‘পুঁজিবাজারে করোনাভাইরাসের প্রভাব অন্য দেশের তুলনায় কম পড়বে’

  • ফারহান ফেরদৌস, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-04-29 16:31:35 BdST

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব অন্য দেশগুলোর তুলনায় কম পড়বে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষক শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমরান হাসান।

তিনি বলেছেন, করোনাভাইরাস পরবর্তী খারাপ প্রভাব অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কম পড়বে। আতঙ্কিত না হয়ে এই মুহূর্তে সবাইকে 'দেখেশুনে' বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন এমরান।

সেইসঙ্গে এই সংকটের সময়ে কোন খাত ভালো করবে; কোন খাতের অবস্থা খারাপ হতে পারে সে বিষয়েও বিশ্লেষণ করেছেন তিনি।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চলমান লকডাউনের মধ্যে বাংলাদেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) লেনদেন বন্ধ রয়েছে।

সরকারি ছুটির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ৫ মে পর্যন্ত বন্ধ আছে ডিএসই এবং সিএসই’র লেনদেন। ৫ মে’র পরে খোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ।

এ পরিস্থিতিতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেছেন এমরান হাসান।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারনে খারাপ প্রভাব আসবে বস্ত্র, সিমেন্ট, ব্যাংকিং, টেলিকম এবং প্রকৌশল খাতে। ভাল করবে ওষুধ এবং জ্বালানি খাত।

“প্রভাবগুলো মাথায় নিয়ে বিনিয়োগ করলে কম ক্ষতিগ্রস্থ হবেন বিনিয়োগকারীরা।”

এমরান বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সাথে ক্ষতিগ্রস্থ হবে পুঁজিবাজার। এটা পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর জন্য যেমন সত্য, বাংলাদেশের জন্যও সত্য।

“তবে পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বিষয়টি কিছুটা আলাদা।”

ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর পুঁজিবাজারে ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে তেজীভাব ছিল, ভালো সময় গেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে কারেকশন বা মূল্যসংশোধন চলছে।

“করোনাভাইরাসের কারনে আমাদের দেশের পুঁজিবাজার যখন ফেব্রুয়ারি মাসে বন্ধ হয়ে গেল তখন মার্কেটের পিই ছিল ১১ এর কাছাকাছি। অলরেডি আমাদের পুঁজিবাজার অনেক বেশি কারেকশন হয়ে গেছে। আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় এদিক দিয়ে এগিয়ে আছি “

“বলতে হবে আমাদের দেশে যে কারেকশন হওয়ার কথা সেটা অনেকটা হয়ে গেছে। যেটা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে হয়নি; বরঞ্চ পুঁজিবাজার বেশ ভালো অবস্থায় ছিল। সেসব দেশে সংশোধনটা অনেক বড় হবে।”

“সে হিসাব করলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে যে সংশোধনটা হবে, সেটা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা কম হবে বলে আমার মনে হয়।”

কোভিড-১৯ এর  প্রভাব কোন খাতে কতটা পড়বে?

করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কিছু কিছু খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিছু খাত কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে; আবার কিছু খাত ভালো করতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন এমরান হাসান।

বস্ত্র খাত খারাপ করবে

এমরান হাসান বলেন, বস্ত্র বা পোশাক শিল্প খাতে করোনাভাইরাসের একটা বড় বিরূপ প্রভাব পড়বে। এর কারণ ইতোমধ্যে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। প্রতিদিনই কমছে এ খাতের রপ্তানি। শুধু তাই না, যারা ক্রেতা সেসব দেশেও মহামারী চলছে। খুব সহজেই তারা আবার আগের মত অর্ডার দিতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলো খারাপ করবে বলে মনে হচ্ছে।

সিমেন্ট খাতেও আশার আলো নেই

সিমেন্ট খাতেও একটা বড় খারাপ প্রভাব পড়বে। কারণ এখন সরকার কোভিড-১৯ মোকাবিলা করতে ব্যস্ত। সরকারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ কমে আসবে। আবার দেশের যে আবাসন খাত সেখানেও কিন্তু চাহিদা এবং কাজ দুটোই কমে আসবে।

 

“এছাড়া সামনে বর্ষা মৌসুম আসছে; বর্ষায় কিন্তু কনস্ট্রাকশনের কাজ এমনিতেই কম হয়। একদিকে করোনাভাইরাসের প্রভাব অন্যদিকে বৃষ্টি সবমিলিয়ে এখানে খুব একটা আশার আলো নেই।”

ওষুধ খাত ভাল করবে

বাংলাদেশের অনেক ওষুধ কোম্পানি করোনাভাইরাস প্রতিরোধক কিছু ওষুধ তৈরি করার চেষ্টা করছে; যেগুলো তারা রপ্তানি করতে চায়।

এর বাইরেও করোনাভাইরাসের আক্রমণের ফলে বেশ কিছু ওষুধ আছে যেগুলোর চাহিদা অনেক বেশি বেড়েছে। ইতোমধ্যে এই ধরনের ওষুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কোম্পানিগুলো ওষুধে তৈরি করে সরবরাহ করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। যারা এ ধরনের ওষুধ বিক্রি করছে সেগুলো ভালো করবে।

“ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম অনেক কমে গেছে। অনেকটা কারকেশন হয়েছে। এই খাতে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীরা বেশ ভালো একটা মুনাফা করতে পারবেন।”

যে সব কোম্পানি করোনারিলেটেড ওষুধ তৈরি করছে না তারাও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে। কেননা, অর্থনৈতিক অবস্থা যখন খারাপ থাকে, তখন অন্য কিছু না কিনলেও মানুষ চেষ্টা করে ওষুধ কিনতে।

বিদ্যুৎ খাতে খুব একটা প্রভাব পড়বে না

এমরান হাসান বলেন, কোভিড-১৯ এর প্রভাব জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর শেময়ারে খুব একটা পড়বে না। যে কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ উত্পাদন করে সেগুলো করোনাভাইরাসের কারনে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। তবে ভবিষ্যতে এসব কোম্পানির বড় প্রজেক্ট পাওয়ার কথা ছিল তারা কিন্তু সেটা নাও পেতে পারে।

অর্থনীতিতে চাহিদা কমে যাবে নতুন পাওয়ার স্টেশন তৈরি হবে না। ফলে নতুন প্রজেক্টগুলো তারা আর পাবে না।

ফলে প্রবৃদ্ধিটা কিছুটা কমে যাবে। বর্তমানে তারা যে জায়গায় আছে সেখান থেকে অবনমন খুব বেশি একটা হবে না।

ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরও খারাপ হবে

এমরান হাসান বলেন, কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা বেশ খারাপ। কোভিড-১৯ এর কারণে সেগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হবে।

“কারণ অর্থনীতির গতি যখন কমে যায় তার প্রভাব কিন্তু ব্যাংকের উপরে আসে। এছাড়াও দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, জুন পর্যন্ত কেউ যদি ঋণের টাকা ফেরত না দেয় তাকে খেলাপি বানানো যাবেনা। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিন্তু বেড়ে যাবে।

“এছাড়াও ব্যাংকিং খাতের একটা বড় গ্রাহক হচ্ছে টেক্সটাইলগুলো। যেহেতু বড় বড় টেক্সটাইলের অর্ডার ক্যানসেল হয়ে যাচ্ছে। টেক্সটাইল খাতে যে ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়েছে সেখানে কিন্তু ডিফল্টের পরিমাণ বেড়ে যাবে। এটা যদি হয় তাহলে ব্যাংকগুলোকে যে ক্যাপ দেওয়া আছে, ৬ শতাংশ হারে আমানত সংগ্রহ করা সেটা তারা পারবে না। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে “

তবে কিছু ব্যাংক যারা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসে ভালো তারা আবার কিছুটা লাভবান হবে। পোশাক কারখানার শ্রমিকসহ অনেক বেতন কিন্ত এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে। এ সেবা যেসব ব্যাংক দিচ্ছে তারা কিন্তু লাভবান হবে বলে মনে করেন এমরান।

টেলিকম খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে

এমরান বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে ভয়েস কল অনেকটাই কমে গেছে। যেহেতু অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ; অনেকের কলের প্রয়োজন পড়েনি। তবে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু ইন্টারনেটের যে ব্যবহার বেড়েছে সেটা কিন্তু ভয়েস কলের ব্যাপারটিকে কাভার করতে পারবে না। ফলে এ খাতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

প্রকৌশল খাতও ক্ষতিগ্রস্থ হবে

যেহেতু অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেমে যাবে। বৃষ্টির কারণে আবাসন খাত স্থবির হয়ে যাবে। সে কারণে আবাসন খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব প্রকৌশল কোম্পানি আছে তাদের প্রবৃদ্ধিও কমে যাবে।

জ্বালানি খাত ভাল করবে

বিশ্ববজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ার ফলে এ খাতের কোম্পানিগুলো দেশে জ্বালানি তেল বিক্রি করে ভাল মুনাফা করবে। যার প্রভাব তাদের শেয়ারের উপর পড়বে বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।

সুপার শপ আছে কোম্পানিগুলো ভাল করবে

লকডাউনের কারণে সব বন্ধ থাকায় মানুষ বাজারে যেতে পারছে না। ঘরে বসে অনলাইনে কেনাকাটা করছেন। সুপারশপগুলো এর ফলে লাভবান হচ্ছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত যে সব কোম্পানির সুপারশপ আছে তারা এই সংকটের সময় ভালো করবে বলে জানান এমরান হাসান।