দিল্লির সহিংসতায় মৃত বেড়ে ৪২, হাই এলার্ট জারি

  • নিউজ ডেস্ক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-25 20:59:37 BdST

দিল্লিতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২ জনে।সহিংসতায় আহত হয়েছে আরও কমপক্ষে দুই শতাধিক মানুষ। গুরুগ্রামে জারি হয়েছে হাই অ্যালার্ট। সহিংসতা তদন্তে দু’টি বিশেষ তদন্তকারী দল (‘সিট’) গঠন করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের আগে রোববার রাজধানী দিল্লিতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) সমর্থক ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি মিছিল থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার রূপ নেয়।

গত রোববারের ঘটনার পরেই অ্যালার্ট জারি হয়েছিল গুরুগ্রামে। তবে এবার শুক্রবারের জুমার নমাজের আগে নিরাপত্তার লক্ষ্যে সেই অ্যালার্টই আরও কঠোর করা হয়েছে।এদিন অবশ্য দোকানবাজার কিছুক্ষণ খোলা রাখার জন্য কোথাও কোথাও কারফিউ কয়েক ঘণ্টার জন্য শিথিল করা হয়েছে। তার পর ফের জারি হবে কারফিউ।

সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৮টি এফআইআর  দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ।সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় কারা কারা জড়িত, কারা অর্থ জোগাচ্ছে, তা খুঁজে বের করার জন্য দিল্লি হাইকোর্ট শুক্রবার কেন্দ্রীয় সরকার, দিল্লি সরকার ও দিল্লি পুলিশকে নোটিস দিয়েছে।

ঘটনার তদন্ত শুরু ও তা এগিয়ে নেওয়ার জন্য এসব তথ্য প্রয়োজন। আগামী ৩০ এপ্রিল, পরবর্তী শুনানির দিন কেন্দ্র, দিল্লি সরকার ও দিল্লি পুলিশকে এ ব্যাপারে জানাতে বলেছে হাইকোর্ট। ওদিকে, দিল্লিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই কমিশনার বদল করা হয়েছে।দিল্লির নতুন পুলিশ কমিশনার হচ্ছেন এস এন শ্রীবাস্তব।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বিবৃতি দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, গত ৩৬ ঘণ্টায় দিল্লির কোথাও বড় কোনও ঘটনা ঘটেনি। মানুষের উচিত হবে গুজবে কান না দেওয়া এবং যে দুষ্কৃতীরা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়াতে চাইছে তাদের ফাঁদে পা না দেওয়া।

এর আগে গত রোববার থেকে ছড়িয়ে পড়া অশান্তিতে টানা কয়েকদিন পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। ১৪৪ ধারা অমান্য করে লোকজন রাস্তায় বন্দুক, লোহার রড, লাঠি হাতে নেমে আসে। পরিস্থিতি ক্রমশই খারাপ হয়েছে। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বহু বাড়ি ও দোকানে। উন্মত্ত জনতার হাতে প্রাণ ঝরে গেছে অনেক। ভাঙচুর হয়েছে গাড়িও।

বুধবার রাতেও মুসলিম অধ্যুষিত উত্তরপূর্ব দিল্লির ভজনপুরা, মৌজপুর ও কারাওয়াল নগরে অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল উত্তরপূর্ব দিল্লির সহিংসতা কবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে ‘সরকার শান্তি ফিরিয়ে আনবে’, ব্যক্তিগতভাবে এমন আশ্বাস দিয়ে গেলেও শান্তি ফিরে আসেনি।

অগ্নিসংযোগের খবর আসে ভজনপুরা, মৌজপুর ও কারাওয়াল নগর এলাকাগুলোতে। জোহরাপুরী-ভজনপুরায় বুধবার নতুন করে দাঙ্গা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ লাগোয়া জোহরাপুরীতে পুলিশের সঙ্গেও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। গভীর রাতে ব্রহ্মপুরী ও মুস্তাফাবাদ থেকেও অশান্তির খবর আসে।

চাঁদবাগ পুলিয়ায় সংঘর্ষ কবলিত এলাকায় একটি নর্দমা থেকে পুলিশ বুধবার উদ্ধার করে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি)-র অফিসার অঙ্কিত শর্মার মৃতদেহ। তিনি উত্তর-পূর্ব দিল্লির খাজুরি খাস এলাকার বাসিন্দা। বুলেটবিদ্ধ হয়ে অঙ্কিতের মৃত্যু হয়েছে। তার দেহে রয়েছে মারধরের আঘাতের চিহ্ন। অঙ্কিত খুনে আপ নেতা তাহির হুসেনের নাম জড়িয়েছে। তবে তাহির হুসেন কোনোকিছুতেই জড়িত নন বলে জানিয়েছেন।

ওদিকে, আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল মুসলিমদের ওপর অ্যাসিড হামলা। মুস্তাফাবাদ এলাকায় বৃহস্পতিবার বেশ কিছু আহত হাসপাতালে ভর্তি হন, যাদের অনেকের চোখে অ্যাসিড ঢালা হয়েছিল। দৃষ্টি হারান চার জন। খুরশিদ নামে এক জনের দু’চোখই নষ্ট হয়। দুই চোখ-সহ পুরো মুখ ঝলসে যায় ওয়কিল নামের আরেকজনের।

এনডিটিভি জানায়, জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস নিবিড়ভাবে দিল্লি পরিস্থিতি নজরে রেখেছেন। বিক্ষোভকারীদেরকে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করতে দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সংযত থাকা উচিত- এ বিষয়টির ওপরই গুতেরেস জোর দিয়েছেন। সেইসঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব শান্ত পরিবেশ এবং স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলেও গুতেরেস মত দেন।

দাঙ্গা শুরুর তিন দিন পর চতুর্থ দিন প্রথমবারের মতো এক বিবৃতিতে ‘শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের’ ডাক দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে একের পর এক রিভিউ মিটিং করে গেলেও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

দাঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ দিল্লি হাইকোর্ট পুলিশকে ঘৃণা ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে বলেছে। চার বিজেপি নেতার বক্ততৃার ভিডিও দেখার পর আদালত এমন নির্দেশনা দেয়। ওই বিজেপি নেতাদের মধ্যে কেন্দ্রের মোদীর সরকারের মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর ও স্থানীয় নেতা কপিল মিশ্রও আছেন। রোববার বিকালে এই কপিল মিশ্রের সমাবেশ থেকেই সহিংসতা শুরু হয় বলে অভিযোগ আছে।

দাঙ্গা থামিয়ে দিল্লিতে শান্তি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ‍নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালকে। বুধবার সন্ধ্যায় তিনি দ্বিতীয়বারের মতো নগরীর দাঙ্গা কবলিত এলাকাগুলোতে যান। দাঙ্গায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি জাফরাবাদ এলাকায় পুলিশের গাড়িবহর নিয়ে হাঁটার সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “ইনশাল্লাহ, এখানে শান্তি ফিরে আসবে।”

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই এক তরুণী এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে সাহায্যের জন্য করুণ আর্তি জানান। দাঙ্গাকারীদের সবাইকে ধরা হবে বলে তিনি তরুণীকে আশ্বাস দেন।

বুধবার দিল্লির বিধানসভায় দেওয়া এক বক্তৃতায় মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, “সহিংসতায় হিন্দু বা মুসলিম, কারো লাভ হবে না। দিল্লির সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে: লোকজন সবাই মিলেমিশে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারে অথবা তারা একে অপরকে আঘাত করে হত্যা করতে পারে।”

এই সহিংসতার জন্য বহিরাগত ও রাজনৈতিক উস্কানিকে দায়ী করেন তিনি। এর আগে দাঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী নামানোর দাবি জানিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু অমিত শাহের দায়িত্বে থাকা ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার দাবি প্রত্যাখ্যান করে।

দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র তীব্র সমালোচনা করেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে শাহর পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সোনিয়া দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালেরও সমালোচনা করেছেন। রোববার সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লির সরকার উভয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।