ট্রাম্প-মোদী ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে কে কি পেলেন?

  • নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
    Published: 2020-02-26 22:01:59 BdST

bdnews24

ভারতে প্রথম সফরে এক কোটি মানুষের স্বাগতম পাওয়ার আশা ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। সে আশা পুরোপুরি পূরণ না হলেও সফর একেবারে বৃথা যায়নি। ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুইজনের জন্যই এ সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প আমেরিকানদের দেখাতে চাইছিলেন,বিদেশেও তার বিপুল জনপ্রিয়তা আছে এবং যে দেশকে তিনি একসময় ‘কিং অব ট্যারিফ’ (শুল্কের রাজা) বলেছিলেন সে দেশটির সঙ্গেও তিনি ভালো চুক্তি করতে পারেন।

অন্যদিকে,কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের কারণে ভাবমূর্তি সংকটে ভূগতে থাকা মোদী চাইছিলেন ইতিবাচক খবরের শিরোনাম হতে।

শেষে দুই দেশের মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত বাণিজ্য চুক্তির সাধ অপূর্ণ থেকে গেলেও দু’নেতারই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। ধুম-ধাড়াক্কা নাচগান আর জমকালো অনুষ্ঠানের বাইরে কূটনৈতিক দিক থেকে দু’পক্ষের প্রাপ্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে বিবিসি:

গ্রহণযোগ্যতা:

ট্রাম্পের ভারত সফরের প্রথমদিনটি মূলত জনগণের কাছে রাজনৈতিক দিক থেকে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার চেষ্টাতেই কেটেছে। পেয়েছেনও যথেষ্ট। গুজরাটের আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে শুরু করে মোতেরা ক্রিকেট স্টেডিয়াম পর্যন্ত কোটি না হলেও লাখো মানুষ রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে।

স্টেডিয়ামে উপস্থিত লাখের বেশি মানুষের সামনে বক্তব্য রেখেছেন ট্রাম্প।বলিউড তারকা, ক্রিকেটারসহ গুণী ব্যক্তিদের নাম নিয়েছেন- যা সহজেই ভারতীয়দের মনে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট।

ট্রাম্পের বক্তব্য শুধু ভারতীয়দের মন জয়ের জন্যই নয়,ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার জন্যও উপযোগী হয়েছে। ‘নমস্তে ট্রাম্প’-এর ভিডিও এরই মধ্যে  নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার শুরু করেছে ট্রাম্প শিবির।

এছাড়া বক্তব্যে বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদির প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। মোদীর ভাবমূর্তি সংকট কাটাতে তা সহায়ক হবে বলেই মনে করেন ব্রুকলিন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো তানভি মদন।

তিনি বলেন, “ট্রাম্প তাকে (মোদী) খুবই শান্তশিষ্ট, মহান এক নেতা এবং এমন একজন ব্যক্তিত্ব বলে বর্ণনা করেছেন যিনি জনগণের জন্য কাজ করেন। মোদী এসব স্তুতিবাক্য সানন্দেই গ্রহণ করবেন।”

আর বিশেষ করে দিল্লিতে নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)নিয়ে সংঘর্ষে প্রাণহানির এ সময়ে যখন মোদীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে- ঠিক সে সময়েই ট্রাম্পের ওই প্রশংসাবাণী অবশ্যই গুরুত্ববাহী।

যে চুক্তি হয়নি আর যা হয়েছে:

গতবছর শুল্ক লড়াইয়ের জেরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তিক্ততা কাটাতে ট্রাম্প এবার ২৫ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে একটি চুক্তি করতে আগ্রহী ছিলেন।কিন্তু তা হয়নি।

যদিও ব্রুকলিন ইন্সটিটিউটের বিশ্লেষক তানভি মদন বলেছেন, চুক্তির সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তিনি বলেন,এ সফর অন্ততপক্ষে ভারতকে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যের ‘হিট লিস্ট’-এর নিচে নামিয়ে আনবে। কারণ বাণিজ্য চুক্তির জন্য আলোচনা এখনও চলছে।

‘কন্ট্রোল রিস্ক কনসালটেন্সি’র সহকারী পরিচালক প্রত্যুষ রাও বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই দুই দেশের মধ্যে সবকিছু ভাল যাচ্ছে না।ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কিছু সময়ের জন্য ভাসা ভাসা হয়ে পড়েছে বলেই প্রতীয়মাণ হয়েছে।সেদিক থেকে সম্পর্কোন্নয়নে প্রেসিডেন্টের সফরের চেয়ে বন্ধুত্ব জাহিরের ভাল উপায় আর হতে পারত না।

যে চুক্তি হয়েছে:

ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি পছন্দ করেন।এবারও যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে বলার মত কিছু সুখবর নিয়ে গেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তিনশ’ কোটি ডলারের জঙ্গি হেলিকপ্টার ও সামরিক সাজ- সরঞ্জাম কিনছে ভারত। আরেকটি চুক্তি হয়েছে এক্সন মোবিলের সঙ্গে।এর আওতায় ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করবে।

প্রত্যুষ রাও বলেন, প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা দরকার। তাছাড়া তারা পেট্রোলিয়াম আমদানির ক্ষেত্রেও বহুমুখী হতে চাইছিল। সেদিক থেকে এ চুক্তি উপযোগী হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হলেও ভারত মূলত ৫০ শতাংশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনে রাশিয়া থেকে। ফলে মস্কোকে হাতে রেখেই প্রতিরক্ষা-ক্ষেত্রে বহুমুখী হতে পারলে ভারতের কোনও ক্ষতি হবে না।

চীন নিয়ে উদ্বেগ দু’পক্ষকে কাছে এনেছে:

ভারত সফরকালে সরাসরি চীনের নাম না নিলেও বেশ কয়েকবারই তাদের সমালোচনা করে খোঁচা দিয়েছেন ট্রাম্প।তিনি একাধিকবার চীনা প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের ৫জি কার্যক্রমের ওপর ওয়াশিংটনের সন্দেহ নিয়েও ইঙ্গিত করেছেন।

‘দ্য উইলসন সেন্টার’ এর উপ-পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন,“ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বড় প্রভাবক চীন। আপনি একই মূল্যবোধ বা মোদী-ট্রাম্পের বন্ধুত্বের কথা বলতে পারেন। তবে যেটি সত্যিই দুই দেশকে কাছাকাছি আনছে, তা হল সমকেন্দ্রিক স্বার্থ।দু’দেশই চীনকে বড় ধরনের উদ্বেগ হিসাবে দেখে।”

আধুনিক চীনের উচ্চাশা দক্ষিণ চিন সাগরকে কেন্দ্র করে। লাগোয়া দেশগুলিকে নিজের মুঠোয় রাখতে চেয়ে চীন বিতর্কিত পদক্ষেপ নিচ্ছে। অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তিতে আমেরিকাকে টক্করও দিতে চাইছে। ফলে, হনোনুলুতে বিশাল প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ড-কে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ নাম দিয়ে নতুন ভাবে ঢেলে সাজতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রেকে।

আর এটিই নিজ নিজ স্বার্থের কারণে ওই অঞ্চলে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এনেছে। এবারের ভারত সফরে ট্রাম্প তার বক্তব্যে চীনের পছন্দের এশিয়া প্যাসিফিক শব্দটি না বলে এই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কথাই বলেছেন।

একই স্বার্থের দিক থেকে কাছে এসেছে জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াও। এ চারটি দেশকে নিয়ে ‘কোয়াড’ নামে একটি জোটও গঠিত হয়েছে। সদস্য চারটি দেশ হচ্ছে, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। এর সঙ্গে আছে ‘ব্লু ডট প্রকল্প’। এর মাধ্যমে চার দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।যেটি ভারতের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়।

ওদিকে, ‘কোয়াড’ এর বিষয়টি দৃশ্যপটে না থাকলেও গতবছর এটিকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলেছে। ভারতে গিয়ে ট্রাম্প এবার এর কথা উল্লেখ করে এটি পুনরুজ্জীবিত করারই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্হিত দিয়েছেন। যেটিকে চীন তাদের বেল্ট এন্ড রোড প্রকল্পের পাল্টা হিসাবেই দেখে।

কাশ্মীর ও পাকিস্তান

বিশ্বনেতারা সাধারণত ভারত সফরের সময় কাশ্মীর এবং পাকিস্তান সম্পর্কে কিছু বলার ক্ষেত্রে একটা সীমার মধ্যে থেকেই কথা বলেন। তবে সে পথে হাঁটেননি ট্রাম্প। বলেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে তার দারুণ সম্পর্ক। কাশ্মীর ইস্যুতে আবারও দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।

প্রত্যুষ রাওয়ের মতে, মোদী একথায় কিছু মনে করবেন না। কারণ, মোদীর অনেক বেশিই প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। আর ভারতীয়রাও ট্রাম্পের ওই কথাকে অপ্রাসঙ্গিক একটি ছোটখাটো বিষয় হিসাবেই দেখবে।

ভারতে চলমান বিক্ষোভ ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিয়েও কোনও মন্তব্য করেননি ট্রাম্প। বরং,তিনি অপ্রত্যাশিত কথাই বলেছেন।ভারতে সব সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখতে চান মোদী তা বলার পাশাপাশি এ লক্ষ্যে তার কাজ চালিয়ে যাওয়ারও ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

তাই কাশ্মীর আর পাকিস্তান নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে কোনও ভারতীয়র মনে অস্বস্তি হয়ে থাকলেও তা মুছে দিতে পারে এ প্রশংসাবাণীই।

সামনে কী হবে:

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড আগে থেকে অনুমান করা মুশকিল হওয়ায় সম্পর্কের জন্য তা  বড় ঝুঁকি। তার সঙ্গে আছে অন্য সমস্যাও।

ভারতের অর্থনৈতিক মন্দা,বাড়তে থাকা সামাজিক অস্থিরতা এবং করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরগতির আশঙ্কা সম্পর্কে কালো ছায়া ফেলতে পারে বলেই মত বিশ্লেষকদের।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেও সর্বোতভাবে ট্রাম্পকে পাশে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও তাতে জাপানের সমালোচনায় ক্ষ্যান্ত দেননি ট্রাম্প। এদিক থেকে আপাতত ভাল অবস্থানে আছে ভারত।

কৌশলগত ও নিরাপত্তাজনিত কারণে ট্রাম্পকে পাশে রাখা প্রয়োজন মোদীর। ভারত সফরে জমকালো অভ্যর্থনায় মোদি বুঝিয়েও দিয়েছেন, এ সম্পর্ক তিনি কতটা ধরে রাখতে চান।

কিন্তু তাদের এ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মূলত আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ওপর।

সফরকালে ট্রাম্প-মোদীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের (ব্রোম্যান্স)পূর্ণ প্রদর্শনী দেখা গেছে। সেটিই এখন দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তিমূল হয়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রে একই নেতা ক্ষমতায় থাকলেই ভারতের জন্য সুবিধা।কেবল ট্রাম্পের অননুমেয় বৈশিষ্ট্যটি এ সম্পর্ককে যাতে কোনও ঝামেলায় না ফেলে সেটিই প্রত্যাশা।

বিশ্লেষক প্রত্যুষ রাও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশাল জনসমাগম ও মনোযোগ কাড়ার মতো চমক চেয়েছিলেন। ভারত তাকে সেটা দিয়েছে। এখন এর প্রভাব কত দিন থাকে তাই-ই দেখার বিষয়।