ব্যাংকের লভ্যাংশ ঘোষণায় লাগাম

  • আবদুর রহিম হারমাছি, প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-05-11 21:39:10 BdST

bdnews24
ঢাকার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল এখন সুনসান। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

কোভিড-১৯ সঙ্কটে ব্যাংকগুলোর হাতে নগদ তারল্য নিশ্চিত করতে তাদের লভ্যাংশ ঘোষণার সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো ২০১৯ সালে যত ভালো ব্যবসাই করুক না কেন, শেয়ারহোল্ডারদের তারা ১৫ শতাংশের বেশি নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

আর এই ১৫ শতাংশ নগদ ল্যাংশের সঙ্গে ১৫ শতাংশ বোনাস (স্টক) লভ্যাংশ যোগ করে মোট ৩০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারবে না কোনো ব্যাংক।

আর ঘোষিত নগদ লভ্যাংশ চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে শেয়ার হোল্ডারদের না দিতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোমবারের এক সার্কুলারে।

ওই নির্দেশনায় বিভিন্ন শর্তের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ লভ্যাংশের কয়েকটি ধাপ ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যাংক এই সীমার বেশি লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

ইতোমধ্যে যেসব ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, সেগুলোর লভ্যাংশের হার যদি এই সীমার বেশি হয়ে থাকে, তাহলে তা স্থগিত করে সংশোধন করে নিতে বলা হয়েছে।

সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো ওই সার্কুলারে বলা হয়েছে, “কোভিড-১৯ মহামারীর এই মহাসঙ্কটের সময়ে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট চাপ মোকাবেলা করে ব্যাংকগুলো যাতে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিতে যথাযথ অবদান রাখতে পারে, সে লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোর মুনাফা অবণ্টিত রেখে (কার্যত লভ্যাংশ না দিয়ে) মূলধন শক্তিশালী করার মাধ্যমে পর্যাপ্ত তারল্য বজায় রাখা একান্ত অপরিহার্য। আর এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোর ভালোর জন্যই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি শাকিল রিজভী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নগদ লভ্যাংশ দিয়ে ব্যাংকগুলো যাতে আরও দুর্বল হয়ে না যায়, সেজন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ নির্দেশনা দিয়েছে।

“আমার বিবেচনায় এতে স্বল্প মেয়াদে শেয়ারহোল্ডারা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক ও শেয়ারহোল্ডার উভয়েই লাভবান হবে।”

তিনি বলেন, প্রতি বছর ব্যাংকগুলো যে ডিভিডেন্ড দেয় তার ৬০ শতাংশের বেশি পান উদ্যোক্তা পরিচালকরা। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পান সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা।

ডিবিএর আরেক সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, “বর্তমান এই কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ বিতরণ নিরুৎসাহিত করা একটি ভালো সিদ্ধান্ত হবে বলে আমি মনে করি। যদিও এতে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা আপতত কিছু লভ্যাংশ কম পাবে। তবে ভবিষ্যৎ শেয়ার বাজারের জন্য ভালো হবে।”

তিনি বলেন, যেসব ব্যাংক গত বছর ভালো মুনাফা করেছে তারা যদি ভালো নগদ লভ্যাংশ দেয়, তাহলে সেই টাকা বাইরে চলে আসবে এবং ব্যাংকগুলোর নগদ টাকার প্রবাহ কমে যাবে।

“তাতে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে তারা অবদান রাখতে পারবে না। নিজেরা ভালো ব্যবসা করতে পারবে না। আগামী বছরগুলোতে মুনাফা কমে যাবে।

“সে বিবেচনায় শেয়ারহোল্ডারা এবার একটু কম লভ্যাংশ পেলেও আগামী বছরগুলোতে যেন ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা এবং ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের রিটার্নের বিষয়টি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করে ২০১৯ সালে সমাপ্ত বছরের জন্য ব্যাংকের শেয়ারের বিপরীতে ডিভিডেন্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে নিচের নীতিমালা অনুসরণ করতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

>> প্রভিশন সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোপূর্বে গৃহীত ডিফারেল সুবিধার অধীন নয় এমন বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডিফারেল সুবিধা গ্রহণ ছাড়া যেসব ব্যাংকের ২.৫% ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম ১২.৫০% বা তার বেশি মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম, সে সব ব্যাংক তাদের সামর্থ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ১৫% নগদসহ মোট ৩০% ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারবে।

>> প্রভিশন সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোপূর্বে গৃহীত ডিফারেল সুবিধার অধীন নয় এমন বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডিফারেল সুবিধা গ্রহণ ছাড়া যেসব ব্যাংকের ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম ১১.২৫% থেকে ১২.৫০% বা তার বেশি মূলধন সংরক্ষণ করতে সক্ষম, সেসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে তাদের সামর্থ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ৭.৫% নগদসহ মোট ১৫% ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারবে।

তবে, উভয় ক্ষেত্রে ঘোষিত নগদ লভ্যাংশ চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে শেয়ারহোল্ডারদের বিতরণ করা যাবে না।

>> প্রভিশন সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোপূর্বে নেওয়া ডিফারেল  সুবিধার অধীন নয় এমন বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডিফারেল  সুবিধা সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় করা হলে যে সব ব্যাংকের ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম ১১.২৫% বা তার বেশি থাকে, সেসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমদনক্রমে সর্বোচ্চ ৫% নগদসহ মোট ১০% ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারবে।

>> প্রভিশন সংরক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইতোপূর্বে গৃহীত ডিফারেল সুবিধার অধীন নয় এমন বা ২০১৯ সালের জন্য কোনো ডিফারেল সুবিধা সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় করা হলে যে সব ব্যাংকের ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম ১১.২৫% এর কম, কিন্তু ন্যূনতম সংরক্ষিত মূলধন ১০% হবে, সেসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমদন নিয়ে সর্বোচ্চ ৫% স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারবে।

>> ইতোমধ্যে যেসব ব্যাংক ২০১৯ সালের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, সেগুলোর লভ্যাংশের হার যদি এ সব নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা স্থগিত করে সংশোধন করতে হবে।