করোনাভাইরাস: ‘ভয়াবহ পরিস্থিতির’ দিকে দক্ষিণ কোরিয়া

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-23 03:30:34 BdST

দক্ষিণ কোরিয়ায় একদিনেই নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ’ হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী চুং সায়ে-কিউন।  

এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানসহ যে কোনো জনসমাগম এড়িয়ে চলতে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। স্বশরীরে উপস্থিতির চেয়ে অনলাইনে অংশগ্রহণ ও যোগাযোগের বিষয়টি বিবেচনারও পরামর্শ দিয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা বলছেন, শুক্রবার থেকে শনিবার নাগাদ নতুন করে ২২৯ জনের করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যাতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩৩ জনে।

নতুন করে আক্রান্তদের মধ্যে অনেকেই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দায়েগুর একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং একটি হাসপাতালের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।  

দায়েগু ও তার পার্শ্ববর্তী চেওংডোকে ‘স্পেশাল কেয়ার জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। আতঙ্কে দায়েগু শহরের সব রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেছে।

ওই শহরে একটি চার্চে প্রার্থনায় যোগ দেওয়া দেড় শতাধিক মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ার পর ওই সম্প্রদায়ের নয় হাজার সদস্য স্বেচ্ছায় নিজেদের ঘরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার এবং পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আর দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হয় চেওংডোর একটি মানসিক হাসপাতালে। পরে সেখানকার আরও অনেক রোগীর এই ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ছে।

চীনের চৌহদ্দি এবং জাপানের প্রমোদতরীর বাইরে দক্ষিণ কোরিয়াতেই এখন করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

জাপানের উপকূলে কোয়ারেন্টিন করে রাখা প্রমোদতরী ডায়মন্ড প্রিন্সেসের ৬৩৯ জনসহ দেশটিতে নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭২ জনে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি ইতালিতেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা একদিনে বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে। শনিবার দেশটিতে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ জনে। তাদের মধ্যে ৩৯ জনই দক্ষিণাঞ্চলীয় লোমবারডি অঞ্চল এবং ১২ জন ভেনেতো অঞ্চলের বাসিন্দা।

লোমবারডির স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান গুইলিও গলেরা শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৭৭ বছরের এক নারীকে তার বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

তাকে নিয়ে দেশটিতে এই রোগে দ্বিতীয় ব্যক্তির মৃত্যু হল। এই ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে মিলানের দক্ষিণের ১০টি গ্রামে সব ধরনের ‘পাবলিক অ্যাক্টিভিটিজ’ আপাতত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে গলেরা জানিয়েছেন।

আরও অনেক দেশে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে, যা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৮০৯ জনে। আর এ ভাইরাসের সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩৭২ জন, যাদের মধ্যে ২৭ জন ছাড়া বাকি সবার মৃত্যু ঘটেছে চীনে।

প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই চীনের মূল খণ্ডের, ৭৬ হাজার ২৮৮ জন। এর বাইরে ৩১টি দেশ ও অঞ্চলে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫২১ জন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী,

জাপানে আক্রান্ত ৭৩৮ ও মৃত্যু ৩, দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্ত ৪৩৩ ও মৃত্যু ২, সিঙ্গাপুরে আক্রান্ত ৮৬, হংকংয়ে আক্রান্ত ৬৮ ও মৃত্যু ২, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত ৩৫ জন করে, ইরানে আক্রান্ত ২৮ ও মৃত্যু ৫, তাইওয়ানে আক্রান্ত ২৬ ও মৃত্যু ১, মালয়েশিয়ায় আক্রান্ত ২২, অস্ট্রেলিয়ায় আক্রান্ত ২১, ইতালিতে আক্রান্ত ৫৫ ও মৃত্যু ২, ভিয়েতনাম ও জার্মানিতে আক্রান্ত ১৬ জন করে, ফ্রান্সে আক্রান্ত ১২ ও মৃত্যু ১, মাকাওয়ে আক্রান্ত ১০, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্যে আক্রান্ত ৯ জন করে, ফিলিপিন্সে আক্রান্ত ৩ ও মৃত্যু ১, ভারতে আক্রান্ত ৩, রাশিয়া ও স্পেনে আক্রান্ত ২ জন করে এবং বেলজিয়াম, কম্বোডিয়া, ফিনল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সুইডেন, মিশর, লেবানন ও ইসরায়েলে একজন করে আক্রান্ত হয়েছে।

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার দেশটির মূল ভূখণ্ডে ৩৯৭ জনের শরীরে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ৮৮৯ জন।

সব মিলিয়ে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার ২৮৮ জন। শুক্রবার চীনে মোট ১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে নতুন এ করোনাভাইরাসে, এর মধ্যে হুবেই প্রদেশেই মারা গেছেন ১০৬ জন। তাতে চীনের মূল ভূখণ্ডে নতুন করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৪৫ জনে।

মধ্য চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়। নিউমোনিয়ার মত লক্ষণ নিয়ে নতুন এ রোগ ছড়াতে দেখে চীনা কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়।

ঠিক কীভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়েছিল- সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নন বিশেষজ্ঞরা। তবে ধারণা করা হচ্ছে, উহানের একটি সি ফুড মার্কেটে কোনো প্রাণী থেকে এ ভাইরাস প্রথম মানুষের দেহে আসে। তারপর মানুষ থেকে ছড়াতে থাকে মানুষে।

সার্স ও মার্স পরিবারের সদস্য নতুন এ করোনাভাইরাসের নাম দেওয়া হয়েছে নভেল করোনাভাইরাস। আর এর সংক্রমণে ফ্লুর মত উপসর্গ নিয়ে যে রোগ হচ্ছে, তাকে বলা হচ্ছে কভিড-১৯।

আক্রান্ত রোগীদের লালা ও শ্লেষ্মা পরীক্ষা করে চীনা বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, নভেল করোনাভাইরাস যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে সার্সের চেয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জার সঙ্গেই এর মিল পাওয়া যাচ্ছে বেশি। আগে যেমনটা ভাবা হয়েছিল, তার চেয়েও সহজে এবং দ্রুত গতিতে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে কাজ করা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষজ্ঞ দল শনিবার চীনের উহানে পৌঁছেছে।

ওই দলে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, নাইজেরিয়া, জার্মানি ও রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ও ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন।

নতুন এই করোনাভাইরাস যেভাবে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে এই রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস-এর পরিচালক ডা. অ্যান্থনি ফাউসি।

তার মতে, ভ্রমণজনিত কারণে চীনের বাইরে এই ভাইরাস এসে এখন মানুষ থেকে মানুষে এবং তার থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটছে।

“তাই আপনি যখন দেখছেন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে এই ঘটনা ঘটছে, মানুষ থেকে মানুষে এবং তার থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটছে এবং কোথা থেকে আসছে তা ধরাও যাচ্ছে না। এভাবেই সব দেশ বা মহাদেশব্যাপী রোগ সংক্রমণের বিস্তার ঘটে।”