েক মিনিট পর চারটি গুলি খেলাম। একটা লাগল কনুইয়ে, একটা পেটের নিচের দিকে, দুই শরীরের দুই পাশে। কোমায় ছিলাম দুই দিন। হাসপাতালে ছিলাম তিন/চার মাস।

তারপর? আবারও ফুটবল খেলার কথা ভেবেছিলেন কি?

জামাল: না। ভেবেছিলাম ফুটবল ছেড়ে দিব। ডেনমার্কের ফুটবল খুব উঁচু পর্যায়ের। মনে হয়েছিল আমাকে দিয়ে আর হবে না, ভেবেছিলাম লেখাপড়াটা ভালোভাবে চালাব। বিষয়টি নিয়ে আমার যুব দলের কোচ জনি লারসনের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি পরামর্শ দিলেন চেষ্টা (ফুটবল) করার। আবার খেলা শুরু করলাম। দুর্ঘটনার সাত মাস পর। ১৪ কেজি ওজন ঝরালাম ওই সময়ে।

সেই স্মৃতি কি এখনও তাড়া করে ফিরে?

জামাল: সবসময় এটা আমার জন্য দুঃখের স্মুতি। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সবকিছুর জন্যই আলাদা পরিকল্পনা আছে। হয়তো ওই দুর্ঘটনা ছিল আমার দুর্ভাগ্য। অবশ্যই সেই স্মৃতি অনেকবারই আমার দুঃস্বপ্নে ধরা দিয়েছে। ভাবতাম, যদি সেদিন আমি ওখানে না থাকতাম, না যেতাম। ওই ঘটনা আমার ফুটবলের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলেছিল। ওই সময় কোপেনহেগেনের যুব দলে আমি সেরা খেলোয়াড় ছিলাম। ক্লাব আমাকে সিনিয়র টিমে চাচ্ছিল, অন্য দলও আগ্রহ দেখাচ্ছিল। শুরুতে আমি অনেক কাঁদতাম, কিন্তু বিষয়টা আমাকে মেনে নিতে হয়েছিল।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ের গত ম্যাচগুলো নিয়ে বলুন। এখনও আপনার দল জয়হীন। যদিও সুযোগ এসেছিল অনেকবার।

জামাল: আমি মনে করি, আফগানিস্তানের বিপক্ষে আমাদের জেতা উচিত ছিল। কাতারের বিপক্ষেও কমপক্ষে পয়েন্ট পাওয়া উচিত ছিল; কেননা, কাতার আমাদের পোস্টে আমাদের চেয়ে কম শট নিয়েছিল। ভারতের বিপক্ষে আমাদের জয়ের সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল; কিন্তু আমরা ছিলাম দুর্ভাগা।

দুর্ভাগ্য কী শুধু ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতায়? আর কোনো বিভাগ নিয়ে অভিযোগ?

জামাল: কখনও কখনও এটা হতাশার। কিন্তু দিন শেষে এটা আপনার দল এবং শ্রদ্ধা করতে হবে। আমাদের রক্ষণভাগ এ মুহূর্তে খুবই ভালো; কোনো অভিযোগ নেই। (মাঝমাঠ নিয়ে) গত ম্যাচে সোহেল রানা ও বিপলু আহমেদকে খেলিয়েছি আমরা। জানি না তাদের সৃষ্টিশীলতায় ঘাটতি ছিল কিনা।

পেছনে ফেরা যাক, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যখন প্রথম ডাক পেলেন, সেসময় নিয়ে বলুন।

জামাল: এটা ২০১১ সালের কথা। কোচ সাইফুল বারী টিটো আমার কিছু ভিডিও দেখার পর ই-মেইল করলেন। যখন বাংলাদেশে এলাম। কাউকে চিনতাম না। শুরুতে একটু জড়তা ছিল আমার। ডেনমার্কে ফিরলাম এবং পরে যখন এলাম, তখন শুধু নিজেকে এবং ফুটবল নিয়ে ভাবতাম। গণমাধ্যম ও খেলোয়াড়রা আমাকে নিয়ে যা-ই বলত, কিছু মনে হতো না। আমি ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ। এরপরই তো যাত্রা শুরু হলো।

শুরুর সময়টা আমার জন্য খুবই কঠিন ছিল। কেননা আবহাওয়া ছিল পুরাই ভিন্ন। এখানে খুব আর্দ্র। আমাকে প্রচুর পানি পান করতে হতো। অনেক ঘটনার পর শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবে যোগ দিলাম। দলটির হয়ে সবকিছু জিতলাম।

সেসময় আপনার পরিবারের পক্ষ থেকে কেমন সাড়া পেতেন?

জামাল: বাবা বলতেন, তোমার বাংলাদেশে যাওয়া উচিত এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করো। ফুটবল ক্যারিয়ার শেষের আগে বাংলাদেশের জন্য যা কিছু করেছে তার জন্য সন্তুষ্ট হও। কিন্তু মা খুব চিন্তিত থাকতেন। বললেন, কেন তুমি ডেনমার্কে থাকছ না, পড়াশোনা চালাচ্ছো না।

২০১৮ সালে জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়ার পরের জামাল কেমন?

জামাল: অধিনায়ক হওয়ার প্রভাবটা এরকম যে, সিদ্ধান্ত নিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তা করি। যাচাই-বাছাই করি। যখন মাঠে থাকি, আমাকে কথা বলতে হয়, সতীর্থদের নির্দেশনা দিতে হয়। আগে এ দায়িত্ব আমার ছিল না। যখন আপনি অধিনায়ক, এটা ভিন্ন রকম। আপনাকে খেলোয়াড়দের বলতে হবে-এটা করো, এটা করবে না। এমন বলতে হয়-এটা না মানলে জরিমানা করব। যেগুলো অধিনায়ক হওয়ার আগে কখনই বলতে হয়নি। এবং আমি জানি, যদি দল হারে তাহলে আমি থাকব আক্রমণের প্রথম সারিতে!

অধিনায়ক হিসেবে পাদপ্রদীপের আলোয় আসাটা কতটা উপভোগ করছেন?

জামাল: জানি না। সত্যি বলতে আমি টিভি দেখি না। পত্রিকা পড়ি না। জানি না বিষয়টা কিভাবে বলব। শুধু বলতে পারি, আমি খুশি যে আমার পারফরম্যান্স মানুষের ভালো লাগছে।

অধিনায়ক হওয়ার পর নিজের পারফরম্যান্সে উন্নতিও হয়েছে বলে মনে করেন?

জামাল: হ্যাঁ। শুধু আমি নই, দলও বদলেছে। আমি অধিনায়ক হওয়ার পর নতুন এবং তরুণ খেলোয়াড় এসেছে দলে। জেমি ডেও অনেক পরিবর্তন করেছেন। সে আর সব কোচের মতো নন, যারা নিজেদের দরকারি বিষয়গুলো বাফুফেকে বলতে কিছুটা ভয় পায়। জেমি এটা সবসময় সরাসরি বলে।

জেমি কি বদল এনেছে?

জামাল: শৃঙ্ক্ষলা, ডায়েট, ফিটনেস, নিয়মিত চেক-আপ এগুলো জেমি যোগ করেছে। আমরা যে কৌশলে খেলি সেটাও পুরোপুরি ভিন্ন। সে জানে খেলোয়াড়দের শক্তি, দলের দুর্বলতা। সে তরুণ কোচ এবং এর আগে ফুটবল খেলেছে। ফুটবলারদেরকে সে অনুভব করে। বোঝে।

কাতার ও ভারত ম্যাচ ভালো করার পেছনের গল্পটা কি?

জামাল: খেলোয়াড়দেরকে বলেছি যদি বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ভালো করো তাহলে অন্য দেশের ক্লাব তোমাকে খুঁজবে। বাংলাদেশ যে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলতে পারে, বিশ্বকে দেখানোর এটা বড় সুযোগ। তো যখন ম্যাচ খেলবে, সিরিয়াসলি খেলবে। অনুশীলনেও সিরিয়াস থাকতে হবে। কোচের নির্দেশনা শুনতে হবে এবং ভালো ফল করতে হবে। এগুলোই।

গত ১৪ মাসে আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের উন্নতির জায়গা কোনগুলো?

জামাল: আমরা খুব বেশি গোল হজম করিনি। কিভাবে রক্ষণ সামলাতে হয়, তা আগের চেয়ে ভালো জানি। জেমির কারণে আমরা আগের চেয়ে অনেক অনুশীলন করি, কিভাবে রক্ষণ সামলে আক্রমণ করা যায়, জানি।

দলের মধ্যেও এখন অনেক বেশি প্রতিযোগিতা হয়। এখন আমাদের ২২ থেকে ২৬ জন খেলোয়াড় আছে, যারা সবাই শুরুর একাদশে খেলার যোগ্যতা রাখে। এই যেমন, বিশ্বনাথ ঘোষ বেশ কিছু দিন শুরুর একাদশে ছিল, এরপর রায়হান হাসান এলো, অনুশীলনে ভালো করল। কোচ ওকে পছন্দ করলেন। তপু বর্মন ও আতিকুর রহমান ফাহাদ চোটে পড়ল। রিয়াদুল ইসলাম রাফি ও সোহেল রানা এলো। ভালো খেলল। দলের মধ্যে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা চলছে।

আগামী তিন-চার বছর পর বাংলাদেশের ফুটবলকে কোথায় দেখতে চান?

জামাল: আমি মনে করি বাংলাদেশ আরও ভালো খেলবে। খেলোয়াড়রা আরও সিরিয়াস হবে। স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলোও সিরিয়াস হবে ফুটবল নিয়ে। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছি।

শেষ প্রশ্ন, নিজেকে কী আগের চেয়ে বেশি বাংলাদেশি মনে হয় এখন?

জামাল: (হাসি) আমি সবসময় অনুভব করি আমি বাংলাদেশি। আরও বেশি নিজের বাড়ি অনুভব করি।


ট্যাগ:  জামাল ভূইয়া  বাংলাদেশ  ঘরোয়া ফুটবল